Today is Thursday & June 27, 2019 (GMT+06)

New Muslim interview ebook

প্রশ্ন/উত্তর

মুহাম্মদ সা: বলছেন, কালোজিরা সকল রোগের ওষুধ, তাহলে ক্যান্সারের রোগীকে কালোজিরা খাওয়ানো হয়না কেন?

একটা বক্স হাতে FBS এর দিকে আরজুকে যেতে দেখলাম। ডাক দেবার পর থামলে জিজ্ঞেস করি, কই যাচ্ছিস? আরজু বললো, ক্যান্সার আক্রান্ত এক মায়ের জন্য টাকা তুলতে যাচ্ছে সে। এরকম জনহিতকর কাজে সবসময়ই এগিয়ে আসে আরজু, তবে কাউকে বলেনা, এমনকি আমাকেও যেতে বলেনা। ভাবলাম এমনিতেই তো ফ্রি আছি, তাই আরজুর সাথে গেলাম এক ক্যান্সার আক্রান্ত মায়ের জন্য টাকা তুলতে। সবার কাছে গিয়ে ঐ অসুস্থ মায়ের দূর্দশার কথা বলতে থাকলাম।যে যেরকম পারছে দানবক্সে টাকা দিচ্ছে, কেউ ১০ টাকা, কেউ ২০ টাকা, আবার একটু আগে একজন ১০০০ টাকারও একটা নোট দিলেন। ডাকসুর সামনে যেতে বিপ্লব ভাইকে দেখলাম।সিগারেটের ধূয়া আকাশের দিকে ছেড়ে ঐ ধোয়ার দিকে তাকিয়ে আছেন। বিপ্লব ভাইয়ের কাছে গিয়ে একটু কথাবার্তা বলে ক্যান্সার আক্রান্ত ঐ মায়ের জন্য টাকা চাইলাম। বিপ্লব ভাই হেসে বললেন, "এই ১০ লক্ষ টাকা তুলে আর কী করবা তার চেয়ে বরং ঐ মা'কে সামান্য কালোজিরা খাওয়াও।ঠিক হয়ে যাবেন।" এরকম মুহূর্তে বিপ্লব ভাইয়ের মজা নেওয়া দেখে আমার কিছুটা বিরক্ত লাগলো, বেচারা সিচুয়েশনও বুঝেননা।বিরক্তির সুরে বললাম, "ভাই এগুলো কি বলছেন,ক্যান্সার হইছে এর মধ্যে কালোজিরা খাইয়ে কি হবে? বিপ্লব ভাই হাসলেন, হাসি থামিয়ে বললেন, "তোমাদের নবী নাকি বলছেন কালোজিরা সকল রোগের ওষুধ (!) তাহলে আবার টাকা তুলে ক্যান্সার রোগীদের সাহায্য করার দরকার কি?কালোজিরা খাওয়ালেই তো হয়।" বিপ্লব ভাই যেটা বলছেন, সেটাতো আসলেই সত্যি। ছোটবেলায় এরকম ওয়াজ শুনেছিলাম যে, কালোজিরা খাইলে সব রোগ কমে যায়, তাহলে ক্যান্সার রোগীকে কালোজিরা খাওয়ানো হয়না কেন? নাকি এই হাদীসটি অযৌক্তিক! আরজু বিপ্লব ভাইকে পাল্টা জিজ্ঞেস করলো, "আচ্ছা ভাই,আপনি কি এই হাদীসটা কোনো হাদীস গ্রন্থ থেকে পড়েছেন, কিংবা কোনো হাদীসের এপস থেকে পড়েছেন?" বিপ্লব ভাই অনেকটা রেগে গিয়ে বললেন, "তার মানে,আমি কি মিথ্যা বলছি? এটা সহীহ বুখারীর হাদীস।" আরজু বললো, "ভাই আমি ঐটা বলিনি, হাদীসটা সহীহ না জাল।আমি জিজ্ঞেস করছি এই হাদীসটা আপনি কোথায় থেকে জানছেন? মুক্তমনা ব্লগ থেকে নাকি হাদীসের বই থেকে?" বিপ্লব ভাইয়ের কন্ঠ এখন একটু নরম হলো, তিনি বললেন, "আমি ব্লগ থেকে জানছি।" আরজু হাসলো, "আমি জানতাম এরকমই হবে।আপনারা হাদীস শিখেন মুক্তমনা ব্লগে ঢুকে, হাদীসের এতগুলো বই বাদ দিয়ে যেখানে ইসলামের বিদ্বেষী লেখালেখি হয় সেখানে যান। হাদীস শিখতে।" আরজুর কথাশুনে বিপ্লব ভাই সত্যি সত্যি রেগে গেলেন, আরজুকে শাসিয়ে বললেন, "হইছে হইছে এবার আমার প্রশ্নের উত্তর দাও।ক্যান্সার রোগীকে তোমাদের নবীর কথামতো কালোজিরা খাওয়াও না কেন?" আরজু বললো, "আপনার বলা মিথ্যা হাদীসটির সংশোধন আগে করে নেই। নবী সা: বলেছেন, কালোজিরা সাম ব্যতীত সকল রোগের উপশম (healing)। সাম মানে হলো মৃত্যু। (বুখারী: ৫৬৮৮, তিরমিযী ২০৪১, ইবনু মাজাহ ৩৪৪৭)। ভালো করে দেখুন এখানে ওষুধ বলা হয়নি, বলা হয়েছে উপশম/healing। এখন বলুন উপশম আর ওষুধ কি এক হয়?" নিজের ভূয়া তথ্যের জালে নিজেই আটকে গিয়ে বিপ্লব ভাইয়ের মুখ দিয়ে আর কোনো কথা বের হচ্ছেনা। আরজু বলে চললো, "তবে কালোজিরাতে এমন সব উপাদান আছে যা ক্যান্সারসহ বিভিন্ন রোগের ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের পথপ্রদর্শক ইবনে সিনা তার বিখ্যাত গ্রন্থ 'কানুন ফিত তিবব' (Canon Of Medicine) গ্রন্থে বলেছেন, কালোজিরা দেহের প্রাণশক্তি বাড়ায় এবং এর মধ্যে শতাধিক পুষ্টি উপাদান রয়েছে যার মধ্যে ২১ শতাংশ প্রোটিন, ৩৮ শতাংশ শর্করা, স্নেহ পদার্থ ৩৫ শতাংশ এবং বাকি অংশ ভিটামিন ও খনিজ।" বিপ্লব ভাই বললেন, এগুলো তো তোমদের নবীর হাদীস ডিফেন্স করতে গিয়ে মুসলিম বিজ্ঞানীর কথা।তিনি তো কালোজিরার পক্ষেই সাফাই গাইবেন। আরজু হাসলো, "আপনাদের নিয়ে পারিও না! আমেরিকার বিখ্যাত ডাক্তার জোসেফ মেরকোলার (Joseph Mercola) নাম শুনছেন?" বিপ্লব ভাই না সূচক মাথা নাড়লেন। আরজু বলে চললো, উনি হলেন আমেরিকার একজন বিখ্যাত ডাক্তার। Fat for fuel:A Revolution, The No-Grain Diet এরকম কয়টি বিখ্যাত বইও লিখেন। কালোজিরা নিয়ে ৬৫০ টা রিসার্চ করা হয় উনার অধীনে। এই রিসার্চ এর সমাপ্তীতে তিনি বলেন,কালোজিরার মধ্যে ফার্মাকোলজিকাল কমপক্ষে ২০ টা উপাদান আছে। তারমধ্যে থাইমোকুইনইন (Thymoquinone) হলো এন্টি-ক্যান্সারের জন্য ব্যবহৃত উপাদান। কালোজিরার মধ্যে এই থাইমোকুইনইন উপাদানটি পাওয়া যায়। অক্সিডিটিভ স্ট্রিস (Oxidative Stress) ডায়াবেটিস নিরোময়ে ব্যবহৃত হয়। কালোজিরার মধ্যে এই উপাদানটি ও পাওয়া যায়। বিপ্লব ভাইয়ের হাতের সিগারেটের শেষ টান দিলেন। আরজু বললো, "নবী সা: বলেননি রোগ হলে কালোজিরা খেতে, তিনি বলেছেন কালোজিরা খেতে যাতে সেটি রোগ প্রতিরোধ শক্তিকে আরো শক্তিশালী করে। কিন্ত হাদীসের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে আপনি বলছেন ওষুধের কথা!" সিগারেট ফেলে দিয়ে বিপ্লব ভাই পকেট থেকে ১০ টাকা বের করে দানবক্সে রাখলেন। আমি বললাম, বিপ্লব ভাই! সিগারেটের পকেটে কিন্ত লেখা আছে, 'Smoking causes Cancer' তাই ধূমপানও করুন, কালোজিরাও খান। আমার কৌতুক শুনে বিপ্লব ভাই হাসলেন। আমরা চললাম পরবর্তী জনের কাছে, "ভাই, আমাদের বন্ধুর মা ক্যান্সারে আক্রান্ত, একটু যদি সাহায্য করতেন..." লেখক ঢাবির ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের শিক্ষার্থী বিয়ে করার সেরা সময় কখন? বাংলা সাহিত্যে ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের (১৮২৫-১৮৯৪) পারিবারিক প্রবন্ধসমূহ যথেষ্ট খ্যাত হয়ে আছে। তার লেখা এসব প্রবন্ধের মধ্যে একটি হলো, বাল্যবিয়ে নিয়ে। বাংলা ভাষায় তিনিই প্রথম বাল্যবিয়ে নিয়ে আলোচনা করেছেন। ভূদেব বাল্যবিয়ের সমর্থক ছিলেন। তিনি তার প্রবন্ধে বলেছেন- ‘মেয়েরা বিবাহের পর শ্বশুর বাড়িতে চলে যায়। শ্বশুর বাড়ির পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে না পারলে সে সুখী হতে পারে না। মেয়েরা অল্প বয়সে বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ি গেলে সেই বাড়িরই একজন হয়ে বেড়ে ওঠে। তাই তাদের পক্ষে সহজ হয় শ্বশুরবাড়ির জীবনধারার সাথে একইভূত হতে পারা। কিন্তু বেশি বয়সের মেয়েদের পক্ষে এটা সম্ভব হতে পারে না। তারা শ্বশুরবাড়িতে জড়িয়ে পড়তে চায় বিবাদবিসম্বাদে।’ ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের সময়ের হিন্দু পরিবার সাধারণত হতো যৌথ পরিবার। মেয়েদের হতে হতো তাদের শ্বশুর বাড়িতে সেই যৌথ পরিবারেরই একজন। ভূদেব এই দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখেছিলেন বাল্যবিয়েকে। হিন্দুশাস্ত্রে বলা হয়, অষ্টমবর্ষে গৌরী দান। হিন্দুধর্মে বাল্যবিয়েকে সমর্থন করা হয়। ভূদেবের ওপর পড়েছিল হিন্দুশাস্ত্রেরও প্রভাব। তাদের শাস্ত্রে বাল্যবিয়ে সমর্থন করা হয়েছে প্রধানত দু’টি কারণে। একটি কারণ হলো, বাল্যবিয়ে হলে মেয়েরা খুব অল্প বয়সেই পেতে পারে স্বামীর সুরক্ষা। অন্য দিকে, অল্প বয়সে বিয়ে হলে মেয়েরা যৌন কামনার বশে বিপথগামী হয় না। কেননা, স্বামী তাদের যৌনতৃষ্ণা মেটাতে পারে। স্ত্রীরা সহজেই থাকতে পারে সতীসাধী। বজায় থাকতে পারে সামাজিক শৃঙ্খলা। এই যুক্তি দু’টি রবীন্দ্রনাথও মানতেন, যদিও তিনি ছিলেন না খাঁটি হিন্দু। তিনি ছিলেন ব্রাহ্ম। কিন্তু ব্রাহ্ম-সমাজের যে শাখার তিনি ছিলেন প্রতিনিধি, সেই আদি ব্রাহ্ম সমাজের অনেক রীতি নীতিই ছিল হিন্দুশাস্ত্রের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। রবীন্দ্রনাথ তার কন্যার বিয়ে দিয়েছিলেন, যতদূর জানি, মাত্র ৯ বছর বয়সে। একসময় বিলাতেও খুব কম বয়সে মেয়েদের বিয়ে হতো। শেকসপিয়রের বিখ্যাত নাটক রোমিও জুলিয়েটে আমরা দেখি, নায়িকা জুলিয়েটের বয়স যখন চৌদ্দ, তখনই সে রোমিওর প্রেমে হতে পেরেছে প্রমত্তা। একসময় বিশ্বের সর্বত্রই মনে করা হতো মেয়েরা ঋতুমতী হলে সে হয় বিয়ের উপযুক্ত। সেটাই তার বিয়ের বয়স। ইসলাম ধর্মে বিয়েতে মেয়েদের অনুমোদন লাগে। মেয়েরা স্বামীকে কবুল না করলে ইসলামি মতে বিয়ে হতে পারে না। কিন্তু বাংলার মুসলমান সমাজে বাস্তব ক্ষেত্রে এই রীতি ঠিক প্রচলিত ছিল বলে মনে হয় না। অভিভাবকেরাই তাদের মেয়ের বিয়ে ঠিক করতেন। আর তাদের কন্যারা পারিবারিকভাবে স্থিরীকৃত ব্যক্তিকেই মেনে নিত তাদের স্বামী হিসেবে। শেখ মুজিবুর রহমান তার অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন : একটা ঘটনা লেখা দরকার, নিশ্চয় অনেকে আশ্চর্য হবেন। আমার যখন বিবাহ হয়, তখন আমার বয়স বারো তেরো বছর হতে পারে। রেণুর বাবা মারা যাবার পরে ওর দাদা আমার আব্বাকে ডেকে বললেন, তোমার বড় ছেলের সাথে আমার এক নাতনীর বিবাহ দিতে হবে। কারণ, আমি সমস্ত সম্পত্তি ওদের দুই বোনকে লিখে দিয়ে যাব। রেণুর দাদা আমার আব্বার চাচা। মুরব্বির হুকুম মানার জন্যই রেণুর সাথে আমার বিবাহ রেজিস্ট্রি করে ফেলা হল। আমি শুনলাম, আমার বিবাহ হয়েছে। তখন কিছুই বুঝতাম না, রেণুর বয়স তখন বোধহয় তিন বছর হবে। রেণুর যখন পাঁচ বছর, তখন তার মা মারা যান। একমাত্র রইল তার দাদা। দাদাও রেণুর সাত বছর বয়সে মারা যান। তারপর, সে আমার মার কাছে চলে আসে। আমার ভাইবোনদের সাথেই রেণু বড় হয়। রেণুর বড়বোনেরও আমার আরেক চাচাতো ভাইয়ের সাথে বিবাহ হয়। এরা আমার শ্বশুর বাড়িতে থাকল, কারণ আমার ও রেণুর বাড়ির দরকার নাই। রেণুদের ঘর আমাদের ঘর পাশাপাশি ছিল, মধ্যে মাত্র দুই হাতের ব্যবধান (অসমাপ্ত আত্মজীবনী। পৃষ্ঠা ৭-৮, দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ঢাকা ২০১২)। শেখ মুজিব তার বিয়ের যে বর্ণনা দিয়েছেন সেটা ছিল তার সময়ের মুসলমান সমাজের প্রায় সাধারণ ধারা। নিকট আত্মীয়ের মধ্যে বিয়ে হতো। কেননা, তাতে বাড়ত পারিবারিক বন্ধন। হিন্দু সমাজ ও মুসলমান সমাজে বাল্য-বিবাহ থাকলেও দু’টি সমাজের পরিবার প্রথা ঠিক এক ছিল না। যেমন হিন্দু সমাজে বিধবার বিয়ে ছিল অসিদ্ধ। কিন্তু মুসলমান সমাজে তা ছিল না। মুসলমানদের সমাজে বিধবা নারীরা ইচ্ছা করলেই আবার বিয়ে করতে পারতেন। এ ছাড়া মুসলিম নারীরা পেতে পারতেন তাদের মাতা-পিতার সম্পত্তির অংশ। পেতে পারতেন মৃত স্বামীর সম্পত্তির ভাগও। তাই স্বামীর মৃত্যু হলেই তাকে অর্থনৈতিক দিক থেকে অসহায় অবস্থার মধ্যে পড়তে হতো না। এখনো তারা শরিয়তের বিধান অনুসারে পিতা-মাতা ও স্বামীর সম্পত্তির অংশ পাওয়ার অধিকারী। এ ছাড়া তখনো পেতেন এবং এখনো পাচ্ছেন বিয়েতে মোহরানা। হিন্দু সমাজে যেহেতু বিধবা বিয়ে ছিল না, তাই বাল্য-বিধবাদের সমস্যা হয়ে উঠেছিল খুবই প্রবল। অনেক হিন্দু বিধবা ব্রিটিশ শাসনামলে স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেছেন এবং মুসলিম পাত্রকে বিয়ে করেছেন। বাংলায় আদমশুমারি আরম্ভ হয় ১৮৭১ সাল থেকে। ওই সময় বাংলায় হিন্দুর সংখ্যা মুসলমানের চেয়ে বেশি ছিল। এর পর ১৮৮১ সালে যে আদমশুমারি হয় তাতে দেখা যায়, হিন্দুর সংখ্যা কমতে ও মুসলিম সংখ্যা বাড়তে। এর পর থেকে মুসলিমদের সংখ্যা ক্রমেই বেড়েছে। অনেকে বলেন, এর একটা কারণ হলো- হিন্দু বিধবাদের মুসলমান স্বামী গ্রহণ। তবে এটাই যে প্রধান কারণ, তা বোধহয়, বলা চলে না। কেননা সে সময় দেখা যায়, হিন্দু মায়েদের সন্তান কম হতে আর মুসলমান মায়েদের সন্তান বেশি হতে। অপরদিকে, যেসব হিন্দু মহিলা মুসলমান ছেলেকে বিয়ে করতেন, তাদেরও সন্তান হতো বেশি। কেন এরকম ঘটেছে, তার ব্যাখ্যা এখনো কেউ দিতে পারেননি। প্রচার করা হয়, বাংলাদেশে ইসলাম জোর করে প্রচার করা হয়েছিল। কিন্তু ইতিহাস বলে ব্রিটিশ শাসনামলে বাংলায় মুসলমানের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। আর এ সময় গায়ের জোরে ইসলাম প্রচারের কোনো প্রশ্নই ছিল না। অনেক মিথ্যা কথা এখন প্রচার করা হচ্ছে। এর মধ্যে গায়ের জোরে ইসলাম প্রচারও হলো অন্যতম। একসময় হিন্দু সমাজে অনেক ভয়ঙ্কর প্রথা প্রচলিত ছিল। যেমন স্বামীর চিতায় তার বিধবা স্ত্রীকে পুড়িয়ে মারা। লর্ড বেন্টিঙ্ক এই ‘সতীদাহ’ প্রথাকে রদ করেন ১৮২৯ খ্রিষ্টাব্দে। বাংলায় ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় সতীদাহ হতো অনেক বেশি। মুসলমান সমাজে এরকম কোনো প্রথা ছিল অকল্পনীয়। কেননা, মুসলাম নারী-পুরুষকে মৃত্যুর পর কবর দেয় হতো, পোড়ানো হতো না। কিন্তু এখন প্রমাণ করার চেষ্টা হয় যে, মুসলমান নারীরা ছিলেন হিন্দু নারীর তুলনায় অনেক বেশি নির্যাতিতা। যেটাও ইতিহাসের নিরিখে সত্য নয়। বাইবেলে বলা হয়েছে ডাইনি মেয়েকে পুড়িয়ে মারার কথা। ইংল্যান্ডে একসময় অনেকে মেয়েকে ‘ডাইনি’ বলে কথিত বিচার করে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। ইংল্যান্ডে ডাইনি বলে কোনো মেয়েকে পুড়িয়ে মারার আইন উঠিয়ে দেয়া হয় ১৯৩৬ সালে। কিন্তু আল কুরআনে মেয়েরা কখনো ডাইনি হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়নি। এমনকি বলা হয়নি, হজরত আদম বেহেশত থেকে দুনিয়াতে পতিত হয়েছিলেন হাওয়া বিবির ‘গম খাবার উপদেশ’ শুনে। ইসলামে নারীকে ‘পাপের উৎস’ বলে বর্ণনা করা হয়নি। যেমন করা হয়েছে খ্রিষ্টান ধর্মে। আল কুরআনে বলা হয়েছে, মেয়েদের সম্মানসহকারে বিয়ে করতে হবে এবং পালন করতে হবে সংসার-ধর্ম (সূরা, ৪:১৯)। সুন্নি মুসলমানদের মধ্যে একটি বহুল প্রচলিত হাদিস হলো, আল্লাহ সবচেয়ে খুশি হন ক্রীতদাসকে মুক্তি দিলে। আর সবচেয়ে বেশি দুঃখ পান স্ত্রীকে তালাক দিলে যদিও সেই তালাক হয় আইনসম্মত। তবে ইসলামে বলা হয়নি মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স সম্পর্কে। রজঃবতী নারীকেই ধরে নেয়া হয়েছে বিয়ের উপযুক্ত হিসেবে। ছেলেদের বেলায়ও কোনো ন্যূনতম বয়সের কথা বলা হয়নি। ছেলেদের বিয়ের উপযুক্ত ধরা হয়েছে তাদের দেহে বীর্য উৎপাদন শুরু হলেই। অর্থাৎ ইসলামি মতে, নর-নারীর বিয়ে হতে পারে তারা সাবালক প্রজনন শক্তিসম্পন্ন হলেই। আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে ছেলেদের বিয়ের বয়স করা হয়েছে ২১ বছর আর মেয়েদের ১৮ বছর। কিন্তু ভারতের একটি হাইকোর্ট ২০১২ সালে রায় দিয়েছে, মুসলমান মেয়েরা ১৫ বছর বয়সেই বিবাহযোগ্যা বলে বিবেচিত হতে পারবে। পত্রিকার খবর (প্রথম আলো, ৩ ডিসেম্বর ২০১৬) পড়ে জানলাম, নিউ ইয়র্ক শহরে হিউম্যান রাইটস নামক সংগঠন পথসভা করে দাবি করেছে, বাংলাদেশে মেয়েদের বাল্যবিয়ে দেয়া চলবে না। কিন্তু খোদ যুক্তরাষ্ট্রে সব অঙ্গরাজ্যে বিয়ের ন্যূনতম বয়সের আইন এক নয়। যেমন নিউহ্যাম্পশায়ারে ১৩ বছরের মেয়ে ও ১৪ বছরের ছেলের মধ্যে বিয়ে হতে পারে, যদি মাতা পিতার অনুমোদন থাকে। এর চেয়েও কম বয়সের ছেলেমেয়েদের মধ্যে বিয়ে হতে পারে যদি আদালত অনুমতি দেন। কোনো কম বয়সী মেয়ে যদি গর্ভবতী হয়, তবে সে ক্ষেত্রে আদালত তার বয়স বিবেচনা না করেও তাকে বিয়ের অনুমতি দিতে পারেন। টেক্সাস অঙ্গরাজ্যে মেয়েদের বয়স ১৬ হলে, মাতা-পিতার অনুমতিতে সে বিয়ে করতে পারে। ১৮ বছর বয়স হলে সে বিয়ে করতে পারে মাতা-পিতার অনুমোদন ছাড়াই। আদালত বিশেষ বিবেচনায় যেকোনো বয়সের মেয়েকেই বিয়ের অনুমতি দিতে পারে। আসলে টেক্সাসে মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স বলে কিছু বেঁধে দেয়া হয়নি। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মানবাধিকারবাদীরা প্রতিবাদ তুলছেন বাল্যবিয়ের বিরুদ্ধে। সব মুসলমান দেশের বিয়ের বয়স এক নয়। মালয়েশিয়াতে শরিয়াহ আদালত অনুমতি দিলেই যেকোনো বয়সের মুসলমান মেয়েরই বিয়ে হতে পারে। আমাদের দেশে কিছু বুদ্ধিজীবী বিশেষভাবেই হয়ে উঠেছেন ‘ভারতপন্থী’। তারা সবকিছুতেই চাচ্ছেন ভারতকে অনুকরণ করতে। কিন্তু ভারতেও এখন দাবি উঠছে ১৮ বছরের পরিবর্তে মেয়েদের বিবাহের ন্যূনতম বয়স ১৬ বছর করার। মেয়েদের জীবন আর ছেলেদের জীবন এক নয়। মেয়েদের জীবনে বার্ধক্য আসে অনেক তাড়াতাড়ি। তারা হারায় তাদের প্রজনন ক্ষমতা। বিশেষ করে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশসমূহে। মেয়েদের বিয়ের বয়স নির্ধারণের সময় তাদের যৌবনের ওপর জলবায়ুর প্রভাবকেও বিবেচনায় নেয়া উচিত। এটা আমরা নিতে চাচ্ছি বলে মনে হচ্ছে না। আমরা বলছি কম বয়সী মেয়েদের বিয়ে হলে তাদের স্বাস্থ্যহানি ঘটবে। কিন্তু এটা কতদূর সত্য, তা বলা যায় না। কেননা, নয় দশ বছরের মেয়েরা রজঃমতী হলেও অধিকাংশের ক্ষেত্রেই তারা হয় না প্রজনন-শক্তিসম্পন্না। একে বলা হয় বয়োসন্ধির অনুর্বরতা (Adolescent sterility)। অন্য দিকে, বেশি বয়সের মেয়েরা বিয়ে করলে তাদের সন্তান হাবাগোবা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কেননা, বেশি বয়সের মায়েদের জরায়ুর আয়তন যথাযথভাবে বৃদ্ধি পেতে চায় না। ফলে ভ্রুণের মাথার ওপর পড়ে চাপ। এতে মাথার আয়তন হতে চায় ছোট। তাতে মগজের পরিমাণ হয় কম। এসব ছেলে হয় হাবাগোবা। যাকে ইংরেজিতে বলে Mongoloid Imbecility। এ ছাড়া বেশি বয়সের মায়েদের সন্তান প্রতিপালনের কাজে ধৈর্যচ্যুতি ঘটে। তারা সুষ্ঠুভাবে সন্তান প্রতিপালন করতে পারেন না, অল্পতেই হয়ে যান বিরক্ত। মানুষ স্তন্যপায়ী প্রাণী। মানব শিশু সাধারণভাবে বাঁচে মাতৃস্তন্য পান করে। কিন্তু বেশি বয়সের মেয়েদের দুগ্ধ-ক্ষরণ হতে দেখা যায় কম। এটাও হয়ে ওঠে অনেক ক্ষেত্রে সমস্যারই কারণ। প্রচার করা হচ্ছে, পুরুষ শাসিত সমাজে নারীরা হয় গৃহবন্দী। কিন্তু বাস্তবে নারীরা গৃহবন্দী হন সন্তানের প্রতি তাদের ভালোবাসার কারণে; পুরুষ শাসনের ফলে নয়। গড়পড়তা মেয়েদের পুরুষের চেয়ে কায়িক শক্তি কম। কায়িক শক্তি কম বলে তারা গৃহকর্মে যতটা পারদর্শী, গৃহের বাইরে যেসব কাজে বেশি শক্তির প্রয়োজন হয়, সেটা তারা করতে পারেন না। এর জন্য নারী-পুরুষের মধ্যে গড়ে উঠেছে শ্রম বিভাজন। এটাকে কোনো মতেই ‘পুরুষ শাসনের ফল’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে না। তবুও এ দেশের বাম চিন্তকেরা সেটাই করতে চাচ্ছেন। তাদের এই চিন্তা আমাদের পরিবার ব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলতে পারে। নৃতাত্ত্বিকদের মতে, মানবশিশু জন্মায় খুবই অসহায়ভাবে। তার হাঁটতে শিখতেই লেগে যায় এক বছরের বেশি সময়। এ কারণে মানবশিশু প্রতিপালনে প্রয়োজন হয় অধিক যত্নের। পরিবার প্রথা গড়ে ওঠার এটাই হলো প্রধান কারণ। রিরংসা জৈবিক, কিন্তু পরিবার প্রথা হলো সাংস্কৃতিক। মানুষ যৌন প্রবৃত্তি জন্মগতভাবেই পায়। কিন্তু পরিবার প্রথা সে লাভ করে সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার সূত্রে। এবনে গোলাম সামাদ লেখক : প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

একজন অবিশ্বাসীর বিশ্বাস

  • আমি রুমে ঢুকেই দেখি সাজিদ কম্পিউটারের সামনে উবুঁ হয়ে বসে আছে।খটাখট কি যেন টাইপ করছে হয়তো। আমি জগ থেকে পানি ঢালতে লাগলাম। প্রচন্ড রকম তৃষ্ণার্ত।তৃষ্ণায় বুক ফেটে যাবার জোগাড়।সাজিদ কম্পিউটার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললো,- 'কি রে, কিছু হইলো?'আমি হতাশ গলায় বললাম,- 'নাহ।' - 'তার মানে তোকে একবছর ড্রপ দিতেই হবে?'- সাজিদ জিজ্ঞেস করলো। আমি বললাম,- 'কি আর করা। আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন।' সাজিদ বললো,- 'তোদের এই এক দোষ,বুঝলি? দেখছিস পুওর এ্যাটেন্ডেন্সের জন্য এক বছর ড্রপ খাওয়াচ্ছে, তার মধ্যেও বলছিস, আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন। ভাই, এইখানে কোন ভালোটা তুই পাইলি,বলতো?' - সাজিদ সম্পর্কে কিছু বলে নেওয়া দরকার।আমি আর সাজিদ রুমমেট। সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাইক্রো বায়োলজিতে পড়ে।প্রথম জীবনে খুব ধার্মিক ছিলো।নামাজ-কালাম করতো।বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে কিভাবে কিভাবে যেন এগনোষ্টিক হয়ে পড়ে। আস্তে আস্তে স্রষ্টার উপর থেকে বিশ্বাস হারিয়ে এখন পুরোপুরি নাস্তিক হয়ে গেছে।ধর্মকে এখন সে আবর্জনা জ্ঞান করে।তার মতে পৃথিবীতে ধর্ম এনেছে মানুষ।আর 'ইশ্বর' ধারনাটাই এইরকম স্বার্থান্বেষী কোন মহলের মস্তিষ্কপ্রসূত। সাজিদের সাথে এই মূহুর্তে তর্কে জড়াবার কোন ইচ্ছে আমার নেই। কিন্তু তাকে একদম ইগনোর করেও যাওয়া যায়না। আমি বললাম,- 'আমার সাথে তো এর থেকেও খারাপ কিছু হতে পারতো,ঠিক না?' - 'আরে, খারাপ হবার আর কিছু বাকি আছে কি?' -- 'হয়তো।' - 'যেমন?' - 'এরকমও তো হতে পারতো,ধর, আমি সারাবছর একদমই পড়াশুনা করলাম না।পরীক্ষায় ফেইল মারলাম।এখন ফেইল করলে আমার এক বছর ড্রপ যেতো।হয়তো ফেইলের অপমানটা আমি নিতে পারতাম না।আত্মহত্যা করে বসতাম।' সাজিদ হা হা হা হা করে হাসা শুরু করলো। বললো,- 'কি বিদঘুটে বিশ্বাস নিয়ে চলিস রে ভাই।' এই বলে সে আবার হাসা শুরু করলো।বিদ্রুপাত্মক হাসি। - রাতে সাজিদের সাথে আমার আরো একদফা তর্ক হোলো। সে বললো,- 'আচ্ছা, তোরা যে স্রষ্টায় বিশ্বাস করিস, কিসের ভিত্তিতে?' আমি বললাম,- 'বিশ্বাস দু ধরনের। একটা হোলো, প্রমানের ভিত্তিতে বিশ্বাস।অনেকটা,শর্তারোপে বিশ্বাস বলা যায়। অন্যটি হোলো প্রমান ছাড়াই বিশ্বাস।' সাজিদ হাসলো। সে বললো,- 'দ্বিতীয় ক্যাটাগরিকে সোজা বাঙলায় অন্ধ বিশ্বাস বলে রে আবুল,বুঝলি?' আমি তার কথায় কান দিলাম না। বলে যেতে লাগলাম- 'প্রমানের ভিত্তিতে যে বিশ্বাস, সেটা মূলত বিশ্বাসের মধ্যে পড়েনা।পড়লেও, খুবই ট্যাম্পোরেরি। এই বিশ্বাস এতই দূর্বল যে, এটা হঠাৎ হঠাৎ পালটায়।' সাজিদ এবার নড়েচড়ে বসলো। সে বললো,- 'কি রকম?' আমি বললাম,- 'এই যেমন ধর,সূর্য আর পৃথিবীকে নিয়ে মানুষের একটি আদিম কৌতূহল আছে। আমরা আদিকাল থেকেই এদের নিয়ে জানতে চেয়েছি, ঠিক না?' - 'হু, ঠিক।' - 'আমাদের কৌতূহল মেটাতে বিজ্ঞান আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছে, ঠিক?' - 'হ্যাঁ।' - 'আমরা একাট্টা ছিলাম। আমরা নির্ভুলভাবে জানতে চাইতাম যে, সূর্য আর পৃথিবীর রহস্যটা আসলে কি। সেই সুবাধে, পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা নানান সময়ে নানান তত্ব আমাদের সামনে এনেছেন। পৃথিবী আর সূর্য নিয়ে প্রথম ধারনা দিয়েছিলেন গ্রিক জ্যোতির বিজ্ঞানি টলেমি।টলেমি কি বলেছিলো সেটা নিশ্চয় তুই জানিস?' সাজিদ বললো,- 'হ্যাঁ। সে বলেছিলো সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘুরে।' - 'একদম তাই। কিন্তু বিজ্ঞান কি আজও টলেমির থিওরিতে বসে আছে? নেই। কিন্তু কি জানিস, এই টলেমির থিওরিটা বিজ্ঞান মহলে টিকে ছিলো পুরো ২৫০ বছর। ভাবতে পারিস? ২৫০ বছর পৃথিবীর মানুষ, যাদের মধ্যে আবার বড় বড় বিজ্ঞানি, ডাক্তার,ইঞ্জিনিয়ার ছিলো, তারাও বিশ্বাস করতো যে, সূর্য পৃথিবীর চারপাশে ঘোরে।এই ২৫০ বছরে তাদের মধ্যে যারা যারা মারা গেছে, তারা এই বিশ্বাস নিয়েই মারা গেছে যে, সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে।' সাজিদ সিগারেট ধরালো। সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বললো,- 'তাতে কি? তখন তো আর টেলিস্কোপ ছিলো না, তাই ভুল মতবাদ দিয়েছে আর কি। পরে নিকোলাস কোপারনিকাস এসে তার থিওরিকে ভুল প্রমান করলো না?' - 'হ্যাঁ। কিন্তু কোপারনিকাসও একটা মস্তবড় ভুল করে গেছে।' সাজিদ প্রশ্ন করলো,- 'কি রকম?' - 'অদ্ভুত! এটা তো তোর জানার কথা। যদিও কোপারনিকাস টলেমির থিওরির বিপরীত থিওরি দিয়ে প্রমান করে দেখিয়েছিলেন যে, সূর্য পৃথিবীর চারপাশে নয়, পৃথিবীই সূর্যের চারপাশে ঘোরে।কিন্তু, তিনি এক জায়গায় ভুল করেন।এবং সেই ভুলটাও বিজ্ঞান মহলে বীরদর্পে টিকে ছিলো গোটা ৫০ বছর।' - 'কোন ভুল?' - 'উনি বলেছিলেন, পৃথিবীই সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘোরে, কিন্তু সূর্য ঘোরে না। সূর্য স্থির। কিন্তু আজকের বিজ্ঞান বলে, - নাহ, সূর্য স্থির নয়। সূর্যও নিজের কক্ষপথে অবিরাম ঘূর্ণনরত অবস্থায়।' সাজিদ বললো,- 'সেটা ঠিক বলেছিস। কিন্তু বিজ্ঞানের এটাই নিয়ম যে, এটা প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হবে। এখানে শেষ বা ফাইনাল বলে কিছুই নেই।' - 'একদম তাই। বিজ্ঞানে শেষ/ফাইনাল বলে কিছু নেই। একটা বৈজ্ঞানিক থিওরি ২ সেকেন্ডও টেকে না, আবার আরেকটা ২০০ বছরও টিকে যায়। তাই, প্রমান বা দলিল দিয়ে যা বিশ্বাস করা হয় তাকে আমরা বিশ্বাস বলিনা।এটাকে আমরা বড়জোর চুক্তি বলতে পারি। চুক্তিটা এরকম,- 'তোমায় ততোক্ষণ বিশ্বাস করবো, যতক্ষণ তোমার চেয়ে অথেনটিক কিছু আমাদের সামনে না আসছে।' সাজিদ আবার নড়েচড়ে বসলো। সে কিছুটা একমত হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। আমি বললাম,- 'ধর্ম বা সৃষ্টিকর্তার ধারনা/অস্তিত্ব হচ্ছে ঠিক এর বিপরীত। দ্যাখ, বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের মধ্যকার এই গূঢ় পার্থক্য আছে বলেই আমাদের ধর্মগ্রন্থের শুরুতেই বিশ্বাসের কথা বলা আছে। বলা আছে- 'এটা তাদের জন্য যারা বিশ্বাস করে।' (সূরা বাকারা,০২)। যদি বিজ্ঞানে শেষ বা ফাইনাল কিছু থাকতো, তাহলে হয়তো ধর্মগ্রন্থের শুরুতে বিশ্বাসের বদলে বিজ্ঞানের কথাই বলা হতো। হয়তো বলা হতো,- 'এটা তাদের জন্যই যারা বিজ্ঞানমনষ্ক।' কিন্তু যে বিজ্ঞান সদা পরিবর্তনশীল, যে বিজ্ঞানের নিজের উপর নিজেরই বিশ্বাস নেই, তাকে কিভাবে অন্যরা বিশ্বাস করবে?' সাজিদ বললো,- 'কিন্তু যাকে দেখিনা, যার পক্ষে কোন প্রমান নেই, তাকে কি করে আমরা বিশ্বাস করতে পারি?' - 'সৃষ্টিকর্তার পক্ষে অনেক প্রমান আছে, কিন্তু সেটা বিজ্ঞান পুরোপুরি দিতে পারেনা।এটা বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা, সৃষ্টিকর্তার নয়।বিজ্ঞান অনেক কিছুরই উত্তর দিতে পারেনা। লিষ্ট করতে গেলে অনেক লম্বা একটা লিষ্ট করা যাবে।' সাজিদ রাগি রাগি গলায় বললো,- 'ফাইজলামো করিস আমার সাথে?' আমি হাসতে লাগলাম। বললাম,- 'আচ্ছা শোন, বলছি। তোর প্রেমিকার নাম মিতু না?' - 'এইখানে প্রেমিকার ব্যাপার আসছে কেনো?' - 'আরে বল না আগে।' - 'হ্যাঁ।' - 'কিছু মনে করিস না। কথার কথা বলছি। ধর, আমি মিতুকে ধর্ষণ করলাম। রক্তাক্ত অবস্থায় মিতু তার বেডে পড়ে আছে। আরো ধর, তুই কোনভাবে ব্যাপারটা জেনে গেছিস।' - 'হু।' - 'এখন বিজ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা কর দেখি, মিতুকে ধর্ষণ করায় কেনো আমার শাস্তি হওয়া দরকার?' সাজিদ বললো,- 'ক্রিটিক্যাল কোয়েশ্চান। এটাকে বিজ্ঞান দিয়ে কিভাবে ব্যাখ্যা করবো?' - 'হা হা হা। আগেই বলেছি। এমন অনেক ব্যাপার আছে, যার উত্তর বিজ্ঞানে নেই।' - 'কিন্তু এর সাথে স্রষ্টায় বিশ্বাসের সম্পর্ক কি?' - 'সম্পর্ক আছে। স্রষ্টায় বিশ্বাসটাও এমন একটা বিষয়, যেটা আমরা, মানে মানুষেরা, আমাদের ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য প্রমানাদি দিয়ে প্রমান করতে পারবো না। স্রষ্টা কোন টেলিষ্কোপে ধরা পড়েন না।উনাকে অণুবীক্ষণযন্ত্র দিয়েও খুঁজে বের করা যায়না। উনাকে জাষ্ট 'বিশ্বাস করে নিতে হয়।' সাজিদ এবার ১৮০ ডিগ্রি এঙ্গেলে বেঁকে বসলো। সে বললো,- 'ধুর! কিসব বাল ছাল বুঝালি। যা দেখিনা, তাকে বিশ্বাস করে নেবো?' আমি বললাম,- 'হ্যাঁ। পৃথিবীতে অবিশ্বাসী বলে কেউই নেই। সবাই বিশ্বাসী। সবাই এমন কিছু না কিছুতে ঠিক বিশ্বাস করে, যা তারা আদৌ দেখেনি বা দেখার কোন সুযোগও নেই।কিন্তু এটা নিয়ে তারা প্রশ্ন তুলে না। তারা নির্বিঘ্নে তাতে বিশ্বাস করে যায়। তুইও সেরকম।' সাজিদ বললো,- 'আমি? পাগল হয়েছিস? আমি না দেখে কোন কিছুতেই বিশ্বাস করিনা, করবোও না।' - 'তুই করিস।এবং, এটা নিয়ে তোর মধ্যে কোনদিন কোন প্রশ্ন জাগে নি।এবং, আজকে এই আলোচনা না করলে হয়তো জাগতোও না।' সে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো। বললাম,- 'জানতে চাস?' - 'হু।' - 'আবার বলছি, কিছু মনে করিস না। যুক্তির খাতিরে বলছি।' - 'বল।' - 'আচ্ছা, তোর বাবা-মা'র মিলনেই যে তোর জন্ম হয়েছে, সেটা তুই দেখেছিলি? বা,এই মূহুর্তে কোন এভিডেন্স আছে তোর কাছে? হতে পারে তোর মা তোর বাবা ছাড়া অন্য কারো সাথে দৈহিক সম্পর্ক করেছে তোর জন্মের আগে। হতে পারে, তুই অই ব্যক্তিরই জৈব ক্রিয়ার ফল।তুই এটা দেখিস নি। কিন্তু কোনদিনও কি তোর মা'কে এটা নিয়ে প্রশ্ন করেছিলি? করিস নি। সেই ছোটবেলা থেকে যাকে বাবা হিসেবে দেখে আসছিস, এখনো তাকে বাবা ডাকছিস। যাকে ভাই হিসেবে জেনে আসছিস, তাকে ভাই।বোনকে বোন। তুই না দেখেই এসবে বিশ্বাস করিস না? কোনদিন জানতে চেয়েছিস তুই এখন যাকে বাবা ডাকছিস, তুই আসলেই তার ঔরসজাত কিনা? জানতে চাস নি। বিশ্বাস করে গেছিস।এখনো করছিস। ভবিষ্যতেও করবি। স্রষ্টার অস্তিত্বে বিশ্বাসটাও ঠিক এমনই রে।এটাকে প্রশ্ন করা যায়না। সন্দেহ করা যায়না। এটাকে হৃদয়ের গভীরে ধারন করতে হয়। এটার নামই বিশ্বাস।' - সাজিদ উঠে বাইরে চলে গেলো। ভাবলাম, সে আমার কথায় কষ্ট পেয়েছে হয়তো। পরেরদিন ভোরে আমি যখন ফজরের নামাজের জন্য অযূ করতে যাবো, দেখলাম, আমার পাশে সাজিদ এসে দাঁড়িয়েছে।আমি তার মুখের দিকে তাকালাম।সে আমার চাহনির প্রশ্নটা বুঝতে পেরেছে। সে বললো,- 'নামাজ পড়তে উঠেছি।'
  •  লেখকঃ আরিফ আজাদ।

আল্লাহ থাকতে এতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ কেন? এতো মানুষ মারা যায় কেন?”

  • এক বিংশ শতাব্দীতে গত দশ বছরের গড় হিসাব করলে প্রতি বছর গড়ে ৭০,০০০ মানুষ মারা যায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে। কিন্তু মানুষের দোষের কারণে কত মানুষ মারা যায় জানেন?
  • শুধু এইডসে গড়ে বছরে ১৮ লক্ষ মারা যায় এবং ২০১০ সালে সাড়া পৃথিবীতে ৩.৪ কোটি এইডস আক্রান্ত মানুষ পাওয়া গেছে।
  • ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক কঙ্গো যুদ্ধে ৩৩ লক্ষ মানুষ মারা গেছে।
  • রাস্তায় দুর্ঘটনায় বছরে ১২ লক্ষ মানুষ মারা যায়।
  • এরকম শত শত পরিসংখ্যান রয়েছে যা প্রমাণ করে পৃথিবীতে বেশিরভাগ মানুষ মারা যায় মানুষেরই ভুলের কারণে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে খুব কমই মারা যায়।
  • এছাড়াও প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর মধ্যে অনেকগুলোই হয় মানুষের কারণে। যেমন নদীতে অপরিকল্পিত বাধ দেবার ফলে বিভিন্ন অঞ্চলে খরা সৃষ্টি হয়। তারপর খরা থেকে শুরু হয় দুর্ভিক্ষ, মহামারি। নিয়ন্ত্রণহীন গাছ উজার করার ফলে  হয় অনাবৃষ্টি এবং মাটির পানি শোষণের ভারসাম্য নষ্টহয়ে হয় বন্যা, নদী ভাঙ্গন। তারপর বন্যা থেকে মহামারি, দুরভিক্ষ। ফ্যাক্টরির বর্জ্য নদীতে ফেলে নদী দূষণের কারণে হয় মহামারি, খাবারের অভাব, দুর্ভিক্ষ, এবং ব্যাপক পরিবেশ দূষণ, যার কারণে মানুষের নানা ধরণের জটিল অসুখ হয়। কোটি কোটি টন মানুষের বর্জ্য নদী থেকে সমুদ্রে ফেলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট, মহামারি, ক্যানসার সৃষ্টি ইত্যাদি।
  • আল্লাহ কখনও কোন জাতির উপরে দেয়া তাঁর অনুগ্রহকে বদলান না, যতক্ষণ না সে জাতি নিজেদেরকে বদলিয়ে না ফেলে। (৮:৫৩)
  • আমরা কত ভাবে প্রকৃতির ক্ষতি করি এবং প্রকৃতি কত ভাবে সেই ক্ষতি গুলোকে সংশোধন করার চেষ্টা করে তা দেখতে হলে এই অসাধারণডকুমেন্টারিটি দেখুন। আপনার পৃথিবী সম্পর্কে শ্রদ্ধা হাজার গুণে বেড়ে যাবে যখন আপনি দেখবেন পৃথিবীতে কত হাজার ধরণের স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা আল্লাহ তাঁর অসীম জ্ঞান দিয়ে তৈরি করে রেখেছেন মানুষের অবাধ দূষণ পরিস্কার করার জন্য। কিন্তু তারপরেও মানুষ সীমালঙ্ঘন করে এবং তার ফলাফল ভোগ করে।
  • মানুষের কোনই হাত নেই এমন কিছু প্রাকৃতিক দুর্যোগ হল – সুনামি, ভুমিকম্প, আগ্নেয়গিরি এবংউল্কাপাত। এখন সুনামি, আগ্নেয়গিরি এবং ভুমিকম্প প্রবণ এলাকা গুলো মানুষ ভালো করেই জানে। তারাসেখান থেকে সরে গেলেই পারে। কিন্তু তারা সেটা করে না। বাপ-দাদার ভিটামাটি আকরে ধরে থাকার এক অন্ধ মোহ আছে তাদের মধ্যে। তারা ভূমিকম্পে, সুনামিতে, যুদ্ধে মারা যাবে, কিন্তু তারপরেও সেখান থেকে তারা সরে যাবে না। তারা অমুসলিম, অত্যাচারী শাসকের অত্যাচারে জীবন পার করবে, কিন্তু আল্লাহর দেওয়া এত বড় পৃথিবীতে অন্য কোথাও গিয়ে ভালভাবে বেঁচে থাকার চেষ্টা করবে না। এদেরজন্য আল্লাহ বলেছেনঃ
  • যখন ফেরেস্তারা ঐসব লোকদের আত্মাকে নিয়ে যাবে যারা নিজেদের উপরে অত্যাচার করছিল এবং জিজ্ঞেস করবে, “তোমরা কি অবস্থায় ছিলে?” তারা উত্তর দিবে, “আমরা দুর্বল/অত্যাচারিত/অসহায় অবস্থায় ছিলাম।” ফেরেস্তারা বলবে, “আল্লাহর পৃথিবী কি যথেষ্ট বড় ছিল না, তোমাদের অন্যকোথাও চলে যাবার জন্য?” ঐসব লোকদের আশ্রয় হবে জাহান্নাম, এক জঘন্য গন্তব্য।  কিন্তু সেসব সত্যিকারের অসহায় পুরুষ, মহিলা এবং বাচ্চারা ছাড়া ,যাদের নিজেদের কোন সামর্থ্য ছিলনা এবং যাদের অন্য কোন পথও ছিল না। (৪:৯৭-৯৮)
  • তবে শুধু অসহায় মানুষদেরই যে সবসময় দোষ তা নয়। মানুষ তার স্বার্থপর রাজনৈতিক নিয়ম দিয়ে আল্লাহর দেওয়া পৃথিবীকে ‘দেশ’ নামের ১৯৬টা ভাগে ভাগ করে এবং ‘ভিসা’ নামের একটি ব্যবস্থা করে এমন ব্যবস্থা করে রেখেছে যে গরিব অসহায় মানুষগুলোকে ভুমিকম্প, সুনামিপ্রবণ এলাকাগুলোতে অসহায় ভাবে বন্দি থাকতে হবেই। আল্লাহর দেওয়া এই বিশাল পৃথিবীতে এতোখালি জায়গা আছে, সেখানে গিয়ে তারা শান্তিতে বেঁচে থাকতে পারবে না। এর জন্য আল্লাহকে দোষ দিয়ে তো কোন লাভ নেই। মানুষ কত স্বার্থপর হতে পারেতা কিছুদিন আগে বার্মাতেই দেখা গেছে। হাজার হাজার গরীব মুসলমান গণহত্যার হাত থেকে বাঁচার জন্য, দিনের পর দিন না খেয়ে সমুদ্রে ভেসে বাংলাদেশে আসলো একটু আশ্রয় পাবার জন্য, আর বাংলাদেশের মানুষ তাদেরকে ভিসা না থাকার জন্য ফেরত পাঠিয়ে দিল। এধরণের চরম অমানুষিক তারপরেও বাংলাদেশের অর্ধেক মানুষ যে পরের দিনই ভুমিকম্পে ধসে মারা যায়নি তার কারণ আল্লাহ নিরন্তর করুণাময়, চরম ধৈর্যশীল।
  • অনেকে প্রশ্ন করেন, আল্লাহ কেন পৃথিবীকে এমনভাবে তৈরি করলো না যাতে করে পৃথিবীতে কখনও বন্যা, খরা, মহামারি, ভুমিকম্প না হয়? আল্লাহর তো সব ক্ষমতাই আছে। তিনি কি ইচ্ছা করলেই এমন একটা পৃথিবী তৈরি করতেপারতেন না যেখানে কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয় না?
  • সহজ উত্তর – হ্যা, তিনি পারেন এবং তিনি বেহেশত তৈরি করেছেন যেখানে কোন বন্যা, খরা, মহামারি, ভুমিকম্প হয় না। পৃথিবী তৈরির উদ্দেশ্য ছিল না পৃথিবীকে আরেকটা বেহেশত বানানোর।
  • আর যারা আরও বিস্তারিত জানতে চান কেন পৃথিবীতে প্রাণের সৃষ্টির জন্য ভুমিকম্প প্রয়োজন, কেন খরা না থাকলে প্রাণ বিলুপ্ত হয়ে যেত – তারা এই আর্টিকেলটি পড়ে দেখুন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ হচ্ছে পৃথিবীর নিজেকে দূষণ মুক্ত করে প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করার একটি সহজাত প্রক্রিয়া। মানুষ ব্যাপক দূষণ করার পরেও পৃথিবীকে বসবাস যোগ্য রাখার জন্য আল্লাহ তাঁর অসীম জ্ঞান দিয়ে হাজার হাজার স্বয়ংক্রিয় প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি করে রেখেছেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ তার মধ্যেএকটি।
  • আল্লাহর বিরুদ্ধে আরেকটি সাধারণ অভিযোগ হল আল্লাহ কেন পৃথিবীতে এত মানুষ পাঠাল, কিন্তু তাদের জন্য যথেষ্ট খাবার, প্রাকৃতিক সম্পদ, জায়গা দিয়ে পাঠাল না। এটি একটি বিরাট ভুল ধারণা যে পৃথিবীতে এত যে গরিব মানুষ তার মূল কারণ পৃথিবীতে সম্পদের অভাব। পৃথিবীত মাত্র ১% মানুষ পুরো পৃথিবীর ৪৮% সম্পদ দখল করে রেখেছে। পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ১০% মানুষ পুরো পৃথিবীর ৮৫% সম্পদের অধিকারী! মোট জনসংখ্যার অর্ধেক, যা কিনা প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন মানুষ, আজকে পৃথিবীর মোট সম্পদের মাত্র ১% এর উপর বেঁচে আছে!
  • শুধু তাই না, মাত্র ২% ধনী মানুষগুলো পুরো পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি বাড়ি এবং জমির মালিক। বাকি অর্ধেক জমি এবং বাড়ির মধ্যে বাকি ৯৮% জনসংখ্যা বসবাস করছে। মানুষের মধ্যে আজকে যে এই চরম বৈষম্য তার কারণ ক্যাপিটালিস্ট অর্থনীতি, লোভ এবং দুর্নীতি। সুদ আরেকটি বড় কারণ যা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে করে বড় লোকরা বসে বসে আরও বড় লোক হয়, আর মধ্যবিত্ত এবং গরিবরা অমানুষিক খাটার পরেও দিনে দিনে আরও গরিব হতে থাকে।
  • সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হল, পুরো পৃথিবীর সব মানুষকে, পুরো ৬ বিলিয়ন মানুষের প্রত্যেকে একটি বাসা এবং সামনে একটি ছোট বাগান দিলেও পৃথিবীর সব মানুষকে যুক্তরাজ্যের এক টেক্সাস অঙ্গরাজ্যেই জায়গা দেওয়া যাবে। আল্লাহ আমাদেরকে এক বিরাট পৃথিবী দিয়েছেন, কিন্তু মাত্র২% লোভী মানুষের কারণে আজকে ১.৬ বিলিয়ন মানুষ দিনে একবেলাও খেতে পারে না।
  • আল্লাহ কখনই মানব জাতির কোন ক্ষতি করেন না, বরং মানুষরাই মানুষের ক্ষতি করে। (১০:৪৪)
  • আল্লাহ মানুষকে যথেষ্ট সময় দেন নিজেদেরকে শোধরানোর জন্য। তারপরেও যখন মানুষ শোধরায় না, তখন বিরাট কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়, বিপুল পরিমাণের সম্পত্তির ক্ষতি হয় যা ধনীদের কুক্ষিগত থাকে, প্রচুর অসহায় মানুষ মারা যায়, যাদের জীবনটা ইতিমধ্যেই পশুর চেয়েও অধম ছিল। তারপর যে মানুষগুলো বেঁচে থাকে, তারা আবার নতুন করে সভ্যতার শুরু করে। এরকম আগে অনেকবার হয়েছে এবং অদূর ভবিষ্যতেও হবার সম্ভাবনা আছে, হয়তো এই বছরই সেটা হতে পারে।

আল্লাহ তো জানে কে বেহেস্তে যাবে,কে দোযখে যাবে? তাহলে মানুষকে পৃথিবীতে পাঠিয়ে পরীক্ষা করার দরকার কি? আল্লাহ যদি জানেই আমি দোযখে যাবো তাহলে আমার আর ভালো কাজ করে লাভ কি?”

  • প্রথমত, আপনি যদি এই ধরণের প্রশ্ন করেন তাহলে আপনার আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে - আপনি দোযখে যাবার জন্য সব দোষ আল্লাহকে দিতে চান। আপনি আপনার দোষের জন্য নিজে কোন দায়িত্ব নিবেন না, পুরোটাই আল্লাহর দোষ। আপনার আসল সমস্যা হচ্ছে আপনি প্রভু-দাস এই ব্যপারটি ঠিকমত বোঝেনি। একারণে আপনাকে অনুরোধ করবো প্রথম পর্বটি বার বার পড়ার।
  • দ্বিতীয়ত, আপনি ধরে নিচ্ছেন আপনি জাহান্নামে যাবেনই। কে বলেছে আপনাকে যে আপনি জাহান্নামে যাবেন এবং আপনার আর ভালো কাজ করে লাভ নেই? বরং আল্লাহ বলেছেনঃ
  • … ও আমার বান্দারা, তোমরা যারা নিজেদের উপরে চরম অন্যায় করেছ, আল্লাহর অনুগ্রহের উপর কখনও আশা হারিয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ সব পাপ ক্ষমা করেন। কোন সন্দেহ নেই, তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, নিরন্তর করুণাময়। (৩৯ঃ৫৩)
  • তখন আপনি প্রশ্ন করবেন, “আমার কি পরিণতি হবে সেটা তো আল্লাহ জানেই? যদি আল্লাহ জানেই আমি দোযখে যাচ্ছি, তাহলে আর ভালো কাজ করে লাভ কি?”
  • এটা একটা জটিল প্রশ্ন কারণ এর সাথে ‘কদর’ বা ‘পূর্ব নির্ধারিত ভাগ্যের’ ধারণা জড়িত। এটি একটি ব্যাপক ব্যপার যার জন্য বেশ কয়েকটি বই পড়া প্রয়োজন। আমি যদি একটা ছোট সারাংশ দেই তাহলে দাঁড়ায়ঃ
  • আল্লাহর কোন কিছু জানার অর্থ এই না যে আপনার কোন স্বাধীনতা নেই। আল্লাহ মানুষকে ‘সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা’ দিয়েপাঠিয়েছেন। প্রতিটি মানুষকে আল্লাহ কিছু ব্যপার পূর্ব নির্ধারিত করে দিয়েছেন, কিন্তু বাকি অনেক কিছু মানুষের সিদ্ধান্তের উপর ছেড়ে দিয়েছেন। মানুষ কোন পরিস্থিতে পড়ে যদি ভালো সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে সে তার জন্য পুরস্কার পাবে, যদি খারাপ সিদ্ধান্ত নেয় তাহলে তার জন্য শাস্তি পাবে। পরিস্থিতিগুলো আল্লাহ তৈরি করেন। প্রতিটি পরিস্থিতে মানুষ কতগুলো সম্ভাব্য পদক্ষেপ নিতে পারবে সেটাও আল্লাহ নির্ধারণ করে দেন। মানুষের কাজ হচ্ছে ভাল সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া এবং নিজের রাগ, লোভ, কামনা, বাসনা, ইগো ইতাদির বশবর্তী হয়ে অন্যায় সিদ্ধান্ত গুলো না নেওয়া।
  • যেই কিনা সৎ কাজ করবে, সে তা নিজের উপকারেই  করবে; আর যেই কিনা অসৎ কাজ করবে, তা সে নিজের বিরুদ্ধেই করবে। তোমার প্রভু তার বান্দাদের উপরে কখনই অবিচার করেন না। (৪১:৪৬)
  • কিন্তু এর মানে এই না যে আল্লাহ জানেন না আমরা কি সিদ্ধান্ত নিব, বা আল্লাহ যদি জানেনই আমরা কি সিদ্ধান্ত নিব, তার মানে এই নাযে আমাদের সমস্ত সিদ্ধান্ত পূর্ব নির্ধারিত। আমরা যখনি বলি – “আল্লাহ তো সব জানেন” – আমরা ধারণা করে নেই যে আল্লাহর জানাটা হচ্ছে অতীত কালের ঘটনা এবং যেহেতু আল্লাহ ‘অতীত কালে’ জেনে গেছেন, তার মানে বর্তমান, ভবিষ্যৎ সবই পূর্ব নির্ধারিত। এটা ভুল ধারণা। আল্লাহ সময়ের উর্ধে। তাঁর জন্য কোন অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ নেই। কোন সত্তা যখন সময়ের বাইরে চলে যায়, তখন সে একই সাথে অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ সবকিছুই একই সময়ে, একই মুহূর্তেজানতে পারে। সুতরাং, আমি জাহান্নামে যাবো এটা যদি আল্লাহ জানেন, তার মানে এই নাযে আল্লাহর জানাটা অতীত কালে ঘটে গেছে এবং আমার আর ভালো কাজ করে কোন লাভনেই, আমার ভবিষ্যৎ পূর্ব নির্ধারিত। আল্লাহ এই মুহূর্তে আমি কি করেছি, কি করবো এবং তার ফলে আমার পরিণতি কি হবে তা সব দেখতে পাচ্ছেন। কিন্তু তারমানে এই না যে আমি কি করবো, কি করবো না, সেই সিদ্ধান্ত নেবার স্বাধীনতা আল্লাহ আমাকে দেন নি।
  • কিভাবে একই সাথে অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ দেখা যায় তার একটা উপমা দেই। ধরুন আপনি সিনেমা হলে গিয়ে একটি চলচ্চিত্র দেখছেন। যেহেতু আপনি একটা একটা করে দৃশ্য দেখছেন, আপনি জানেন না সামনে কি হতে যাচ্ছে। আপনি শুধুই অতীতে কি হয়েছে জানেন এবং বর্তমানে কি দৃশ্য হচ্ছে তা দেখতে পাচ্ছেন। কিন্তু ধরুন চলচ্চিত্রটির পুরো ফিল্মের রোলটাকে যদি মাটিতে সমান করে বিছিয়ে রাখা হত এবং আপনি দশ তলা বাড়ির ছাদ থেকে পুরো ফিল্মটির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একবারে, এক পলকে দেখতে পেতেন, তাহলে আপনি একই সাথে, একই মুহূর্তে অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ সবকিছুই দেখতে পেতেন। আপনার কাছে তখন আর চলচ্চিত্রটি একটা একটা দৃশ্য করে আগাতো না বরং পুরো চলচ্চিত্রটির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এক মুহূর্তে আপনার চোখের সামনে ভেসে উঠত।এটা শুধুই একটা উপমা, আল্লাহ্‌ই জানেন সময় তাঁর কাছে কিভাবে কাজ করে।
  • এবার পূর্ব নির্ধারিত ভাগ্যের একটা উদাহরণ দেই। ধরুন আপনি ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম গাড়িতে করে যাচ্ছেন। আপনি একটা রাস্তার মোড়ে এসে দেখলেন একটা রাস্তা বায়ে গেছে, আরেকটা ডানে গেছে। আপনি বায়ের রাস্তা নিলেন এবং চট্টগ্রামের বদলে সিলেটে গিয়ে পৌঁছালেন। এখন যারা রাস্তা বানিয়েছে - বিআরটিএ, তারা ভালো করেই জানে কোন রাস্তায় গেলে মানুষ কোন জায়গায় গিয়ে পৌঁছাবে। প্রত্যেকটা রাস্তার মোড়ে গিয়ে কোন দিকেঘুরলে মানুষ কোন জায়গায় গিয়ে পৌঁছাবে তারা তা সবই জানে। তারমানে এই না যে আপনি সিলেটে গিয়ে পৌঁছাবেন তা পূর্ব নির্ধারিত, কারণ বিআরটিএ ইতিমধ্যেই জানে রাস্তাগুলো সিলেটে গেছে। আপনি আপনার জীবনে যত মোড় নিবেন, তার প্রত্যেকটির পরিণতি সম্পর্কে আল্লাহ জানেন কারণ জীবনের রাস্তার প্রতিটা মোড় তাঁরই বানানো।
  • যেমন ধরুন আপনার যখন দশ বছর বয়স ছিল, আপনার স্কুলে দুজন বন্ধু ছিল। রহিম – যে একজন ভালো ছাত্র, সারাদিন পড়াশুনা করে, ভালো ঘরের ছেলে; আর রকি - যে বিরাট বড় লোকের ছেলে, যার ভিডিও গেমের অভাব নেই, সারারাত মুভি দেখে, বন্ধু বান্ধব নিয়ে আড্ডা দিয়ে বেড়ায়। আল্লাহ আপনাকে দুটো সুযোগ দিয়েছিলেন – রহিম এবং রকি। আপনি রকির ভিডিও গেমের লোভকে সামলাতে না পেরে রকির পিছনে লেগে গেলেন। পড়ালেখা বাদ দিয়ে সারাদিন সময় নষ্ট করে বেড়ালেন। স্কুল শেষ করলেন একটা বাজে রেজাল্ট নিয়ে। জীবনটা দুর্বিষহ করে ফেললেন। সারাজীবন আল্লাহকে দোষ দিলেন আপনার দুরাবস্থার জন্য। বাকি জীবনটা আল্লাহর কোন নির্দেশ না মেনে, তার সাথে যুদ্ধ করে, তার নির্দেশগুলো অমান্য করে দোযখে চলে গেলেন।
  • আপনি যদি রকির পেছনে না ঘুরে রহিমের সাথে থাকতেন, আপনার একটা সুন্দর চরিত্র তৈরি হত, আপনি সুন্দর চিন্তা করতে শিখতেন, ঠিকমত পড়ালেখা করতেন, ভাল রেজাল্ট করে ভালো কলেজে পড়তে পারতেন। আপনার জীবনটা সফল হতো। তখন আপনি সারাজীবন আল্লাহকে ধন্যবাদ দিয়ে, তাঁর আদেশ মেনে জীবন পার করে বেহেশতে চলে যেতেন।
  • আল্লাহ আপনাকে দুটো সুযোগ দিয়েছিলেন। আপনার সিদ্ধান্তের জন্য আপনি দায়ী।
  • আবার ধরুন আপনি রকির পেছনে লেগে ছিলেন এবং কোন মতে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হতে পেরেছেন আপনার বাবা-মার মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দিনরাত চেষ্টা করার পর। তারপর একদিন আপনার বন্ধু করিম আপনাকে এসে বলল, ”দোস্ত, আমার এক বন্ধুর কাছে খবর পেলাম। ওদের এক দল আছে যারা সন্ধার পর ‘ইয়ে’ করতে যায়। সাংঘাতিক মজার ব্যপার নাকি। চল, আমরাও আজকেএকবার ‘ইয়ে’ করে দেখি।” এখন এতদিনে আপনার যথেষ্ট শিক্ষা হয়েছে আজে বাজে বন্ধুর সাথে মিশলে জীবনে কত পস্তাতে হয়। কিন্তু তারপরেও আপনি লোভ সামলাতে পারলেন না, বন্ধুর সাথে চলে গেলেন। এর জন্য যদি আল্লাহ আপনাকে ধরে সোজা জাহান্নামে পাঠিয়ে দেন, আপনি কি আল্লাহকে দোষ দিবেন?
  • কিন্তু ধরুন আপনি নিজে তো গেলেনই না, বরং আপনার বন্ধু করিমকেও আটকে রাখলেন। তাকে আপনার নিজের জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে ভালো করে বোঝালেন। যার ফলে সে জীবনে একটা বড় ভুল করা থেকে বেঁচে গেল। নিজেকে সংশোধন করার জন্য এবং অন্য একজন মানুষের জীবনকে বাঁচানোর জন্য আল্লাহ খুশি হয়ে আপনাকে বেহেশত দিয়ে দিলেন।
  • এভাবে আল্লাহ আমাদেরকে জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন রাস্তার ব্যবস্থা করে দেন। আমাদেরকে সংশোধনের সুযোগ করে দেন। কিছু রাস্তা আপনাকে আরও খারাপ করে দিবে, আপনার এবং আপনার পরিবারের সদস্যদের জীবনে আরও কষ্ট এনেদিবে। কিছু রাস্তা আপনাকে আপনার দুরবস্থা থেকে বের করে এনে জীবনটা সহজ করে দিবে। আপনি যদি আপনার গত জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা না পেয়ে, নিজের লোভ, ইগো, সন্মান, রাগ, অহংকারকে সংযত না করে আবারো ভুল রাস্তায় চলে যান, তাহলে এর জন্য আপনি দায়ী, আল্লাহ নয়।
  • আমি নিশ্চিত ভাবে মানুষকে সঠিক পথ দেখিয়েছি, সে কৃতজ্ঞ হোক আর অকৃতজ্ঞ হোক।  (৭৬:৩)
  • এ পর্যন্ত যা বললাম তা হল মানুষের মস্তিস্ক বর্তমানে যে পর্যায়ে আছে তার পক্ষে ধারণা করা সম্ভব এমন কিছু উপলব্ধি। যেহেতু ’কদর’ ব্যপারটিই মানুষের কল্পনাতীত একটি ব্যপার, তাই মানুষের চিন্তা করার ক্ষমতা যত উন্নত হবে, মানুষের এইসম্পর্কে ধারণায় তত পরিবর্তন হবে। এখন পর্যন্ত আমরা এইটুকুই আন্দাজ করতে পারি। আল্লাহ্‌ই জানেন তিনি কিভাবে কদর সৃষ্টি করেছেন। এধরনের ব্যপার মানুষের জন্য চিন্তা করাটা কঠিন কারণ মানুষ সময়ের মধ্যে বাস করে এবং সময়ের বাইরে কোন কিছু তারা চিন্তা করতে পারেনা। আমাদের ভাষায় অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ এর বাইরে আরকোন শব্দ নেই। যেহেতু আমাদের ভাষায় এর বাইরে কোন শব্দ নেই, সেহেতু আমরা সময়ের বাইরে কিছু কল্পনাও করতে পারিনা।
  • বিস্তারিত জানতে দেখুনঃ
  • http://eshaykh.com/doctrine/destiny-before-adam-created/
  • http://www.deenresearchcenter.com/LinkClick.aspx?fileticket=6BnFlF8OBx8%3D&tabid=94&mid=511
  • http://www.islamweb.net/emainpage/index.php?page=articles&id=97118

আল্লাহ কেন শয়তানকে বানালো? না থাকলে তো আমরা সবাই বেহেস্তে যেতে পারতাম

 

  • আসলে প্রশ্নটা হচ্ছে, আল্লাহ কেন “মন্দ” সৃষ্টি করলো? কেন শুধুই ‘ভালো’ থাকলো না?
  • প্রশ্ন হচ্ছে যদি মন্দ না থাকে, তাহলে আপনি বুঝবেন কি করে ভালো কি? যদি অসুন্দর না দেখে থাকেন, তাহলে সুন্দর দেখলে তা বুঝবেন কি করে যে সেটা সুন্দর? যদি কখনও কষ্ট পেয়ে না থাকেন, তাহলে আরাম কি সেটা বুঝবেন কি করে? যদি অসুস্থতা না থাকে, সুস্থতা অনুভব করবেন কিভাবে?
  • সুখ হচ্ছে দুঃখের অভাব। যখন আমরা কম দুঃখে থাকি, তখনি আমরা সুখ অনুভব করি। আমাদের দুঃখ কখনও সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যায় না।
  • একবার রোবট বানানোর সময় বিজ্ঞানীরা চিন্তা করছিলেন, কিভাবে রোবটকে সুখের অনুভুতি দেওয়া যায়? তারা চিন্তা করে দেখলেন, রোবটকে সবসময় কোন একটা কষ্ট দিতে হবে, যাতে করে রোবট চেষ্টা করবে সেই কষ্টটা কমানোর, কারণ কষ্ট কম মানেই ‘সুখ’। যখনি রোবট বুঝবেএই কাজটা করলে তার কষ্ট কমে যায়, তখনি সে ‘সুখ’ পাবার জন্য সেই কাজটা বেশি করে করবে। এজন্য বিজ্ঞানীরা রোবটের মধ্যে বিভিন্ন ধরণের ‘কষ্ট’ তৈরি করে তাকে ‘দুঃখে’ রাখলেন এবং তার মধ্যে সেই দুঃখ কমানোর উপায় প্রোগ্রাম করে দিলেন। রোবট তারপর সবসময় চেষ্টা করে ‘দুঃখ’ কমাবার এবং যখনি তার ‘দুঃখ’ কমে যায়, সে ‘সুখি’ অনুভব করে।
  • আমরা জানি সুখ হচ্ছে দুঃখের বিপরীত অনুভুতি। ধরুন আপনাকে আমি যদি বলি আমি এখন ‘কস্টানন্দে’ আছি, আপনি কি বুঝবেন ‘কস্টানন্দ’ অনুভূতিটা কি? যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি কস্টানন্দ অনুভব না করছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত আপনি কি করে তার বিপরীত অনুভুতি ‘আনন্দুঃখ’ অনুভব করবেন? আল্লাহ যদি মানুষকে আনন্দুঃখ দিতে চান, তাহলে কি তিনি মানুষকে প্রথমে কস্টানন্দ অনুভব করাবেন না?
  • আল্লাহ আমাদের উপরে একটা বিরাট অনুগ্রহ করেছেন যে আমাদেরকে দুঃখ, কষ্ট, বেদনা, অশান্তি খুব বেশি হলে ১২০ বছর সহ্য করতে হবে এবং তারপর আমরা হাজার বছর, লক্ষ বছর, কোটি কোটি বছর আনন্দ, সুখ, শান্তি অনুভব করবো। চলুন আমরা সেটা অর্জন করার জন্য সব রকম চেষ্টা করি। আপনাকে যদি কেউ বলে আপনাকে আজকে সারাদিন রোদে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে এবং তার বিনিময়ে আপনাকে বাড়ি, গাড়ি, জমি, টাকা সব দেওয়া হবে – আপনি কি চোখবন্ধ করে রাজি হয়ে যাবেন না?
  • দ্বিতীয়ত, আমাদের মধ্যে একটা ভুল ধারণা আছে যে, যা কিছুই ভালো তা আসে আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর যা কিছুই খারাপ তা হয় শয়তানের কারণে, এতে আমাদের কোন হাত নেই। ভুল ধারণা। ভালো মন্দ সবকিছুই আসে আল্লাহর কাছ থেকেঃ
  • … যখন ভালো কিছু হয়, তারা বলে, “এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে”, আর যখন খারাপ কিছু হয়, তারা বলে, “এটা তোমার (মুহম্মদ) কারণে হয়েছে।” তাদেরকে বল, “দুটোই আসে আল্লাহর পক্ষ থেকে।” এই মানুষগুলোর সমস্যা কি যে তারা কিছুতেই বোঝে না তাদেরকে কি বলা হচ্ছে?  (৪:৭৮)
  • আমার অনুসারীদের উপরে তোমার (শয়তান) কোন ক্ষমতা থাকবে না , কিন্তু ওই সব পথভ্রষ্টরা ছাড়া যারা তোমাকে অনুসরণ করে।  (১৫:৪২)
  • যখন সব ফয়সালা হয়ে যাবে (কিয়ামতের দিন), তখন শয়তান বলবে, “আল্লাহ তোমাদেরকে সত্যিকারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। আমিও তোমাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, কিন্তু সেগুলো ছিল সব মিথ্যা। তোমাদেরকে শুধু ডাকা ছাড়াআমার আর কোন ক্ষমতা ছিল না তোমাদের উপরে। তোমরাই আমার ডাকে সাড়া দিয়েছিলে। তাই আমাকে কোন দোষ দিয়ো না বরং নিজেদেরকে দোষ দাও।”… (১৪:২২)
  • সুতরাং অন্যায় করে বলেন না যে সব শয়তানের দোষ, শয়তান না থাকলে আপনি সেই অন্যায়গুলো করতেন না। শয়তান শুধুই আপনাকে আইডিয়া দেয়, আপনি নিজে জেনেশুনে অন্যায়গুলো করেন। আপনার সিদ্ধান্তের স্বাধীনতার অপব্যবহারের জন্য আপনি দায়ী, শয়তান নয়। আপনার টেবিলে একটা কম্পিউটারের ম্যাগাজিন পড়েআছে, আর সামনে টিভিতে এমটিভি চ্যানেলে একজন শিক্ষিত, বয়স্ক, দুই সন্তানের মা, নামমাত্র কাপড় পড়ে লাফালাফি করছে। আপনি টিভি বন্ধ করে ম্যাগাজিনটা না পড়ে যদি হা করে তাকিয়ে থাকার সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে সেটাতে শয়তানের দোষ নেই, পুরোটাই আপনার দোষ।

সত্যিই যদি আল্লাহ থাকে তাহলে পৃথিবীতে এতো দুঃখ, কষ্ট কেন?

  • আপনার যদি এই ধারণা থাকে যে – সত্যিই যদি কোন ‘পরম করুণাময়’ সৃষ্টিকর্তা থাকতো, তাহলে পৃথিবীতে এত দুঃখ, কষ্ট, যুদ্ধ, অভাব, অসুখ থাকতো না – তার মানে এই না যে কোন পরম করুণাময় সৃষ্টিকর্তা নেই। এর মানে এটাই যে আল্লাহ কি উদ্দেশে পৃথিবী তৈরি করেছেন, তা আপনি বুঝতে পারেন নি। পৃথিবীতে কোন সমস্যা থাকার মানে এই না যে কোন পরম করুণাময় সৃষ্টিকর্তানেই বরং এটাই প্রমাণ হয় যে আপনি সৃষ্টিকর্তার সংজ্ঞা সম্পর্কে নিজেনিজেই কিছু একটা ধারণা করে নিয়েছেন, যা সঠিক না। একটা পিঁপড়া যদি মানুষকে চ্যালেঞ্জ করে – “তোমাদের না এতবুদ্ধি? তাহলে তোমরা মাটির উপরে বাড়ি বানাও কেন? আমাদের মত মাটির নিচে থাকলেই তো পারো?” এখানে পিঁপড়া ধরে নিচ্ছে বুদ্ধিমান হলেই মাটির নিচে থাকতে হবে, যা হাস্যকর। ঠিক একই ভাবে এটা হাস্যকর যে মানুষ সৃষ্টিকর্তার এক সংজ্ঞা নিজে নিজে বানিয়ে, সেই সংজ্ঞা ব্যবহার করে নিজেরাই সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বকে অস্বীকার করে।
  • দ্বিতীয়ত, আপনাকে কে শেখাল করুণা কি? পৃথিবীতে যদি কোন সমস্যা না থাকতো, কোন অন্যায় না হত, কোন খারাপ কিছু না থাকতো, তাহলে আপনিবুঝতেন কি করে ‘খারাপ’ কি এবং তখন ‘ভালো’ বলতেই বা কি বোঝাতো? করুণা করার প্রশ্ন তখনই আসে যখন কোন মন্দ ঘটনা ঘটে। কোন মন্দ না থাকলে তো করুণার অস্তিত্ব থাকতো না। বরং আপনার মনে করুণার ধারনাটি যে আছে সেটাই তো প্রমাণ করে যে কেউ একজন আছে যে আপনাকে করুণার ধারনাটি দিয়েছে! না হলে এই ধারণাটি আপনার মনে আসলো কিভাবে? এটা তো ক্ষুধারমত কোন শারীরবৃত্তীয় ধারণা না যে আপনি বিবর্তনের মাধ্যমে বানর থেকে মানুষ হবার সময় এই ধারণাটি পেয়েছেন!
  • তৃতীয়ত, আল্লাহ পরম করুণাময় হলেই যে তিনি কাউকে কোন অন্যায় করতে দিবেন না, তা আপনাকে কে বলেছে? বাবা-মা তাদের বাচ্চাদেরকে অত্যন্ত ভালবাসে, কিন্তু তাই বলে তারা নিশ্চয়ই তাদের বাচ্চাদের চিন্তার স্বাধীনতা কেড়ে নেয় না এবং প্রত্যেকটা কাজে বাধা দেয় না। বাচ্চারা অন্যায় করে, তারপর তার জন্য শাস্তি পায়। বাবা-মা সব সময় চেষ্টা করে বাচ্চাদেরকে যতটুকু সম্ভব ভুল না করতে দেওয়ার, অন্যায় থেকে দূরে থাকার জন্য উপদেশ দেবার। আল্লাহও সেটাই করেন আমাদের সাথে।
  • চতুর্থত, আপনি ধরে নিচ্ছেন, পৃথিবীতে যাবতীয় দুঃখ কষ্টের জন্য শুধু আল্লাহ দায়ী। এখানে মানুষের কোন হাত নেই। মানুষের হাত থাকলেও কেন আল্লাহ এমন ব্যবস্থা করলো না যার জন্য মানুষ যেন কখনও অন্য মানুষকে কষ্ট দিতে না পারে। আমরা অনেক সময় ঠিকভাবে সময় নিয়ে চিন্তা করে দেখি না আমরা আল্লাহকে কি নিয়ে দোষ দেই। যেমন আপনি হয়তো আফ্রিকার গরিব মানুষদের কষ্ট দেখে ভাবছেন কেন আল্লাহ তাদেরকে এত কষ্ট দেয়? আল্লাহ আফ্রিকার দেশগুলোকে অনেক প্রাকৃতিক সম্পদ দিয়ে পাঠিয়েছিলেন। তাদের তেল ছিল, হীরা ছিল, সোনা ছিল। কিন্তু কোন লাভ হয়নি। তাদের ব্যবসায়ী সরকার নিজেদের পকেটে টাকা ঢোকাবার জন্য পশ্চিমা দেশের কোম্পানিগুলোর সাথে চুক্তি করে সব তেল, গ্যাস, হীরা, সোনা পশ্চিমা দেশে পাচার করে দিয়েছে। যার ফলে নিজের দেশের অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে দেশের মানুষগুলো চরম গরিব হয়ে না খেয়ে মারা যাচ্ছে। আফ্রিকার গরিব দেশগুলোর সরকারগুলো যদি পররাষ্ট্রনীতিতে স্বচ্ছ এবং দক্ষ হত, তারা নিজেদের কমিশনের কথা চিন্তা না করে দেশের মানুষের জন্য ভাবতো, প্রাকৃতিক সম্পদগুলোকে গোপন রাখত, যতক্ষণ না তারা নিজেদের দেশে দক্ষ শ্রমিক তৈরি করে সেই প্রাকৃতিক সম্পদগুলো নিজেরাই ভোগ করতে না পারছে, তাহলে আজকে তাদের এই অবস্থা হত না। আল্লাহ সেই দেশগুলোকে বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদ দিয়েছিলেন, যে রকম কিনা তিনি মালয়েশিয়াকে দিয়েছেন। কিন্তু মালয়েশিয়া তাদের সম্পদকে নিজের দেশেরেখে নিজেরাই ভোগ করে বিরাট বড় লোক হয়ে গেছে। অন্যদিকে আফ্রিকার দেশগুলো অল্প কমিশনের বিনিময়ে বিদেশি কোম্পানিগুলোকে সেই প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ে যাবার সুযোগ করে দিয়ে ফকির হয়ে গেছে।
  • আল্লাহ কখনও কোন জাতির উপরে দেয়া তাঁর অনুগ্রহকে বদলান না, যতক্ষণ না সে জাতি নিজেদেরকে বদলিয়ে না ফেলে। (৮:৫৩)
  • এখন আপনি দাবি করবেন, “আল্লাহ তাহলে তাদেরকে এমন সরকার হতে দিল কেন? কেন সেই সরকারের সদস্যগুলোর মাথায় বাজ পড়লো না, যখন তারা বিদেশি কোম্পানিগুলোর সাথে চুক্তি করে নিজের দেশকে বিক্রি করে দিচ্ছিল? কেন  বিদেশি দেশগুলোকে আল্লাহ  টর্নেডো, ভুমিকম্প, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত দিয়ে আটকিয়ে রাখল না, যাতে করে তারা আফ্রিকাতে গিয়ে সম্পদগুলো চুরি করতে না পারে?” সমস্যা হচ্ছে আপনি চাচ্ছেন পৃথিবীর মানুষ প্রতিনিয়ত অন্যায় করে যাবে, আর আল্লাহ অলৌকিক ভাবে প্রতিনিয়ত মানুষকে অন্যায় করা থেকে আটকিয়ে রাখবেন। যদি আল্লাহ তাই করতেন তাহলে এই পৃথিবী তৈরি করে মানুষকে পাঠিয়ে পরীক্ষা নেবারকোন দরকার ছিল না, যদি তাঁর উদ্দেশই থাকতো মানুষকে যেভাবেই হোক অন্যায় করা থেকে আটকিয়ে রাখার। মানুষ অন্যায় করবে, তার জন্য শাস্তি পাবে। মানুষের অন্যায়ের কারণে যারা ভুক্তভুগি, তাদের সাথে আল্লাহ যথার্থ ন্যায় বিচার করবেন এবং তাদের কষ্টের জন্য যথাযথ প্রতিদান দিবেন। মনে রাখবেন, আল্লাহ হচ্ছেন ‘পরম ন্যায় বিচারক’ – তিনি সামান্যও অন্যায় করেন না। সুতরাং মানুষের কষ্ট দেখে আল্লাহর উপর ভরসা হারিয়ে না ফেলে আল্লাহর গুণগুলো নিয়ে ভালভাবে চিন্তা করুন। আপনার মনে আল্লাহর সম্পর্কে যত ধরণের সংশয়, দ্বিধা, সন্দেহ আছে, তা চলে যাবে। কু’রআন নিজে মনোযোগ দিয়ে বুঝে পড়লেই এধরনের সংশয়ের সমাধান পেয়ে যাবেন। যখনি মনে কোন সন্দেহ জাগবে, সেই সন্দেহের উত্তর খোঁজার জন্য কু’রআন পড়া শুরু করবেন। দেখবেন আল্লাহ আপনার সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে রেখেছেন। সবসময় মনে রাখবেনঃ
  • আল্লাহ কখনই মানব জাতির কোন ক্ষতি করেন না, বরং মানুষরাই মানুষের ক্ষতি করে। (১০:৪৪)
  • কিছুদিন আগে আমাকে একজন জিজ্ঞেস করেছিলেন, “আল্লাহ কেন গরিব মানুষগুলোকে মান্না এবং সালওয়া পাঠায় না, যে রকম কিনা ওই বদ ইহুদিগুলোকে দিয়েছিল।” এ ধরণের অলৌকিক ঘটনা ঘটলে তার ফলাফল কি ভয়াবহ হবে চিন্তা করে দেখুন। ধরুন বসনিয়াতে নির্যাতিত মুসলিমদের উপর একদিন হঠাৎ করে আকাশ থেকে মান্না এবং সালওয়া আসা শুরু হল। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সেই খবর ইন্টারনেটএ ছড়িয়ে যাবে এবং বিবিসি, সিএনএন, ন্যাশনাল জিওগ্রাফি, ডিসকভারি চ্যানেল থেকেশত শত হেলিকপ্টারে করে হাজার হাজার সাংবাদিক গিয়ে সেখানে হাজির হবে। পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ সারাদিন বসে টিভিতে দেখতে থাকবে এই অসম্ভব ঘটনা। সাড়া পৃথিবী থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ এই অলৌকিক ঘটনা নিজের চোখে দেখার জন্য প্লেনে করে বসনিয়াতে যাবার জন্য বিরাট লাইন দিয়ে দিবে। বসনিয়ার আসে পাশের দেশগুলো থেকে লক্ষ লক্ষ গরিব মানুষ গরু, ঘোড়া, গাধায় করে রওনা দিবে বসনিয়ার উদ্দেশে এই বিনামুল্যে পাওয়া খাবারে ভাগ দেবার জন্য। কয়েক দিনের মধ্যে পৃথিবীর একটা বড় জনগোষ্ঠী বসনিয়াতে গিজ গিজ করতে থাকবে। বসনিয়ার বাড়িঘর, রাস্তাঘাটে কোন জায়গা পাওয়া যাবে না। শহরের পানি, খাদ্য, পয়ঃনিস্কাশন ব্যবস্থা নষ্ট হয়ে যাবে। খ্রিস্টান, মুসলিম, ইহুদি আলেমদের মধ্যে বিরাট ঝগড়া লেগে যাবেযে এই অলৌকিক ঘটনার জন্য কে দায়ী – আল্লাহ, নাকি যীশু, নাকি ইহুদিদের খোদা এল্লাহি। কয়েকদিনের মধ্যে পশ্চিমা দেশের বড় বড় কোম্পানিগুলো তাদের আর্মিকে হাতিয়ে, বসনিয়াকে ক্যান্টনমেন্ট বানিয়ে কাটা তারের বেড়া দিয়ে সবাইকে বের করে দিবে, মান্না এবং সালওয়া নিয়ে গবেষণা এবং ব্যবসা করার জন্য।
  • আল্লাহ জানেন এ ধরণের কোন অলৌকিক ঘটনা ঘটালে মানব জাতির লাভের থেকে ক্ষতিহবে। এ কারণেই তিনি তা করেন নাঃ
  • অলৌকিক নিদর্শন পাঠাতে আমার কোন বাঁধা নেই, কিন্তু আগের প্রজন্মগুলো সেগুলো অমান্য/অস্বীকার  করেছে। আমি থামুদের লোকদেরকে পরিস্কার নিদর্শন হিসেবে এক উটদিয়েছিলাম। কিন্তু তারপরেও তারা সেটার সাথে অন্যায় করেছিল। আমি অলৌকিক নিদর্শন পাঠাই মানুষকে শুধুমাত্র সাবধান করতে। (১৭:৫৯)

আল্লাহ কেন এরকম করলো? আল্লাহ থাকতে এসব হয় কিভাবে?

  • بِسْمِٱللَّهِ ٱلرَّحْمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ
  • আল্লাহ আমাকে কেন বানিয়েছেআমি কি আল্লাহকে বলেছিলাম আমাকে বানাতেআল্লাহ আমাকেপৃথিবীতে পাঠাবার আগে আমাকে জিজ্ঞেস করল না কেন আমি এরকম জীবন চাই কিনা?“
  • যারা এধরনের প্রশ্ন করে তাদেরকে আপনি যদি একটা যুক্তিযুক্ত উত্তর দেনও, সাথে সাথে তারা প্রশ্ন করবেঃ
  • আল্লাহ কেন আমাকে এতো কষ্টের জীবন দিলযেখানে অন্যরা কত শান্তিতে আছেআমি কি বলেছিলাম আমাকে এতো কষ্ট দিতে?”
  • আপনি যদি ব্যাখ্যা করেন কিভাবে ক্যাপিটালিস্ট অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এমন ভাবে বানানো হয়েছে যে, কেউ ধনী হলে সেঅন্য অনেক মানুষকে গরীব বানিয়ে ছাড়বেই, তখন তারা এই ধরণের প্রশ্ন করা শুরু করবেঃ
  • আল্লাহ আমাকে মেয়ে বানালো কেনআমিতো মেয়ে হতে চাইনিআল্লাহ আমাকে কালো কিন্তু অন্যদেরকে ফর্সা বানাল কেনএটা তো ঠিক হল নাআমি খাট কেনলম্বা না কেনআমার কপালে এরকম শয়তান স্বামী পড়ল কেনআমি পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়িরোযা রাখিকোনদিন ঘুষ খাইনিকিন্তু তারপরেও আমার ক্যান্সার হল কেন?”
  • এই ধরনের “আমি, আমার, আমাকে” প্রশ্নগুলোর উত্তর পাবার পর তারা চলে যাবে আরও জটিল সব ঘটনায়ঃ
  • সত্যিই যদি আল্লাহ থাকে তাহলে পৃথিবীতে এতো দুঃখকষ্ট কেনমুসলমানরা কেন আজকে সবচেয়ে দুর্বলপশ্চাদপদনিপীড়িত জাতিসব টেররিস্টগুলো মুসলমান কেনকেন ধর্মের নামে এতো খুনাখুনিযুদ্ধআল্লাহ কেন শয়তানকে বানালোশয়তান না থাকলে তো আমরা সবাই বেহেস্তে যেতে পারতাম।আল্লাহর মানুষ বানিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়ে এতো কষ্ট দেবার দরকার কি ছিলসরাসরি মানুষকে বেহেস্তে পাঠালেই তো হয়ে যেত। আল্লাহ কি জানে না কে বেহেস্তে যাবেকে দোযখে যাবেতাহলে মানুষকে পৃথিবীতে পাঠিয়ে পরীক্ষা করার দরকার কিআল্লাহ যদি জানেই আমি দোযখে যাবো তাহলে আমার আর ভালো কাজ করে লাভ কিআল্লাহ যদি সত্যিই অতি দয়ালু হয় তাহলে দোযখ বানিয়ে মানুষকে এতো কষ্ট দিবে কেনএই জীবনে অল্প কয়েক বছরের কিছু দোষের জন্য দোযখে এতো ভয়াবহ শাস্তি পেতে হবে – এটাতো অন্যায়।
  • এধরণের প্রশ্ন শুধু যে অমুসলিম, নাস্তিকরা করে তাই না, আজকাল মুসলমানদের মধ্যেও ব্যাপক হারে এধরণের প্রশ্ন করতে দেখা যায়। বিশেষ করে আমরা যখনি কোন জটিল শারীরিক, মানসিক, পারিবারিক, সামাজিক সমস্যায় পড়ি, তখনি আল্লাহর সম্পর্কে এই ধরণের অভিযোগ করা শুরু করে দেই।
  • এই সবগুলো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে আমি প্রশ্নকারীদেরকে তিন ভাগে ভাগকরবঃ
  • অসহায় ক্যাটাগরিঃ কেন আমাকে বানাল, কেন আমার এতো কষ্ট, কেন আমার এত অসুখ, …
  • স্বার্থপর ক্যাটাগরিঃ আমি মেয়ে কেন, আমি কালো কেন, আমার এতো অভাব কেন, …
  • দার্শনিক ক্যাটাগরিঃ কেন শয়তান, কেন দোযখ, কেন পৃথিবীর দরকার, সোজা বেহেস্ত দিলেই তো হত, …
  • এই তিন ধরণের ক্যাটাগরির মানুষের জন্য তিন ধরণের ব্যাখ্যা দিব, ইনশা আল্লাহ।
  • কিন্তু যে কোন প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে আমাদেরকে প্রথমে ‘আল্লাহ’ বলতে আমরা কি ধরনের সত্ত্বার কথা বলছি, তার সম্পর্কে কিছুটা ধারণা থাকা দরকার। যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা সঠিকভাবে উপলব্ধি না করবো ‘আল্লাহ’ কে, ততক্ষণ পর্যন্ত প্রশ্নগুলোর উত্তর দিয়ে লাভ হবে না। সবসময় একটা ‘কিন্তু…’ থেকেই যাবে।
  • আজ থেকে মাত্র বিশ বছর আগেও আপনি যদি কাউকে বলতেন যে শীঘ্রই আপনি ফার্মগেটে বাসে ঝুলতে ঝুলতে বাংলাদেশে থেকে আমেরিকায় কারও সাথে সরাসরি কথা বলতে পারবেন, সে আপনাকে পাগল ভাবতো। কিন্তু এখন আমাদের সবার হাতে দেখুন মোবাইল ফোন রয়েছে। আজ থেকে পনের বছর আগেও যদি কাউকে বলতেন শীঘ্রই আপনি বান্দরবনের এক পাহাড়ে বসে আমেরিকায়, যুক্তরাজ্যে, চায়নায় কয়েকজন মানুষের সাথে সরাসরি শুধু কথাই বলতে পারবেন না, একই সাথে তাদেরকে দেখতেও পারবেন, ফাইল আদান প্রদান করতে পারবেন, তাহলে সে আপনারদিকে আতংক নিয়ে তাকাতো। কিন্তু দেখুন এখন Skype মানুষের ঘরে ঘরে।  গত একশ বছরে মানুষ জ্ঞানে, বিজ্ঞানে, প্রযুক্তিতে এতোটা এগিয়ে গেছে যেটা গত হাজার বছরেও হয়নি। মানুষ যদি মাত্র একশ বছরে এমন সব কল্পনাতীত অর্জন করতে পারে, তাহলে মানুষ আজ থেকে দশ হাজার বছরপরে কোথায় যাবে, সেটা এই বিংশ শতাব্দীতে বসে আমরা কল্পনাও করতে পারবো না। মানুষের উন্নতি যদি একই ধারায় চলতে থাকে, তাহলে আজ থেকে দশহাজার বছর পরের মানুষ আমাদের থেকে জ্ঞান-বিজ্ঞানে এতো এগিয়ে যাবে, চিন্তার ক্ষমতায় এতো উন্নত হবে, মানসিক ধারণ ক্ষমতা এতো বেশি হবে যে, আজকে শিম্পাঞ্জী এবং মানুষের মধ্যে যে রকম ব্যাপক ব্যবধান, তাদের সাথে আমাদের ব্যবধান হবে সে রকম। সেই উন্নত মানবজাতির কেউ একজন যদি আজকে আমাদের কাছে কোনো ভাবে চলে আসে, তাহলে সে চারিদিকে তাকিয়ে শুধুই শিম্পাঞ্জী গোছের কিছু মানুষ দেখবে। আমাদের কাছ থেকে তারকিছুই শেখার বা জানার থাকবে না, এমনকি তার কথা বোঝার মতো যথেষ্ট মানসিক ক্ষমতাও আমাদের থাকবে না।
  • তাহলে চিন্তা করে দেখুন যেই সত্ত্বা ১৬০০ কোটি বছরের (মহাবিশ্বের বয়স) থেকে অনেক বেশি সময় ধরে আছেন, যিনি মানুষের মতো অত্যন্ত বুদ্ধিমান প্রাণী সৃষ্টি করতে পারেন, যিনি এই বিশাল পৃথিবীকে সৃষ্টি করতে পারেন, যিনি পৃথিবীর মতো এরকম একটি দুটি নয়, বরং ১০ ০০০ ০০০০০০ ০০০ ০০০ ০০০ ০০০ এরও বেশি গ্রহ, নক্ষত্র সৃষ্টি করে তাদের রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারেন, তিনি আমাদের থেকে কত উপরে। তাঁর জ্ঞান, তাঁর “মানসিক” ক্ষমতা, তাঁর পরিকল্পনা, তাঁর সৃজনশীলতা কোন্‌ পর্যায়ের হতে পারে, সেটা আমাদের পক্ষে কোনভাবেই আন্দাজ করা সম্ভব নয়, যেখানে কিনা আমরা নিজেরাই দশ হাজার বছর পরে কি পর্যায়ে পৌছাবো সেটাই কল্পনা করতে পারি না।
  • যারা আল্লাহর সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে নানা ধরণের প্রশ্ন করে, তারা আসলে আল্লাহ কে এবং সে কে – সেটাই তারা বোঝে না। তারা মনে করে তারা তাদের বিবেক বুদ্ধিব্যবহার করে আল্লাহর জ্ঞান, সিদ্ধান্ত, কাজের মধ্যে অনেক ফাঁক ফোঁকর বের করে ফেলেছে, যেটা আল্লাহ বের করতে পারেন নি। বাইবেলে এর একটা চমৎকার উত্তর দেওয়া আছেঃ
  • “Destructionis certain for those who argue with their Creator. Does a clay pot ever argue with its maker? Does the clay dispute with the one who shapes it, saying,‘Stop, you are doing it wrong!’ Does the pot exclaim, ‘How clumsy can you be!’How terrible it would be if a newborn baby said to its father and mother, ‘Why was I born? Why did you make me this way?
  • যারা তাদের প্রভু সাথে তর্ক করে তাদের ধ্বংস নিশ্চিত। একটা মাটির পাত্র কি কখনও কামারের সাথে তর্ক করে? মাটি কি তাকে বলে, “থামো, তুমি ভুল করে বানাচ্ছ!” মাটির পাত্রটাকি অভিযোগ করে, “তুমি এতো খামখেয়ালি কেন?” কি বাজে ব্যপার হবে যদি একটা শিশু জন্ম নিয়েই তার বাবা-মাকে প্রশ্ন করে, “আমি জন্ম হলাম কেন? আমাকে এরকম করে জন্ম দিলে কেন?” (Isaiah:45:9-10)
  • কু’রআনের পুরো বাণীকে যদি এক লাইনে বলা যায়, তাহলে কু’রআনের বাণী হচ্ছেঃ
  • আল্লাহ হচ্ছে তোমার প্রভু, তুমি হচ্ছ আল্লাহর একজন দাস।
  • একজন দাসকে তার প্রভু যা ইচ্ছা দিতে পারে, যা ইচ্ছা কেড়ে নিতে পারে। এখানে দাসের অভিযোগ করার কিছুই নেই। প্রভু কোন বন্ধু না যে দাসকে তার কোন জবাব দিতে হবে। আমার যদি একটা গরু থাকে এবং গরুটা দুধ দেওয়া বন্ধ করে দিলে আমি যদি তাকে বিক্রি করে দিতে চাই, তখন যদি গরুটা আমার সাথে তর্ক শুরু করে, “আমি না এত দুধ দিলাম? আমাকে বিক্রি করবা কেন?” – তাহলে ব্যপারটা কেমন দাঁড়ায়?
  • এই পর্যায়ে গিয়ে বেশিরভাগ মানুষের প্রতিক্রিয়া হয়ঃ
  • নাএটা তো ঠিক হল না! আল্লাহ আমাদের প্রভু এবং আমরা দাস হলেই কি আল্লাহ আমাদেরকে নিয়ে যা খুশি তাই করবেএটা কেমন এক প্রভুর সংজ্ঞা হল?”
  • আল্লাহ অন্য সব প্রভুর মত নন। প্রভু-দাস এই শব্দগুলো সম্পর্কে আমাদের কোন ভালো ধারণা নেই কারণ প্রভু হিসেবে মানুষ সাধারনত সবসময়ই নিষ্ঠুর, স্বেচ্ছাচারী, অত্যাচারী হয়। আর দাস বলতে আমরা সবসময় বুঝি অত্যাচারিত, অধিকার বঞ্চিত, গরিব মানুষ।কিন্তু আল্লাহ তাঁর বর্ণনা দিয়েছেন সুরা ফাতিহাতেঃ
  • আল্লাহর নামে, পরম করুণাময়, নিরন্তর করুণাময়। সমস্ত প্রশংসা-মহিমা-ধন্যবাদ আল্লাহর, যিনি সৃষ্টি জগতের প্রভু। পরম করুণাময়, নিরন্তর করুণাময়। (১:১-৩)
  • এখানে আল্লাহ বার বার বলেছেন, তিনি হচ্ছেন পরম করুণাময়, নিরন্তর করুণাময় প্রভু। তিনি মানুষের মত অল্প করুণাময়, মাঝে মাঝে করুণাময় নন। আল্লাহ কিন্তু শুধুই বলতে পারতেন “তিনি পরম করুণাময়”, ব্যাস। কিন্তুএকজন পরম করুণাময় কিন্তু সবসময় করুণা নাও দেখাতে পারেন। তিনি সকালে করুণা দেখালেন, রাতে আর দেখালেন না। কিন্তু না, তিনি নিরন্তর করুণাময়, তিনি প্রতি মুহূর্তে আমাদেরকে করুণা করছেন। আপনি যখন সকালে ফজরের এলার্ম বন্ধ করে নামায পড়বেন কিনা তা কিছুক্ষন চিন্তা ভাবনা করে আবার ঘুম দেন, তখন আপনার একটা হাত খুলে পড়ে যায় না। আপনি যখন একজন অন্ধ ফকিরের পাশ দিয়ে নাদেখার ভান করে হেটে চলে যান, তখন কিন্তু আপনার চোখ দুটা নষ্ট হয়ে যায় না। কারণ আল্লাহনিরন্তর করুণাময়। আপনি তাঁর এক মামুলি দাস হয়ে দিনের বেশিরভাগ সময় তাঁর আদেশ অমান্য করে, তাঁকে আপনার পরিবারের সদস্যদের চাহিদা থেকে কম গুরুত্ব দিয়ে, লোকে কি বলবে এই ভেবে ক্রমাগত তার আদেশ ভেঙ্গে যাবার পরেও তিনি আপনাকে প্রতিদিন ছেড়ে দেন। কারণ তিনি নিরন্তর করুণাময়, চরম ধৈর্যশীল।
  • এছাড়াও তিনি বলেছেন – সমস্ত প্রশংসা, মহিমা, ধন্যবাদ তাঁর। তিনি যাই করেন, সেটাই প্রশংসনীয়। সেটা আমরা আমাদের নগণ্য বুদ্ধি নিয়ে বুঝি, আর নাই বুঝি। একটা সামান্য পিঁপড়া যেভাবে হাজার হাজার পিঁপড়ার সাথে ক্রমাগত যোগাযোগ করে, যার সমকক্ষ কিছু মানুষ এখনও তৈরি করতে পারেনি; যেভাবে মৌমাছিরা ভূমিকম্প প্রতিরোধক বাসা তৈরি করে, যা মানুষ এখনও বানাতে পারেনি, যেভাবে এক মামুলি ঘাস নাইট্রোজেন জমা করে হাজার ধরণের ছোট বড় প্রাণীকে প্রোটিন সরবরাহ করে, যার ধারে কাছে কোন কিছু মানুষ বানাতে পারেনি – এসব কিছুর মধ্যে আল্লাহর বিরাট প্রশংসা এবং মহিমা রয়েছে।আমরা মানুষরা যদি আল্লাহর এই মহিমা উপলব্ধি করে তাঁর প্রশংসা না করি, আল্লাহর তাতে কিছুই যায় আসে না। আমরা শুধু শুধুই নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারবো।
  • তাহলে আমার এতো অভাব কেনআমার এতো অসুখ কেন?”
  • স্বাভাবিক ভাবেই এই প্রশ্নগুলো আসে। “যদি আল্লাহ সত্যিই পরম করুণাময়, নিরন্তর করুণাময়, সকল প্রশংসা পাবার যোগ্য হন, তাহলে আমার এইকরুণ অবস্থা কেন?”
  • আপনার সমস্যা হচ্ছে আপনি মনে করছেন, যদি আল্লাহ পরম করুণাময়, নিরন্তর করুণাময়, সব প্রশংসার অধিকারী হন, তাহলে আপনার জীবনটা হবে বেহেস্তের মত। আপনার যোগ্যতা থাকুক বা না থাকুক – আল্লাহ আপনাকে কোন টাকা পয়সার অভাব দিবেন না। আপনার দাদা-নানা তাদের জীবনে ফাঁকিবাজি করে আপনার বাবার জন্য জীবনটা সচ্ছল করে দিয়ে যাক বা না যাক, আল্লাহ আপনার জীবনটা ঠিকই আরামে পার করে যাবার সব ব্যবস্থা করে দিবেন। আপনি প্রতিদিন লক্ষ মানুষের মল মিশ্রিত ঢাকা ওয়াসার দুষিত পানি পান করেন আর নাই করেন, আল্লাহ আপনার পাকস্থলিকে এতো শক্তিশালী করে দিবে যে সেই পানি খেয়েও আপনার কোন অসুখ হবে না। আপনি প্রতিদিন ফরমালিন দেওয়া ফল, মাছ খান বা না খান, আলাহ প্রতি মাসে আপনার শরীরের সব কোষকে নতুন করে পাল্টিয়ে দিয়ে কখনও আপনার শরীরে ক্যানসার হতে দিবেন না।
  • আপনি কু’রআনের উপদেশ মেনে আপনার জীবন পার করবেন না, কিন্তু তারপরেও আপনার ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক জীবনে কোন সমস্যা থাকবে না। আল্লাহ মহাবিশ্বের সব নিয়ম কানুন ভেঙ্গে, বিশ্বের সমস্ত মানুষের সব খারাপ কাজের প্রভাব থেকে আপনাকে মুক্ত রেখে; সমস্ত জীবাণু, রাসায়নিক বিষক্রিয়ার প্রভাব থেকে আপনার দেহকে প্রতিরোধ করে; অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ, সমস্ত ঘটনাকে আপনার সুবিধা মত পরিবর্তন করে, আপনার কাছে যখন যেটা সমস্যা মনে হবে, সেটাই তিনি দূর করে দিবেন। এই হচ্ছে আপনার মতে “পরম করুণাময়, নিরন্তর করুণাময়” এর সংজ্ঞা।
  • কিন্তু সেটা আল্লাহর দেওয়া সংজ্ঞা নয়। এখন আপনি বলবেনঃ
  • তাহলে আমার দোষ কিআমাকে দুনিয়াতেও কষ্ট করতে হবে আবার দোযখের শাস্তিও পেতে হবেএটা কেমন ন্যায় বিচার হল?”
  • তোমার প্রভু কারো সাথে একটুও অবিচার করবেন না। ১৮:৪৯
  • কিয়ামতের দিন যখন পাপীদেরকে জাহান্নামে নেওয়া হবে, তখন কেউ দাবিকরবে না যে তাকে অন্যায়ভাবে জাহান্নামে নেওয়া হচ্ছে। সবাই যখনতাদের কাজের ফলাফল দেখতে পাবে, তখন সবাই নিজেরাই বুঝতে পারবে যে সে শাস্তি পাবার যোগ্য।
  • একই ভাবে দুনিয়াতে প্রতিটি কষ্টের জন্য আল্লাহ কিয়ামতের দিন তাকে ছাড় দিবেনই, যদি মানুষ কষ্টে পরেও আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে নাফেলে, আল্লাহকে অভিযুক্ত না করে বরং তার বিশ্বাসকে আঁকড়ে থাকে।
  • ‘আমি’ তোমাদেরকে নিশ্চয়ই পরীক্ষা করবো ভয়, ক্ষুধা, এবং সম্পত্তি, জীবন ও ফল-ফসল হারানোর মধ্য দিয়ে। তবে (মুহম্মদ) ধৈর্যধারণকারীদের সুসংবাদ দাও। যাদেরকে দুর্ঘটনা/বিপর্যয়/কষ্ট আঘাত করলে বলে, “নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর এবং তাঁর কাছেই আমরা ফেরত যাব।” তাদের উপরেই আল্লাহর পক্ষ থেকে অনুগ্রহ এবং দয়া রয়েছে এবং তারাই সঠিকপথে আছে। (২:১৫৫-১৫৭)
  • যারাই জীবনে পরীক্ষায় পড়ে আল্লাহকে দোষ না দিয়ে আল্লাহর সিদ্ধান্ত মেনে নিবে এবং ধৈর্য ধরবে, আল্লাহ তাদেরকে জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন। সুতরাং চলুন আমরা বেশিকরে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি যেন তিনি আমাদেরকে জীবনের কঠিন পরীক্ষাগুলো ধৈর্য নিয়ে পাস করার সামর্থ্য দেন।
  • এছাড়াও আরেকটি অসাধারণ আয়াত হলঃ
  • তোমাদেরকে শাস্তি দিয়ে আল্লাহর কি লাভ? ৪:১২৭
  • আল্লাহ কেন আমাদেরকে খামোখা শাস্তি দিবেন? তাঁর তো আমাদেরকে শাস্তি দিয়ে কোন লাভ নেই। তিনি আমাদেরকে শাস্তি তখনই দিবেন যখন আমরা শাস্তি পাবার মত কাজ করবো। আপনি আমি যখন Nando’s চিকেন খাই, আর আমাদের পাশের গলিতে একটা লোক না খেয়ে ছেড়া চাদর গায়ে দিয়ে রাস্তায় ঘুমায়, তখন আমাদেরকে যখন জাহান্নামে নেওয়া হবে, আমরা কিন্তু সেটাকে “এটা ঠিক হল না!” বলে চিল্লাচিল্লি করবো না। আমরা যখন আমাদের ছেলে মেয়েদেরকে নিয়ে আইফোনে গেম ফেলি, টিভি দেখি, রেস্টুরেন্টে খাই, স্কুলে পাঠাই, কিন্তু তাদেরকে দশ মিনিটও কু’রআন পড়ে শোনাই না, সারা জীবনে তাদেরকে আল্লাহর পাঠানো একমাত্র বইটা শেখাইনা; তারপর তারা বড় হয়ে নামায ফাঁকি দেয়, সুদের লোণ নেয়, বন্ধু বান্ধব নিয়ে পার্টি করে, অশ্লীল সিনেমা দেখে, মিথ্যা কথা বলে, প্রতারণা করে, ফুটানি করে, গরিবের সাথে অন্যায় করে – তখন সেই সমস্ত গুনাহর ভাগীদার হয়ে আমরা যখন মাথা নিচু করে জাহান্নামে যাবো, তখন আমরা প্রশ্ন করবো না – “আমার কি দোষ ছিল!”
  • আমাদের বাবা-মা যখন আমাদেরই চোখের সামনে ইসলাম না মেনে অন্যায় করে যাচ্ছে, আর আমরা ভাবছি – “তাদেরকে ভালো কথা বলতে গেলেই আরেকটা লেকচার শুনতে হবে, একটা ঝগড়া শুরু হয়ে যাবে, এর চেয়ে নিজেঠিক থাকি।” তারপর যখন কিয়ামতের দিন আমাদেরকে দেখান হবে কিভাবে আল্লাহ আমাদেরকে ইসলাম শেখার এবং অনুসরন করার সব ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন, কিন্তু আম রাঅকৃতজ্ঞের মত নিজের বাবা-মাকেও সংশোধন করার কষ্টটা করতে পারি নি। যারা কিনা ছোটবেলায় আমাদের বমি পরিস্কার করেছে, সারারাত আমাদের ক্যান ক্যান শুনে নিজেরা না ঘুমিয়ে কোলে নিয়ে বারান্দায় হেঁটেছে, সারাদিন কাজ করে পরদিন ভোর বেলা উঠে স্কুলে নিয়ে গেছে – তাদেরকেই আমরা নিজেদের হাতে জাহান্নামে ঠেলে দিয়েছি। তখনযদি আমাদেরকে তাদের সাথে জাহান্নামে পাঠানো হয়, আমরা তার প্রতিবাদ করবো না।
  • আল্লাহ আমাদের সম্পর্কে একটা চমৎকার কথা বলেছেনঃ
  • যখন আমি মানুষকে অনুগ্রহ করি তখন সে গর্বে নিজের মত থাকে, কিন্তু যেই না খারাপ কিছু হয়, সাথে সাথে সে লম্বা দোয়া করা শুরু করে। ৪১:৫১
  • যারা এই সব প্রশ্ন করে, দেখবেন তাদের দিনকাল যখন বেশ ভালো যায় – কোন অসুখ নেই, টাকা পয়সার অভাব নেই, ব্যবসা-বাণিজ্য ভালো যাচ্ছে – তখন কিন্তু তারা এইসব প্রশ্ন করে আল্লাহকে চ্যালেঞ্জ করে না। বরং যখনই তার কোন সমস্যা হয়, তার পরিবারের কারো বিপদ হয়, ডায়াবেটিস, ক্যানসার ধরাপড়ে, তখনই তাদের এই সব প্রশ্ন শুরু হয়। মানুষের মত একটা নগণ্য বুদ্ধির প্রাণী, যারা এখন পর্যন্ত পদার্থের ‘ভর’ কেন হয় – এরকম অত্যন্ত প্রাথমিক একটা ব্যপার বের করতে পারেনি; যেই ‘হিগ্‌স বোসন’ বের করার জন্য ২ বিলিয়ন ডলার খরচ করে গবেষণা করছে এক যুগ ধরে, তারাই এই মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তার অচিন্তনীয়, অকল্পনীয় সৃষ্টিকে নিয়ে চ্যালেঞ্জ করে। এরকম মূর্খ একটা প্রাণীই দাবি করে – আল্লাহ বলে কিছু নেই, থাকলে পৃথিবীতে এত অশান্তি, এত দুঃখ, কষ্ট, যুদ্ধ, থাকতো না।
  • কিন্তু আপনি এসব কিছুই মানতে পারছেন না। আপনি বলবেনঃ
  • আল্লাহ আমাকে পৃথিবীতে পাঠাবার আগে আমাকে জিজ্ঞেস করল না কেন আমি এরকম জীবন চাই কিনা?”
  • যারা এধরনের প্রশ্ন করে তারা আসলে চিন্তা করেই দেখেনি কি রকম অবাস্তব একটা প্রশ্ন এটা। আল্লাহ কি প্রতিটা মানুষের আত্মাকে জন্ম হবার আগে একটা ঐশ্বরিক টিভি ছেড়ে দিয়ে বলতেন, “দেখ, এই হচ্ছে তোমার হবু বাবা-মা। তাদের অবস্থা দেখে তোমার যদি পছন্দ হয়, তাহলে আমাকে জানাও, আমি তোমাকে পৃথিবীতে পাঠাব।”
  • ধরুন আপনার বাবাকে এই সুযোগটা দেওয়া হয়েছিল। তিনি ‘না’ বলেছিলেন কারণ আপনার দাদা-দাদিকে তার পছন্দ হয় নি। যে কারনে আপনার বাবার জন্ম হয়নি। তাহলে আপনি আসবেন কোথা থেকে?
  • এভাবে পেছনের দিকে যেতে থাকেন। আপনার বড় দাদা, তার বাবা, তার বাবা। কেউ একজন যদি বলতেন, ”না, আমার বাবা-মাকে আমার পছন্দ হচ্ছে না, আমি যাবো না” – তাহলে পুরো একটা প্রজন্মের কোন দিন জন্ম হত না। আপনি কোন দিন সেই সুযোগটা পেতেন না। আপনার আত্মাকে বলা হত – “যেহেতু তোমার বাবা পৃথিবীতে যেতে চাচ্ছে না, সেহেতু তোমার পৃথিবীতে যাবার কোন সুযোগ নেই।” তখন কি আপনি দাবি করতেন না – “কেন? আমার বাবা না গেলে আমি সুযোগ পাব না কেন? এটা অন্যায়!”
  • এ পর্যায়ে আমাকে একজন বলেছিলেন, “আচ্ছা ঠিক আছে, আমি পৃথিবীতে আসব, কি আসব না সেটা না বলে, আমাকে আমার পছন্দ মত বাবা-মা দেওয়া হল না কেন?”
  • ব্যপারটা কিভাবে ঘটত চিন্তা করে দেখেছেন কি? আল্লাহ কি আপনাকে একটা ঐশ্বরিক টিভি এবং একটা ঐশ্বরিক রিমোট দিয়ে বলতেনঃ
  • “যাও, পৃথিবীতে এখন যে ২ কোটি বাবা-মা আছে, তাদের অবস্থা দেখে সিদ্ধান্ত নাও। এই রিমোটটা দিয়ে একটা করে চ্যানেল পালটালে একটা করে বাবা-মার জীবন দেখতে পারবে। তোমার দেখা শেষ হলে আমাকে বল কোন বাবা-মার সন্তান হতে চাও তুমি।”
  • তাহলে এই সুযোগ শুধু আপনাকে না, প্রতিদিন যে লক্ষ লক্ষ বাচ্চা জন্ম হয় তাদের প্রত্যেকের আত্মাকে একই সুযোগ দিতে হবে। তাহলে ঘটনা কি দাঁড়াবে? প্রতিদিন হাজার হাজার আত্মা আল্লাহকে গিয়ে বলবে, “আমি বিল গেটসকে আমার বাবা হিসেবে চাই”।
  • প্রতি দিন সকালে বিল গেটসের স্ত্রী মেলিন্ডা গেটস ঘুম থেকে উঠে দেখবেন, তার সামনে হাজার হাজার আত্মার বায়োডাটা পড়ে আছে এবং তাকে বলতে হবে কাকে তিনি আজকে জন্ম দিতে চান। তিনি যাদেরকে না বলবেন, তাদের আত্মার কাছে খবর চলে যাবে অন্য কোন বাবা-মা খুঁজে বের করতে। এই প্রক্রিয়া চলতেই থাকবে এবং যেই আত্মাগুলোর কপালে আফ্রিকার কোন গরিব বাবা-মা পড়বে, সে বলবে, “আমার কপালে এরকম বাবা-মা পড়ল কেন? কেন বিল গেটসকে আমার বায়োডাটা আগে দেওয়া হল না?”
  • তখন আমাকে যিনি এই প্রশ্নগুলো করছিলেন বললেন, “আল্লাহ আমাকে মেয়ে বানাল কেন? আমাকে তো অন্তত এইটুকু জিজ্ঞেস করতে পারত?”
  • তাহলে শুধু আপনাকে না, আজকে যে লাখ খানেক মেয়ে বাচ্চা জন্ম নিবে, তাদের সবাইকে এই সুযোগ দিতে হবে। তখন দেখা যাবে আজকে সবগুলো ছেলে বাচ্চা জন্ম হল। কালকেও সব ছেলে হল। এভাবে এক বছর ধরে শুধুই ছেলে বাচ্চা জন্মাল এবং এক প্রজন্মের মধ্যেই পৃথিবীতে সব মেয়ে শেষ হয়ে গেল এবং মানবজাতি পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল।
  • আপনি যত ভাবেই চিন্তা করেন না কেন, যখনি আপনি স্বার্থপর চিন্তা না করে, সবার জন্য সমানভাবে কাজ করে এরকম কোন নিরপেক্ষ ব্যবস্থা চিন্তা করে বের করবেন, দেখবেন আল্লাহ আমাদেরকে যেভাবে বানিয়েছেন, সেটাই সবচেয়ে নিরপেক্ষ ব্যবস্থা।
  • সুতরাং আল্লাহ যে সবচেয়ে নিরপেক্ষ, সবচেয়ে ন্যায়পরায়ণ, সবচেয়ে সুবিচারক সত্তা এবং তিনি যে প্রতিটি মানুষকে তার প্রতিটি কষ্টের জন্য যথাযথ প্রতিদান দিবেন – আপনি সেটায় সম্পূর্ণ আস্থা রাখুন। আপনি যদি মেয়ে হন, তাহলে আপনার মেয়ে হবার কারণে জীবনে যত জটিলতা হয়েছে, যা আপনি ধৈর্যধরে আল্লাহর সিদ্ধান্তকে মেনে নিয়ে, বিশ্বাসকে অটুট রেখে পার করেছেন, তার প্রত্যেকটার জন্য আপনার পরকালের হিসাব কম দিতে হবে এবং আপনি তত সহজে বেহেশতে যাবেন। ছেলেদের পরকালের হিসাব হবে আপনার থেকে অনেক অনেক কঠিন।তারা এই পৃথিবীতে যত আরামে থাকবে, যত সুযোগ সুবিধা পাবে, তাদেরকে তারজন্য বরং তত বেশি জবাব দিতে হবে।
  • ‘আমি’ তোমাদেরকে নিশ্চয়ই পরীক্ষা করবো ভয়, ক্ষুধা, এবং সম্পত্তি, জীবন ও ফল-ফসল হারানোর মধ্য দিয়ে। তবে (মুহম্মদ) ধৈর্য ধারণকারীদের সুসংবাদ দাও। যাদেরকে দুর্ঘটনা/বিপর্যয়/কষ্ট আঘাত করলে বলে, “নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর এবং তাঁর কাছেই আমরা ফেরত যাব।” [আরবিঃ ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন] তাদের উপরেই আল্লাহর পক্ষ থেকে অনুগ্রহ এবং দয়া রয়েছে এবং তারাই সঠিক পথেআছে। (২:১৫৫-১৫৭)
  • যারাই জীবনে পরীক্ষায় পড়ে আল্লাহকে দোষ না দিয়ে আল্লাহর সিদ্ধান্ত মেনে নিবে এবং ধৈর্য ধরবে, আল্লাহ তাদেরকে জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন। সুতরাং চলুন আমরা বেশিকরে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি যেন তিনি আমাদেরকে জীবনের কঠিন পরীক্ষাগুলো ধৈর্য নিয়ে পাস করার সামর্থ্য দেন।
  • আরেকটি ব্যাপার মনে রাখবেন, আল্লাহ আপনার ভালোর জন্য অন্য কোন বৃহত্তর স্বার্থ ত্যাগ করবেন না, কারণ সেটা মানুষের দৃষ্টিতেই অন্যায় হয়ে যাবে। বরং তিনি বৃহত্তর স্বার্থে ক্ষুদ্রতর ক্ষতি করবেন – যার একজন ভুক্তভুগি আপনি হতে পারেন। যেমন শেষ নবীর (সা) ছেলে সন্তান হয়ে মারা গিয়েছিল। একজন নবী, যাকে কিনা আল্লাহ সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেন, তাকে কিভাবে তিনি সন্তান মারা যাবার মত ভয়ংকর কষ্ট দিতে পারেন? তিনি কি তার সন্তান হওয়াটা আটকাতে পারতেন না? তিনি কি তার ছেলে সন্তানটিকে অলৌকিকভাবে বাঁচাতে পারতেননা? কত নবীকে তিনি অলৌকিকভাবে সাহায্য করেছেন! এধরণের ঘটনা থেকে এটাই প্রমাণিত হয় যে আল্লাহ বৃহত্তর স্বার্থে ক্ষুদ্রতর ক্ষতি করেন, সেটা নবী হোক, সাধারণ মুসলমান হোক, আর কোন কাফির হোক। কু’রআনের সবঅলৌকিক ঘটনাগুলো পড়লে দেখবেন যখনই মানব জাতির ব্যপক ক্ষতি হতে থাকে এবং সেটা না আটকালে মানবজাতির অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যেতে পারে, তখনি আল্লাহ অলৌকিক ঘটনা ঘটান। যেন তেন কারণে তিনি তাঁর নিজের বানানো পদার্থ বিজ্ঞানের নিয়ম, মহাবিশ্ব পরিচালনার আইন নিজেই যখন তখন ভাঙ্গেন না – আগুনকে ঠাণ্ডাহতে বলেন না, নদীর পানিকে রক্তাক্ত করেদেন না, আকাশ থেকে উল্কা বৃষ্টি করেন না। সুতরাং যখন আপনার ব্যক্তিগত স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হবে, ধরে নিবেন এরএকটা কারণ হতে পারে যে আল্লাহ বৃহত্তর স্বার্থে আপনার ব্যক্তিগত স্বার্থ ত্যাগ করেছেনএবং আপনার ক্ষতির যথাযথ প্রতিদান আপনি পাবেন। অথবা হতে পারে আল্লাহ আপনাকে কোন ভুল করার শাস্তি দিচ্ছেন, আপনার পাপমোচনের সুযোগ করে দিচ্ছেন।
  • শেষে আবারো বলব, যারা এধরণের প্রশ্ন করে তাদের আসল সমস্যা হচ্ছে তারা বুঝতে পারেনি প্রভুর সংজ্ঞা কি। আপনি প্রভু এবং দাস প্যারাগুলো বার বার পড়ুন।
  • আল্লাহর মানুষ বানিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়ে এতো কষ্ট দেবার কি দরকার ছিলসরাসরি মানুষকে বেহেস্তে পাঠালেই তো হয়ে যেত?”
  • তাহলে যারা দোযখে যাবে তারা কি জিজ্ঞেস করবে না, “কেন আমাকে দোযখ দেওয়া হল? আমি কি অপরাধ করেছি?” যারা বেহেস্তে যাবে, তারা কি দাবি করবে না, “কেন আমাকে বেহেশতে ৫০,০০০ একর বাগান দেওয়া হল, কেন ১,০০,০০০ একর বাগান দেওয়া হল না?”
  • মানুষকে যদি আল্লাহ কোন শাস্তি দেন, তাহলে এটা স্বাভাবিক যে আল্লাহ মানুষকে সেই শাস্তি পাবার কারণ কি সেটা দেখাবেন। তা না হলে মানুষ দাবি করবেই কেন তাকেশাস্তি দেওয়া হল। আল্লাহ যদি মানুষকে পৃথিবীর জীবনের সুযোগটা না দিয়ে জাহান্নাম বানিয়ে, তাতে সরাসরি মানুষ ভরে দিতেন – তাহলে মানুষ কি সেটা মেনে নিত?
  • একই ভাবে মানুষ যখন বেহেশতে যাবে, তার দাবি থাকবে তাকে বেহেশতে যা দেওয়া হয়েছে তা কিসের ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছে। কেন সে কম পেল তার বেহেশতের প্রতিবেশীর থেকে? কেন সে যা পেয়েছে তার থেকে অন্য কিছু পেল না? মানুষ স্বাভাবিকভাবেই দাবি করবে আল্লাহ কিসের ভিত্তিতে তাকে বেহেশতে সেসব দিয়েছে। একারণেই মানুষকে পৃথিবীর জীবন দেওয়া হয়েছে যেন মানুষ বেহেশতে যা কিছু পাবে, তা সে নিজে পৃথিবীতে অর্জন করে যেতে পারে।
  • এগুলো সবই হচ্ছে যুক্তি নির্ভর উত্তর। আল্লাহই ভালো জানেন তিনি কেন পৃথিবী বানিয়েছেন। যারা এধরনের প্রশ্ন করে তাদের প্রথম সমস্যাই হচ্ছে আল্লাহ এবং তার নিজের অবস্থান সম্পর্কে তার কোন ধারণানেই। আগে সেটা ঠিক করা দরকার।
  • আরেকটা ব্যপার হল, আপনি ধরেই নিচ্ছেন মানুষকে পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছে শুধুই কষ্ট করার জন্য। এটি কিছু জাল হাদিসের উপর ভিত্তিকরে প্রচলিত ভুল ধারণা। আল্লাহ তাঁর অসাধারণ সৃষ্টিকে নিয়ে কু’রআনে অনেক গর্ব করেছেন। তিনি মানুষকে বার বার বলেছেন পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াতে, তাঁর অসাধারণ সৃষ্টিকে উপভোগ করতে, পৃথিবীতে পরিমিত উপভোগ করে সুন্দর জীবন যাপন করে পরকালে আরও আনন্দের জন্য চেষ্টা করতে। আল্লাহ কতবার তাঁর সৃষ্ট সুস্বাদু ফলমূলের কথা কু’রআনে বলেছেন, যেন আমরা সেগুলো উপভোগ করি। কতবার তিনি তাঁর সৃষ্ট অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কথা বলেছেন, যেন আমরা সেগুলো ঘুরে দেখি। কতবার তিনি পৃথিবীতে কত আনন্দের উপকরণের কথা বলেছেন, যেন আমরা সেগুলো পাবার চেষ্টা করি। এমনকি আমরা কিন্তু নামাযে দোয়াও করিঃ
  • রাব্বানা আতিনা ফিদ দুনিয়া হাসানাতাও ওয়াফিল আখিরাতি হাসানাতাও,… ও আমাদের প্রভু, আমাদেরকে দুনিয়াতে কল্যাণ দিন, এবং আমাদেরকে আখিরাতেও কল্যাণ দিন। (২:২০১)
  • আল্লাহ আমাদেরকে প্রথমেই দুনিয়াতে কল্যাণ চেতে বলেছেন। তাঁর উদ্দেশ্য যদি থাকতো দুনিয়াতে একটা বন্দি, কষ্টের জীবন দেবার, তাহলে তিনি আমাদেরকে দুনিয়াতে কল্যাণ চেতে না বলে শুধুই চুপ করে ধৈর্য ধরে থাকতে বলতেন। কু’রআনে বহু আয়াতে আল্লাহ আমাদেরকে দেশ বিদেশ ঘুরতে বলেছেন, তাঁর অসাধারণ সৃষ্টিকে উপভোগ করতে বলেছেন, ব্যবসা বাণিজ্য করে জীবনকে সমৃদ্ধ করতে বলেছেন। আমাদেরকে দুনিয়াতে পাঠিয়ে শুধুই কষ্ট দেওয়াটা তার উদ্দেশ্য নয়।
  • আল্লাহ অনুগ্রহ করে যা দিয়েছেন তা নিয়ে যারা কিপটামি করে আর ভাবে সেটাই তাদের জন্য ভাল, না, বরং সেটা তাদের জন্য খুবই খারাপ। … (৩:১৮০)
  • সুতরাং আপনি কিপটামি করে টাকা জমিয়ে রেখে একটা নিম্ন মানের জীবন যাপন করে যদি মনে করেন আপনি ভাল কাজ করছেন, তবে সেটা ভুল। কিয়ামতের দিন আপনার সেই জমানো সম্পদ আপনার ঘাড়ে পেছিয়ে দেওয়া হবে।
  • এখন আপনি মনে করেন, আপনার জীবনের সব কষ্টের জন্য আল্লাহ দায়ী। আপনার কষ্টের পেছনে আপনার, আপনার বাবা-মার, আপনার দাদা-দাদি, নানা-নানি, মামা, চাচা, খালু, দেশের প্রধানমন্ত্রী কারও কোন হাত নেই। ভুল ধারণা। আপনি গরীব তার কারণ আপনার বাবা-মা তাদের জীবনে ভুল করেছে। আল্লাহর দেওয়া অনেক সুযোগ হেলা করে ছেড়ে দিয়েছে, কিপটামি করেছে। তারা আরেকটু বেশি চেষ্টা করলেই জীবনটা তাদের এবং আপনার জন্য অনেক সুন্দর করতে পারতো। কিন্তু তা না করে ঘরে বসে হিন্দি সিরিয়াল দেখেছে, প্রতিবেশীর বাসায় গিয়ে রাজনীতি আর শাড়ি নিয়ে গল্প করে আল্লাহর দেওয়া মূল্যবান সময়, সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিমত্তা, প্রতিভা এবং ক্ষমতা নষ্ট করেছে। একই ভাবে আপনার জীবনটা আজকে এত কঠিন এবং কষ্টের তার কারণ আপনার দাদা একটু চেষ্টা করলেই একটা জমিচাষ না করে আল্লাহ তাকে যে আরেকটা জমি চাষের সুযোগ করে দিয়েছিলেন, সেটা করে তিনি নিজের জন্য একটা বাড়ি করে ফেলতে পারতেন এবং আপনার বাবা তখন পড়াশুনা করে, ভালো চাকরি করে, তার নিজের জন্য আরেকটা বাড়ি কিনতে পারতেন – তাহলে আপনার তখন কোন অভাব থাকতো না। বাংলাদেশের প্রাক্তন শ্রদ্ধেয় প্রধানমন্ত্রীকে আল্লাহ দশ বছর আগে বিনামূল্যে ফাইবার অপটিক ইন্টারনেট পাবার সুযোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তার লোভের জন্য সেই সুযোগ ছেড়ে দিয়েছিলেন। তিনি যদি সেই সুযোগটা নিতেন, তাহলে আজকে লক্ষ লক্ষ বেকার যুবকের চাকরি থাকতো এবং লক্ষ লক্ষ পরিবার সুখী, সচ্ছল জীবন পার করতে পারতো। তাদেরকে দোষ না দিয়ে আপনার জীবনের সব সমস্যা, দুঃখ, কষ্টের জন্য শুধু আল্লাহকে দোষ দিচ্ছেন কেন? আল্লাহ তো আপনার বাবা-মা, দাদা-দাদি, নানা-নানি, প্রধানমন্ত্রীকে বিবেক-বুদ্ধি, সুযোগ, সামর্থ্য সবই দিয়েছিলেন।
  • আপনার যদি মনে হয়, আমার বাবা-মার কোনই উপায় ছিলনা তাদের অবস্থার পরিবর্তন করার, আল্লাহ তাদেরকে এমন কঠিন অবস্থায় রেখেছিলেন যে তাদের সেখান থেকে বের হবার কোন উপায়ই ছিল না, তাহলে আপনি বিজ্ঞানী আইনস্টাইন, প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, স্টিফেন হকিং এর জীবনী পড়ে দেখেন। অসম্ভব অবস্থার মধ্যে থেকেও তারা অসম্ভবকে সম্ভব করে গেছেন।আপনার বাবা-মা কু’রআন পড়ে আল্লাহর আদেশ মেনে চললেই তাদের অবস্থার পরিবর্তন করতে পারতেন। খুব সম্ভবত তারা জীবনে একবারও পুরো কু’রআন বুঝে পড়েননি এবং আপনিও হয়তো এখনও পুরো কু’রআন বুঝে পড়ে তার ১০% নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করেন নি। আর আপনিই কিনা আল্লাহকে দোষ দিচ্ছেন আপনার দুরবস্থার জন্য!
  • আর আপনি যদি ভাবেন – “এখানে আমার দোষ কি? অন্যের ভুলের জন্য আমাকে কেন পস্তাতে হবে?” তাহলে আপনি কি আশা করেন – আল্লাহ আপনাকে জন্ম দিবে গাছের মত পাতা দিয়ে, যাতে করে আপনি সূর্যের আলো থেকে সালোক সংশ্লেষণ করে খাবার তৈরি করতে পারেন, আপনাকে খাবারের জন্য কষ্ট করে চাকরি করতে না হয়? নাকি আপনার কান থেকে ঘন তরল সোনা বের হবে যা বিক্রি করে আপনি বাড়ি, গাড়ি কিনে ফেলতে পারবেন? না কি আল্লাহর উচিৎ ছিল আপনার বাবা-মার প্রজনন ক্ষমতা নষ্ট করে দেওয়ার, যাতে করে তারা সন্তান না পাবার দুঃখে সারা জীবন আল্লাহকে দোষ দিতেন?
  • আরেকটা ব্যপার হচ্ছে, মানুষ স্বভাবতই অলস। তাকে অভাব, কষ্ট না দিলে, একটু ধাক্কা না দিলে সে সাধারণত কোন ঝুঁকি নিতে চায় না। আর ঝুঁকি না নিলে জীবনে বড় কিছু পাওয়া যায় না। আল্লাহ অনেক সময় আপনাকে জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে কষ্ট, সমস্যা দেন আপনাকে সেই ধাক্কাটি দেবার জন্য যাতে করে আপনি যে ভুল দিকে যাচ্ছিলেন সেদিকে না গিয়ে সঠিক দিকে যান, নিজের জন্য এবং নিজের পরিবার, সন্তান, প্রতিবেশী, সমাজ, দেশের জন্য একটা বড় কিছু করেন। অনেক সময় আল্লাহ আপনাকে কষ্ট দেন আপনাকে সাবধান করার জন্য, যে আপনি একটা বড় পাপ কাজ ক্রমাগত করে যাচ্ছেন এবং আপনার নিজেকে সংশোধন করা উচিত।

বিধির লিখন যায় না খণ্ডন!

  • তাকদির সংশ্লিষ্ট ব্যাপার নিয়ে নাস্তিকরা এই পর্যন্ত কম জল ঘোলা করে নি। হতাশাবাদী থেকে শুরু করে ধার্মিক হৃদয়েও এরকম প্রশ্ন আসে- আমি খারাপ; এটা কি আমার দোষ? আল্লাহ্‌ই তো আমার ভাগ্যে খারাপ লিখেছেন। আল্লাহ্‌ যেহেতু জানেনই কে বেহেশতে যাবে আর কে জাহান্নামে যাবে, তাহলে দুনিয়াতে পাঠিয়ে এত কষ্ট দেয়ার মানে কি? সরাসরি জাহান্নাম বা জান্নাতে পাঠালেই তো হত! আর নাস্তিকদের তো রেডিমেড প্রশ্নই আছে যে, আল্লাহ্‌ই নাকি তাদের ভুল পথে পরিচালিত করেছে! আজকে আমরা তাকদির সংশ্লিষ্ট এরকম জটিল প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করবো।
  • ১। একজন মানুষের ভবিষ্যৎ তার মাতৃগর্ভেই লিখে দেয়া হয় এবং তাদেরকে ভুল পথে পরিচালিত করার মূলে রয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ্‌! তাহলে কেন তাদের কৃতকর্মের জন্য কিংবা কাফের/অবিশ্বাসী হওয়ার জন্য পরকালে সাজা পেতে হবে?
  • উত্তর: এটা নাস্তিকদের খুব প্রিয় একটা প্রশ্ন। তারা তাদের বক্তব্যের স্বপক্ষে সবসময় সূরা বাকারার ৬-৭ নম্বর আয়াতটা তুলে ধরে। প্রথমে এই আয়াতটা তাহলে দেখা যাক।
  • “নিশ্চয়ই যারা অবিশ্বাস করে, তাদের তুমি সাবধান করো, আর না-ই করো, তাদের কাছে তা একই কথা— তারা বিশ্বাস করবে না। আল্লাহ তাদের বুদ্ধিমত্তা/হৃদয়ের উপর এবং তাদের শোনার ক্ষমতার উপর সিল করে দিয়েছেন; তাদের দৃষ্টির উপরে আছে এক পর্দা। তাদের জন্য আছে এক প্রচণ্ড শাস্তি।” [সূরা বাকারাহ ২:৬-৭]
  • কু’রআনের মূল আরবি ছাড়া প্রচলিত অনুবাদগুলো পড়ে মানুষ যে অনেক সময় বিরাট ভুল বুঝতে পারে, তার একটি চমৎকার উদাহরণ হলো এই আয়াত দুটি। অনুবাদকরা যতই চেষ্টা করুন না কেন, তারা অন্য ভাষায় রূপান্তর করতে গিয়ে মাঝে মাঝে ভুল করে এমন অনুবাদ করে ফেলেন, যা পড়ে মানুষ অনেক সময় বিরাট ভুল বোঝাবুঝির শিকার হয়।
  • আয়াতটির প্রথম অংশ إِنَّ ٱلَّذِينَ كَفَرُوا হচ্ছে একটি অতীত ক্রিয়াবাচক বাক্য, যার সঠিক বাংলা অনুবাদ হবে, “যারা অবিশ্বাস করবে বলে মন স্থির করে ফেলেছে” বা “যারা অবিশ্বাস করেছে এবং করবেই।”[১] কিন্তু প্রশ্ন হলো অবিশ্বাস করে কীসে? এখানে এক বিশেষ ধরনের কাফিরদের কথা বলা হয়েছে—এই আয়াতের আগের আয়াতগুলোতে মুত্তাকীদের যে বৈশিষ্ট্যগুলো বলা হয়েছে- ১) মানুষের চিন্তার বাইরের কিছু ব্যাপারে বিশ্বাস, ২) সালাত প্রতিষ্ঠা করা, ৩) আল্লাহ্‌র দেওয়া রিজিক থেকে দান করা, ৪) নবী (সা) এর উপর যা নাজিল হয়েছে, ৫) তাঁর আগে নবীদের (আ) উপর যা নাজিল হয়েছে ৬) আখিরাতে দৃঢ় বিশ্বাস—এগুলোতে তারা কোনোভাবেই বিশ্বাস করবে না বলে ঠিক করেছে এবং তাদেরকে বার বার বোঝানোর পরেও তারা অবিশ্বাস করেই যাচ্ছে। এই ধরনের মানুষদেরকে সাবধান করে আর কোনো লাভ নেই, তারা শুনবে না।[২]
  • সাবধান করার জন্য এখানে আল্লাহ্‌ যে শব্দটি ব্যবহার করেছেন তা হলো – ءَأَنذَرْتَهُمْ ইনযার অর্থ এমন খবর জানানো, যেটা জানার পর মানুষ সাবধান হয়ে যায়, চিন্তিত হয়ে পড়ে। ইনযার হচ্ছে ভালবাসার সাথে, উৎসাহের মাধ্যমে সাবধান করা, যাতে মানুষ নিজের ইচ্ছায় ভুল দিকে না যায়। যেমন, ছোট বাচ্চাদেরকে আগুন, সাপ ইত্যাদির খারাপ দিকগুলো সম্পর্কে সাবধান করে দেওয়া, যাতে তারা সেগুলো না ধরে। এটা কোনো ভয়ভীতি দেখিয়ে সাবধান করা নয়। আপনি যদি কাউকে বলেন, “তিন দিন সময় দিলাম, মুসলিম হও। নাইলে কিন্তু…” – এটা ইনযার নয়। ইনযার ব্যবহার করে আল্লাহ্‌ আমাদেরকে শেখাচ্ছেন যে, অমুসলিমদেরকে, এমনকি ঘোরতর কাফিরদেরকেও ভালবাসার সাথে, উৎসাহের সাথে ইসলামের দিকে ডাকতে হবে, তাদের ভুল ধারণার পরিণতি সম্পর্কে সাবধান করতে হবে। কোনো ধরণের ভয়ভীতি, জোর করা যাবে না।
  • কাফির শব্দটির অর্থ সম্পর্কে আমাদের অনেকের ভুল ধারণা আছে। অবিশ্বাসী (কাফির) তারাই যারা সত্য জানার পরেও তা জেনে শুনে অবিশ্বাস করে। অবিশ্বাসীরা তারা নয় যাদের কাছে সত্য পৌঁছায়নি; বা যাদের জানার বা বোঝার ক্ষমতা নেই যে, তারা সত্যকে অস্বীকার করছে; বা যাদেরকে কেউ সত্য ঠিকমতো বোঝাতে পারেনি।[৩]
  • আপনার মুসলিম নামধারী প্রতিবেশীরা কাফির হবেন, যদি কু’রআনের বাণী জানার এবং বোঝার পরেও তারা সিদ্ধান্ত নেয় যে, তারা তা মানবে না। আপনার ভাই মুহাম্মাদ একজন কাফির হবেন, যদি তিনি খুব ভালো করে জানেন: কু’রআনে আল্লাহ্‌ ﷻ আমাদেরকে বহুবার সালাত আদায় করার কথা বলেছেন, কিন্তু তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি নিয়মিত সালাত পড়বেন না, কারণ তার কাছে মনে হয় না প্রত্যেক দিন সালাত আদায় করাটা জরুরি কিছু, তাও আবার দিনে ৫ বার! আপনার বোন ফাতিমা কাফির হয়ে যাবেন, যদি তিনি সিদ্ধান্ত নেন তিনি রামাদানের সিয়াম পালন করবেন না—যদিও তিনি ভালো করে জানেন কু’রআনে রোযা রাখা ফরয করা হয়েছে। ইসলামের কোন বিষয় আপনি মেনে না চলতে পারলে কাফির হবেন না, বরং সেই বিষয়গুলোকে অস্বীকার করা এবং হারামকে হালাল ভাবার মাধ্যমে আপনি কাফির হবেন।
  • কাফিরদের তুলনা হচ্ছে ধূমপায়ীদের মতো, যারা জানে ধূমপান করা স্বাস্থ্যর জন্য খারাপ। তাদের যথেষ্ট বোঝানো হয়েছে, প্যাকেটের গায়ে লেখা পর্যন্ত আছে ‘ধূমপান স্বাস্থ্যর জন্য ক্ষতিকর’, কিন্তু তারপরেও তারা বুঝে শুনে ধূমপান করে। তাদের অন্তর তাদেরকে বার বার জানান দেয় যে, তারা যা করছে তা ভুল, তাদের এটা করা উচিত নয়। কিন্তু তারপরেও তারা তাদের অন্তরের ভিতরের সেই আর্তনাদকে চেপে রেখে সত্যকে অস্বীকার করে যায়। অর্থাৎ, কাফির হচ্ছে তারাই, যারা জেনে শুনে নিজেদের অভ্যাস, গোঁড়ামি, অন্ধ বিশ্বাস, অমূলক সন্দেহ এবং ইগোর কারণে তাদের ধারণার বাইরে নতুন বা ভিন্ন কিছুকে গ্রহণ করার ক্ষমতাকে ধামাচাপা দিয়ে রেখেছে, যাতে তাদের অন্তরে সত্যর আলো কখনো পৌঁছাতে না পারে।
  • এর পরের আয়াতে আল্লাহ্‌ বলেছেন যে, তিনি এই ধরনের কাফিরদের অন্তর এবং কান সিল করে দেন এবং তাদের চোখের উপরে আবরণ দিয়ে ঢেকে দেন। এই আয়াতটি নিয়ে নাস্তিকরা মহাখুশি। তারা এই আয়াতটি দিয়ে মুসলিমদেরকে প্রায়ই আক্রমণ করে, “দেখো! তোমাদের আল্লাহ্‌ কত খারাপ! সে একদিকে মানুষকে ভালো হতে বলে, অন্যদিকে তার কথা না শুনলেই সে মানুষের অন্তরকে বন্ধ করে দেয়, মানুষের ভালো হওয়ার সব সুযোগ বন্ধ করে দেয়।” অমুসলিম ক্রিটিক এবং নাস্তিকরা কু’রআনকে অবমাননা করার জন্য এই আয়াতটি ব্যাপকভাবে অপব্যবহার করেছে এবং প্রচুর মুসলিমকে তারা সফলভাবে বিভ্রান্ত করতে পেরেছে, যারা কু’রআনের এই আয়াত পড়ে ভেবেছে—“তাইতো, আল্লাহ্‌ দেখি আসলেই কাফিরদের ভালো হওয়ার সব পথ বন্ধ করে দেন! তাহলে তারা আর কীভাবে মুসলিম হবে! এটা কেমন কথা হলো?”
  • আপনার মনে হতে পারে— আল্লাহ্‌ যদি কাফিরদের অন্তর সিল করেই দেন তাহলে তাদের দোষ কী? তারাতো ইচ্ছা করলেও ভালো হতে পারবে না। কাফিররা তারাই যারা জেনে শুনে নিজেদের দেখা, শোনা ও বোঝার ক্ষমতার উপর আবরণ টেনে নিয়েছে। আল্লাহ শুধু সে আবরণের ব্যবস্থা করে দেন। কাফির, মুনাফিকরা তাদের মস্তিস্কের সঠিক ব্যবহার না করতে করতে, তাদের মস্তিস্কের সত্য-মিথ্যা পার্থক্য করার ক্ষমতা নষ্ট করে ফেলেছে।[৪] মানুষ যদি ছয় মাস তার পা ব্যবহার না করে, তার পায়ের পেশি শুকিয়ে যায়, তখন আর সে দাঁড়াতে পারে না। একইভাবে মানুষ যদি মস্তিস্কের যথেষ্ট ব্যবহার না করে, তাহলে তার মস্তিস্ক ভোঁতা হয়ে যায়। মস্তিস্ক এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যে, মানুষ তা যত ব্যবহার করবে, তা তত শক্তিশালী হবে।[৫] আমরা যখন কোনো কিছু করি, আমরা আমাদের চিন্তার স্বাধীনতা ব্যবহার করে করার ইচ্ছা করি। কিন্তু প্রকৃত কাজটা হয় আল্লাহর তৈরি প্রাকৃতিক নিয়ম, বস্তু এবং শক্তি দিয়েই। যেমন: আমরা যখন খাই, আল্লাহই আমাদের খাওয়ান। কারণ খাওয়ার জন্য যেসব খাবার হাত দিয়ে সেই খাবার তোলা, সেই হাতকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য পেশি, মস্তিস্ক, স্নায়ুতন্ত্র, খাবার খাওয়ার জন্য মুখ, চাবানোর জন্য দাঁত, হজমের জন্য পরিপাকতন্ত্র—সবকিছুই আল্লাহ তৈরি করে দিয়েছেন এবং সবকিছুই তিনি নিয়ন্ত্রণ করেন। আমরা শুধু ইচ্ছা করি, বাকি পুরোটা ‘করেন’ আল্লাহ্‌, তাঁর নির্ধারিত প্রাকৃতিক নিয়ম দিয়ে। সুতরাং, এটা বলা যায় যে—আমরা যা করার ইচ্ছা করি, সেটা সম্পাদন করেন আল্লাহ।[৬] কু’রআনের যেসব আয়াতে বলা হয় যে, আল্লাহ‌ কাফির বা মুনাফিকদের দেখার, শোনার ক্ষমতা কেড়ে নেন, সেগুলোর প্রকৃত অর্থ হলো—মানুষ তার নিজের দোষের ফলাফল হিসেবে তাদের শোনার এবং দেখার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে এবং সেটা করেন আল্লাহ্‌, তাদের জন্য শাস্তি হিসেবে, মহাবিশ্ব পরিচালনার ‘পূর্ব-নির্ধারিত নিয়ম’ বা ‘প্রাকৃতিক নিয়ম’ দিয়েই, কোন আলাদা গজবের ব্যবস্থা করে নয়।
  • ঠিক এই আয়াতের মতো একটি কথা যদি বলি তাহলে দেখুন কী দাঁড়ায়— “নিশ্চয়ই যারা কোনোভাবেই খেতে চায় না, তাদের খেতে বলো আর নাই বলো, তারা খাবে না। আল্লাহ্‌ তাদের দেহ শুকিয়ে দেন, তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে দেন, তাদের জন্য রয়েছে কঠিন অসুখ।” এখানে ওরা খেতে চায়না দেখেই তাদের দেহ শুকিয়ে যায়, অসুখ হয়। দেহ শুকানোর প্রক্রিয়া, জীবাণুর আক্রমণ, দেহের অঙ্গে সমস্যা হয়ে অসুস্থ হওয়া—এগুলোর সব ব্যবস্থা আল্লাহ্‌ করে দিয়েছেন প্রাকৃতিক নিয়মকানুন দিয়ে। আশা করি প্রথম প্রশ্নের উত্তর পেয়েছেন।
  • আরেকটা উদাহরণ দেই। মনে করুন, আপনি কোন পাওয়ার স্টেশন থেকে বিদ্যুৎ নিচ্ছেন এবং সেই বিদ্যুৎ আপনি ইচ্ছামত বিভিন্ন কাজে লাগাচ্ছেন। এখান থেকে আমরা দুইটা পয়েন্ট পাচ্ছি।
  • ১। বিদ্যুতের জন্য আপনি পাওয়ার স্টেশন যিনি চালাচ্ছেন তার মুখাপেক্ষী।
  • ২। কিন্তু বিদ্যুৎ কি খাতে ব্যবহার করবেন সেটা আপনার ইচ্ছাধীন।
  • তারমানে-
  • ১। বিদ্যুতের সঠিক/অপ ব্যবহারের জন্য আপনি নিজেই দায়ী, ‘পাওয়ার স্টেশন যিনি চালাচ্ছেন’ তিনি নন।
  • ২। কিন্তু যেহেতু ‘পাওয়ার স্টেশন যিনি চালাচ্ছেন’ তার ইচ্ছা ব্যতীত আপনি বিদ্যুৎ পেতে পারেন না, সেহেতু একথা বলা যায়, বিদ্যুতের যে ইচ্ছামত ব্যবহার আপনি করছেন তা ‘পাওয়ার স্টেশন যিনি চালাচ্ছেন’ তার ইচ্ছাতেই করতে পারছেন।
  • কেউ যখন বলে “আল্লাহ্‌র ইচ্ছাতেই সবকিছু হয়”, তখন সবচেয়ে বড় যে ভুলটা সাধারণত হয় তা হলো আল্লাহ্‌র ইচ্ছাকে মানুষের ইচ্ছার মত কিছু একটা বিবেচনা করা হয়। বস্তুত আল্লাহর ইচ্ছা হচ্ছে আমাদের জন্য একপ্রকার শক্তি, যেই শক্তির বলে আমরা ইচ্ছা করতে পারি। আমরা তখনই কেবল ইচ্ছা করতে পারি যখন “আল্লাহ্‌র ইচ্ছা” আমাদেরকে ইচ্ছা করার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি সরবরাহ করে। একটু আগেই বিষয়টা নিয়ে কিছু কথা বলা হয়েছে।
  • ১। ইচ্ছা করতে পারব কি না এই ব্যাপারে আমরা আল্লাহর ইচ্ছার ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। “আল্লাহর ইচ্ছা” তথা শক্তি ছাড়া আমরা কোন ইচ্ছাই করতে পারি না।
  • ২। কিন্তু ইচ্ছা করার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি “আল্লাহর ইচ্ছা” কর্তৃক প্রাপ্ত হবার পর আমরা “কী ইচ্ছা করব”- সেই ব্যাপারে আমাদের স্বাধীনতা রয়েছে। [মানুষের ইচ্ছার স্বীকৃতি রয়েছে এমন কিছু আয়াত ১৮:২৯, ২৫:৫৭, ৭৬:২৯, ৭৩:১৯, ৭৮:৩৯, ৮০:১২, ৭৪:৫৫]
  • এ ব্যাপারে আরও কিছু বিষয় বলে রাখা প্রয়োজন। সবক্ষেত্রে আমরা স্বাধীনভাবে ইচ্ছাশক্তি প্রয়োগ করতে পারবো- ব্যাপারটা এমন না। তবে আমাদের শুধু সে সকল বিষয়েরই হিসাব নেয়া হবে, যে সকল বিষয়ে আমরা স্বাধীনভাবে ইচ্ছা শক্তিকে প্রয়োগ করতে পারবো।
  • আর যে সকল বিষয়ে আমাদের কোন হাত নেই, আল্লাহ নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন এবং তা তাকদিরের কিতাবে লিখেও রেখেছেন। যেমন- কোন মানুষ কখন জন্মাবে, কখন মারা যাবে, সে কতটুকু রিযিক পাবে ইত্যাদি। এসব ব্যাপারে আমাদের জবাবদিহি করতে হবে না।
  • ধরুন, আমি খুলনায় পড়াশোনা করি বাপ-মায়ের টাকায়। এখানে খুলনায় পড়াশোনা থেকে শুরু করে সেখানে জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছুও তাদেরই টাকায়। এখন আমি ওইখানে পড়াশোনা করবো নাকি ফুর্তি করে বেড়াবো- এটা সম্পূর্ণ আমার ইচ্ছাধীন। কিন্তু তারা আমাকে খুলনায় পাঠিয়ে 'টাকা' দিচ্ছে বলে আমি তাদেরকে ব্লেম করতে পারি না, যদিও বা আমি ফুর্তি করলে এই 'টাকা' দিয়েই করবো। একইভাবে মানুষের সামনে চলার দুইটা রাস্তা আছে, একটা ভাল এবং অন্যটা খারাপ। এই দুইটা পথই আল্লাহ্‌র সৃষ্টি। এখন আপনার ইচ্ছা যে আপনি কোন পথে যাবেন। তাই বলে আপনি স্রষ্টাকে এই ‘দুইটা পথ’ সৃষ্টি করার জন্য দোষারোপ করতে পারেন না।
  • অধিকাংশ বিষয়েই আল্লাহ্‌ মানুষকে ইচ্ছা প্রয়োগের ক্ষমতা বা স্বাধীনতা দিয়েছেন। যেমন- ঈমান আনা বা না আনা, হালাল উপায়ে রিযিক অন্বেষণ করা বা হারাম উপায়ে করা, ভাল বা খারাপ কাজ করা ইত্যাদি। এই বিষয়গুলোর জন্য মানুষকে জবাবদিহি করতে হবে। এগুলোও তাকদিরের কিতাবে লিপিবদ্ধ করা আছে, কিন্তু এগুলো তাকদির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয়। প্রশ্ন হল- এটা কিভাবে সম্ভব? তাকদিরের কিতাবে লিপিবদ্ধ করা আছে, কিন্তু এগুলো তাকদির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয়! এবার চলুন এই প্যারাডক্সের সমাধান করি।
  • প্রথমে ছোট একটা উদাহরন দেই। ধরুন- আপনি কোন পড়াশোনা করেন না। আপনার শিক্ষক আপনার প্রস্তুতি সম্পর্কে অবগত। এখন তিনি যদি পরীক্ষার আগে আপনাকে বলেন যে, আপনি পাশ করতে পারবেন না। আর রেজাল্ট দেয়ার পর যদি দেখা যায়, আপনি সত্যি সত্যিই ফেল করেছেন। সেক্ষেত্রে আপনি কাকে দায়ী করবেন? শিক্ষককে নাকি নিজেকে?! স্রষ্টা আর আমাদের জানাটা ‘কিছুটা’ এরকমই। (তবে এক্ষেত্রে শিক্ষকের ভবিষ্যৎবাণী ভুল হতে পারে, কিন্তু আল্লাহ্‌র হবে না)। স্রষ্টা জানেন আমরা কি করবো, কিন্তু এর মানে এই নয় যে তিনি আমাদের কৃতকর্মের জন্য দায়ী। আমরা কি করবো সেটা আল্লাহ্ তার জ্ঞানের কারণে আগে থেকেই জানেন। কিন্তু তিনি জানেন বলেই আমরা ঐ কাজ করবো- ব্যাপারটা এমন নয়।
  • আরও একটা উদাহরন দেখি। আমার সামনে দুইটা রাস্তা আছে। ধরা যাক, আমি ডান দিকের রাস্তায় গেলাম। আমি যে ডান দিকের রাস্তায় যাবো- এটা আল্লাহ্ আগে থেকেই জানতেন, তাই তিনি এটা আমাকে দুনিয়াতে পাঠানোর আগেই লিখে রেখেছিলেন। এখন তিনি লিখে রেখেছিলেন বলেই কিন্তু আমি ডান দিকের রাস্তায় যাই নি। বরং আমি ডান দিকের রাস্তায় যাবো দেখে আল্লাহ্ লিখে রেখেছিলেন। আমরা যখনই বলি – “আল্লাহ তো সব জানেন” – আমরা ধারণা করে নেই যে আল্লাহ্‌র জানাটা হচ্ছে অতীত কালের ঘটনা এবং যেহেতু আল্লাহ্‌ ‘অতীত কালে’ জেনে গেছেন, তার মানে বর্তমান, ভবিষ্যৎ সবই পূর্ব নির্ধারিত। এটা ভুল ধারণা। আল্লাহ সময়ের উর্ধে। সময়কে আল্লাহ্ সৃষ্টি করেছেন। তাই তিনি সময়ের উপর নির্ভরশীল নন। তাঁর জন্য কোন অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ নেই। আমরা সময়ের গণ্ডিতে বাঁধা। কিন্তু আল্লাহ্ নন। আমাদের কাছে কোন ঘটনা ঘটার আগে সেটা ‘হতে পারে’ অবস্থায় থাকে। কিন্তু আল্লাহ্‌র কাছে ‘হতে পারে’ বলে কিছু নাই। কোন সত্তা যখন সময়ের বাইরে চলে যায়, তখন সে একই সাথে অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ সবকিছুই একই সময়ে, একই মুহূর্তে জানতে পারে। সুতরাং, আমি জাহান্নামে যাবো এটা যদি আল্লাহ্‌ জানেন, তারমানে এই না যে আল্লাহর জানাটা অতীতকালে ঘটে গেছে এবং আমার আর ভালো কাজ করে কোন লাভ নেই, আমার ভবিষ্যৎ পূর্বনির্ধারিত। আল্লাহ্‌ এই মুহূর্তে আমি কি করছি, কি করবো এবং তার ফলে আমার পরিণতি কি হবে তা সব দেখতে পাচ্ছেন। কিন্তু তার মানে এই না যে আমি কি করবো, কি করবো না, সেই সিদ্ধান্ত নেবার স্বাধীনতা আল্লাহ্‌ আমাকে দেন নি।
  • আল্লাহ্‌র কাছে অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের সকল জ্ঞান রয়েছে। সেই জ্ঞানের ভিত্তিতে আল্লাহ্‌ জানেন কখন মানুষ কী করবে। এবং এই জানার ভিত্তিতেই আল্লাহ্ তাকদিরের কিতাবে লিখে রেখেছেন মানুষ কি কি করবে।
  • অতএব, যারা ভুল পথে পরিচালিত হয় তারা নিজেদের ইচ্ছাতেই, নিজেদের কারণেই হয়। শয়তান শুধু তাদেরকে ওয়াসওয়াসা দেয়, খারাপ কাজে উৎসাহ দেয়; কিন্তু মূল কাজটা করে ব্যক্তি নিজেই। আপনাকে যদি কেউ পাহাড় থেকে লাফ দিতে বলে আর আপনি তার কথামত লাফ দিলেন- এখানে আসল দোষটা কার? ঐ ব্যক্তি নাকি আপনার? শয়তানের ব্যাপারটা এমনই, সে হল প্রভাবক- ভুল পথের আহ্বানকারী। আহ্বান শোনা বা না শোনা আপনার নিয়ন্ত্রণাধীন। আর আল্লাহ্‌ও তাদেরকে গোমরাহ করেন না। আল্লাহ্‌ শুধু তাদের সেই ভবিষ্যৎ অবস্থাটা তার জ্ঞানের মাধ্যমে আগে থেকেই লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন মাত্র, সেটার নিয়ন্ত্রণ নয়।
  • ২। আল্লাহ্‌ যেহেতু জানেনই কে বেহেশতে যাবে আর কে জাহান্নামে যাবে, তাহলে দুনিয়াতে পাঠিয়ে এত কষ্ট দেয়ার মানে কি? সরাসরি জাহান্নাম বা জান্নাতে পাঠালেই তো হত!
  • একই ধরনের আরেকটা প্রশ্ন, আল্লাহ্‌ যদি সর্বজ্ঞ হোন, তবে তার বান্দাদের পরীক্ষা করে দেখার কোন মানে আছে কি?
  • উত্তর: একটু চিন্তা করলেই বুঝা যায় যে, এটা আসলে কতটা হাস্যকর কথা। যদি আপনাকে কোন কিছু করার সুযোগ না দিয়েই জাহান্নামে পাঠানো হয়- তাহলে আপনি নিশ্চিতভাবেই আল্লাহ্‌কে বলবেন- “কেন আমাকে দোযখে দেওয়া হল? আমি কি অপরাধ করেছি?” যারা বেহেস্তে যাবে, তারা কি দাবি করবে না, “কেন আমাকে বেহেশতে ৫০,০০০ একর বাগান দেওয়া হল; কেন ১,০০,০০০ একর বাগান দেওয়া হল না?”
  • মানুষকে যদি আল্লাহ্‌ কোন শাস্তি দেন, তাহলে এটা স্বাভাবিক যে আল্লাহ্‌ মানুষকে সেই শাস্তি পাবার কারণ কি সেটা দেখাবেন। তা না হলে মানুষ দাবি করবেই কেন তাকে শাস্তি দেওয়া হল। আল্লাহ্‌ যদি মানুষকে পৃথিবীর জীবনের সুযোগটা না দিয়ে জাহান্নাম বানিয়ে, তাতে সরাসরি মানুষ ভরে দিতেন– তাহলে মানুষ কি সেটা মেনে নিত?
  • একইভাবে মানুষ যখন বেহেশতে যাবে, তার দাবি থাকবে তাকে বেহেশতে যা দেওয়া হয়েছে তা কিসের ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছে। কেন সে কম পেল তার বেহেশতের প্রতিবেশীর থেকে? কেন সে যা পেয়েছে তার থেকে অন্য কিছু পেল না? মানুষ স্বাভাবিকভাবেই দাবি করবে আল্লাহ কিসের ভিত্তিতে তাকে বেহেশতে সেসব দিয়েছে।
  • একারণেই মানুষকে পৃথিবীর জীবন দেওয়া হয়েছে যেন মানুষ বেহেশতে যা কিছু পাবে, তা সে নিজে পৃথিবীতে অর্জন করে যেতে পারে।
  • আর এখানে পরীক্ষা বলতে আপনি যদি ভেবে থাকেন যে, এটা একজন বিজ্ঞানীর গবেষণার মত; যিনি দেখছেন কোন একটা পদার্থে অমুক অমুক উপাদান যোগ করলে মূল পদার্থটির কি কি পরিবর্তন হয়- তাহলে ভুল ভাবছেন। আল্লাহ্‌র পরীক্ষা নেয়ার বিষয়টা এরকম না। কারণ আল্লাহ্‌র জ্ঞান অপরিবর্তনীয়, কোন কিছুই তার জ্ঞানের বাইরে না। তিনি ভাল করেই জানেন ফলাফল কি হবে। পরীক্ষাটা হলো আমাদের নিজেদের মধ্যে, নিজেদের জন্য। আমরা কিভাবে বিভিন্ন কন্ডিশনে রেসপন্স করি। যাতে করে আমরা আমাদের কৃতকর্মের জন্য স্রষ্টাকে দায়ী করতে না পারি। যাতে আমরা বলতে না পারি, “আল্লাহ্‌ আমাকে তো তুমি যথেষ্ট পরিমাণ সুযোগ দাও নি।”
  • ৩। যেহেতু কারও জন্ম-মৃত্যু নির্ধারিত, সেহেতু কারও মুসলিম হিসেবে জন্মগ্রহণ করাটাও তো নির্ধারিত। আর মুসলিম হিসেবে জন্মগ্রহণ করে সে জান্নাতে যাবে। আর যাদের জন্ম হয়েছে হিন্দু, খ্রিস্টান পরিবারে- তাদের কি দোষ? তারা কেন জাহান্নামে যাবে?
  • উত্তর: যারা মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছে, তারা জন্মের জন্য জান্নাতে যাবে না, বরং তাদের বিশ্বাস ও কর্মের জন্য জান্নাতে যাবে। অনেক মানুষ আছে যারা মুসলিম পরিবারে জন্ম নিয়েও নামায আদায় করে না অথচ নামায ঈমান ও কুফরের পার্থক্যকারী। আবার অনেকেই মুসলিম পরিবারে জন্মেও ইসলাম ত্যাগ করে। মুসলিম পরিবারে জন্ম নেওয়া অবশ্যই জান্নাতের গ্যারান্টি নয়।
  • সব মুসলিমরা জান্নাতে যাবে বা কয়েকদিন জাহান্নামে শাস্তির পর জান্নাতে চলে যাবেই — এই ভুল ধারণা বনী ইসরাইলের ছিল, যারা ছিল সেই যুগের মুসলিম। কোনো কারণে নিজেদের প্রতি এমন অতি আত্মবিশ্বাস আজকে মুসলিমদের মধ্যেও চলে এসেছে। সূরা বাকারাহ সহ আরও কমপক্ষে ১০টি আয়াতে আল্লাহ্‌ আমাদেরকে বলেছেন: শুধু ঈমান এনেছি বললেই হবে না, একইসাথে আমাদেরকে ভালো কাজ (عَمِلُوا۟ ٱلصَّٰلِحَٰتِ) করতে হবে, যদি আমরা জান্নাতে যেতে চাই। আর ঈমান একটা বড় ব্যাপার। কেউ মুসলিম দাবী করলেই ঈমানদার হয়ে যায় না। ঈমান যথেষ্ট কষ্ট করে অর্জন করতে হয় এবং তার থেকেও বেশি কষ্ট করে ধরে রাখতে হয়। একজন মুখে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলল, কিন্তু ‘লা ইলাহা ইল্লালাহ’ মানে কী সেটা বুঝল না, -এর সাতটি শর্ত পূরণ করল না; ‘লোকে কী বলবে’ এই ভয়ে সে আল্লাহ্‌র নির্দেশকে প্রতিদিন অমান্য করল; নিজের কামনা-বাসনা পূরণ করার জন্য জেনে শুনে কু’রআনের নির্দেশ অমান্য করল; ইসলামকে সঠিকভাবে মানার জন্য নিজের ভেতরে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনার কোনো ইচ্ছাই তার ভেতরে নেই — এই ধরনের মানুষের ভেতরে ঈমান এখনও জায়গা পায়নি। তারা কেবল হয়ত মুসলিম হয়েছে বা নিজেকে শুধুই মুসলিম বলে দাবি করেছে।
  • কেউ নিজেকে মুসলিম বলে দাবি করুক আর না করুক, তার অবস্থা যদি এই আয়াতের মতো হয়, তাহলে সে চিরকাল জাহান্নামে থাকবে, যদি আল্লাহ ইচ্ছা করেন—
  • “কখনই না! যে একটিও বড় পাপ অর্জন করে এবং তার পাপের ধারাবাহিকতা তাকে ঘিরে রাখে — ওরা হচ্ছে (জাহান্নামের) আগুনের সহযাত্রী। সেখানে তারা অনন্তকাল [বা অনেক লম্বা সময়] থাকবে।” [আল-বাক্বারাহ ২:৮১]
  • এই আয়াতে আল্লাহ্‌ এক বিশেষ প্রজাতির মানুষের কথা বলেছেন, যাদের অবাধ্যতা চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। তিনি বলছেন: যারা ‘একটিও বড় পাপ’ করে। سَيِّئَةً — যা এসেছে سُوء থেকে, যার অর্থগুলো হলো: নিজের বা অন্যের জন্য ক্ষতিকারক কাজ, অশ্লীলতা, অপব্যবহার, অন্যায় সুবিধা নেওয়া। এটি হচ্ছে ঘৃণিত পাপ, বড় পাপ, যেমন মদ বা মাদকের প্রতি আসক্তি, ব্যভিচার, সুদ, হারাম ব্যবসা, অশ্লীলতা ইত্যাদি। এটি ছোটখাটো পাপ ذنب নয়। এই ধরনের একটি পাপ যে করে, তারপর যখন সেই পাপ তার জীবনটাকে ঘিরে ফেলে, সেই পাপ থেকে সে কোনোভাবেই বের হয় না, বরং সেই পাপ তাকে অন্যান্য পাপের দিকে নিয়ে যেতে থাকে, তাকে হাজার বুঝিয়েও লাভ হয় না—সে জাহান্নামের পথে চলতেই থাকে সে চিরজীবন জাহান্নামে থাকবে, যদি আল্লাহ ইচ্ছা করেন।
  • হতে পারে সে কিছু ভালো কাজও করে। কিন্তু সেই পাপটা সে করবেই, এবং সেটা নিয়ে তার কোনো অনুশোচনা নেই। তাকে কু’রআন থেকে যতই প্রমাণ দেখানো হোক না কেন, সেই পাপ করা সে কোনোভাবেই ছাড়বে না। সে পাপটাকে হারাম মানে না। সে তার নিজের ইচ্ছা এবং সিদ্ধান্তকে আল্লাহ্‌র ইচ্ছা থেকে উপরে স্থান দিয়েছে। তার প্রভু আর আল্লাহ্‌ নয়, তার প্রভু হয়ে গেছে তার নিজের ইচ্ছা। এভাবে সে আল্লাহ্‌র আয়াতের কুফরি করেছে এবং আল্লাহ্‌র সাথে শিরক করছে, যার শাস্তি চির জাহান্নাম।
  • মানুষ যখন ছোট খাটো পাপ অনায়াসে করতে অভ্যস্ত হয়, তখন বড় পাপে জড়িত হওয়ার পথ খুলে যায়। আর বড় পাপগুলো কুফর ও শিরকের কাছাকাছি করে দেয়। এক পর্যায়ে ইসলাম থেকেই বের করে নেয়। ফলে তখন চিরস্থায়ী জাহান্নামই তার ঠিকানা হয়ে যায়।
  • এই ধরনের মানুষের উদাহরণ আমরা চারপাশে তাকালে দেখতে পারব, যারা হয়ত নিয়মিত জুম’আর নামায পড়ে, ফকিরদেরকে টাকা পয়সা দেয়, কুরবানির ঈদে লক্ষ টাকার গরু কিনে জবাই করে। কিন্তু তারপরে দেখা যায়: তারা তাদের হারাম ব্যবসা কোনোভাবেই ছাড়বে না। তারা কোনোভাবেই রাতের বেলা একটু হুইস্কি না টেনে ঘুমাতে যাবে না। তারা কোনোভাবেই ইন্টারনেটে পর্ণ দেখার অভ্যাস থেকে বের হবে না। তারপর তারা বিদেশে গেলে … না করে ফিরবে না। —এই ধরনের মানুষদেরকে পাপ ঘিরে ফেলেছে। তারা ঠিকই লক্ষ্য করছে যে, একটা পাপের কারণে তারা অন্যান্য পাপে জড়িয়ে পড়ছে। তারা খুব ভালো করে জানে তাদের কাজটা হারাম, কিন্তু তারপরেও তারা নানাভাবে সেই পাপ কাজকে সমর্থন করে। তারা কোনোভাবেই সেই পাপ থেকে বের হবে না। এমনটা নয় যে, তারা প্রবৃত্তির তাড়নায় এই পাপগুলো করছে। বরং তারা জেনে শুনেই ইচ্ছা করে অবাধ্য হয়ে পাপগুলো করছে। —এদের পরিণাম ভয়ঙ্কর।
  • এই আয়াতে خَطِيٓـَٔتُ এর অনুবাদ সাধারণত ‘পাপ’ করা হলেও, এটি হচ্ছে পাপের কারণে যে ফলাফল হয়, সঠিক রাস্তা থেকে দূরে চলে যাওয়া। এখানে আল্লাহ্‌ বলছেন যে, যে বড় পাপ করে, তারপর পাপের ধারাবাহিকতায় করা কাজকর্ম তার জীবনটাকে ঘিরে ফেলে।
  • যেমন, রাহাত সাহেব বিশাল পরিমাণের ঘুষ খাইয়ে একটা সরকারি প্রজেক্টের কন্ট্রাক্ট হাতালেন। এর জন্য তিনি মন্ত্রীকে গুলশানে দুইটা ফ্ল্যাট কিনে দেওয়ার নিশ্চয়তা দিলেন। তারপর ব্যাংকের লোণ নিয়ে জোগাড় করা সেই বিশাল অংকের ঘুষ, সুদ সহ শোধ করতে গিয়ে, এবং মন্ত্রীকে কথা দেওয়া দুইটা ফ্ল্যাটের টাকা উঠানোর জন্য শেষ পর্যন্ত তাকে প্রজেক্টের অনেক টাকা এদিক ওদিক সরিয়ে ফেলতে হলো। দুই নম্বর সস্তা কাঁচামাল সরবরাহ করতে হলো। যোগ্য কনট্রাক্টরদের কাজ না দিয়ে অযোগ্য, সস্তা কনট্রাক্টরদের কাজ দিতে হলো, যারা কিনা তাকে প্রচুর ঘুষ খাওয়ালো। এরপর একদিন তার প্রজেক্ট ধ্বসে পড়ল। তার নামে ব্যাপক কেলেঙ্কারি হয়ে মামলা হয়ে গেলো। মামলায় উকিলের টাকা জোগাড় করতে তাকে আরও বিভিন্ন উপায়ে টাকা মারা শুরু করতে হলো। তারপর কয়েকদিন পর পর তাকে পুলিশ ধরতে আসে, আর তিনি পুলিশের উপরের তলার লোকদের ঘুষ খাইয়ে পুলিশকে হাত করে ফেলেন। প্রজেক্টে দুর্নীতির কারণে ভুক্তভুগি মানুষদের হাত থেকে বাঁচার জন্য তাকে অনেক টাকা খরচ করে কিছু ‘সোনার ছেলে’ পালতে হয়। তারা মাঝে মাঝেই খুন, ধর্ষণ করে, হোটেলে থেকে … করে এসে বিরাট বিল ধরিয়ে দেয়। তারপর তাদেরকে যখন পুলিশ ধরতে আসে, তিনি পুলিশকে টাকা খাইয়ে তাদেরকে রক্ষা করেন। এত দুশ্চিন্তার মধ্যে তিনি রাতে কোনোভাবেই ঘুমাতে পারেন না। দুশ্চিন্তা ভুলে থাকার জন্য তাকে নিয়মিত মদ খাওয়া ধরতে হয়। এভাবে একটার পর একটা পাপে তিনি জড়িয়ে পড়তে থাকেন। পাপের ধারাবাহিকতা তার জীবনটাকে ঘিরে ফেলে।
  • এই আয়াতে আল্লাহ বলেননি, “যারা একটি পাপ করে”, বরং তিনি বলেছেন, “যারা একটিও পাপ অর্জন করে।” এ থেকে আমরা এই ধরনের পাপীদের মানসিকতা সম্পর্কে ধারণা পাই: তারা চেষ্টা করে সেই পাপ অর্জন করে। পাপটা এমনিতেই ভুলে হয়ে যায় না। বরং তারা সেই পাপ করে একধরনের পরিতৃপ্তি পায়। সেই পাপ করে তার কোনো অনুশোচনা নেই, এটা তার কাছে একটা অর্জন। তারা মনে করে যে, এই পাপ করা কোনো ব্যাপার না, অন্য সবাই করছে না?
  • কেউ যদি আল্লাহ্‌র সাথে শিরক করে, হোক সে মুসলিম বা অমুসলিম- সে কখনও জান্নাতে যাবে না। একইভাবে যারা সালাত কায়েম করে না, বা ইসলামের কোন বিধানকে অস্বীকার করে (যেমন- কেউ যদি পর্দার বিধানকে অস্বীকার করে, সমকামিতাকে হালাল মনে করে), তারা সুস্পষ্ট কুফরিতে নিমজ্জিত হল। এরাও জান্নাতে যাবে না। বিস্তারিত দেখুন IslamQA-তে: http://islamqa.info/en/147996
  • এবার আসি পরের পয়েন্টে। দুনিয়াতে এত এত মানুষ যদি নিজের ধর্ম ছেড়ে ইসলামের দিকে আসতে পারে, তাহলে তার আসতে সমস্যা কি? যে সবকিছু ছেড়ে ইসলামে আসবে, তার জন্য আল্লাহ্‌ তো তার অতীতের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেয়ার নিশ্চয়তা দিচ্ছেনই। সেটা কি কোন বেনিফিট নয়? প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় যে কোন মানুষের স্বাধীন বুদ্ধি ও বিবেক থাকে। এই সময়ে যদি তার কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছায় এবং সে যদি তা গ্রহণ না করে, তাহলে হিন্দু, খ্রিষ্টান বা নাস্তিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করা তার জন্য অজুহাত হতে পারে না। যে অমুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছে, তার জন্য সেটি একটি পরীক্ষা। পৃথিবীতে বহু মানুষ এই পরীক্ষায় কৃতকার্য হচ্ছে, অমুসলিম থেকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করছে। সে যদি যথার্থভাবে ইসলামের দাওয়াত পায়, তাহলে ইসলাম গ্রহণ করা তার জন্য অবশ্য কর্তব্য হবে। (মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই ধরণের অভিযোগ মূলত আসে নাস্তিকদের পক্ষ থেকে। কিন্তু নিজ পরিবারের বিশ্বাসকে প্রত্যাখ্যান করা যদি অসম্ভবই হবে তাহলে তারা আবার নাস্তিক হয় কীভাবে!)
  • “...অতঃপর যদি তোমাদের নিকট আমার পক্ষ থেকে কোন হেদায়েত পৌঁছে, তবে যে ব্যক্তি আমার সে হেদায়েত অনুসারে চলবে, তার উপর না কোন ভয় আসবে, না (কোন কারণে) তারা চিন্তাগ্রস্ত ও সন্তপ্ত হবে। আর যে লোক তা অস্বীকার করবে এবং আমার নিদর্শনগুলোকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার প্রয়াস পাবে, তারাই হবে জাহান্নামবাসী; অন্তকাল সেখানে থাকবে।” (সূরা বাকারাহ ২:৩৮-৩৯)
  • ৪। অনেকের কাছে তো ইসলামের দাওয়াতই পৌঁছায় না। পৃথিবীতে অনেক দুর্গম জায়গা আছে যেখানে হয়তো ইসলামের দাওয়াত যায়নি। আবার অনেকের কাছে বিভিন্ন কারণেই ঠিকভাবে ইসলামের বাণী পৌঁছায়নি। তাহলে এদের সবাই কি জাহান্নামে যাবে?
  • উত্তর: এসব ব্যাপারেও ইসলাম আমাদেরকে সুস্পষ্টভাবে অভিহীত করে। আল্লাহ্‌ কারো প্রতি সামান্যতম অন্যায় করবেন না। এটি আল্লাহর সিফাত বা গুণ নয় যে তিনি বান্দার প্রতি বিন্দুমাত্রও জুলম করেন।
  • “নিশ্চয়ই আল্লাহ কারো প্রতি বিন্দুমাত্রও জুলুম করেন না; আর যদি তা[মানুষের কর্ম] সৎকর্ম হয়, তবে তাকে দ্বিগুণ করে দেন এবং নিজের পক্ষ থেকে বিপুল সওয়াব দান করেন।” (সূরা নিসা ৪:৪০) “...বস্তুতঃ আল্লাহ তাদের উপর কোন অন্যায় করেননি, কিন্তু তারা নিজেরাই নিজেদের উপর অত্যাচার করছিল।” (সূরা আলি ইমরান ৩:১১৭) “কোন রাসূল না পাঠানো পর্যন্ত আমি কাউকেই শাস্তি দান করি না।” (সূরা বনী ইসরাঈল ১৭:১৫)
  • চার প্রকারের লোক কিয়ামতের দিন আল্লাহ্‌ তা’আলার সাথে কথোপকথন করবে। প্রথম হল বধির লোক, যে কিছুই শুনতে পায় না; দ্বিতীয় হল সম্পূর্ণ নির্বোধ ও পাগল লোক যে কিছুই জানে না। তৃতীয় হল অত্যন্ত বৃদ্ধ যার জ্ঞান লোপ পেয়েছে।চতুর্থ হল ঐ ব্যক্তি যে এমন যুগে জীবন যাপন করেছে যে যুগে কোন নবী আগমন করেননি বা কোন ধর্মীয় শিক্ষাও বিদ্যমান ছিল না। বধির লোকটি বলবে, “ইসলাম এসেছিল, কিন্তু আমার কানে কোন শব্দ পৌঁছেনি।” পাগল বলবে, “ইসলাম এসেছিল বটে, কিন্তু আমার অবস্থা তো এই ছিল যে শিশুরা আমার উপর গোবর নিক্ষেপ করত।” বৃদ্ধ বলবে, “ইসলাম এসেছিল, কিন্তু আমার জ্ঞান সম্পূর্ণ লোপ পেয়েছিল। আমি কিছুই বুঝতাম না।” আর যে লোকটির কাছে কোনও রাসূল আসেনি এবং সে তাঁর কোন শিক্ষাও পায়নি সে বলবে, “আমার কাছে কোনও রাসুল আসেননি এবং আমি কোন সত্যও পাইনি। সুতরাং আমি আমল করতাম কিভাবে?”
  • তাদের এসব কথা শুনে আল্লাহ্‌ তা’আলা তাদেরকে নির্দেশ দেবেন- “আচ্ছা যাও, জাহান্নামে লাফিয়ে পড়।” রাসূল (সা) বলেন, “যাঁর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! যদি তারা আল্লাহর আদেশ মেনে নেয় এবং জাহান্নামে লাফিয়ে পড়ে তবে জাহান্নামের আগুন তাদের জন্য ঠাণ্ডা আরামদায়ক হয়ে যাবে।”
  • অন্য বিবরণে আছে যে, যারা জাহান্নামে লাফিয়ে পড়বে তা তাদের জন্য হয়ে যাবে ঠাণ্ডা ও শান্তিদায়ক। আর যারা বিরত থাকবে তাদের হুকুম অমান্যের কারণে টেনে হিঁচড়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
  • ইমাম ইবনু জারির(র) এই হাদিসটি বর্ণণা করার পরে আবু হুরাইরা(রা)-র নিম্নের ঘোষণাটি উল্লেখ করেছেন- “এর সত্যতা প্রমাণ হিসেবে তোমরা ইচ্ছা করলে আল্লাহ্‌ তা’আলার وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّىٰ نَبْعَثَ رَسُولًا [কোন রাসূল না পাঠানো পর্যন্ত আমি কাউকেই শাস্তি দান করি না।] বাক্যও পাঠ করতে পারো।”
  • [মুসনাদ আহমাদ, তাফসির ইবন কাসির, সুরা বনী ইস্রাইল ১৫নং আয়াতের তাফসির] [ইমাম মুহাম্মাদ ইবনু ইয়াহইয়া যাহলী(র) কর্তৃক বর্ণিত একটি রেওয়াতে নবীশূণ্য যুগের লোক, পাগল ও শিশুর কথাও এসেছে।]
  • কিয়ামতের দিন অজ্ঞ ও বোধহীন লোকেরা নিজেদের বোঝা কোমরে বহন করে নিয়ে আসবে এবং আল্লাহ্‌ তা’আলার সামনে ওজর পেশ করে বলবে, “আমাদের কাছে কোন রাসূল আসেননি এবং আপনার কোন হুকুমও পৌঁছেনি। এরূপ হলে আমরা মন খুলে আপনার কথা মেনে চলতাম।” তখন আল্লাহ্‌ তা’আলা বলবেন, “আচ্ছা এখন যা হুকুম করবো তা মানবে তো?” উত্তরে তারা বলবে, “হ্যাঁ, অবশ্যই বিনা বাক্য ব্যয়ে মেনে নেবো।” তখন মহামহিমান্বিত আল্লাহ্‌ বলবেন, “আচ্ছা যাও, জাহান্নামের পার্শ্বে গিয়ে তাতে প্রবেশ কর।” তারা তখন অগ্রসর হয়ে জাহান্নামের পার্শ্বে পৌঁছে যাবে। সেখানে গিয়ে যখন ওর উত্তেজনা, শব্দ এবং শাস্তি দেখবে তখন ফিরে আসবে এবং বলবে, “হে আল্লাহ্‌ আমাদেরকে এর থেকে রক্ষা করুন।” আল্লাহ্‌ তা’আলা বলবেন, “দেখো, তোমরা অঙ্গীকার করেছো যা আমার হুকুম মানবে আবার এই নাফরমানী কেন?” তারা উত্তরে বলবে, “আচ্ছা, এবার মানবো।” অতঃপর তাদের কাছ থেকে দৃঢ় অঙ্গীকার নেয়া হবে। তারপর এরা ফিরে এসে বলবেঃ “হে আল্লাহ্‌, আমরা তো ভয় পেয়ে গেছি। আমাদের দ্বারা তো আপনার এই আদেশ মান্য করা সম্ভব নয়।” তখন প্রবল প্রতাপান্বিত আল্লাহ্‌ বলবেন, “তোমরা নাফরমানী করেছো। সুতরাং এখন লাঞ্ছনার সাথে জাহান্নামী হয়ে যাও।” রাসূল (সা) বলেন যে, প্রথমবার তারা যদি আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী জাহান্নামে লাফিয়ে পড়তো তবে ওর অগ্নি তাদের জন্য ঠাণ্ডা হয়ে যেত এবং তাদের দেহের একটি লোমও পুড়তো না।
  • [মুসনাদ বাযযার, ইমাম ইবন কাসির(র) এর মতে ইমাম ইবন হাব্বান(র) নির্ভরযোগ্যরূপে বর্ণণা করেছেন; তাফসির ইবন কাসির, সুরা বনী ইস্রাইল ১৫নং আয়াতের তাফসির, ইয়াহইয়া ইবন মুঈন(র) ও নাসাঈ(র) এর মতে এতে(সনদের ব্যাপারে) ভয়ের কোন কারণ নেই।]
  • আল্লাহ্‌র গুণাবলী সম্পর্কে কুরআন ও হাদিস থেকে আমরা যা জানতে পারি, তা থেকে নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, যারা আদৌ ইসলামের দাওয়াত পাবে না, তাদের প্রতি পরকালে যে পরীক্ষা হবে তা মোটেও তাদের সাধ্যাতীত কিছু হবে না। অনেক লোকই আগুনের সেই পরীক্ষাতেও নিজ যোগ্যতায় পাশ করে যাবে এবং অনেকে নিজ অযোগ্যতায় ব্যর্থ হবে।
  • “আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যাতীত কোন কাজের ভার দেন না; সে তাই পায় যা সে উপার্জন করে এবং তাই তার উপর বর্তায় যা সে করে।...” (সূরা বাকারাহ ২:২৮৬)
  • কেউ যদি দাবি করে যে সে ভবিষ্যতের কথা জানে এবং তার এই জানার ভিত্তিতে সে একটা বই রচনা করে, কিন্তু সেই ভবিষ্যতবাণীকে বাস্তবতা দেবার জন্য সে কোন প্রচেষ্টা না চালায়, তাহলে তার ব্যাপারে দুইটি সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়:
  • ১। যদি তার সব ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তব হয়, তবে বলা যাবে সে আসলেই ভবিষ্যত জানে।
  • ২। যদি তার ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তব না হয়, তবে বলা যাবে সে আসলে ভবিষ্যত জানে না।
  • কিন্তু তার প্রতিটি ভবিষ্যদ্বাণী ফলে যাবার কারণে,
  • একথা বলা যাবে না যে, তার ভবিষ্যদ্বাণীর কারণেই কোনো ঘটনা ঘটেছে।
  • বরং বলতে হবে, ভবিষ্যতের সঠিক জ্ঞান থাকার কারণেই সে ঘটনাটিকে আগেই লিখে রাখতে পেরেছে।
  • ইসলাম একথা বিশ্বাস করতে বলে যে, আল্লাহ্‌ তার ইলমের দ্বারা জানেন মানুষ কী করবে, তা তিনি তাকদিরের কিতাবে লিখে রেখেছেন। এটা নিছক আল্লাহর ইলম সংক্রান্ত একটা বিশ্বাস বা স্বীকৃতি। স্রষ্টা অনাদি, অনন্ত, সর্বজ্ঞ। তিনি সময়ের অধীন না। অতীত, বর্তমান ভবিষ্যতের সব জ্ঞানই তার কাছে আছে। সেই জ্ঞান তিনি লিপিবদ্ধ করবেন কি করবেন না, সেটা তার ইচ্ছা। সেটা লিপিবদ্ধ করা বা না করার দ্বারা কারো ওপর কিছু আরোপিত হয় না।
  • ইসলাম একথা বিশ্বাস করতে বলে না যে, আল্লাহ তাকদিরের কিতাবে লিখে রেখেছেন বলেই আমরা পৃথিবীতে সব কাজ করি, বা আল্লাহ ‘by force’ আমাদেরকে দিয়ে তাকদিরের কিতাবের লিখিত বিষয়বস্তুর অভিনয় করাচ্ছেন আর আমরা রোবটের মত অভিনয় করে যাচ্ছি! [অথচ আমরা অনেকে তাকদিরকে সেটাই মনে করি, আর সেখানেই আমাদের ভুল।]
  • শেষ কথা- আল্লাহ্‌ই ভাল জানেন তাকদির সম্পর্কে। আমাদের শুধু বিশ্বাস রাখতে হবে।
  • তথ্যসূত্র:

তাকদির: আল্লাহ্ই সব করিয়েছেন, আমার কোন দোষ নাই! আসলেই কি তাই??

  • আমাদের অনেকের মনেই এরকম প্রশ্ন আসে- আমি খারাপ; এটা কি আমার দোষ? আল্লাহ্‌ই তো আমার ভাগ্যে খারাপ লিখেছেন। কোন কাজে ব্যর্থ?- আমার পোড়া কপাল! এরকম প্রশ্নও আসে- আল্লাহ্‌ যেহেতু জানেনই কে বেহেশতে যাবে আর কে জাহান্নামে যাবে, তাহলে দুনিয়াতে পাঠিয়ে এত কষ্ট দেয়ার মানে কি? সরাসরি জাহান্নাম বা জান্নাতে পাঠালেই তো হত! আজকে আমরা এরকম প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করবো।
  • মনে করুন, আপনি কোন পাওয়ার স্টেশন থেকে বিদ্যুৎ নিচ্ছেন এবং সেই বিদ্যুৎ আপনি ইচ্ছামত বিভিন্ন কাজে লাগাচ্ছেন। এখান থেকে আমরা দুইটা পয়েন্ট পাচ্ছি।
  • ১। বিদ্যুতের জন্য আপনি পাওয়ার স্টেশন যিনি চালাচ্ছেন তার মুখাপেক্ষী।
  • ২। কিন্তু বিদ্যুৎ কি খাতে ব্যবহার করবেন সেটা আপনার ইচ্ছাধীন।
  • তারমানে-
  • ১। বিদ্যুতের সঠিক/অপ ব্যবহারের জন্য আপনি নিজেই দায়ী, ‘পাওয়ার স্টেশন যিনি চালাচ্ছেন’ তিনি নন।
  • ২। কিন্তু যেহেতু ‘পাওয়ার স্টেশন যিনি চালাচ্ছেন’ তার ইচ্ছা ব্যতীত আপনি বিদ্যুৎ পেতে পারেন না, সেহেতু একথা বলা যায়, বিদ্যুতের যে ইচ্ছামত ব্যবহার আপনি করছেন তা ‘পাওয়ার স্টেশন যিনি চালাচ্ছেন’ তার ইচ্ছাতেই করতে পারছেন।
  • কেউ যখন বলে “আল্লাহর ইচ্ছাতেই সবকিছু হয়”, তখন সবচেয়ে বড় যে ভুলটা সাধারণত হয় তা হলো আল্লাহর ইচ্ছাকে মানুষের ইচ্ছার মত কিছু একটা বিবেচনা করা হয়। বস্তুত আল্লাহর ইচ্ছা হচ্ছে আমাদের জন্য একপ্রকার শক্তি, যেই শক্তির বলে আমরা ইচ্ছা করতে পারি। আমরা তখনই কেবল ইচ্ছা করতে পারি যখন “আল্লাহর ইচ্ছা” আমাদেরকে ইচ্ছা করার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি সরবরাহ করে।
  • ১। ইচ্ছা করতে পারব কি না এই ব্যাপারে আমরা আল্লাহর ইচ্ছার ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। “আল্লাহর ইচ্ছা” তথা শক্তি ছাড়া আমরা কোন ইচ্ছাই করতে পারি না।
  • ২। কিন্তু ইচ্ছা করার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি “আল্লাহর ইচ্ছা” কর্তৃক প্রাপ্ত হবার পর আমরা “কী ইচ্ছা করব”- সেই ব্যাপারে আমাদের স্বাধীনতা রয়েছে। [মানুষের ইচ্ছার স্বীকৃতি রয়েছে এমন কিছু আয়াত ১৮:২৯, ২৫:৫৭, ৭৬:২৯, ৭৩:১৯, ৭৮:৩৯, ৮০:১২, ৭৪:৫৫]
  • এ ব্যাপারে আরও কিছু বিষয় বলে রাখা প্রয়োজন। সবক্ষেত্রে আমরা স্বাধীনভাবে ইচ্ছাশক্তি প্রয়োগ করতে পারবো- ব্যাপারটা এমন না। তবে আমাদের শুধু সে সকল বিষয়েরই হিসাব নেয়া হবে, যে সকল বিষয়ে আমরা স্বাধীনভাবে ইচ্ছা শক্তিকে প্রয়োগ করতে পারবো।
  • আর যে সকল বিষয়ে আমাদের কোন হাত নেই, আল্লাহ নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন এবং তা তাকদিরের কিতাবে লিখেও রেখেছেন। যেমন- কোন মানুষ কখন জন্মাবে, কখন মারা যাবে, সে কতটুকু রিযিক পাবে ইত্যাদি। এসব ব্যাপারে আমাদের জবাবদিহি করতে হবে না।
  • অধিকাংশ বিষয়েই আল্লাহ মানুষকে ইচ্ছা প্রয়োগের ক্ষমতা বা স্বাধীনতা দিয়েছেন। যেমন- ঈমান আনা বা না আনা, হালাল উপায়ে রিযিক অন্বেষণ করা বা হারাম উপায়ে করা, ভাল বা খারাপ কাজ করা ইত্যাদি। এই বিষয়গুলোর জন্য মানুষকে জবাবদিহি করতে হবে। এগুলোও তাকদিরের কিতাবে লিপিবদ্ধ করা আছে, কিন্তু এগুলো তাকদির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয়। প্রশ্ন হল- এটা কিভাবে সম্ভব? তাকদিরের কিতাবে লিপিবদ্ধ করা আছে, কিন্তু এগুলো তাকদির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয়! এবার চলুন এই প্যারাডক্সের সমাধান করি।
  • প্রথমে ছোট একটা উদাহরন দেই। ধরুন- আপনি কোন পড়াশোনা করেন না। আপনার শিক্ষক আপনার প্রস্তুতি সম্পর্কে অবগত। এখন তিনি যদি পরীক্ষার আগে আপনাকে বলেন যে, আপনি পাশ করতে পারবেন না। আর রেজাল্ট দেয়ার পর যদি দেখা যায়, আপনি সত্যি সত্যিই ফেল করেছেন। সেক্ষেত্রে আপনি কাকে দায়ী করবেন? শিক্ষককে নাকি নিজেকে?! স্রষ্টা আর আমাদের জানাটা ‘কিছুটা’ এরকমই। (তবে এক্ষেত্রে শিক্ষকের ভবিষ্যৎবাণী ভুল হতে পারে, কিন্তু আল্লাহ্র হবে না)। স্রষ্টা জানেন আমরা কি করবো, কিন্তু এর মানে এই নয় যে তিনি আমাদের কৃতকর্মের জন্য দায়ী। আমরা কি করবো সেটা আল্লাহ্ তার জ্ঞানের কারণে আগে থেকেই জানেন। কিন্তু তিনি জানেন বলেই আমরা ঐ কাজ করবো- ব্যাপারটা এমন নয়।
  • আরও একটা উদাহরন দেখি। আমার সামনে দুইটা রাস্তা আছে। ধরা যাক, আমি ডান দিকের রাস্তায় গেলাম। আমি যে ডান দিকের রাস্তায় যাবো- এটা আল্লাহ্ আগে থেকেই জানতেন, তাই তিনি এটা আমাকে দুনিয়াতে পাঠানোর আগেই লিখে রেখেছিলেন। এখন তিনি লিখে রেখেছিলেন বলেই কিন্তু আমি ডান দিকের রাস্তায় যাই নি। বরং আমি ডান দিকের রাস্তায় যাবো দেখে আল্লাহ্ লিখে রেখেছিলেন। আরও একটা ব্যাপার আমাদের মনে রাখতে হবে যে, সময়কে আল্লাহ্ সৃষ্টি করেছেন। তাই তিনি সময়ের উপর নির্ভরশীল নন। আমরা সময়ের গণ্ডিতে বাঁধা। কিন্তু আল্লাহ্ নন। আমাদের কাছে কোন ঘটনা ঘটার আগে সেটা ‘হতে পারে’ অবস্থায় থাকে। কিন্তু আল্লাহ্র কাছে ‘হতে পারে’ বলে কিছু নাই। আল্লাহ্র কাছে অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের সকল জ্ঞান রয়েছে। সেই জ্ঞানের ভিত্তিতে আল্লাহ জানেন কখন মানুষ কী করবে। এবং এই জানার ভিত্তিতেই আল্লাহ্ তাকদিরের কিতাবে লিখে রেখেছেন মানুষ কি কি করবে।
  • এবার আসি বিখ্যাত সেই প্যারাডক্স প্রসঙ্গে- আল্লাহ্‌ যেহেতু জানেনই কে বেহেশতে যাবে আর কে জাহান্নামে যাবে, তাহলে দুনিয়াতে পাঠিয়ে এত কষ্ট দেয়ার মানে কি? সরাসরি জাহান্নাম বা জান্নাতে পাঠালেই তো হত!
  • একটু চিন্তা করলেই বুঝা যায় যে, এটা আসলে কতটা হাস্যকর কথা। যদি আপনাকে কোন কিছু করার সুযোগ না দিয়েই জাহান্নামে পাঠানো হয়- তাহলে আপনি নিশ্চিতভাবেই আল্লাহ্কে বলবেন- “কেন আমাকে দোযখ দেওয়া হল? আমি কি অপরাধ করেছি?” যারা বেহেস্তে যাবে, তারা কি দাবি করবে না, “কেন আমাকে বেহেশতে ৫০,০০০ একর বাগান দেওয়া হল; কেন ১,০০,০০০ একর বাগান দেওয়া হল না?”
  • মানুষকে যদি আল্লাহ্‌ কোন শাস্তি দেন, তাহলে এটা স্বাভাবিক যে আল্লাহ্‌ মানুষকে সেই শাস্তি পাবার কারণ কি সেটা দেখাবেন। তা না হলে মানুষ দাবি করবেই কেন তাকে শাস্তি দেওয়া হল। আল্লাহ্‌ যদি মানুষকে পৃথিবীর জীবনের সুযোগটা না দিয়ে জাহান্নাম বানিয়ে, তাতে সরাসরি মানুষ ভরে দিতেন– তাহলে মানুষ কি সেটা মেনে নিত?
  • একই ভাবে মানুষ যখন বেহেশতে যাবে, তার দাবি থাকবে তাকে বেহেশতে যা দেওয়া হয়েছে তা কিসের ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছে। কেন সে কম পেল তার বেহেশতের প্রতিবেশীর থেকে? কেন সে যা পেয়েছে তার থেকে অন্য কিছু পেল না? মানুষ স্বাভাবিকভাবেই দাবি করবে আল্লাহ কিসের ভিত্তিতে তাকে বেহেশতে সেসব দিয়েছে।
  • একারণেই মানুষকে পৃথিবীর জীবন দেওয়া হয়েছে যেন মানুষ বেহেশতে যা কিছু পাবে, তা সে নিজে পৃথিবীতে অর্জন করে যেতে পারে।
  • ইসলাম একথা বিশ্বাস করতে বলে যে, আল্লাহ্‌ তার ইলমের দ্বারা জানেন মানুষ কী করবে, তা তিনি তাকদিরের কিতাবে লিখে রেখেছেন। স্রষ্টা অনাদি, অনন্ত, সর্বজ্ঞ। তিনি সময়ের অধীন না। অতীত, বর্তমান ভবিষ্যতের সব জ্ঞানই তার কাছে আছে। সেই জ্ঞান তিনি লিপিবদ্ধ করবেন কি করবেন না, সেটা তার ইচ্ছা। সেটা লিপিবদ্ধ করা বা না করার দ্বারা কারো ওপর কিছু আরোপিত হয় না।
  • ইসলাম একথা বিশ্বাস করতে বলে না যে, আল্লাহ তাকদিরের কিতাবে লিখে রেখেছেন বলেই আমরা পৃথিবীতে সব কাজ করি, বা আল্লাহ ‘by force’ আমাদেরকে দিয়ে তাকদিরের কিতাবের লিখিত বিষয়বস্তুর অভিনয় করাচ্ছেন আর আমরা রোবটের মত অভিনয় করে যাচ্ছি! [অথচ আমরা অনেকে তাকদিরকে সেটাই মনে করি, আর সেখানেই আমাদের ভুল।]
  • শেষ কথা- আল্লাহ্‌ই ভাল জানেন তাকদির সম্পর্কে। আমাদের শুধু বিশ্বাস রাখতে হবে।

মানুষ কেন নাস্তিক হয়?

  • মানুষ কিশোর বয়স থেকেই স্বাধীন হতে চায়। সে যত বড় হয়, কিশোর থেকে তরুণ হয়, তরুণ থেকে প্রবীণ হয়, তখন তার স্বাধীন হওয়ার ইচ্ছা আরও বেড়ে যায়। কিন্তু তার স্বাধীনতার পথে একটা বাধা এসে দাঁড়ায়: ধর্ম। মানুষ যখন বড় হতে থাকে, তখন সে দেখতে পায় যে, ধর্ম বলে: এটা করা নিষেধ, ওটা করা নিষেধ, এটা খাওয়া যাবে না, ওটা দেখা যাবে না, এটা শোনা যাবে না, ওটা বলা যাবে না। তখন তার হাতে দুটি পথ খোলা থাকে—
  • ১) তাকে এই নিয়মগুলো মেনে নিয়ে জীবন পার করতে হবে। ২) সে এই নিয়মকানুনগুলো অস্বীকার করে নিজের খেয়াল খুশি মত জীবন যাপন করবে।
  • কিন্তু নিজের মত করে জীবন যাপন করতে গেলে প্রথমে তাকে ধর্মকে অস্বীকার করতে হবে। তখন সে বলা শুরু করবে: “সৃষ্টিকর্তা বলতে কিছু নেই। আমি সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস করি না।” এটা বলে সে নিজের ভেতর এক ধরনের মানসিক স্বাধীনতা অনুভব করে, কারণ তখন তার মধ্যে কোনো ধর্মীয় দায়বদ্ধতা থাকে না, যা তাকে এক ধরনের আনন্দ দেয়। আর এভাবেই জন্ম হয় বেশিরভাগ নাস্তিকদের।
  • আজকাল যে সকল নাস্তিকদের আমরা দেখে থাকি, তাদের বেশিরভাগই হুজুগে নাস্তিক। তারা কেন নাস্তিক, সেটা তারা নিজেরাও জানে না। তাদেরকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়: আপনি কেন নাস্তিক? —তারা কোনো যুক্তিসংগত উত্তর দিতে পারে না। তারা নাস্তিক হয় সবার চেয়ে আলাদা হওয়ার জন্য। অন্যদের বলার জন্য যে, “দেখ, আমি তোমাদের চেয়ে আলাদা। তোমরা সব মান্ধাত্তা আমলের কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষ, তাই ঈশ্বরে বিশ্বাস করো। আমি একজন আধুনিক শিক্ষিত মানুষ। আমি ঈশ্বর মানি না।”
  • কিছু নাস্তিক আছে, যারা হতাশা থেকে নাস্তিক হয়। যেমন- সে আল্লাহ্‌র কাছে কোন কিছুর জন্য অনেক চাইল, কিন্তু তারপরেও তার সেটা না পাওয়ার থেকে হতাশা তৈরি হয়। এরপর তার মাথায় চিন্তা ঘুরে, “আমি এত করে চাওয়ার পরেও আল্লাহ্‌ আমাকে দিলো না। আল্লাহ্‌ যদি সত্যিই থাকতো তাহলে দুনিয়ার এত মানুষ কেন এত কষ্ট সহ্য করে, এত অবিচারের স্বীকার হয়? খারাপ লোকদের কেন কিছু হয় না? তিনি থাকতে এত দুঃখকষ্ট হয় কিভাবে?... ইত্যাদি আরও নানা ধরনের প্রশ্ন!
  • আর এক শ্রেনীর নাস্তিক আছে, যারা বিভিন্ন বই পড়ে নাস্তিক হয়। তারা ঐ বইয়ের লেখকদেরকে মনে করে সর্বজ্ঞানী। ঐ লেখকদের বইয়ে, মতবাদে কোনো ভুল থাকতে পারে — সেটা তারা কল্পনাও করতে পারে না। হাজার হোক, লেখকদের পিএইচডি ডিগ্রী আছে না? তারা কীভাবে ভুল করতে পারে? তাদের বইয়ের বা মতবাদের বা যুক্তির ভুলগুলোকে, ফাঁকফোকরগুলোকে কেউ আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেও তারা সেটাকে মানে না। তার বিশ্বাসের পক্ষের যুক্তিগুলো সে খুব ভালো করে শোনে, খুব ভালো করে মনে রাখে। কিন্তু তার বিশ্বাসের বিরুদ্ধে যায় এমন যুক্তিগুলো তার এক কান দিয়ে ঢুকে অন্য কান দিয়ে বের হয়ে যায়। তখন তাকে তার বিশ্বাসের বিরুদ্ধে কিছু বললেও কোনো লাভ হয় না। সে ঘুরে ফিরে বিভিন্নভাবে নিজেকে নানাভাবে বোঝাতে থাকে, যেন সে তার বিশ্বাসে অটুট থাকতে পারে। তারা তখন আপনার যুক্তিগুলোকে বলবে ঠুনকো যুক্তি, সবকিছুই ভুল, মিথ্যাচার করা হয়েছে, বিজ্ঞানের নামে ছদ্মবিজ্ঞানের আশ্রয় নেয়া হয়েছে...ইত্যাদি। অর্থাৎ, তাদের কাছে আপনি যাই বলবেন সবই ভুল। শুধু তারা বা তাদের গুরুরা যা বলবে তাই ঠিক! তারা ভুল করতেই পারে না,তারা ভুলের উর্ধ্বে!! (নাউযুবিল্লাহ্)
  • সবশেষে আমাদের জন্য আল্লাহর ﷻ কিছু আমন্ত্রণ দিয়ে শেষ করি—
  • “আমি আমার বান্দার প্রতি যাহা অবতীর্ণ করিয়াছি, তাহাতে তোমাদের কোন সন্দেহ থাকিলে, তোমরা ইহার অনুরুপ একটি সূরা আনয়ন কর। এবং তোমরা যদি সত্যবাদী হও, তাহলে আল্লাহ্‌ ব্যতীত তোমাদের সকল সাহায্যকারীকে আহ্বান কর। যদি আনয়ন না কর, এবং কখনোই করিতে পারিবে না। তাহলে সেই আগুন কে ভয় কর, কাফিরদের জন্য যাহা প্রস্তুত করিয়া রাখা হইয়াছে মানুষ এবং পাথর হইবে যাহার ইন্ধন।” [সূরা আল্-বাকারা ২:২৩-২৪]
  • “মানুষকে বলো, ‘আকাশ এবং পৃথিবীতে যা আছে, তা ভালো করে দেখো।’”  [সূরা ইউনুস ১০:১০১]
  • "রহমানের সৃষ্টিতে কোথাও কোন অসঙ্গতি দেখতে পাবে না। তোমার সুতীক্ষ্ণ দৃষ্টিকে প্রসারিত করে দেখো, তেমন কিছু দেখতে পেলে কি? তোমার সেই দৃষ্টি আবার বুলিয়ে নাও। এবং আবারও। তোমার দৃষ্টি তোমার কাছে ফিরে আসবে আহত, ব্যথিত, লাঞ্চিত ও লজ্জিত হয়ে।" [সূরা মূলক্ ৬৭:৩-৪]

নাস্তিকদের নিয়ে কিছু কথা

بِسْمِٱللَّهِ ٱلرَّحْمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ

  • “আমি আমার বান্দার প্রতি যাহা অবতীর্ণ করিয়াছি, তাহাতে তোমাদের কোন সন্দেহ থাকিলে, তোমরা ইহার অনুরুপ একটি সূরা আনয়ন কর। এবং তোমরা যদি সত্যবাদী হও, তাহলে আল্লাহ্‌ ব্যতীত তোমাদের সকল সাহায্যকারীকে আহ্বান কর। যদি আনয়ন না কর, এবং কখনোই করিতে পারিবে না। তাহলে সেই আগুনকে ভয় কর, কাফিরদের জন্য যাহা প্রস্তুত করিয়া রাখা হইয়াছে মানুষ এবং পাথর হইবে যাহার ইন্ধন।” (সূরা আল্-বাকারা ২:২৩-২৪)
  • এ পর্যন্ত কেউই আল্লাহ্‌র দেয়া এ চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়ন করতে পারে নি এবং ভবিষ্যতেও কেউই কুরআনের সূরার মত সূরা লিখতে পারবে না। অনেক অমুসলিম চেষ্টা করেছে কু’রআনের সূরার মতো সূরা তৈরি করার। তারা চুড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কুরআনের সূরার মতো নকল সূরা তৈরি করার। ইন্টারনেটে এরকম বানানো সূরা আপনি অনেক পাবেন। যেকোনো অভিজ্ঞ আরব ভাষাবিদকে দিয়ে আপনি সেগুলো দেখালেই সে আপনাকে বলে দিতে পারবে সেগুলো কতখানি হাস্যকর।
  • যারা এখনও আল্লাহর ﷻ অস্তিত্ব নিয়ে ঠিক পুরোপুরি বিশ্বাস করেনি, একধরনের দোটানার মধ্যে ঝুলে আছে,তাদেরকে আপনি যদি প্রশ্ন করেন, “আপনি কেন বিশ্বাস করেন না যে, আল্লাহ সত্যিই আছেন?”—তাহলে আপনি নিচের কোনো একটা উত্তর পাবেন:
  • ১) আল্লাহ থাকতেও পারে, আবার নাও পারে, আমি ঠিক জানি না। যেহেতু আমি জানি না সে সত্যিই আছে কি না, তাই আমি ধরে নিচ্ছি যে সে নেই এবং আমি আমার ইচ্ছা মতো জীবন যাপন করব।
  • ২) আল্লাহ আছে কি নেই, সেটা বিজ্ঞান কখনই নিঃসন্দেহে প্রমাণ করতে পারবে না। যেহেতু আল্লাহর অস্তিত্ব প্রমাণ করা সম্ভব না, তাই আমি ধরে নিচ্ছি যে সে নেই, এবং আমি আমার মতো করে জীবন যাপন করব।
  • উপরের উত্তর দুটি লক্ষ করলে দেখবেন,সে ‘বেনিফিট অফ ডাউট’ দিচ্ছে‘আল্লাহ নেই’-কে। সে কিন্তু ‘আল্লাহ আছেন’—এটা ধরে নিতে রাজি হচ্ছে না। সে যদি সত্যিই নিরপেক্ষ হয়,তাহলে সে কেন নিচের উত্তরগুলোর একটা দিচ্ছে না?
  • ১) আল্লাহ থাকতেও পারে, আবার নাও পারে, আমি ঠিক জানি না। যেহেতু আমি জানি না তিনি সত্যিই আছেন কিনা, তাই আমি ধরে নিচ্ছি তিনি আছেন এবং আমি তাঁর আদেশ মতো জীবন পার করব।
  • ২) আল্লাহ আছেন কি নেই, সেটা বিজ্ঞান কখনই নিঃসন্দেহে প্রমাণ করতে পারবে না। তাই আমি ধরে নিচ্ছি তিনি আছেন এবং আমি তাঁর আদেশ মতো জীবন পার করব।
  • কিন্তু এই ধরনের উত্তর আপনি পাবেন না। বেশিরভাগ মানুষ ধরে নিবে আল্লাহﷻ নেই, কারণ আল্লাহﷻ আছেন ধরে নিলেই নিজেকে পরিবর্তন করতে হবে: নামায পড়তে হবে,রোযা রাখতে হবে, যাকাত দিতে হবে,হিন্দি/ইংলিশ সিরিয়াল বা মুভি এবং পর্ণ দেখা বন্ধ করতে হবে,ফেইসবুকে হাঁ করে অন্যের বেপর্দা ছবি দেখা বন্ধ করতে হবে—এগুলো করার কোনো ইচ্ছা তাদের নেই। তাহলে তাদের সাথে তর্ক করে শেষ পর্যন্ত কী লাভটা হচ্ছে?
  • ধরুন আপনি এদের কাউকে বললেন, “ভাই,আপনার কথা যদি সত্যি হয় যে,আল্লাহর অস্তিত্ব নেই, মৃত্যুর পরে কোনো জগত নেই,তাহলে আপনি যখন মারা যাবেন, তখন আপনার অস্তিত্ব শেষ। আপনি কোনোদিন জানতে পারবেন না যে, আপনার ধারণাটা সঠিক ছিল কিনা। আপনিও বাঁচলেন, আমিও বাঁচলাম (আযাব থেকে)। কিন্তু ধরুন আপনি ভুল, আর মারা যাওয়ার পর দেখলেন,আল্লাহ সত্যিই আছেন। জাহান্নামের যেসব ভয়ঙ্কর শাস্তির কথা পড়ে আপনি হেঁসে উড়িয়ে দিয়েছিলেন, সেগুলো সব সত্যি ঘটনা। তখন কী হবে একবার ভেবে দেখেছেন?”
  • এই অবস্থায় বেশিরভাগ মানুষের প্রতিক্রিয়া হবে,“এরকম যুক্তি তো অনেক কিছুর বেলায়ই দেখানো যায়। তাই বলে কি ‘আল্লাহ আছেন’ ধরে নিয়ে আমাকে ইসলাম মানতে হবে নাকি? এটা কী রকম যুক্তি হলো?” অথচ ‘আল্লাহ নেই’,এটা ধরে নেওয়াটা তাদের জন্য ঠিকই যুক্তিযুক্ত। তাদের যুক্তি অনুসারে: আল্লাহ আছেন, নাকি নেই–সেটা ৫০-৫০ সম্ভাবনা। তারপরেও তারা ‘আল্লাহ নেই’ এটা ঠিকই মেনে নিতে রাজি, কিন্তু ‘আল্লাহ আছেন’ এটা মেনে নিতে রাজি না।
  • আল্লাহ আমাদের সম্পর্কে একটা চমৎকার কথা বলেছেনঃ
  • “যখন আমি মানুষকে অনুগ্রহ করি তখন সে গর্বে নিজের মত থাকে, কিন্তু যেই না খারাপ কিছু হয়, সাথে সাথে সে লম্বা দোয়া করা শুরু করে।” [সূরা ফুসিলাত৪১:৫১]
  • শতকরা ৯৫ ভাগ নাস্তিক কোন কঠিন সমস্যা বা রোগে পড়লে আস্তিক হয়ে যায়!!! কিন্তু যখনই তারা এ ধরনের সমস্যা থেকে বের হয়ে আসে, তখন সে আবার আগের মতই নাস্তিক হয়ে যায়। যদি সে ঐ সমস্যা থেকে পরিত্রাণ না পায়, তখন তারা বলে যে, আল্লাহ্ যদি সত্যিই থাকতো তাহলে সে কখনোই এই বিপদে পড়তো না। পড়লেও আল্লাহকে সে যে এত ডেকেছে, তিনি নিশ্চয়ই তার কথা শুনতেন। সে কিন্তু তখন এটা ভাববে না যে তার এত পাপের কারণেই আল্লাহ্ তাআলা তার প্রার্থনায় সাড়া দেন না। অর্থাৎ যেটাই হোক না কেন সে সবসময়ই আল্লাহর অস্তিত্বকেঅস্বীকার করবে।
  • মানুষের মত একটা নগণ্য বুদ্ধির প্রাণী, যারা এখন পর্যন্ত পদার্থের ‘ভর’ কেন হয় – এরকম অত্যন্ত প্রাথমিক একটা ব্যপার বের করতে পারেনি; যেই ‘হিগ্‌স বোসন’ বের করার জন্য ২ বিলিয়ন ডলার খরচ করে গবেষণা করছে একযুগ ধরে, তারাই এই মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তার অচিন্তনীয়, অকল্পনীয় সৃষ্টিকে নিয়ে চ্যালেঞ্জ করে। এরকম মূর্খ একটা প্রাণীই দাবি করে – আল্লাহ বলে কিছু নেই, থাকলে পৃথিবীতে এত অশান্তি, এত দুঃখ, কষ্ট, যুদ্ধ থাকতো না।
  • অনেক নাস্তিক আবার বলে যে, তারা যদি আল্লাহকে নিজের চোখে দেখে বা আল্লাহ্‌র নিদর্শনের কোন অলৌকিক ঘটনা দেখে, তাহলেতারা আস্তিক বা মুসলমান হয়ে যাবে। অলৌকিক ঘটনা দেখানোর একটি সমস্যা হলো: ঘটনাটি যারা নিজের চোখে দেখে,তাদের উপরে ঠিকই বিরাট প্রভাব পড়ে,কিন্তু তাদের ভবিষ্যৎ বংশধরেরা—যারা শুধু তাদের পূর্বপুরুষের মুখে ঘটনার বর্ণনা শুনে—তাদের খুব একটা গায়ে লাগে না। ধরুন,আপনি একদিন কক্সবাজারে সমুদ্রের তীরে হাঁটছেন। এমন সময় প্রচণ্ড বাতাস শুরু হলো,আর দেখলেন বঙ্গোপসাগরের পানি দুইভাগ হয়ে গিয়ে সাগরের মধ্য দিয়ে একটা রাস্তা হয়ে গেল। তারপর সেই রাস্তা দিয়ে হেঁটে পার হয়ে এল বার্মার অত্যাচারিত মুসলিম। এটা দেখে আপনার ওপর একটা বিরাট প্রভাব পড়বে। আপনি হয়তো পরের মাসেই উমরাহ করতে চলে যাবেন। কিন্তু আপনি যদি একদিন আপনার ছেলেমেয়েদের চোখ বড় বড় করে গল্পটা বলেন, “জানো?একদিন আমি দেখলাম: বঙ্গোপসাগরের পানি সরে গিয়ে সাগরের মধ্যে দিয়ে একটা শুকনা রাস্তা তৈরি হয়ে গেল,আর বার্মার গরিব মুসলিমরা হেঁটে বাংলাদেশে চলে এল!”—তাদের উপরে কাহিনিটার সেরকম কোনো প্রভাব পড়বে না, কারণ তাদের কাছে সেটা একটা গল্প ছাড়া আর কিছু নয়। তারা সেই ঘটনা শোনার পর দিন থেকেই মুভি বা হিন্দি/ইংলিশ সিরিয়াল দেখা, পর্ন দেখা, বিয়েতে সেজেগুজে অর্ধ নগ্ন হয়ে যাওয়া —সব বন্ধ করে আদর্শ মুসলিম হয়ে যাবে না।
  • ধরুন, কেউ দাবি করল যে,“ভাই, আমাকে সমুদ্র দুই ভাগ করে দেখাতে হবে না। আমি যদি ছোটোখাটো একটা অলৌকিক কিছু দেখি, তাহলেই হবে। যেমন ধরুন, আকাশ থেকে গম্ভীর স্বরে যদি কেউ কথা বলে, বা ধরুন আলোর তৈরি মানুষের মতো দেখতে কেউ যদি আমার সামনে এসে বলে, ‘হ্যা, কু’রআন সত্যিই আল্লাহরﷻ বাণী, কোনো সন্দেহ নেই। তোমাকে এর পুরোটাই মানতে হবে’—তাহলে আমি সত্যি বলছি, কালকে থেকে আমি একদম পুরোপুরি ঈমানদার হয়ে যাব—আল্লাহর কসম।”
  • অথচ এই একই লোকই যখন একদিন গাড়ি চালানোর সময় রেডিওতে শুনে, “কারওয়ান বাজারে আগুন লেগেছে। সেখানে বিরাট যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। যানবাহনকে অনুরোধ করা হচ্ছে সেদিকে না যেতে”—কারওয়ানে বাজারে জরুরি মিটিং থাকা সত্ত্বেও সে এটা শোনা মাত্র গাড়ি ঘুরিয়ে মগবাজারের দিকে চলে যাবে। তার মনে কোনোই সন্দেহ থাকবে না যে,কারওয়ান বাজারে সত্যি সত্যি আগুন লেগেছে। সে দাবি করবে না,“আমাকে যদি একটা আলোর তৈরি প্রাণী এসে বলে কারওয়ান বাজারে আগুন লেগেছে, তাহলেই আমি শুধু বিশ্বাস করব। নাহলে আমি মানতে পারছি না রেডিওর খবরটা সত্যি কি না।”—কেন এরকম হয়?
  • কারণ সে চিন্তা ভাবনা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে,সে রেডিওকে বিশ্বাস করবে। যেই রেডিওর সাংবাদিকরা রাজনৈতিক দলের মদদে ভুল তথ্য প্রচার করে, সিগারেটের বিজ্ঞাপন দেয়, পশ্চিমা ব্যান্ডগুলোর সুড়সুড়ি দেওয়া গান চালায়—সেই একই রেডিওর সাংবাদিককে তার বিশ্বাস করতে কোনোই আপত্তি নেই, যখন সেটা কোনো আগুন লাগার খবর প্রচার করে। সে এই ব্যাপারে তার বিচার-বুদ্ধি ঠিকই ব্যবহার করতে রাজি,কিন্তু যখন সেটা কু’রআনের কোনো কথা হয়, তা সে বিচার-বুদ্ধি ব্যবহার করে মানতে রাজি নয়।
  • যেই কু’রআন তাকে কোনো ধরনের অন্যায় করতে বলে না, কোনো ভুল তথ্য দেয় না, তার ক্ষতি হবে এমন কিছু করতে কখনও বলে না— সেই কু’রআন যখন তাকে বলে নামায পড়তে, রোজা রাখতে, যাকাত দিতে, সুদ না খেতে, ঘুষ না দিতে, রাস্তাঘাটে মাথা-ঘাড়-হাত বের করে অর্ধ-নগ্ন হয়ে ঘোরাফেরা না করতে—তখন সে আর সেটাকে মেনে নিতে পারে না। তখনি তার একটা অলৌকিক কিছু দেখার প্রয়োজন হয়ে পড়ে।
  • যারা অলৌকিক প্রমাণ দেখতে চায়, ধরুন তাদেরকে একটা অলৌকিক প্রমাণ দেখানো হলো। একদিন সে সকাল বেলা ঘুমের থেকে উঠে দেখল:তার সামনে আলোর তৈরি এক মধবয়স্ক প্রবীণ ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আছে। সেই অলৌকিক পুরুষ গম্ভীর স্বরে তাকে বলল, “বৎস,আমি আল্লাহরﷻ কাছ থেকে প্রেরিত দুত। তুমি কালকে থেকে কু’রআন মানতে পারো। আমি তোমাকে গ্যারান্টি দিচ্ছি কু’রআন সত্যিই আল্লাহর বাণী।”—এখন সে প্রমাণ করবে কী করে যে,সেটা তার কোনো হেলুসিনেশন বা মতিবিভ্রম ছিল না? আবার ধরুন: আগামীকাল থেকে সে আকাশ থেকে গম্ভীর স্বরে এক ঐশ্বরিক বাণী শোনা শুরু করল। সে কীভাবে প্রমাণ করবে যে,সেটা তার কোনো মানসিক সমস্যা নয়?
  • তর্কের খাতিরে ধরুন: আপনি এদের কাউকে একদিন প্রমাণ করে দেখালেন যে, আল্লাহﷻ সত্যিই আছেন। আপনি এমন এক কঠিন প্রমাণ দেখালেন,যার বিপক্ষে সে কোনো কিছুই উপস্থাপন করতে পারল না। আপনার প্রমাণ দেখার পর, সে কি পরদিন থেকেই একদম আদর্শ মুসলিম হয়ে যাবে,কারণ সে আপনার যুক্তি খণ্ডন করতে পারেনি? সে কি তার লাইফ স্টাইল একদম পালটিয়ে ফেলবে এবং ইসলামের নিয়ম অনুসারে সবকিছু করা শুরু করবে?
  • বেশিরভাগ মানুষই সেটা করবে না। মানুষ আল্লাহকে ﷻ তখনি বিশ্বাস করে,যখন সে নিজে থেকে ‘উপলব্ধি’ করতে পারে যে, তিনি সত্যিই আছেন। তাদেরকে কিছু যুক্তি-প্রমাণ দেখালেই তারা আল্লাহর ﷻ উপর পুরোপুরি বিশ্বাস করা শুরু করে দেয় না এবং তাদের জীবনকে পালটিয়ে ফেলে না। ঈমান একটি দীর্ঘ সফর, যার গন্তব্যে শুধু তর্ক করে পৌঁছা যায় না।
  • এধরনের মানুষের সমস্যাটা আসলে অলৌকিক কিছু দেখা নয়, এইধরনের মানুষের সমস্যা হচ্ছে: পক্ষপাতহীনভাবে বিচার-বুদ্ধি প্রয়োগ করে নিজেকে পরিবর্তন করার সদিচ্ছার অভাব। এদের যদি সত্যিই ইচ্ছা থাকত,তাহলে এরা চিন্তা ভাবনা করে নিজেরাই বুঝতে পারত যে, কু’রআন সত্যিই মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তার বাণী এবং একে আমাদের অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলতে হবে। তাদের তখন আর অলৌকিক কিছু দেখে নিজেকে বিশ্বাস করানোর প্রয়োজন থাকত না। শুধুই প্রয়োজন কু’রআনকে নিয়ে যথেষ্ট চিন্তা ভাবনা করে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো।
  • আবার কিছু মানুষ আছে যারা “মানব ধর্ম”, মানবধর্ম করে গলা ফাটান। তারা তাদের ‘মানব ধর্ম’ কতটুকু পালন করে তা তারা ভাল করেই জানে। তারা তাদের মত একই মতাবলম্বীদেরকে হয়তো সাহায্য করবে, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা ভিন্ন আদর্শের মানুষদেরকে সাহায্য করবে না। তারা আপনাকে সবসময় অবদস্থ করার জন্য উঠেপড়ে লাগবে। এরই নাম ‘মানব ধর্ম’!
  • আল্লাহর ﷻ অস্তিত্ব যে রয়েছে, তার পক্ষে হাজার হাজার প্রমাণ মহাবিশ্বে ছড়িয়ে আছে। তাঁর অস্তিত্বের পক্ষে সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো এই সৃষ্টিজগত। আল্লাহর ﷻ অস্তিত্বে বিশ্বাস না করা মানে হলো এটাই বিশ্বাস করা যে, এই পুরো সৃষ্টিজগত তৈরি হয়েছে কোনো কারণ বা ঘটক ছাড়া—যা একটি অবৈজ্ঞানিক দাবি। যাদের বিজ্ঞান নিয়ে যথেষ্ট পড়াশুনা আছে, তারা এই ধরনের অবৈজ্ঞানিক দাবি করেন না। শুধুই উঠতি ‘বিজ্ঞানীদের’ মধ্যে এই ধরনের হাস্যকর দাবি করতে দেখা যায়, যাদের পড়াশুনা বিজ্ঞানের দুই-একটি শাখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।[]
  • যারা নিরপেক্ষভাবে, আন্তরিক জানার আগ্রহ থেকে আল্লাহকে ﷻ খুঁজে বেড়ান, শুধু তাদের পক্ষেই শেষ পর্যন্ত তাঁকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয়। তাঁকে খুঁজে পাওয়াটা একটা বিরাট সন্মান। এই সন্মান মানুষকে অর্জন করতে হয়।
  • নাস্তিক এবং অধার্মিকদের দেখানো জনপ্রিয় সব যুক্তি এবং প্রমাণগুলোর মধ্যে যে আসলে কত ফাঁকফোকর আছে, সেটা জানার জন্য এই তিনটি বই বেশ কাজের– ১) গণিতবিদ, ফিলসফার এবং বেস্ট সেলার ড: ডেভিড বারলিন্সকি-এর লেখা  The Devil’s Delusion, ২) ‘আধুনিক নাস্তিকতার জনক’ নামে কুখ্যাত নাস্তিক ফিলসফার এনথনি ফ্লিউ-এর ৭০ বছর পর আস্তিক হয়ে যাওয়ার পরে লেখা There is a God,৩) The Human Genome প্রজেক্টেরপ্রধান, বিশ্বের সবচেয়ে নামকরা বিজ্ঞানীদের একজন: ড:ফ্রান্সিস কলিন্স-এর লেখা The Language of God
  • The origin of the universe was unique and the probability of it occurring by ‘chance’ is zero. ‘এমনি এমনি’ সৃষ্টিজগত তৈরি হওয়াটা যে যৌক্তিকভাবে হাস্যকর একটা তত্ত্ব, সেটা নিয়ে ড:ডেভিড বিস্তারিত যৌক্তিক প্রমাণ দিয়েছেন। এমনকি মাল্টিভারস তত্ত্ব যে আসলে একটা পলিটিকাল কৌশল, যেখানে দুর্বোধ্য গণিতের আড়ালে নাস্তিকরা লুকিয়ে থেকে তাদের সেক্যুলার মতবাদ প্রচার করে যাচ্ছে–সেটা তিনি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন। DNA-তে ৩০০ কোটি অক্ষরে[] যে এক প্রচণ্ড সৃজনশীল এবং অকল্পনীয় জ্ঞানী সত্তার স্বাক্ষর স্পষ্টভাবে লেখা আছে,সেটা ড:ফ্রান্সিস সুন্দরভাবে দেখিয়েছেন, যা আধুনিক নাস্তিকতার জনক এনথনি ফ্লিউকেও আস্তিক হতে বাধ্য করেছে।
  • যারা রিচার্ড ডকিন্স নামে একজন বায়োলজিস্ট-এর লেখা The God Delusion বইয়ের সস্তা কথাবার্তা পড়ে ভক্তিতে গদগদ হয়ে গেছেন,তারা কয়েকজন সত্যিকারের বিজ্ঞানী এবং অ্যাকাডেমিকের লেখা পড়ে দেখুন। বুঝতে পারবেন যে,রিচার্ড ডকিন্স আসলে একজন ফার্মগেটের রাস্তার ওষুধ বিক্রেতার মতো হাস্যকর কথাবার্তা বলে মানুষকে একধরনের উত্তেজক ড্রাগ দিয়ে বেড়াচ্ছে এবং তার মাজারের সাগরেদ,কিছু উঠতি ‘বিজ্ঞানীরা’, পলিটিশিয়ানদের সাথে হাত মিলিয়ে,তাকে একজন সেলিব্রিটি বানিয়ে ব্যাপক ব্যবসা করে বেড়াচ্ছে। এদের প্ররোচনায় পড়ে লক্ষ লক্ষ বোকা মানুষ তাদের মাজারের মুরিদ হয়ে যাচ্ছে এবং ডকিন্স এবং তার মাজারের সাগরেদদের বিরাট বড়লোক বানিয়ে দিচ্ছে।
  • আপনি যদি প্রথমেই কোন সিদ্ধান্তে পৌছে তারপর যুক্তি দাড়া করান, তাহলে আপনি সহজে সত্যের নিকট পৌছতে পারবেন না। আপনি ইসলাম বা হিন্দু বিদ্বেষী হয়ে তারপর মনগড়া সব যুক্তি দাড় করালেন, ভুল ব্যখ্যা দিলেন, অন্যেরকথা অন্ধভাবে বিশ্বাস করলেন, তাহলে তো আপনি কখনোই সত্যটাকে জানতে পারবেন না। আপনাকে নিরপেক্ষভাবে চিন্তা করতে হবে এবং সেই অনুযায়ী যুক্তি দাড় করাতে হবে। আর সবসময় একটা কথা মনে রাখবেন যে দুনিয়াতে আপনিই একমাত্র জ্ঞানী ব্যক্তি নন।
  • মানুষের ভেতরে একধরনের ঝোঁক বা প্রবণতা থাকে: সে যা বিশ্বাস করে সেটাকে সঠিক হিসেবে প্রমাণ করার। তার কাছে যখন কোনো তথ্য বা প্রমাণ আসে,সে সেটাকে এমনভাবে বুঝে নেয়, যা তার আগে থেকে ধরে রাখা বিশ্বাসকে সমর্থন করে। এমনকি তার কাছে যদি অপ্রাসঙ্গিক কোনো তথ্যও আসে,সে সেটাকে এমনভাবে গ্রহণ করে, যেন সেটা তারই বিশ্বাসকে সমর্থন করছে। সাইকোলজির ভাষায় এটা হচ্ছে এক ধরনের ‘কনফারমেশন বায়াস’।[১৭০] তার বিশ্বাসের পক্ষের যুক্তিগুলো সে খুব ভালো করে শোনে, খুব ভালো করে মনে রাখে। কিন্তু তার বিশ্বাসের বিরুদ্ধের যুক্তিগুলো তার এক কান দিয়ে ঢুকে অন্য কান দিয়ে বের হয়ে যায়। তখন তাকে তার বিশ্বাসের বিরুদ্ধে কিছু বললেও কোনো লাভ হয় না। সে ঘুরে ফিরে বিভিন্নভাবে নিজেকে নানাভাবে বোঝাতে থাকে, যেন সে তার বিশ্বাসে অটুট থাকতে পারে।
  • যাদের অন্তরে অসুখ রয়েছে, তাদেরকে অলৌকিক কিছু দেখিয়ে কোনো লাভ হয় না,তারা বদলায় না। আর যাদের অন্তরে অসুখ নেই,তারা চেষ্টা করলেই আল্লাহরﷻ ইচ্ছায় ঈমানদার হয়ে যেতে পারে, তাদের জন্য অলৌকিক কিছুর দরকার হয় না। একই বাবা-মায়ের কাছে জন্মগ্রহন করা, একই পরিবার ও সমাজে বড় হওয়া, একই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাওয়া দুই ভাইয়ের মধ্যে কেউ ঈমানকে বেছে নিয়েছে,কেউ বেছে নিয়েছে কুফরকে। এখানে শিক্ষা,পরিবেশ ও পরিবার কোনো প্রভাব ফেলে না, ফেলে সত্যকে গ্রহণ করার ইচ্ছা। একই জিনিসের মধ্যে কেউ ঈমান, আবার কেউ কুফর খুঁজে পেতে পারে।
  • সবশেষে আমি পবিত্র কুরআনের আমার প্রিয় একটি আয়াত দিয়ে শেষ করছি- “সত্য যখন মিথ্যার সামনে এসে দাড়ায়, মিথ্যা তখন বিলুপ্ত হয়ে যায়। কারন মিথ্যা তো বিলুপ্ত হবার জন্যই।” (সূরা বনী-ইসরাঈল ১৭:৮১)
  • সুত্র:
  • [১] The Human Genome Project – http://web.ornl.gov/sci/techresources/Human_Genome/project/info.shtml
  • [২] গণিতবিদ, ফিলসফার এবং বেস্ট সেলার ড: ডেভিড বারলিন্সকি-এর লেখা  The Devil’s Delusion
  • [১৭০] কনফারমেশন বায়াস — http://en.wikipedia.org/wiki/Confirmation_bias

মানবধর্মই তো শ্রেষ্ঠ ধর্ম, আলাদা ধর্মের কি প্রয়োজন?

বর্তমান সেকুলার পৃথিবীতে ‘মানবধর্ম’ কথাটা বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। সাদা চোখে মানবধর্মের ‘পারষ্পরিক শ্রদ্ধাবোধ’, ‘সহনশীলতা’, ‘সাম্য’ এই উপাদানগুলোর কথা খুব চটকদার মনে হলেও একটু ভালোভাবে চিন্তা করলেই বুঝা যায় এসব আসলে ফাঁকাবুলি ছাড়া কিছুই না।
মানবধর্মের একটা মেজর ড্রব্যাক হচ্ছে এর কোন জেনারেল স্ট্যান্ডার্ড বা রেফারেন্স নেই। যে বিষয়টা একজনের কাছে মানবিক মনে হয় সেটা আরেকজনের কাছে বেশ অমানবিক। জাকির নায়েক ব্যাপারটা খুব সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। আমাদের অনেকের কাছেই কোন মানুষকে ধর্ষণের দায়ে হত্যা করাটা খুব অমানবিক। কিন্তু সেই ধর্ষণটা যদি আমাদের মা, বোন কিংবা স্ত্রীর সাথে করা হয় তবে আমরা সবাই ই চাইব নিষ্ঠুরতম উপায়ে লোকটাকে হত্যা করতে।
আবার কিছু কিছু ব্যাপারে আমরা খুব সহজেই একমত হতে পারি। যেমন: বাবা-মার সাথে ভালো ব্যবহার করা, দুস্থ মানুষকে সাহায্য করা। কিন্তু এই ভাল ব্যবহারটা কিভাবে করব কিংবা দুস্থ মানুষটাকে কিভাবে কিংবা কতটুকু সাহায্য করব তা নিয়ে মানবধর্ম কিছুই বলতে পারে না। কেউ হয়তো বলতে পারে বাবা-মার সাথে ঝগড়া না করাটাই ভালো ব্যবহার আবার দুস্থ মানুষদের কিছু টাকা দেয়া কিংবা চাদর দেয়াই হচ্ছে তাদের সাহায্য করা। আমরা ব্যবহারের ধরণ ও সাহায্যের পরিমাণ নিয়ে কখনোই এক জায়গায় অবস্থান করতে পারব না যতক্ষণ পর্যন্ত না আমরা রিলিজিয়নকে আমাদের রেফারেন্স হিসেবে ধরে না নিব। যতক্ষণ পর্যন্ত না আমরা হ্রদয় দিয়ে ধারণ করব পরম করুণাময়ের বাণী-
“তোমার পালনকর্তা আদেশ করেছেন যে, তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সাথে ভালো ব্যবহার কর। তাদের মধ্যে কেউ অথবা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়; তবে তাদেরকে ‘উহ’ শব্দটিও বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না এবং তাদেরকে শিষ্ঠাচারপূর্ণ কথা বল।”[৭]
যতক্ষণ পর্যন্ত না আমরা সেই মানুষটার আদর্শ আমাদের জীবনে ধারণ করি যিনি সামর্থ্য থাকলে কখনোই কোন মানুষকে ফিরিয়ে দিতেন না।
ধরা যাক, আপনি একজন ব্যক্তির উপকার করলেন আর পরবর্তীতে সেই ব্যক্তিটাই আপনার ক্ষতি করল, মানুষের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য হিসেবেই পরবর্তীতে আপনি সেই লোকটার ক্ষতি করতে চাইবেন। এখানে একটা জিনিষই আপনাকে প্রতিশোধ স্পৃহা থেকে দূরে রাখতে পারে, তা হচ্ছে ক্ষমা- যেটা কেবল ধর্মই আপনাকে খুব সুন্দরভাবে শিক্ষা দেয়। ধর্ম আমাদের ভালো কাজের পিছনে একটা প্রেরণা যোগায়। মানবধর্ম যেহেতু মৃত্যুর পরের জীবনটাকেই অস্বীকার করে সেখানে এমন প্রেরণা পাবার সুযোগ নেই। এজন্যই মানবতাবাদী নাস্তিকদের তুলনায় আস্তিকরা চ্যারিটি প্রদানে বেশ এগিয়ে। আর্থার সি ক্লার্কের লেখা থেকে উদ্ধৃত করছি:
“The differences in charity between secular and religious people are dramatic. Religious people are 25 percentage points more likely than secularists to donate money (91 percent to 66 percent) and 23 points more likely to volunteer time (67 percent to 44 percent).
The data shows that if two people — one religious and the other secular — are identical in every other way, the secular person is 23 percentage points less likely to give than the religious person and 26 points less likely to volunteer”[৮]
আবার আমাদের নৈতিকতা স্থান-কালভেদে ধ্রুবক নয়। যে কাজটা আগের যুগের লোকদের কাছে মানবিক ছিল তা আমাদের কাছে অমানবিক। আবার যে কাজটা আমাদের কাছে মানবিক তা হয়তো ভবিষ্যতের মানুষদের নিকট অমানবিক মনে হতে পারে। ঠিক একইভাবে যে কাজটা একজনের কাছে খারাপ সেই একই কাজ আরেকজন মুক্তচিন্তা ও ফ্রীডম অফ উইলের অজুহাতে করতে পারে। এর উদাহারণ পর্ণ মুভি দেখা থেকে শুরু করে ইন্সেস্ট পর্যন্ত দেয়া যেতে পারে। আমাদের অনেকের মনে হয়তো ইন্সেস্টের মত জঘন্য চিন্তাই আসেনি, কিন্তু সভ্য(!) দেশগুলোতে ঢু মারলে পিতা-কন্যা একসাথে সুখী(?) সংসার জীবন করছে এমন উদাহারণ অহরহ দেখা যাবে। এছাড়াও আপনি দেখবেন যে, বিভিন্ন দেশে ধর্ষণের আইনও ভিন্ন। অনেক দেশেই পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে সেক্স করা ১৮ বছর বয়সী নারীর কেস ফাইল করা হয় না; অর্থাৎ, একই বয়সী নারীকে এক দেশে প্রাপ্তবয়স্ক, অন্যদেশে শিশু হিসেবে ধরা হয়![৯] আবার সমকামিতা কয়েকবছর আগেও খারাপ চোখে দেখা হত, আর এখন অনেক দেশে এটা permitted. So we need a unique humanity concept which can be applicable for every era, at least for some decades for all race of humanity.
একটা সত্য গল্প বলি। একবার কিছু সাহাবী লক্ষ্য করলেন উমার(রাঃ) অনবরত হাসছেন আর কাঁদছেন, সাহাবীরা তাকে এই অদ্ভুত আচরণের কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, “আমি জাহেলিয়াতের দিনগুলোর কথা মনে করছি। আমি খেজুর দিয়ে তৈরী মূর্তি নিজের কাছে রাখতাম। একদিন আমার খুব ক্ষুধা লাগল আর আমি মূর্তি থেকে খেজুর খেয়ে নিলাম (আমি কি বোকাটাই না ছিলাম যে খেজুরের তৈরি মূর্তির উপাসনা করতাম!)। তারপর আমার কান্না পেল আর আমি মনে করলাম একদিন আমি গর্ত খুঁড়ছিলাম আর আমার কন্যাকে (জীবন্ত) কবর দিচ্ছিলাম, যখন আমি তাকে কবর দিচ্ছিলাম, হঠাৎ সে তার হাত উঠিয়ে আমার দাঁড়ি থেকে ময়লা পরিষ্কার করে দিল।”[১০] একজন মুসলিম হিসেবে এই ঘটনাগুলো উমার(রাঃ) কে হাসিয়েছিল আবার কাঁদিয়েছিল। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে খেজুরের তৈরি মূর্তিকে সিজদা দেয়া কিংবা কন্যা শিশুকে জীবন্ত কবর দেয়া তাদের মানবধর্মে একদম স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল।
“যখন সমুদ্রকে উত্তাল করে তোলা হবে,যখন আত্মাসমূহকে যুগল করা হবে, যখন জীবন্ত প্রোথিত কন্যাকে জিজ্ঞেস করা হবে, কি অপরাধে তাকে হত্যা করা হল?[১১]
তথ্যসূত্র:
[১] সূরা বাকারা ২:২৬
[২] সূরা বাকারা ২:১১৮
[৩] আশ্‌-শূরা ৪২:৫১
[৪] Paul Davies –এর বই God and The New Physics
[৫] সূরা মায়েদা ৫:১১৫
[৬] সূরা ইব্রাহিম ১৪:১৮
[৭] সূরা বনী ইসরাইল ১৭:২৩
[১০] Understanding the Quran- Anwar Al Awlaki
[১১] সূরা তাক্‌ভীর ৮১:৬-৯

মাদার তেরেসা,বিল গেটস-এরা এত ভাল কাজ করেও কেন জাহান্নামে যাবে?

ধরুন, একজন লোক তার স্ত্রীর সাথে খুব ভাল আচরণ করে, একেবারে আদর্শ স্বামী। কিন্তু এই একই ব্যক্তি তার পিতামাতার প্রতি সহানুভূতিশীল না, তাদের সাথে সে যাচ্ছে তাই ব্যবহার করে। এরকম ব্যক্তিকে আপনি কিভাবে সংজ্ঞায়িত করবেন? আপনি কি শুধু স্ত্রীর সাথে ভাল ব্যবহারের প্রেক্ষিতে তাকে ভালো মানুষ বলবেন? তেমনিভাবে কিছু মানুষ সৃষ্টির প্রতি হয়তো সহানুভূতিশীল, কিন্তু এই অসীম মহাবিশ্বের স্রষ্টা কর্তৃক আরোপিত দায়িত্বের প্রতি সে উদাসীন।
মূল প্রশ্নের উত্তর দেয়ার আগে আমাদের প্রথমে কিছু আনুষঙ্গিক বিষয়গুলো সম্পর্কে ক্লিয়ার কনসেপ্ট থাকতে হবে। প্রথম কথা হল, একজন মানুষ মুসলিম হিসেবে জন্মগ্রহণ করলেই কি সে জান্নাতের সার্টিফিকেট পেয়ে যায়? অবশ্যই না। তাকে জান্নাতে যাওয়ার জন্য যোগ্যতা অর্জন করতে হয়। আর যে এত এত মানুষের জাহান্নামে যাওয়ার কথা চিন্তা করতে পারে, সে কি নিজের জান্নাতে যাওয়ার কথা চিন্তা করতে পারে না? সেটা ভাবাই তো সম্ভবত বুদ্ধিমানের কাজ।
দ্বিতীয়ত, আল্লাহ্‌ কাকে জান্নাতে দিবেন বা কাকে জাহান্নামে, এটা একান্তই আল্লাহ্‌র ইচ্ছা। তিনি কারও কাছে এ ব্যাপারে জবাবদিহি করতে বাধ্য নন।
যে সমস্ত অমুসলিমরা ভালো কাজ করে, তাদের হিসাব আল্লাহ্‌ এই দুনিয়াতেই দিয়ে দিবেন। আর যদি দুনিয়াতে নাও দেন, জাহান্নামে তাদের শাস্তি লাঘব করবেন। যেমন- মুহাম্মাদ (সা) এর চাচা আবূ তালিব কাফির হওয়া সত্ত্বেও রাসূল (সা)-কে আগলিয়ে রাখার জন্য তিনি জাহান্নামে সবথেকে কম শাস্তি ভোগ করবেন।
মাদার তেরেসা, ফ্লোরেন্স নাইটেঙ্গেলরা হয়তো পৃথিবীর জন্য অনেক ভালো ভালো কাজ করে গিয়েছেন কিন্তু যে উদ্দেশ্যে তারা এই সুন্দর পৃথিবীতে এসেছিলেন, সে উদ্দেশ্য সঠিকভাবে খুঁজে পেতে তারা ব্যর্থ হয়েছিলেন। তাদের সমস্ত জীবনটাকে একটা থলের সাথে তুলনা করা যেতে পারে, যে থলেতে তারা আজীবন পরম মমতায় তাদের অর্থ জমা করেছেন কিন্তু সে থলের কোন তলা ছিল না।
“যারা তাদের রবকে অবিশ্বাস করে তাদের ভালো কাজগুলোর উদাহারণ ছাইয়ের মত যা ঝড়ো বাতাস উড়িয়ে নিয়ে যায়। তাদের উপার্জনের কোন অংশই তাদের কাছে থাকবে হবে না। এটাই চূড়ান্ত পথভ্রষ্টতা।”[৬]

সত্যিই যদি আল্লাহর অস্তিত্ব থাকে,তিনি কেন অলৌকিক কিছু করেন না যাতে আমরা সবাই তাঁকে বিশ্বাস করি?

-মহান আল্লাহ তায়ালা যুগে যুগেই তার অলৌকিকতা বিভিন্নভাবে প্রকাশ করেছেন যাতে মানুষ তাঁর দেখানো পথে ফিরে আসে। কিন্তু প্রতিটা সময়েই মানুষ তাঁর সবচেয়ে মোক্ষম যুক্তি(?) দিয়ে সে অলৌকিকতাকে ভুয়া প্রমাণ করার চেষ্টা করেছে। ১৪০০ বছর আগে রাসূল(সা:) যখন মক্কার লোকদের সামনে কুরআন তিলওয়াত করতেন তখন সবাই তাঁর অলৌকিকতার সামনে অসহায়বোধ করত। কিন্তু তারপরেও তাদের অনেকেই কুরআনকে অলৌকিক হিসেবে বিশ্বাস করেনি, তাদের কাছে একটাই (অপ) ব্যাখ্যা ছিল- “এটা যাদু ছাড়া আর কিছুই না।” একই ঘটনা অন্যান্য নবীদের বেলাতেও ঘটেছে।
আমরা বিজ্ঞানের যুগে বাস করি তাই সবকিছু বিজ্ঞান দিয়েই ব্যাখ্যা করতে ভালবাসি। ধরুন আপনি কক্সবাজার বন্ধুদের নিয়ে বেড়াতে গেলেন এবং হঠাৎ আপনাদের মাথায় এই চিন্তা আসল যে, যদি এই অসম্ভব সুন্দর জায়গায় আল্লাহ তায়ালা তাঁর কোন নিদর্শন দেখান তবে আপনারা সবাই বাকি জীবন তাঁর কথামত চলবেন। আর হঠাৎই দেখতে পেলেন সমুদ্রের পানি দু’ভাগ হওয়া শুরু করেছে। সন্দেহ নেই ঘটনার আকস্মিকতা আপনাদের অভিভূত করবে মক্কার সেই লোকগুলোর মতই।
কিন্তু তারপরেই সবাই ব্যখ্যা দাঁড় করানোর জন্য উঠে পড়ে লাগবেন। মক্কার লোকগুলো উত্তর হিসেবে নিয়ে এসেছিল জাদু আর আপনারা নিয়ে আসবেন বিজ্ঞানকে। সব যুক্তি ব্যর্থ হলে ‘প্রকৃতির হেয়ালীপনা’ হিসেবে চালিয়ে দেয়ার নজির কিন্তু খুব একটা বিরল নয়। আশেপাশে শত অলৌকিকতা দেখেও যে তার হ্রদয়টাকে অন্ধ রাখতে পারে, তার পক্ষে জলজ্যান্ত অলৌকিকতা দেখে তাতে ঈমান আনা বেশ কঠিনই। আল্লাহ তায়ালা এই কারণেই বলেন,
“যারা বিশ্বাস করে তারা জানে যে এটাই তাদের রবের পক্ষ থেকে একমাত্র সত্য। কিন্তু যারা অবিশ্বাস করে, তার বলে, ‘আল্লাহ আসলে এসব উদাহরণ দিয়ে কি বুঝাতে চান?’ এভাবেই আল্লাহ তায়ালা অনেককে পথ দেখান আর অনেককে পথভ্রষ্ট করেন। তিনি কেবল অবাধ্য ব্যক্তিদেরই পথভ্রষ্ট করেন।”[১]
অলৌকিকতার সাথে সাথেই যে দুইটা প্রশ্ন প্যারালালি চলে আসে তা হল আল্লাহকে দেখতে পেলে কিংবা তাঁর সাথে কথা বলতে পারলেই তো আমরা সবাই তাঁর উপর ঈমান আনতাম। সে ক্ষেত্রে একই কথা আসে। হঠাৎ কোন গায়েবী আওয়াজ কিংবা আলোর ঝলকানি দেখলেই যে অবিশ্বাসী মন সেটা স্রষ্টাপ্রদত্ত বলে বিশ্বাস করবে এমন কোন কথা নেই। বরং অনেকেই তাকে মানসিক বিকারগ্রস্থ ভাবা শুরু করবে আর সে নিজেও হয়তো কোন সাইকিয়াট্রিস্টের শরণাপন্ন হবার প্রয়োজনবোধ করবে।
তাছাড়া ধরুন, একদিন সোমালিয়াতে আকাশ থেকে খাবার পড়তে শুরু করলো। এরপর ফলাফলটা কি হতে পারে ভাবুন তো! বিশ্বের সব মিডিয়া ঐখানে জড়ো হবে, টুরিস্টরা দেখতে আসবে। ঝাঁকে ঝাঁকে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক সংস্থাগুলো আসবে গবেষণা করতে। অতঃপর, ঐ এলাকাকে তারা restricted area ঘোষণা করে দিবে। যাদের মূলত উপকার পাওয়ার কথা, তারাই বঞ্চিত হবে। সবশেষে তাদের গবেষণায় উঠে আসবে, এলিয়েনদের খাবার পাঠানো থেকে শুরু করে আরও বিভিন্ন ধরণের বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব!
দ্বিতীয়ত, আপনি এমন কোন VIP হয়ে যান নি যে আপনাকে বিশ্বাস করানোর জন্য আল্লাহর আপনার সাথে কথা বলতে হবে। আপনি ফেরারি গাড়ির শোরুমে গিয়ে যদি বলেন, আমি এই গাড়ি কিনবো না যতক্ষণ পর্যন্ত না ফেরারি কোম্পানির CEO আমার সাথে দেখা না করে বা আমার সাথে ফোনে কথা না বলে- তাহলে কি সে আপনার সাথে দেখা করবে? বা আপনার সাথে কথা বলবে? নিশ্চয়ই না। সে-ই আপনার সাথে বলবে না, আর সবকিছুর স্রষ্টা, মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ্ তাঁর অস্তিত্ব বিশ্বাস করানোর জন্য আপনার সাথে কথা বলবে? How funny! কোম্পানির আপনার মত দু-একজন মাথা মোটা কাস্টমার না হলেও চলবে। কারণ ভাল জিনিসের কাস্টমারের অভাব হবে না। বরং মাঝখানে আপনি একটা ভাল গাড়ির মালিক হওয়া থেকে বঞ্চিত হলেন!
আপনি যদি ভেবে থাকেন যে এই ধরনের কথা নব্য নাস্তিকদের আবিষ্কার, তাহলে ভুল করছেন। রাসূল (সা) কেও কাফিররা এরকম প্রশ্ন করতো। পূর্বের নবী-রাসুলদেরও একই প্রশ্ন করা হয়েছিল। কুরআনে আল্লাহ্‌ এর উত্তর দিয়েছেন-
“যারা বোঝে না, তারা বলে, ‘কেন আল্লাহ আমাদের সাথে কথা বলে না?’ বা ‘আমাদের কাছে কোনো অলৌকিক নিদর্শন আসে না কেন?’ ওদের আগের প্রজন্মও একই কথা বলে গেছে। ওদের সবার অন্তর আসলে একই রকম। আমি অবশ্যই আমার নিদর্শনগুলো যথেষ্ট পরিষ্কার করে দিয়েছি সেই সব মানুষের কাছে, যারা নিশ্চিত হতে চায়।” [২]
এই মহাবিশ্বের বিশালতার তুলনায় আমাদের এই পৃথিবী বিশাল সমুদ্রের এক ফোঁটা পানির মত। সেখানে আমরা তো ব্যাকটেরিয়াসমও না। কোন ধরনের Guideline ছাড়া আমাদের শাস্তি দেয়াটা নিতান্তই অযৌক্তিক বলে আল্লাহ্‌ তায়ালা দয়াপরবশ হয়ে আমাদের জন্য একটা জীবনবিধান দিয়ে দিয়েছেন। আর আমরা এখানে তার নিয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়ার পরিবর্তে উল্টো প্রশ্ন করি কেন তিনি তার অস্তিত্ব বোঝাতে আমাদের মত VIP (!)-দের সাথে কথা বলেন না!
“কোন মানুষের এমন মর্যাদা নেই যে, আল্লাহ্‌ তার সাথে সরাসরি কথা বলবেন, ওয়াহয়ির মাধ্যম, পর্দার আড়াল অথবা কোন দূত (ফেরেশতা) পাঠানো ছাড়া?” [৩]
যুক্তি দিয়ে বিচার করলেও ব্যাপারটা বেশ হাস্যকর। একটা ব্যাক্টেরিয়া যদি চায় সে আমাদের সাথে দেখা করবে কিংবা কথা বলবে তাহলে সেটা যতটা হাস্যকর শোনায়, স্রষ্টা আমাদের সবার সাথে দেখা করবেন কিংবা কথা বলবেন এটা তার চেয়েও বেশি হাস্যকর এবং অযৌক্তিক।
ফিজিসিস্ট পল ডেভিয়েস বিষয়টা খুব সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেছেন:
“মনে করুন 3D জগত থেকে একজন মেশিন-গানার 2D স্ক্রিনে গুলি করতে করতে ডান পাশ থেকে বাম পাশে যাচ্ছে যাতে করে প্রতিটি গুলির দ্বারা তৈরী গর্তগুলোর দূরত্ব সমান হয়। এখন 2D জগতে বসবাসকারী বিজ্ঞানী জ্যামিতির দ্বারা লিমিটেড হওয়ায় মেশিন-গানার সম্পর্কে অজ্ঞ থাকবে কিন্তু সে গর্তগুলোকে দেখতে পাবে।
কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করার পর সে বুঝতে পারবে যে গর্তগুলো রেন্ডমলি সৃষ্টি হচ্ছে না বরং একটা নিয়ম (সমান দূরত্ব) মেনে সৃষ্টি হচ্ছে এবং তাতে Regularity-ও বিদ্যমান থাকছে। অতঃপর এই বিষয়টাকে সে “The Law Of Hole Creation” হিসেবে ব্যাখ্যা করবে।
অথচ প্রতিটি গর্ত সৃষ্টি হচ্ছে মেশিন-গানারের কারণে। সেই চাইলে যে কোন সময়ই গর্তগুলোর দূরত্ব পরিবর্তন করতে পারে আর সেটার কনভার্শন না হলে 2D এর সাইন্টিস্টের কাছে সেটা মিরাকল বলে আর্বিভূত হবে। কনভার্শন হলে সে তার Law দিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারলেও বুঝতে পারবে না যে এটা অটোমেটিক নয়।”[৪]
কোন কিছুর সত্যতা যাচাইয়ের জন্য একেক যুগে একেকটা জিনিস মানদণ্ড ছিল। বিজ্ঞান নিজেই একটা মিরাকল। বিজ্ঞান কোন কিছু invention করে না, discovery করে। যেমন- বিজ্ঞান প্রকৃতির নিয়মগুলো আবিস্কার করেছে, কিন্তু শুন্য থেকে প্রকৃতিতে একটা নিয়েমের প্রচলন ঘটাতে পারে নি। বিজ্ঞান ইচ্ছা করলেই g=9.8 m/s^2 থেকে পরিবর্তন করতে পারবে না। তাই এই Law-গুলাও মিরাকল আর ২ টা ম্যাগনেটের মাঝখানে একটা ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ড আছে এটাই একটা মিরাকল। কিন্তু যারা চিন্তা করে তাদের জন্য।
সবচেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে, মহান আল্লাহ তায়ালার অলঙ্ঘনীয় একটা সুন্নাত আছে। সেটা হচ্ছে অলৌকিকতা দেখানোর পরেও যদি কোন জাতি কুফরীতে অটল থাকে, তবে আল্লাহ তায়ালা তাদের সমূলে ধ্বংস করে দেন। ঈসা(আঃ) এর সাহাবীরা যখন তার নিকট আসমান থেকে খাবার নিয়ে আসার কথা বলে তখন আল্লাহতায়ালা তাদের এই বলে সাবধান করেন,
“নিশ্চয় আমি সে (খাবারের) ঝুড়ি তোমাদের প্রতি অবতরণ করব। অতঃপর যে ব্যাক্তি এর পরেও অকৃতজ্ঞ হবে, আমি তাকে এমন শাস্তি দেব, যে শাস্তি বিশ্বজগতের অপর কাউকে দেব না।”[৫]

নাস্তিকদের যুক্তি খন্ডন – ঘৃণাস্তিক

ঘৃণাস্তিক: ধর্মের নামে যে পরিমাণ মানুষ হত্যা হয়েছে, আর অন্য কোনোভাবে এত মানুষ মারা যায়নি। ধর্মের কারণে মানুষে মানুষে ঝগড়া, ঘৃণা, মারামারি, দলাদলি, এক জাতি আরেক জাতিকে মেরে শেষ করে ফেলা —এমন কোনো খারাপ কাজ নেই যা হয় না। পৃথিবীতে যদি কোনো ধর্ম না থাকতো, তাহলে মানুষে-মানুষে এত ভেদাভেদ, এত রক্তারক্তি কিছুই হতো না। যদি আল্লাহ বলে আসলেই কেউ থাকে, তাহলে ধর্মের নামে এত হত্যা কেন হয়? ধার্মিকরা এতঅসাধু হয় কেন? যতসব চোর, লম্পট, প্রতারকরা দেখা যায় টুপি-দাঁড়ি পড়ে মসজিদে নামাজ ঠিকই পড়ে।

  • উত্তরঃ যদি আল্লাহ বলে আসলেই কেউ থাকে, তাহলে ধর্মের নামে এত অন্যায় হয় কেন? Encyclopedia of Wars নামের তিনখণ্ডের এক বিশাল বইয়ে ১৭৬৩টি যুদ্ধের বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। এর মধ্যে ১২৩টি যুদ্ধকে ধর্ম [2]সম্পর্কিত বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। যার অর্থ এই পর্যন্ত যত যুদ্ধ হয়েছে, তার মধ্যে মাত্র ৬.৯৮% যুদ্ধধর্ম সম্পর্কিত। ৯৩% যুদ্ধের সাথে ধর্মের কোনোই সম্পর্ক নেই। R. J. Rummel এর বিখ্যাত Lethal Politics এবং Death by Government বইয়ে দেখানো হয়েছে, নাস্তিকদের কারণে হত্যার পরিমাণ কতখানি—
  • Non-Religious-Dictator Lives Lost Joseph Stalin 42,672,000 Mao Zedong 37,828,000 Adolf Hitler 20,946,000 Chiang Kai-shek 10,214,000 Vladimir Lenin 4,017,000 Hideki Tojo 3,990,000 Pol Pot 2,397,000 মহিলা এবং শিশুকে গুলি করে, পিটিয়ে, নির্যাতন করে, কুপিয়ে, পুড়িয়ে, অভুক্ত রেখে, বরফে জমিয়ে, পিষে বা জোর করে কাজ করিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। জীবন্ত পুঁতে, পানিতে ডুবিয়ে, ফাঁসিতে ঝুলিয়ে, বোমা মেরে, বা অন্য আরও নানা পদ্ধতি ব্যবহার করে সরকারগুলো নিরস্ত্র, অসহায় দেশবাসী এবং বিদেশীদের হত্যা করেছে। মোট মৃতের সংখ্যা ৩০০ মিলিয়ন ছাড়িয়ে যেতে পারে। মানব জাতি যেন এক কালো মহামারির শিকার। কিন্তু এই মহামারি কোনো জীবাণু থেকে মহামারি নয়, বরং শক্তির মোহ থেকে সৃষ্ট মহামারি। নাস্তিকরা এই বিংশ শতাব্দীতে ১৫ কোটির বেশি মানুষ খুন করেছে। পুরো বাংলাদেশের জনসংখ্যার সমান মানুষতারা এই বিংশ শতাব্দীতেই মেরে শেষ করেছে। (সূত্রঃ The Irrational Atheist, TheodoreBeale-এর লেখা বই) ১৯১৭ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত মোট ১৪.৮ কোটি মানুষ মারা গেছে ৫২ জন নাস্তিকের[২৩৩] কারণে, যা পুরো বিংশশতাব্দীতে যুদ্ধ, গৃহ যুদ্ধ এবং সকল অন্যয়ের কারণে মারা যাওয়া মোট জনসংখ্যার চেয়ে ৩ গুণ বেশি! নোবেল পুরস্কার জয়ী Aleksandr Solzhenitsyn পঞ্চাশ বছর ধরে গবেষণা করে বের করেছেন যে রাশিয়াতে যে ৬কোটি মানুষ মারা গেছে কমিউনিজমের কারণে, তার আসল কারণ নাস্তিকতা।[২৩৩] দুঃখজনকভাবে আজকে আধুনিক যুগের মানুষরা মিডিয়ার গণমগজ ধোলাইয়ের শিকার। মিডিয়া বেশিরভাগ মানুষকে সফলভাবে বোঝাতে পেরেছে যে, যত মারামারি, খুনাখুনি, হত্যা হয়, তার বেশিরভাগ হয় ধর্মের কারণে। ধর্ম না থাকলে মানুষ অনেক শান্তিতে বাস করতে পারত। মিডিয়ার নানা ধরনের মগজ ধোলাইয়ের শিকার হয়ে মানুষ এতটাই বুদ্ধি প্রতিবন্ধী হয়ে গেছে যে, তারা জানে মিডিয়া যা বলে তার বেশিরভাগই উদ্দেশ্য প্রণোদিত, বিকৃত, কিন্তু তারপরেও তারা মিডিয়াকেই বিশ্বাস করে, যখন তা ধর্মের ব্যপারে কিছু বলে।

নাস্তিকদের যুক্তি খন্ডন – আঁতেল নাস্তিক

আঁতেল নাস্তিক: আল্লাহ ﷻধারণাটা আসলে মানুষের কল্পনা প্রসূত। মানুষ যখন কোনো প্রাকৃতিক ঘটনা ব্যাখ্যা করতে পারত না, তখন তারা মনে করত: নিশ্চয়ই কোনো অতিপ্রাকৃত সত্তা রয়েছে, যে এসব ঘটাচ্ছে। একারণে মানুষ এমন কোনো সত্তাকে কল্পনা করে নেয়, যার কোনো দুর্বলতা নেই। যেমন: তার ক্ষুধা, ঘুম পায় না; সে মারা যায় না; কেউ তাকে জন্ম দেয় নি। এরকম অবিনশ্বর, অসীম ক্ষমতা ইত্যাদি যত সব কল্পনাতীত গুণ মানুষ চিন্তা করে বের করতে পেরেছে, তার সবকিছু ব্যবহার করে সে এক স্রষ্টা সৃষ্টি করেছে। এর মানে তো এই না যে, স্রষ্টা বলে আসলেই কেউ আছে?

  • উত্তরঃ আল্লাহ ধারণাটা আসলে মানুষের কল্পনা প্রসূত এই ধরনের নাস্তিকদের দাবি হচ্ছে: মানুষ নিজে থেকেই চিন্তাভাবনা করে একজন স্রষ্টার ধারণা বের করেছে। যেহেতু মানুষের সীমাবদ্ধতা আছে, মানুষ অনেক কিছুই করতে পারে না, তাই একরকম অবিনশ্বর, অসীম ক্ষমতা ইত্যাদি যত সব কল্পনাতীত গুণ মানুষচিন্তা করে বের করতে পারে, তার সবকিছু ব্যবহার করে সে এক স্রষ্টাকে সৃষ্টি করেছে। কিন্তু বাস্তবে এরকম কোনো স্রষ্টা নেই। এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য ধাপে ধাপে কিছু যুক্তি দাঁড় করাতে হবে এবং একটি লম্বা কল্পনা-অনুশীলন করতে হবে— কল্পনা করুন: একটা বিশাল খালি ঘর, যার ভেতরটা একদম শূন্য। এর ভেতরে কিছুই নেই। কোনো আলো, বাতাস, পদার্থ, শক্তি, ক্ষেত্র — কিছুই নেই। ভেতরটা হচ্ছে ঘুটঘুটে অন্ধকার, পরম শূন্যতা। এখন আপনার উদ্দেশ্য হচ্ছে: এই ঘরের ভেতরে কিছু একটা তৈরি করার। কিন্তু শর্ত হচ্ছে: আপনি বাইরে থেকে কিছু ব্যবহার করতে পারবেন না। ধরুন, আপনি সেই ঘরের ভেতর এক মুহূর্তের জন্য একটা আলো জ্বালাতে চান। কিন্তু আপনি তা করতে পারবেন না, কারণ আলো জ্বালানোর জন্য যা কিছু দরকার, তা আপনাকে বাইরে থেকে দিতে হবে। এখন আপনি দাবি করতে পারেন যে, আমরা যদি কোটি কোটি বছর অপেক্ষা করি, তাহলে একদিন হয়ত সেই ঘরের শূন্যতার মধ্যে একটা ক্ষুদ্র কণা, অণু, বা পরমাণু আপনা আপনিই তৈরি হবে। তারপর আরও কয়েক কোটি বছর পার হলে তা থেকে একসময় তেল, ম্যাচ, কাঠ তৈরি হয়ে একসময় আগুন ধরে যাবে এবং আলো তৈরি হবে। কিন্তু এই দাবির সমস্যা রয়েছে। প্রথমত, সময় নিজে থেকে কিছু করে না। কোনো ঘটনা ঘটলে, তা ঘটে সময়ের মধ্যে, কিন্তু সময় সেই ঘটনা ঘটায় না। যেমন, আপনি যদি চুলায় ডাল দিয়ে ১৫ মিনিট অপেক্ষা করেন, তাহলে সেই পনের মিনিট কিন্তু ডাল রান্না করে না, বরং চুলার তাপ ডাল রান্না করে। আপনি যদি চুলা না জ্বালিয়ে চুপচাপ ১৫ মিনিট বসে থাকতেন, তাহলে আপনা আপনি ডাল রান্না হয়ে যেত না। সুতরাং আমরা যদি অসীম সময় পর্যন্তও অপেক্ষা করি, সেই ঘরের ভেতরে কিছুই আপনা থেকে সৃষ্টি হবে না। সেটা একটা অত্যন্ত ক্ষুদ্র কণিকা হোক, বা একটা বড় ফুটবল হোক না কেন। তাহলে এখন প্রশ্ন আসে, যদি কোটি কোটি বছর আগে মহাবিশ্ব সৃষ্টির আগে শূন্যতা বিরাজ করছিল, তাহলে এখনও কেন শূন্যতা নেই? শূন্যতা থেকে তো কোনো কিছু আসতে পারেনা। তাহলে তো এখনও শূন্যতা বিরাজ করার কথা। কিন্তু যেহেতু আপনি আছেন এবং আপনি এই আর্টিকেল পড়ছেন, তার মানে দাঁড়ায় এখন শূন্যতা নেই, কিছু একটা আছে। এর মানে দাঁড়ায়: শূন্যতা কখনই ছিল না। কিছু একটা সবসময় ছিল। এখন প্রশ্ন হলো: সেটা কী? সেটা কি একটা কণিকা ছিল? এক ধরনের শক্তি? একটা না হয়ে অনেক কিছু কি ছিল? আমাদের কল্পনার ঘরে ফেরত যাই। ধরে নেই: সেই ঘরে পাঁচটি বল রয়েছে। সেই বলগুলো চিরকাল থেকে সেই ঘরের ভেতরে ছিল। এখন আমরা যদি আরও দশ বছর অপেক্ষা করি, তাহলে কি আরেকটা বল তৈরি হবে? যদি কয়েক কোটি বছর অপেক্ষা করি, তাহলে কি হবে? হবে না। যদি পাঁচটি বলের বদলে কোটি কোটি বল থাকে, তাহলে কি সেই বলগুলো থেকে আরেকটি বল সৃষ্টি হবে? হবে না। সুতরাং সংখ্যা এখানে কোনো ব্যাপার নয়। সময় কোনো ব্যাপার নয়। নিষ্প্রাণ বস্তু কখনো অন্য কোনো বস্তুর জন্ম দেবে না, তার সংখ্যা যতই হোক না কেন এবং যতই সময় দেওয়া হোক না কেন। এখন ধরুন বলের বদলে সেই ঘরে একটা মোরগ রয়েছে। এখন আমরা যদি কয়েক বছর অপেক্ষা করি, তাহলে কি একটা মুরগির বাচ্চার জন্ম হবে? হবে না। কিন্তু যদি একটা মোরগ এবং মুরগি রাখা হয়, তাহলে একটা বাচ্চা মুরগির জন্ম হতে পারে। সুতরাং, আমরা দেখছি এখানে সংখ্যা একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। বলের বেলায় সংখ্যার কোনো গুরুত্ব নেই, কিন্তু মুরগির বেলায় সংখ্যার গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, সেই ঘরের শূন্যতার মধ্যে যেই জিনিস রয়েছে তার গুণ কী। তার গুণ নির্ধারণ করে যে, সে অন্য কোনো কিছু সৃষ্টি করতে পারে, কি পারে না। মুরগির উদাহরণটাতে কিছু সমস্যা আছে। একটা মোরগ এবং মুরগি যদি একটা ঘরের শূন্যতার মধ্যে ভাসতে থাকে, তাহলে তারা কোনোদিনও একটা মুরগির বাচ্চার জন্ম দিতে পারবে না। কারণ সেই ঘরের মধ্যে কোনো প্রকৃতি নেই। কোনো বাতাস নেই, কোনো খাবার নেই, হাটার মত মাটি নেই। ওরা কিছুই খেতে পারে না, হেঁটে একজন আরেকজনের কাছে আসতে পারে না। ওদের পক্ষে কিছুই জন্ম দেওয়া সম্ভব নয়। এমনকি তাদের পক্ষে সেখানে বেঁচে থাকাও সম্ভব নয়। সুতরাং সেইঘরের শূন্যতার মধ্যে যদি কিছুর অস্তিত্ব থাকে, তবে সেটি হতে হবে এমন একটা কিছু, যার কোনো বাতাস, আলো, শক্তি — কিছুরই দরকার নেই। সেটা এমন একটা কিছু, যার সাথে আমাদের পরিচিত কোনো প্রাণীর কোনোই মিল নেই। এখন প্রশ্ন আসতে পারে, কোনো প্রাণী না থাকুক, কোনো জড় বস্তু তো থাকতে পারে? তাদের তো কোনো খাবার, পানি, আলো-বাতাসের দরকার নেই? আমরা আগেই দেখেছি বলের উদাহরণটা। ধরুন, বলের বদলে পাঁচটি অণু রয়েছে। তাহলে কী দাঁড়াবে? যতই সময় যাক না কেন, সেই পাঁচটি অণুই থাকবে। নতুন কিছুই সৃষ্টি হবে না। এখন চিন্তা করে দেখুন, সেই অণুগুলো থাকার জন্য কী দরকার। কয়েক বছর আগে সরকারি পর্যায়ে কয়েকটি পশ্চিমা দেশের উদ্যোগে Large Hadron Collider নামে একটি বিশাল যন্ত্র তৈরি করা হয়, যা কয়েক মাইল চওড়া একটি যন্ত্র। এর মধ্যে দুটো অণুকে প্রচণ্ড গতিবেগে চালিয়ে একে অন্যের সাথে সংঘর্ষ ঘটানো হয়। উদ্দেশ্য হচ্ছে একটি অতি ক্ষুদ্র কণিকা জন্ম দেওয়া। বিপুল পরিমাণ শক্তি খরচ করে এই সংঘর্ষ থেকে একটি মাত্র অতি ক্ষুদ্র কণিকা তৈরি করা হয়। সুতরাং আমাদের সেই কল্পনার ঘরে যদি পাঁচটি অণু থাকতে হয়, তাহলে এক বিশাল পরিমাণের শক্তির প্রয়োজন। এতক্ষণে আমরা যা জানলাম, তা থেকে কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়— প্রথমত, সৃষ্টির আগে যদি কিছু থেকে থাকে, তাহলে সেটি হবে এমন একটি কিছু, যার অস্তিত্বের জন্য অন্য কিছুর দরকার নেই। যেটি একটি একক সত্তা। এর অস্তিত্বের জন্য অন্য কোনো কিছুর দরকার নেই। সেটি অমুখাপেক্ষী, কোনো কিছুর উপর নির্ভরশীল নয়। দ্বিতীয়ত, সেটির ক্ষমতা থাকতে হবে অন্য কোনো কিছুর সৃষ্টি করার। কারণ যদি সেটির সৃষ্টি করার ক্ষমতা না থাকে, তাহলে আমাদের চারপাশে এই যে বিশাল সৃষ্টিজগৎ, এর কিছুরই অস্তিত্ব থাকার কথা নয়। যেহেতু আপনি, আমি আছি, তাই সৃষ্টির আগে কিছু একটা ছিল, যার সৃষ্টি করার ক্ষমতা রয়েছে। তৃতীয়ত, সেই কিছু একটার অকল্পনীয় ক্ষমতা থাকতে হবে। আজকে আমরা একটি অতি ক্ষুদ্র কণিকা তৈরি করতে কয়েক বিলিয়ন ডলার খরচ করে যন্ত্র বানিয়ে, লক্ষ মেগাওয়াট শক্তি খরচ করি। এই পরিমাণ শক্তি যদি একটি মাত্র অতি ক্ষুদ্র কণিকা তৈরি করতে লাগে, তাহলে আপনি, আমি, আমাদের চারপাশ, এই বিশাল পৃথিবী, লক্ষ পৃথিবীর সমান বিরাট সূর্য, কোটি কোটি সূর্যের মত বিশাল তারা দিয়ে ভরা প্রকাণ্ড ছায়াপথ, এরকম কয়েকশ কোটি প্রকাণ্ড ছায়াপথসহ মহাবিশ্বের সবকিছু সৃষ্টি করতে কী পরিমাণ শক্তির দরকার? সুতরাং এই পর্যায়ে এসে আমরা কয়েকটি ব্যাপার প্রমাণ করলাম—
  • • সৃষ্টির আগে ‘কিছু একটা’ ছিল।
  • • সেই কিছু একটার অকল্পনীয় ক্ষমতা।
  • • সেই কিছু একটার ‘অন্য কিছু’ সৃষ্টির ক্ষমতা আছে।
  • • সেই কিছু একটা ‘অন্য কিছু’ অবশ্যই সৃষ্টি করেছে।
  • • সেই কিছু একটা অন্য কিছুর উপর নির্ভরশীল নয়।
  • • অন্য কোনো কিছুই সেটার সাথে তুলনা করার যোগ্য নয়।
  • এখন চলুন সৃষ্টির আগে চলে যাই। শুধুই সেই অবিনশ্বর জিনিসটা রয়েছে। আর কিছুই নেই। এখন যদি অন্য কোনো কিছুর সৃষ্টি করতে হয়, তাহলে সেটা শুধুমাত্র সেই অবিনশ্বর জিনিসটাকে দিয়েই সম্ভব। আর অন্য কোনো কিছু নেই, যা কিনা তার উপর প্রভাব ফেলতে পারে, যা সেই জিনিসটাকে উদ্বুদ্ধ করতে পারে কিছু একটা সৃষ্টি করার জন্য। এখন সেই জিনিসটার কোনো কিছু সৃষ্টি করার কোনোই প্রয়োজন নেই, কারণ সে নিজে থেকেই অস্তিত্ব নিয়ে থাকতে পারে, এবং সবসময়ই ছিল। যেহেতু সেটার কোনোই প্রয়োজন নেই অন্য কোনো কিছু সৃষ্টি করার, তার মানে হলো: যদি কিছু সৃষ্টি হয়, তাহলে সেটা সৃষ্টি হয়েছে সেই অবিনশ্বর জিনিসটার ‘ইচ্ছা’র কারণে। এমনটা নয় যে, সেই অবিনশ্বর জিনিসটার প্রকৃতি হচ্ছে এমন যে, সেটি ‘কিছু সময়’ পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্য কোনো কিছু সৃষ্টি করা শুরু করবে। কারণ ‘কিছু সময়’ হচ্ছে একটা ‘অন্য কিছু’, যা এখনো সৃষ্টি হয়নি। যদি সেই জিনিসটা ‘কিছু সময়’ সৃষ্টি না করে, তাহলে ‘কিছু সময়’-এর কোনো অস্তিত্ব হবে না। এখন আমরা একটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার উপলব্ধি করলাম: সেই জিনিসটার ‘ইচ্ছা’ আছে। সুতরাং সেই জিনিসটা কোনো ‘জিনিস’ নয়, সেটা ‘কেউ একজন’ — কোনো চেতন সত্তা। আমরা আর সেটাকে ‘সেটা’ বলতে পারব না, বলতে হবে ‘তিনি’। এখন অনেকে দাবি করতে পারেন: যা কিছু সৃষ্টি হয়েছে, সেটা তো দৈবক্রমে, বা ঘটনাচক্রেও সৃষ্টি হতে পারে? ‘ইচ্ছা’-এর দরকার নাও থাকতে পারে? যদি ইচ্ছা’র দরকার না থাকে, তাহলে আর কোনো চেতন সত্তার দরকার নেই। তখন সেটা অচেতন ‘কোনো জিনিস’ হতেই পারে। যেহেতু ‘দৈবক্রম’ বা ‘ঘটনাচক্র’ হচ্ছে ‘অন্য কিছু’ একটা, যা সেই অবিনশ্বর জিনিসটা নয়, এবং আমরা এর আগে দেখেছি যে, ‘অন্য কিছু’ সৃষ্টি হওয়া শুধুমাত্র সেই অবিনশ্বর জিনিসটার পক্ষেই করা সম্ভব, সুতরাং এই ‘দৈবক্রম’ বা ‘ঘটনাচক্র’ সেই অবিনশ্বর জিনিসটাকেই সৃষ্টি করতে হবে। ‘দৈবক্রম’ বা ‘ঘটনাচক্র’ কখনই সেইঅবিনশ্বর জিনিসটার বাইরে নিজে থেকেই থাকতে পারে না। তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম অবিনশ্বর সত্তাটি একটি অতি পরমাণু, সেটি কোনো চেতন সত্তা নয়। সেটির সৃষ্টি করার ক্ষমতা রয়েছে। সেই অণুটির যতই ক্ষমতা থাকুক, যত কিছুই সৃষ্টি করার সামর্থ্য থাকুক না কেন, সৃষ্টি করার ‘ইচ্ছা’ না থাকলে সেই অণুটা চিরজীবন যেমন ছিল, তেমনই থাকবে।যেহেতু এর অন্য কোনো কিছু সৃষ্টি করার কোনোই প্রয়োজন নেই, সেটি কখনই কিছু সৃষ্টি করবে না। কিন্তু অন্য কিছু সৃষ্টি অবশ্যই সৃষ্টি হয়েছে, কারণ আপনি-আমি আজকে আছি। সুতরাং দৈবক্রম, বা ঘটনাচক্র বলে কিছু নেই। থাকলে সেটা সেই অবিনশ্বর সত্তারই সৃষ্টি। যদি তাই হয়, তার মানে সেই অবিনশ্বর সত্তা ‘ইচ্ছা’ করেন বলেই অন্য কিছু সৃষ্টি হয়। যদি ‘ইচ্ছা’ না থাকত, তাহলে যতই ক্ষমতা থাকুক না কেন, যতই সময় পার হোক না কেন, অন্য কোনো কিছুই সৃষ্টি হতো না। এথেকে আমরা এটা দাবি করতে পারি, সেই অবিনশ্বরসত্তার ‘ইচ্ছা’ আছে। এখন আমরা আগে দেখেছি, সেই অবিনশ্বর সত্তা অন্য কোনো কিছু ছাড়াই থাকতে পারেন। সুতরাং, তিনি সময় কিংবা পার্থিব জগতে আবদ্ধ নন, কারণ তিনি সময় এবং স্থান সৃষ্টি করেছেন। একইভাবে যেহেতু তিনিই স্থান সৃষ্টি করেছেন, তাই তিনি ইচ্ছা করলেই স্থানের বাইরে অদৃশ্য থাকতে পারেন, যেন তাঁকে কোনোভাবেই বৈজ্ঞানিকভাবে পর্যবেক্ষণ এবং পরিমাপ করা না যায়। আবার তিনি ইচ্ছা করলেই স্থানের ভেতরে নিজেকে উপস্থাপন করতে পারেন, যেন তাঁর সৃষ্টি তাঁকে দেখতে এবং শুনতে পারে। এবার ধরি সেই অবিনশ্বর সত্তা একটি অণু সৃষ্টি করলেন। তিনি কি সেই অণুটির ব্যাপারে যা কিছু জানা সম্ভব তার সবকিছু জানেন? অবশ্যই, কারণ তিনি শূন্য থেকে সেই অণুটি সৃষ্টি করতে পারেন। শূন্য থেকে কোনো কিছুবানানো, আর তেল ময়দা মাখিয়ে পরোটা বানানোর মধ্যে আকাশ পাতাল পার্থক্য রয়েছে। আমরা যা কিছুই বানাই, আমরা কখনই তা শূন্য থেকে বানাই না। একারণে কোনো কিছুর ব্যাপারে যা কিছু জানা সম্ভব, তার সব কখনই আমরা জানতে পারবো না। আমাদের জ্ঞান সবসময়ই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে। এখন ধরুন তিনি দুটি ভিন্ন ধরনের অণু সৃষ্টি করলেন। তিনি কি সেই দুটো অণুর ব্যাপারে যা কিছু জানা সম্ভব, তার সবকিছু জানেন? অবশ্যই, একটার ব্যাপারে জানলে, দুটোর বেলায় কেন হবে না? সুতরাং আমরা দেখছি তাঁর সৃষ্ট কোনো কিছুর ব্যাপারে তাঁর জ্ঞান, কয়টি সৃষ্টি হয়েছে, তার সংখ্যার উপর নির্ভর করে কমে না বা বাড়ে না। এভাবে তিনি যদি কোটি কোটি কোটি অণুও সৃষ্টি করেন, তারপরেও তিনি সেগুলোর প্রত্যেকটির ব্যাপারে যা কিছু জানা সম্ভব, তার সবকিছুই জানবেন। সুতরাং আমরা একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি যে, তিনি শুধুই অকল্পনীয় জ্ঞানের অধিকারীই নন, তাঁর সবকিছুর ব্যাপারে সবরকম জ্ঞান রয়েছে। তিনি পরমজ্ঞানী, সকল জ্ঞানের অধিকারী। যদি সেই সত্তা প্রতিটি অণুর ব্যাপারে যা কিছু জানা সম্ভব, তাঁর সব কিছু জানেন, তার মানে দাঁড়ায় সেই অণুগুলো যা কিছু ঘটাচ্ছে, ঘটিয়েছে, এবং ঘটাবে, অর্থাৎ সৃষ্টিজগতে যা কিছুই ঘটে, সবকিছুর ব্যাপারেই জানেন। সুতরাং তিনি প্রতিটি শব্দ শোনেন, প্রতিটি ঘটনা দেখেন। শুধু তাই না, যেহেতু তিনি প্রতিটি অণু বানিয়েছেন, তাই প্রতিটি অণু যা কিছুই ঘটাতে পারে, তার সবকিছুই তিনিই নির্ধারণ করেদিয়েছেন। সুতরাং মহাবিশ্বের প্রতিটি ঘটনা তাঁর অনুমতিতে ঘটে। তিনিই সবকিছু ঘটান। তাঁর ঘটানো ঘটনার বাইরে অন্য কোনো কিছু ঘটে না।
  • • সৃষ্টির আগে ‘কোনো একজন’ ছিলেন।
  • • সেই ‘কোনো একজন’-এর অকল্পনীয় ক্ষমতা।
  • • সেই ‘কোনো একজন’-এর ‘অন্য কিছু’ সৃষ্টির ক্ষমতা আছে।
  • • সেই ‘কোনো একজন’ ‘অন্য কিছু’ অবশ্যই সৃষ্টি করেছেন।
  • • সেই ‘কোনো একজন’ অন্য কিছুর উপর নির্ভরশীল নন।
  • • অন্য কোনো কিছুই সেই ‘কোনো একজন’-এর সাথে তুলনা করার যোগ্য নয়।
  • • সেই ‘কোনো একজন’ সবকিছুর ব্যাপারে সব জানেন, সব দেখেন, সব শোনেন।
  • • মহাবিশ্বের প্রতিটি ঘটনা ঘটে সেই ‘কোনো একজন’-এর ইচ্ছায়।
  • উপরের এই যুক্তিগুলো ব্যবহার করে আমরা যে সত্তার অস্তিত্বকে প্রমাণ করলাম, তিনি কোনো কাল্পনিক সত্তা নন। তিনি থাকতে বাধ্য। না হলে উপরের সবগুলো যুক্তিমিথ্যা। যদি উপরের যুক্তিগুলো মিথ্যা হয়, তাহলে আপনার কোনো অস্তিত্ব নেই। যেহেতু আপনার অস্তিত্ব আছে, তাই উপরের যুক্তিগুলো ধারাবাহিকভাবে সবগুলো সত্যি। সুতরাং এরকম একজন সত্তা অবশ্যই আছেন। এই মহান সত্তাকে আমরা ‘আল্লাহ’ নামে ডাকি, কারণ তিনি অনুগ্রহ করে আমাদেরকে তাঁর সম্পর্কে জানিয়েদিয়েছেন— قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ اللَّهُ الصَّمَدُ لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ وَلَمْ يَكُن لَّهُ كُفُوًا أَحَدٌ বল, তিনিই আল্লাহ, অদ্বিতীয়। তিনি অমুখাপেক্ষী, সবকিছু তাঁর উপর নির্ভরশীল। তিনি কোনো উত্তরসূরি জন্ম দেন নি এবং কেউ তাকে জন্ম দেয়নি। তাঁর সমকক্ষ আর কিছুই নেই! [সুরা ইখলাস] তিনিই আল্লাহ, যিনি অবিনশ্বর, পরম অস্তিত্বধারী। তন্দ্রা বা ঘুম তাকে আচ্ছন্ন করতে পারে না। আকাশগুলো এবং পৃথিবীতে যা কিছুই আছে, সব তাঁর। কে আছে, যে তাঁর অনুমতি ছাড়া তাঁর সামনে সুপারিশ করতে পারে? তাদের আগে কী ঘটেছে এবং পরে কী ঘটবে — তিনি সব জানেন। তিনি নিজে থেকে তাদেরকে যা শেখান, তার বাইরে তাঁর জ্ঞানের কিছু জানার কোনো ক্ষমতাই তাদের নেই। তার নিয়ন্ত্রণ-সিংহাসন সবগুলো আকাশ এবং পৃথিবীর উপরে বিস্তৃত। এদেরকে নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে তিনি মোটেও ক্লান্ত হন না। তিনি সর্বোচ্চ সত্তা, প্রচণ্ড ক্ষমতাবান। [আয়াতুল কুরসি, আল-বাক্বারাহ ২:২৫৫] তিনি যেটা করতে ইচ্ছা করেন, সেটাই করেন। [আল-বুরুজ ৮৫:১৬] ওদেরকে জিজ্ঞেস করো, “কে তোমাদেরকে আকাশ এবং পৃথিবী থেকে তোমাদের বেঁচে থাকার জন্য যা দরকার, সবকিছু দেন? তোমাদের শোনা এবং দেখাকে কে নিয়ন্ত্রণ করেন? কে তোমাদেরকে নিষ্প্রাণ অবস্থা থেকে প্রাণ দেন এবং জীবিত থেকে মৃত করেন? সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন কে?” ওরা নির্দ্বিধায় বলবে, “আল্লাহ!” তাহলে ওদেরকে জিজ্ঞেস করো, “তবে কেন তোমরা তাঁর ব্যাপারে সাবধান থাকো না?” তিনিই আল্লাহ, তোমার পালনকর্তা, শাশ্বত সত্য। এই সত্য ছাড়া যা কিছু আছে, তার সব মিথ্যা ছাড়া আর কী? তাহলে কিসের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছো তোমরা? [ইউনুস ১০:৩১] তিনি আল্লাহ, যিনি ছাড়া উপাসনার যোগ্য কোনো সত্তা নেই। গোপন এবং প্রকাশ্য সব জ্ঞানের অধিকারী। পরম করুণাময়, নিরন্তর করুণাময়। তিনি আল্লাহ, যিনি ছাড়া উপাসনার যোগ্য কোনো সত্তা নেই। একমাত্র অধিপতি, পবিত্র সত্তা, সকল শান্তির উৎস, নিরাপত্তাদাতা, সবকিছুর অভিভাবক, সব ক্ষমতা কর্তৃত্বের অধিকারী, যে কোনো কিছুকে বাধ্য করতে সক্ষম, সবার থেকে উপরে। ওরা আল্লাহর সাথে যা কিছুরই তুলনা করে, ওসবের থেকে তিনি অনেক ঊর্ধ্বে। তিনি আল্লাহ, একমাত্র সৃষ্টিকর্তা, উদ্ভাবক, রূপদায়ক। সমস্ত সুন্দর নামগুলো তাঁর। আকাশ এবং পৃথিবীতে সবকিছু তাঁর মহিমা প্রকাশ করছে। তিনি সকল ক্ষমতা কর্তৃত্বের অধিকারী, পরম প্রজ্ঞাময়। [আল-হাশর ৫৯:২২-২৪]

নাস্তিকদের যুক্তি খন্ডন – বুদ্ধি প্রতিবন্ধী নাস্তিক

বুদ্ধি প্রতিবন্ধী নাস্তিক: আল্লাহ ﷻবলে কেউ আছে —এর পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই।এখন পর্যন্ত কোনো বিজ্ঞান সম্মত প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে, সৃষ্টিজগৎ কোনো অতিবুদ্ধিমান সত্তা বানিয়েছে। সুতরাং আল্লাহ ﷻবলে কেউ নেই।

  • উত্তরঃ স্রষ্টার অস্তিত্বের পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই এই ধরনের নাস্তিকদের দাবি, “স্রষ্টার অস্তিত্বের পক্ষে কোনো প্রমাণ কেউ দেখাতে পারেনি। সুতরাং স্রষ্টা নেই।” ফিলসফির ভাষায় একে বলে Ad Ignorantiam। যারা এই ধরনের প্রশ্ন করে, তাদেরকে আপনি প্রশ্ন করুন:
  • • মানুষ কি এখন পর্যন্ত যা কিছু প্রমাণ করা সম্ভব, তার সব কিছু প্রমাণ করে দেখেছে?
  • • মানুষ কি এখন পর্যন্ত সমস্ত ‘বিজ্ঞান সম্মত’ ঘটনা দেখেছে? ‘বিজ্ঞান সম্মত’-এর সংজ্ঞা কি বাকি জীবন পর্যন্ত অপরিবর্তিত থাকবে?
  • • মানুষ কি এখন পর্যন্ত যা জানা সম্ভব, তার সব কিছু জেনেছে?
  • • মানুষ কি এখন পর্যন্ত সৃষ্টিজগতের ১%-ও বৈজ্ঞানিকভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পেরেছে?
  • এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি ‘না’ হয়, তাহলে কেবল মাত্র একজন বুদ্ধি প্রতিবন্ধী মানুষের পক্ষেই বলা সম্ভব যে, স্রষ্টার অস্তিত্বের পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। কেউ যদি এই ধরনের দাবি করে, তবে তাকে আগে দেখাতে হবে যে, সৃষ্টিজগতে যাকিছু প্রমাণ করা সম্ভব, তার সব প্রমাণ হয়ে গেছে। সৃষ্টিজগতে যা কিছু জানা সম্ভব, তার সব সে জেনেছে। মানুষের আর জানার, বোঝার, প্রমাণ করার কিছুই বাকি নেই। যেহেতু আর কিছু বাকি নেই, তাই তখনও যদি স্রষ্টার পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া না যায়, তখন নিশ্চিতভাবে দাবি করা যাবে: স্রষ্টা বলে কেউ নেই। “মানুষ কি নিজে থেকেই সৃষ্টি হয়েছে, নাকি তারা নিজেরাই নিজেদেরকে সৃষ্টি করেছে? মানুষ কি আকাশগুলো এবং পৃথিবী সৃষ্টি করেছে? না! ওদের একেবারেই কোনো জ্ঞান নেই।” [আত-তুর ৫২:৩৫-৩৬] বৈজ্ঞানিকভাবে যন্ত্র দিয়ে পর্যবেক্ষণ করা বা প্রমাণ করাটার যে কত সীমাবদ্ধতা রয়েছে, এবং সেটি যে মোটেও যথেষ্ট নয়, তার জ্বলন্ত প্রমাণ হচ্ছে Quantum Entanglement বা কোয়ান্টাম আঁতাত।[২৩২] বিজ্ঞানীরা গবেষণাগারে প্রমাণ করেছেন যে, উপপারমানবিক কণিকাগুলো, যেমন ইলেকট্রন, কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে একে অন্যের সাথে যোগাযোগ করতে পারে, যদিও কিনা তাদের মধ্যে বিশাল দূরত্ব থাকে। তাদের মধ্যে দূরত্ব ১ মিটার হোক, বা কোটি কোটি আলোকবর্ষ হোক না কেন, তারা কোনো ভাবে জানে অন্যরা কী করছে। এটি আইনস্টাইনের বিখ্যাত তত্ত্ব: কোনো যোগাযোগ আলোর গতিবেগকে অতিক্রম করতে পারে না — এর বিরুদ্ধে যায়। এই গবেষণা থেকে এটাই প্রমাণ হয় যে, এই কণিকাগুলোর কোনো এক বিশেষ জগৎ বা স্তরে আলাদা একটি অস্তিত্ব রয়েছে, যেখানে তারা সবাই ‘একসাথে’ থাকে এবং একে অন্যের সাথে যোগাযোগ করতে পারে। আমাদের এই সৃষ্টিজগতে আমরা এই সব উপপারমানবিক কণাগুলোর একটি প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই মাত্র। এটাই তাদের একমাত্র অস্তিত্ব নয়। শুধু তাই না, এটা তাদের মুল অস্তিত্বও নয়। তাদের মুল অস্তিত্ব রয়েছে অন্য কোথাও। সেটা কোথায়, সেটা কী —আমরা তা জানি না। এই তত্ত্বকে Holographic Universe বলা হয়।[২৩১] এই তত্ত্ব অনুসারে আমাদের চারপাশে আমরা এই যে বিশাল সৃষ্টিজগৎ দেখতে পাচ্ছি, সেটা হচ্ছে একটি প্রতিচ্ছবি মাত্র। এই মহাবিশ্বের প্রতিটি কণিকা, শক্তি অন্য কোনো জগতে আরেকটি অস্তিত্ব রয়েছে। এর অর্থ হলো, ভৌত বিজ্ঞান যেভাবে প্রমাণ করার চেষ্টা করে: কোনো কিছুর এই মহাবিশ্বে যে ভৌত অস্তিত্ব রয়েছে, সেটাকে ভৌত পদ্ধতিতে পর্যবেক্ষণ করে সিদ্ধান্তে পৌছা — সেটা সঠিক নয়। কোনো কিছুকে এই মহাবিশ্বে পর্যবেক্ষণ করতে না পারলেই যে আর সেটার অস্তিত্ব নেই, এটা এখন আর সঠিক নয়। কোয়ান্টাম বিজ্ঞানে এরকম অনেক কিছুই আছে, যার কোনো ‘বৈজ্ঞানিক’ ব্যাখ্যা নেই, প্রচলিত ভৌত বিজ্ঞানের নিয়ম অনুসারে। বিজ্ঞান একটি পদ্ধতি, আর এই পদ্ধতির কাজ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে কোনো কিছু কিভাবে কাজ করে সেটির ব্যাখ্যা দেয়া। আধুনিকতার তথাকথিত বেড়াজালে পড়ে আমরা এখন দাবী করি: যেহেতু আমরা জানি এটা কীভাবে কাজ করে, সেহেতু এর কোনো স্রষ্টার প্রয়োজন নেই। অথচ আমরা ভুলে যাই: কীভাবে কাজকরে, আর কেন এভাবে কাজ করে —এই দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। কোনো কিছু এভাবে কাজ করে বলে এটিকে কেউ সৃষ্টি করেনি —এই ধারণায় বিজ্ঞান কখনোই আসে না। কারণ সেটি বিজ্ঞানের পদ্ধতির আওতায় পড়ে না। বিজ্ঞান আমাদেরকে বলে “কীভাবে”, কিন্তু সে কখনো “কেন” প্রশ্নের কোনো উত্তর দেয় না, আর সেটি নিয়ে মাথা ঘামানো বিজ্ঞানের কাজ নয়। যেমন, আপনি রাস্তায় একটা বরফের টুকরো পড়ে থাকতে দেখে সেটা নিয়ে বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ শুরু করলেন। বিজ্ঞান আপনাকে বলতে পারবে সেটা কী দিয়ে তৈরি, কীভাবে তৈরি, কখন তৈরি হয়েছে ইত্যাদি। কিন্তু বিজ্ঞান কখনোই আমাদেরকে বলতে পারবে না: কে সেটিকে কেন তৈরী করেছে? সেটি কোনো প্রাকৃতিক কারণে শিলা হয়ে মেঘ থেকে পড়েছে, নাকি কেউ তার ফ্রিজ থেকে এক টুকরো বরফ নিয়ে এসে রাস্তায় ফেলে রেখেছে?

হতাশাগ্রস্থ নাস্তিক: আল্লাহ ﷻ থাকলে এত খারাপ কিছু হয় কেন?

হতাশাগ্রস্থ নাস্তিক: সত্যিই যদি আল্লাহ ﷻথাকে, তাহলে পৃথিবীতে এত দুঃখ, কষ্ট, মুসলিমদের উপর এত অত্যাচার, এত প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারি হয় কেন? আল্লাহ ﷻএগুলো হতে দেয় কেন?

  • উত্তরঃ আল্লাহ ﷻ থাকলে এত খারাপ কিছু হয় কেন? নাস্তিকদের দেওয়া তর্কটি এরকম—
  • • স্রষ্টা একজন পরম করুণাময়, ন্যায়পরায়ণ সত্তা, যিনি সবকিছু করতে পারেন।
  • • সৃষ্টিজগতে অন্যায় হয়।
  • • সুতরাং সৃষ্টিকর্তা ন্যায়পরায়ণ নন, তিনি পরম করুণাময়ও নন, এবং তিনি অন্যায় প্রতিরোধ করতে পারেন না। সুতরাং স্রষ্টা বলে কেউ নেই।
  • যুক্তিটা বেশ ভালোই। কিন্তু এর মধ্যে দুটো ব্যাপার ধরে নেওয়া হয়েছে, যা প্রকাশ করা হয়নি—
  • • স্রষ্টা এমন একটি জগৎ সৃষ্টি করতে বাধ্য, যেখানে কোনো অন্যায় থাকবে না।
  • • স্রষ্টা পরম করুণাময়, ন্যায়পরায়ণ হলে তিনি কোনোভাবেই অন্যায় হতে দিতে পারেন না।
  • আল্লাহ ﷻ যদি এমন একটা জগৎ সৃষ্টি করেন, যেখানে কেউ কোনো অন্যায় করতে পারে না, তাহলে সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা বলে কিছু থাকবে না। মানুষ হয়ে যাবে ফেরেশতা অথবা অন্যান্য পশুদের মত আরেকটি সৃষ্টি, যাদের সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা নেই। যারা নিজেদের ইচ্ছামত কিছুই করতে পারেনা। মানুষকে সৃষ্টি করার উদ্দেশ্য সেটা ছিল না।

উঠতি নাস্তিকঃ আল্লাহ যদি সবকিছু সৃষ্টি করে থাকে, তাহলে তাকে সৃষ্টি করলো কে?

উঠতি নাস্তিক: আল্লাহ ﷻযদি সবকিছু সৃষ্টি করে থাকে, তাহলে তাকে সৃষ্টি করলো কে?

  • উত্তরঃ আল্লাহ যদি সবকিছু সৃষ্টি করে থাকে, তাহলে তাকে সৃষ্টি করলো কে? প্রথমত প্রশ্নটা মহাবিশ্বের সৃষ্টির কোনো সমাধান নয়, বরং একটা পালটা প্রশ্ন। দিতীয়ত প্রশ্নটা অনেক সমস্যার সৃস্টি করে। স্টিফেন হকিংস এর মহাবিস্ফোরণ তত্ত্ব আমাদের বলে যে, বিগ ব্যাং এর আগে কোন ম্যাটার, এনার্জি; স্থান, সময় কিছুই ছিল না। একদম শুন্য। তাই স্রষ্টাকে কখন, কোথায়, কে সৃষ্টি করল প্রশ্নটি অবান্তর। কেননা যেহেতু স্রস্টা সময় এবং স্থান সৃষ্টি করেছেন তাই স্রস্টার কোন এক নির্দিষ্ট 'স্থানে' বা 'সময়' এর মদ্ধে সৃষ্টি হওয়া সম্ভব নয়। স্রস্টা স্থান ও কাল এর উর্ধে। এবং তিনি অতিত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ সব কিছু একইসাথে দেখেন। আল্লাহকে ﷻ যে সৃষ্টি করেছে, তাকে তাহলে কে সৃষ্টি করেছে? সেই মহাসত্তাকে যে সৃষ্টি করেছে, সেই মহা-মহাসত্তাকে কে সৃষ্টি করেছে? সেই মহা-মহাসত্তাকে যেই মহা-মহা-মহাসত্তা সৃষ্টি করেছে, তাকে কে সৃষ্টি করেছে?… এই প্রশ্নের শেষ নেই। এটা চলতেই থাকবে। তৃতীয়ত, এই প্রশ্নটা একটা ভুল প্রশ্ন। কারণ এখানে সৃষ্টিকর্তা অর্থ ‘যে সৃষ্ট নন বরং যিনি সৃষ্টি করেন।’ সুতরাং কেউ যখন জিজ্ঞেস করে, “সৃষ্টিকর্তাকে কে বানিয়েছে?”, সে আসলে জিজ্ঞেস করছে— “যাকে কেউ সৃষ্টি করেনি, তাকে কে সৃষ্টি করেছে?” এধরনের অনেক প্যাঁচানো প্রশ্ন আপনারা ফিলোসফার এবং নাস্তিকদের কাছ থেকে পাবেন, যারা ভাষার মারপ্যাচ দিয়ে এমন সব প্রশ্ন তৈরি করে, যা পড়ে আপনার মনে হবে – “আসলেই তো! এর উত্তর কি হবে? হায় হায়! আমি কি তাহলে ভুল বিশ্বাস করি?” তাদের আসল সমস্যা হচ্ছে তারা ভাষা এবং বিজ্ঞান ঠিকমত বোঝে না এবং তাদের প্রশ্নগুলো যে ভাষাগতভাবে ভুল এবং বৈজ্ঞানিকভাবে অবাস্তব, সেটা তারা নিজেরাই ঠিকমত চিন্তা করে দেখেনি। এরা আপনাকে ভাষাগত ভাবে ভুল বাক্য তৈরি করে, বৈজ্ঞানিক ভাবে অবৈজ্ঞানিক একটা প্রশ্ন করে, তারপর আপনার কাছে দাবি করবে একটা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেওয়ার। আগের পর্বে আমরা বিস্তারিত দেখিয়েছি, কেন এরকম অসীম পর্যন্ত পুনরাবৃত্তি হওয়া সম্ভব নয়। অসীম একটি ধারণা মাত্র, এর কোনো বাস্তব অস্তিত্ব নেই।

ঐতিহাসিক নাস্তিক: প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে ঘটা ঘটনার বাইরে কোনো ঘটনা নেই

ঐতিহাসিক: যদি কোনো বুদ্ধিমান সত্তা মহাবিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করতই, তাহলে ইতিহাসে অনেক ঘটনা থাকতো, যা থেকে বোঝা যেত: কোনো বুদ্ধিমান সত্তা সেগুলো ঘটিয়েছে, যা কোনোভাবেই প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে ঘটা সম্ভব নয়। এরকম ঘটনা ঘটতে তো দেখা যাচ্ছে না। তাহলে প্রমাণ কী যে, আল্লাহ বলে সত্যিই কেউ আছে?  

  • উত্তরঃ প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে ঘটা ঘটনার বাইরে কোনো ঘটনা নেই মানুষের চিন্তাশীল মস্তিষ্কে তালা দিতে নাস্তিক মহল একটা শব্দ আবিষ্কার করেছে, তার নাম হল “প্রকৃতি”। প্রথমত আমাদের বুঝতে হবে প্রকৃতি কি জিনিস। আমাদের চারপাশে গাছপালা, পশুপাখি যা আছে তা সবই প্রকৃতি। মানুষ যা করে তাও প্রকৃতি। পিপড়া বাসা বানালে সেটা প্রাকৃতিক আর মানুষ কম্পিউটার বানালে সেটা অপ্রাকৃতিক এ কথা যৌক্তিক নয়। দ্বিতীয়ত প্রকৃতির “স্বাভাবিক” নিয়ম বলে কিছু নেই। কোন কিছুই স্বাভাবিক না, কারন কোন কিছুই হওার কথা ছিল না। আপনি বিজ্ঞান দিয়ে কোন কিছু কিভাবে কাজ করে সেটা ব্যাখ্যা করতে পারলেই সেটা স্বাভাবিক আর তা পেছনে কারো হাত নেই এই কথা ঠিক না। কারন, বিজ্ঞান দিয়ে আমি ব্যাখ্যা করতে পারি ঘড়ি কিভাবে কাজ করে; তার মানে এই না যে ঘড়ির কোন সৃষ্টি করতা নেই। আমি বিজ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারি সুপার কম্পিউটার কিভাবে কাজ করে; তার মানে এই না সুপার কম্পিউটার কেউ বানায় নি। তবে আমাদের প্রাত্যহিক পারসেপশনের বাইরেও অনেক ঘটনা ঘটে যেগুলো সচরাচর ঘটে না। ফিরাউন যখন মুসা ﷺ নবীর দাবি অস্বীকার করলো এবং বনী ইসরাইলকে মুক্ত করে দিতে অস্বীকার জানালো, তখন আল্লাহ ﷻ মিশরে একের পর এক অতিপ্রাকৃত দুর্যোগ পাঠালেন, যা কোনো স্বাভাবিক প্রাকৃতিক ঘটনা ছিল না। কু’রআনের কিছু আয়াতে এই ঘটনাগুলো বর্ণনা করা হয়েছে— আমি ফিরাউনের লোকদের উপর বছরের পর বছর খরা, ফসলহানি দিলাম, যাতে করে তারা নির্দেশ শোনে। … কিন্তু তারা বলল, “তুমি আমাদের উপর জাদু করার জন্য যতই অলৌকিক ঘটনা দেখাও, আমরা তোমাকে বিশ্বাস করব না।” তাই আমি ওদের উপর বন্যা, পঙ্গপাল, উকুন, ব্যাঙ, রক্ত পাঠালাম — একদম পরিষ্কার নিদর্শন। কিন্তু ওরা ছিল এক অহংকারী সম্প্রদায় এবং দুর্নীতিবাজ। [আল-আরাফ ৭:১৩০-১৩৩] ১৯ শতকের শুরুর দিকে মিশরে একটি প্রাচীন ফলক আবিষ্কার হয়, যা হল্যান্ডের মিউজিয়ামে অনুবাদ করার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। এই প্রাচীনফলকের নাম ‘ইপুয়ের-এর ফলক’ যেখানে মিশরের প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর ঘটনা বর্ণনা করা আছে। ফলকটি ইপুয়ের নামের একজন প্রাচীন মিশরীয় লিখেছেন, এবং ধারণা করা হয় তিনি এই ঘটনাগুলো নিজের চোখে দেখেছেন। তিনি কী লিখেছেন দেখা যাক— সারাদেশে মহামারি, চারিদিকে রক্ত… পুরো নদীতে রক্ত… সবগুলো শহর ধ্বংস হয়ে গেছে… চারিদিকে চিৎকার, হাহাকার… সব গাছপালা ধ্বংস হয়ে গেছে… কোথাও কোনো ফল, শাকসবজি নেই… কোথাও কোনো আলো নেই… দেখ! এক বিশাল আগুন… [২৩০] এধরনের ঘটনা প্রকৃতির কোনো স্বাভাবিক নিয়মে ঘটে না। থামুদ নামে কু’রআনে এক জাতির কথা বলা আছে, যারা আল-হিজর নামে একটি জায়গায় পাহাড় কেটে বিশাল সব প্রাসাদ, বাড়ি বানিয়েছে। তাদের এই বিশেষ ক্ষমতা অন্য কোনো জাতির দেখা যায়নি। শক্ত পাহাড়ের পাথর কেটে বানানো তাদের বিশাল সব প্রাসাদ, স্তম্ভ, বাড়িঘর আজও অটুট রয়েছে। কিন্তু সেই থামুদ জাতির মানুষরা কোনো কারণে ধ্বংস হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। তাদের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। এরকম প্রযুক্তিতে অগ্রসর, বিত্তশালী, শক্তিশালী জাতি কীভাবে রাতারাতি বিলুপ্ত হয়ে গেল, অথচ তাদের বানানো বাড়িঘরগুলো ঠিকই থাকলো — সেটা আজও একটা বিস্ময়। কু’রআনে বলা আছে সেদিন কী ঘটেছিল— আল-হিজরের বাসিন্দারা আমার রাসুলদের অস্বীকার করেছিল। আমি ওদেরকে আমার নিদর্শন দেখিয়েছিলাম, কিন্তু ওরা মানল না। ওরা পাহাড় কেটে বাড়িঘর বানাত, নিরাপদে বসবাস করত। সকাল বেলা এক প্রচণ্ড আঘাত ওদেরকে শেষ করে দিল। ওরা কতকিছু অর্জন করেছিল, যার কিছুই ওদের কোনো কাজে আসলো না। [আল-হিজর ১৫:৮০-৮৫] এই সব রহস্য প্রমাণ করে যে, পৃথিবীর ইতিহাসে অনেক ঘটনা রয়েছে, যার কোনো স্বাভাবিক প্রাকৃতিক কারণ নেই, যা কোনো প্রচলিত প্রাকৃতিক নিয়মে ব্যাখ্যা করা যায় না। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো, যে সব জাতিগুলো এরকম রহস্যময়ভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে, তাদের প্রত্যেকের ধ্বংসাবশেষ ঘাঁটলে দেখা যায় যে, এরা সবাই সম্পদে, প্রাচুর্যে অন্ধ হয়ে নৈতিকভাবে একেবারেই নিচে নেমে গিয়েছিল এবং জঘন্য সব কাজ করত তারা। এদের শহরগুলো ভর্তি মদের পাত্রের ছড়াছড়ি। রাস্তার মোড়ে মোড়ে পতিতালয়। দেওয়ালে দেওয়ালে সমকামিতার ছবি। উদ্ধার করা প্রাচীন লিপিগুলোতে বর্ণনার যোগ্য নয় এমন নোংরা সবঘটনার বর্ণনা। তাদের ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ঘটনাগুলো পর্যবেক্ষণ করলে দেখাযায় যে, এই সব অতিপ্রাকৃত ঘটনাগুলো ঘটেছে পরিকল্পিতভাবে। এগুলো কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। কেউ একজন আছেন, যিনি চরমভাবে দুর্নীতিগ্রস্থ, নৈতিকভাবে একেবারেই নষ্ট হয়ে যাওয়া এই ধরনের জাতিগুলোকে বার বার ধ্বংস করে দেন।

নাস্তিকদের যুক্তি খন্ডন – জীববিজ্ঞানীঃ সকল প্রাণী বিবর্তনের ফসল

  • জীববিজ্ঞানী: সকল প্রাণী বিবর্তনের ফসল
  • প্রথমে ভেবে দেখুন, আপনি কীভাবে জন্ম নিলেন? আপনি এসেছেন আপনার বাবা-মা’র কাছ থেকে। আপনার বাবা-মা এসেছেন তাদের বাবা-মা’র কাছ থেকে। এভাবে যদি পেছন দিকে যেতে থাকেন, একসময় আপনি পৃথিবীর সর্বপ্রথম বাবা এবং মা পর্যন্ত পৌঁছে যাবেন, যাদেরকে কেউ জন্ম দেয়নি। এখন প্রশ্ন হলো, তারা কোথা থেকে এলেন?
  • এই প্রশ্নের উত্তর নিয়ে গত দুশো বছরে পৃথিবীতে তোলপাড় হয়ে গেছে। একদল মানুষ বিশ্বাস করে: সৃষ্টিকর্তা সেই প্রথম মানব এবং মানবীকে অন্য কোথাও বানিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন, অথবা তিনি পৃথিবীতেই তাদেরকে কোনো অতিপ্রাকৃত প্রক্রিয়ায় বানিয়েছেন। আরেকদল মানুষ মনে করে, সেই প্রথম আধুনিক মানব-মানবী এসেছেন কোনো গরিলা/শিম্পাঞ্জীর মতো দেখতে আদি পিতা-মাতা থেকে, যারা ঠিক আজকের মানুষের মতো ছিলেন না। কোনো কারণে প্রথমবারের মতো সেই আদি পিতা-মাতা একটি আধুনিক মানব এবং মানবী শিশুর জন্ম দেন এবং তাদের থেকে পৃথিবীতে আজকের যত মানুষ রয়েছে সবার জন্ম হয়েছে। শুধু তাই নয়, সেই আদি পিতা-মাতারা এসেছেন আরেকটু বেশি বানরের কাছাকাছি দেখতে আদিমানব, আদিমানবী থেকে, যারা নাকি এসেছেন আরও বেশি বানরের মতো দেখতে আরও আদিমানব এবং আদিমানবী থেকে—এই হচ্ছে ডারউইনের বিখ্যাত বিবর্তনবাদ, যা পৃথিবীর মানুষকে দুই ভাগে ভাগ করে দিয়েছে—আস্তিক ও নাস্তিক।
  • ডারউইনের বিবর্তনবাদ
  • ডারউইনের বিবর্তনবাদ অনুসারে একজন আদি পিতা ও মাতা—যারা ঠিক আজকের মানুষের মতো মানুষ ছিলেন না—বিশেষ কোনো জেনেটিক মিউটেশনের কারণে তারা প্রথম একজন আধুনিক মানব শিশুর জন্ম দেন। এটি দৈব চক্রে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা মাত্র: এর পেছনে কোনো উদ্দেশ্য নেই, কোনো সৃষ্টিকর্তার হাত নেই। প্রকৃতির হাজার খেলার মধ্যে এটি ছিল একটি খেলা। এই একই প্রক্রিয়ায় পৃথিবীতে সকল প্রাণের উদ্ভব হয়েছে।
  • বিবর্তনবাদ অনুসারে প্রাণের সৃষ্টি হয়েছে দৈব চক্রে। কোনো কারণে ৩.৬ বিলিয়ন বছর আগের আদি পৃথিবীতে, কোনো এক জায়গার কাদা মাটিতে কিছু অজৈব পদার্থ কাকতালীয়ভাবে একসাথে মিশে প্রথম অ্যামাইনো অ্যাসিড তৈরি করে। এরকম অনেকগুলো অ্যামাইনো অ্যাসিড কোনো কাকতালীয় কারণে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে একসাথে হয়ে প্রোটিন তৈরি হয়। তারপর কয়েকটি বিশেষ প্রোটিন কোনো কাকতালীয় কারণে একসাথে হয়ে ডিএনএ তৈরি হয় এবং তারপর সেখান থেকে আরও বিরাট কোনো কাকতালীয় কারণে প্রথম এককোষী প্রাণীর সৃষ্টি হয়। সেই এককোষী প্রাণীরা বহু বছর ধরে বিবর্তিত হয়ে একসময় কোনো কাকতালীয় কারণে বহুকোষী প্রাণীতে পরিণত হয়। তার বহু বছর পরে সেই বহুকোষী প্রাণীরা বিবর্তিত হয়ে আরও জটিল জলচর প্রাণীতে পরিণত হয়। তারপর সেই জলচর প্রাণীগুলো একসময় হাত-পা গজিয়ে ডাঙায় উঠে এসে নানা ধরনের স্থলচর প্রাণীতে পরিণত হয়। এরপর সেই স্থলচর প্রাণীগুলো কোটি কোটি বছর ধরে বিবর্তিত হয়ে একসময় গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগির মতো প্রাণীতে পরিণত হয়। এবং সবশেষে একই প্রক্রিয়ায় ধাপে ধাপে বানররূপী আদিমানব থেকে উদ্ভব হয়েছে আধুনিক মানুষের।
  • এখানে লক্ষ্য করুন: এই গোটা প্রক্রিয়ায় কতগুলো কাকতালীয় ব্যাপার রয়েছে। এই প্রতিটি কাকতালীয় ঘটনা ঘটার সম্ভাব্যতা হচ্ছে কমপক্ষে কোটি কোটি কোটি সম্ভাবনার মধ্যে একটি। যেমন ৩০০ অণু দিয়ে গঠিত একটি প্রোটিন তৈরি হবার সম্ভাবনা হচ্ছে ১০৩৯০ এর মধ্যে একটি। ১০ এর পরে ৩৯০টি শূন্য দিলে যে বিরাট সংখ্যা হয় ততগুলো সম্ভাবনার মধ্যে একটি।যার অর্থ হচ্ছে— এটা গাণিতিকভাবে দেখলে কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
  • বিবর্তনবাদ কি আসলেই কোনো প্রমাণিত বিজ্ঞান?
  • বিবর্তনবাদ যদি সত্যি হতো তাহলে—
  • ১) আমরা এক প্রাণী থেকে অন্য প্রাণীতে বিবর্তিত হওয়ার সময়, তার মাঝামাঝি অবস্থার অনেক নিদর্শন প্রকৃতিতে দেখতে পারতাম। কিন্তু এখন পর্যন্ত আমরা যে লক্ষ লক্ষ ফসিল পেয়েছি, তার কোথাও কোনোদিনও এক প্রাণী থেকে অন্য প্রাণীতে বিবর্তিত হওয়ার সময় মাঝামাঝি অবস্থার কোনো প্রাণী দেখা যায়নি।[২২০] যেমন, এখনও পর্যন্ত এমন কোনো বানর বা গরিলার ফসিল পাওয়া যায়নি—যেটার মাথা ছিল মানুষের মতো, বা যেটার গায়ের লোম মানুষের মতো একদম ছোট, বা যেটার হাত মানুষের হাতের মতো—যেগুলো দেখে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, গরিলা বা বানর থেকে ধীরে ধীরে বিবর্তন হয়ে মানুষ এসেছে।
  • ২) প্রাণীদের মধ্যে সূক্ষ্ম বিবর্তনের (Microevolution) নিদর্শন মিললেও বড় ধরনের বিবর্তনের কোনো প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি, যেখানে এক প্রজাতির প্রাণী বিবর্তিত হয়ে আরেক প্রজাতির প্রাণীতে পরিণত হয়েছে। Macroevolution বা স্থূল বিবর্তনের পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। বিজ্ঞানীরা গবেষণাগারে মাছির বিবর্তন করার চেষ্টা করেছিলেন। অনেক চেষ্টার পরে দেখা গেল তিন ধরনের মাছি তৈরি হলো—১) আগে যেরকম ছিল সেরকমই, ২) মিউটেটেড বাবিকৃত, অথবা ৩) মৃত।[২২১] ২০১০ সালে একটিগবেষণায় মাছির ৬০০ প্রজন্ম পরীক্ষা করেও কোনো বিবর্তনের চিহ্ন পাওয়া যায়নি।[২২২] একইভাবে ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়ার ৪০,০০০ প্রজন্মের উপর বিবর্তনের চেষ্টা করেও বিবর্তনবাদের পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।[২২৩] সুতরাং অতীতেও বিবর্তন হয়ে একটি প্রজাতির প্রাণী অন্য প্রজাতির প্রাণীতে রূপান্তরের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি, বর্তমানেও না।
  • ৩) বিবর্তনবাদ দাবি করে যে, জেনেটিক মিউটেশনের মাধ্যমে প্রাণীদের মধ্যে বিবর্তন হয়ে উন্নততর এবং বেশি টেকসই প্রাণীর সৃষ্টি হয় এবং এইভাবেই আদি-মানুষ থেকে আধুনিক মানুষ এসেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণায় উলটো প্রমাণ পাওয়া গেছে। উদ্ভিদ এবং মানুষ উভয়েরই উপর গবেষণায় দেখাগেছে বেশিরভাগ মিউটেশনের ফলে দেহে কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয় না।কিন্তু খারাপ মিউটেশন হয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে এবং এগুলো কোষের বংশ পরম্পরায় টিকে থাকে। একে বলা হয় জেনেটিক এনট্রপি। প্রত্যেক মানুষ তার নিজের মিউটেশন এবং তার পূর্ব পুরুষদের মিউটেশন বহন করে এবং তারপর তার বংশধরের মধ্যে দিয়ে দেয়।[২২৪]
  • সাম্প্রতিক কালে হিউমেন জিনোম গবেষণার উন্নতির ফলে বিজ্ঞানীরা ২১৯ জন মানুষ এবং ৭৮ জন বাবা-মা এবং তাদের সন্তানদের মধ্যে গবেষণা করে দেখেছেন, প্রতি বংশ পরম্পরায় ৬০টি নতুন মিউটেশন যোগ হয়![২২৫]
  • বিবর্তনবাদীরা দাবি করে: ২.৪ মিলিয়ন বছর আগে, এক বানর/গরিলার কাছাকাছি দেখতে আদি মানুষ থেকে আধুনিক মানুষের উদ্ভব হয়েছে। যার অর্থ দাঁড়ায় এই পর্যন্ত মানুষের প্রায় ১২০,০০০ প্রজন্ম এসেছে। এখন প্রতি প্রজন্ম যদি ৬০টি মিউটেশন যোগ করে, তাহলে ১২০,০০০ প্রজন্মে আজকে মানুষের মধ্যে ৭,২০০,০০০ মিউটেশন থাকার কথা। এতো মিউটেশন হলে মানুষ আর মানুষ থাকত না, এবং অনেক আগেই মানব জাতি পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত।
  • ৪) এক প্রজাতির প্রাণীর থেকে অন্য প্রজাতির প্রাণীর মধ্যে ধাপে ধাপে বিবর্তন কখনও সম্ভব নয়। যেমন, সরীসৃপের দ্বিমুখী ফুসফুস কখনই পাখির একমুখী ফুসফুসে বিবর্তিত হতে পারে না। সেটা হতে হলে বিবর্তন শেষ না হওয়া পর্যন্ত সরীসৃপকে শ্বাস নেওয়া বন্ধ করে দিতে হবে—যেটা কেবল হাস্যকরই নয়, বরং অযৌক্তিক। সুতরাং বিবর্তনবাদীরা যে-দাবি করে সরীসৃপ থেকে পাখির বিবর্তন হয়েছে, সেটা ভুল।[২২৬] একইভাবে উভচর প্রাণীর তিন-কক্ষ-বিশিষ্ট হৃদপিণ্ড থেকে স্তন্যপায়ী প্রাণীর চার-কক্ষ-বিশিষ্ট হৃদপিণ্ডের বিবর্তন হওয়া কখনও সম্ভব নয়, কারণ সেটা হতে হলে প্রথমে উভচর প্রাণীর হৃদপিণ্ডের মধ্যে নতুন দেওয়াল সৃষ্টি হতে হবে, যা রক্ত চলাচল ব্যহত করবে, না হয় নতুন রক্তনালীর সৃষ্টি হতে হবে, যা রক্ত চলাচলকে ব্যহত করবে।
  • এরকম অনেক প্রমাণ রয়েছে, যা থেকে সহজেই দেখানো যায় যে, এক প্রজাতির প্রাণীর মধ্যে ধীরে ধীরে বিবর্তন হয়ে অন্য প্রজাতির প্রাণী সৃষ্টি হওয়া সম্ভব নয়। কারণ বিবর্তনের সময় মাঝামাঝি যেই অবস্থাগুলো হতে হবে, সেগুলো প্রাণীর জন্য কোনোভাবেই কল্যাণকর নয়। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে এইধরনের অর্ধেক বিবর্তন সেই প্রাণীর জন্য মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সুতরাং বিবর্তনবাদ শুধুই একটি থিওরি। এর পক্ষে কোনো গ্রহণযোগ্য ও যৌক্তিকপ্রমাণ নেই।
  • প্রকৃতিতে কী ধরনের বিবর্তন হয়?
  • একটি ব্যাপার পরিষ্কার করা দরকার: Microevolution বা সূক্ষ্ম-বিবর্তন অবশ্যই প্রকৃতিতে হয়। এবং সেটা হয় একই প্রজাতির মধ্যে, অল্প কিছু জেনেটিক পরিবর্তন থেকে। আর এভাবেই একসময় উপ-প্রজাতির সৃষ্টি হয়।[২২৭] কিন্তু এই সূক্ষ্ম বিবর্তন হতে হতে একসময় Macroevolution বা স্থুল-বিবর্তন হয়ে একপ্রজাতির প্রাণী সম্পূর্ণ অন্য প্রজাতির প্রাণীতে পরিণত হয় না—যেটা বিবর্তনবাদীরা প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন। মজার ব্যাপারহচ্ছে এটা নিয়ে বিবর্তনবাদীদের মধ্যেই দ্বিমত রয়েছে।[২২৮] কাজেই বলা যায়, বানরের মধ্যে সূক্ষ্ম বিবর্তন হয়ে বিভিন্ন প্রজাতির বানর তৈরি হয়, কিন্তু তারা শেষ পর্যন্ত বানরই থাকে; মানুষ হয়ে যায়না।
  • বিবর্তনের টেক্সট বইগুলোতে বিবর্তনবাদের পক্ষে যে সব উদাহরণ দেখানো হয়— যেমন ডারউইনের পাখির ঠোটের ‘বিবর্তন’, ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়ার ‘বিবর্তন’ হয়ে এন্টিবায়োটিকের প্রতি রেজিস্টেন্স, এইচআইভি ভাইরাসের ‘বিবর্তন’—এগুলো সবই হয় একই প্রজাতির মধ্যে। পাখি বিবর্তনের পরে পাখিই থাকে, ডাইনোসর হয়ে যায় না। একইভাবে ব্যাকটেরিয়া শেষ পর্যন্ত ব্যাকটেরিয়াই থাকে, ফাঙ্গাস হয়ে যায় না।[২২৯]
  • ঐতিহাসিক: প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে ঘটা ঘটনার বাইরে কোনো ঘটনা নেই
  • ফিরাউন যখন মুসা ﷺ নবীর দাবি অস্বীকার করলো এবং বনী ইসরাইলকে মুক্ত করে দিতে অস্বীকার জানালো, তখন আল্লাহ ﷻ মিশরে একের পর এক অতিপ্রাকৃত দুর্যোগ পাঠালেন, যা কোনো স্বাভাবিক প্রাকৃতিক ঘটনা ছিল না। কু’রআনের কিছু আয়াতে এই ঘটনাগুলো বর্ণনা করা হয়েছে—
  • আমি ফিরাউনের লোকদের উপর বছরের পর বছর খরা, ফসলহানি দিলাম, যাতে করে তারা নির্দেশ শোনে। … কিন্তু তারা বলল, “তুমি আমাদের উপর জাদু করার জন্য যতই অলৌকিক ঘটনা দেখাও, আমরা তোমাকে বিশ্বাস করব না।” তাই আমি ওদের উপর বন্যা, পঙ্গপাল, উকুন, ব্যাঙ, রক্ত পাঠালাম — একদম পরিষ্কার নিদর্শন। কিন্তু ওরা ছিল এক অহংকারী সম্প্রদায় এবং দুর্নীতিবাজ।  [আল-আরাফ ৭:১৩০-১৩৩]
  • ১৯ শতকের শুরুর দিকে মিশরে একটি প্রাচীন ফলক আবিষ্কার হয়, যা হল্যান্ডের মিউজিয়ামে অনুবাদ করার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। এই প্রাচীনফলকের নাম ‘ইপুয়ের-এর ফলক’ যেখানে মিশরের প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর ঘটনা বর্ণনা করা আছে। ফলকটি ইপুয়ের নামের একজন প্রাচীন মিশরীয় লিখেছেন, এবং ধারণা করা হয় তিনি এই ঘটনাগুলো নিজের চোখে দেখেছেন। তিনি কী লিখেছেন দেখা যাক—
  • সারাদেশে মহামারি, চারিদিকে রক্ত… পুরো নদীতে রক্ত… সবগুলো শহর ধ্বংস হয়ে গেছে… চারিদিকে চিৎকার, হাহাকার… সব গাছপালা ধ্বংস হয়ে গেছে… কোথাও কোনো ফল, শাকসবজি নেই… কোথাও কোনো আলো নেই…  দেখ! এক বিশাল আগুন… [২৩০]
  • এধরনের ঘটনা প্রকৃতির কোনো স্বাভাবিক নিয়মে ঘটে না।
  • থামুদ নামে কু’রআনে এক জাতির কথা বলা আছে, যারা আল-হিজর নামে একটি জায়গায়  পাহাড় কেটে বিশাল সব প্রাসাদ, বাড়ি বানিয়েছে। তাদের এই বিশেষ ক্ষমতা অন্য কোনো জাতির দেখা যায়নি। শক্ত পাহাড়ের পাথর কেটে বানানো তাদের বিশাল সব প্রাসাদ, স্তম্ভ, বাড়িঘর আজও অটুট রয়েছে। কিন্তু সেই থামুদ জাতির মানুষরা কোনো কারণে ধ্বংস হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। তাদের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। এরকম প্রযুক্তিতে অগ্রসর, বিত্তশালী, শক্তিশালী জাতি কীভাবে রাতারাতি বিলুপ্ত হয়ে গেল, অথচ তাদের বানানো বাড়িঘরগুলো ঠিকই থাকলো — সেটা আজও একটা বিস্ময়।
  • কু’রআনে বলা আছে সেদিন কী ঘটেছিল—
  • আল-হিজরের বাসিন্দারা আমার রাসুলদের অস্বীকার করেছিল। আমি ওদেরকে আমার নিদর্শন দেখিয়েছিলাম, কিন্তু ওরা মানল না। ওরা পাহাড় কেটে বাড়িঘর বানাত, নিরাপদে বসবাস করত। সকাল বেলা এক প্রচণ্ড আঘাত ওদেরকে শেষ করে দিল। ওরা কতকিছু অর্জন করেছিল, যার কিছুই ওদের কোনো কাজে আসলো না। [আল-হিজর ১৫:৮০-৮৫]
  • এই সব রহস্য প্রমাণ করে যে, পৃথিবীর ইতিহাসে অনেক ঘটনা রয়েছে, যার কোনো স্বাভাবিক প্রাকৃতিক কারণ নেই, যা কোনো প্রচলিত প্রাকৃতিক নিয়মে ব্যাখ্যা করা যায় না। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো,  যে সব জাতিগুলো এরকম রহস্যময়ভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে, তাদের প্রত্যেকের ধ্বংসাবশেষ ঘাঁটলে দেখা যায় যে, এরা সবাই সম্পদে, প্রাচুর্যে অন্ধ হয়ে নৈতিকভাবে একেবারেই নিচে নেমে গিয়েছিল এবং জঘন্য সব কাজ করত তারা। এদের শহরগুলো ভর্তি মদের পাত্রের ছড়াছড়ি। রাস্তার মোড়ে মোড়ে পতিতালয়। দেওয়ালে দেওয়ালে সমকামিতার ছবি। উদ্ধার করা প্রাচীন লিপিগুলোতে বর্ণনার যোগ্য নয় এমন নোংরা সবঘটনার বর্ণনা। তাদের ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ঘটনাগুলো পর্যবেক্ষণ করলে দেখাযায় যে, এই সব অতিপ্রাকৃত ঘটনাগুলো ঘটেছে পরিকল্পিতভাবে। এগুলো কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। কেউ একজন আছেন, যিনি চরমভাবে দুর্নীতিগ্রস্থ, নৈতিকভাবে একেবারেই নষ্ট হয়ে যাওয়া এই ধরনের জাতিগুলোকে বার বার ধ্বংস করে দেন।
  • উঠতি নাস্তিক: আল্লাহ যদি সবকিছু সৃষ্টি করে থাকেতাহলে তাকে সৃষ্টি করলো কে?
  • আল্লাহকে ﷻ যে সৃষ্টি করেছে, তাকে তাহলে কে সৃষ্টি করেছে? সেই মহাসত্তাকে যে সৃষ্টি করেছে, সেই মহা-মহাসত্তাকে কে সৃষ্টি করেছে? সেই মহা-মহাসত্তাকে যেই মহা-মহা-মহাসত্তা সৃষ্টি করেছে, তাকে কে সৃষ্টি করেছে?…
  • এই প্রশ্নের শেষ নেই। এটা চলতেই থাকবে।
  • দ্বিতীয়ত, এই প্রশ্নটা একটা ভুল প্রশ্ন। কারণ এখানে সৃষ্টিকর্তা অর্থ যে সৃষ্ট নন বরং যিনি সৃষ্টি করেন।
  • সুতরাং কেউ যখন জিজ্ঞেস করে, “সৃষ্টিকর্তাকে কে বানিয়েছে?”, সে আসলে জিজ্ঞেস করছে—
  • যাকে কেউ সৃষ্টি করেনিতাকে কে সৃষ্টি করেছে?”
  • এধরনের অনেক প্যাঁচানো প্রশ্ন আপনারা ফিলোসফার এবং নাস্তিকদের কাছ থেকে পাবেন, যারা ভাষার মারপ্যাচ দিয়ে এমন সব প্রশ্ন তৈরি করে, যা পড়ে আপনার মনে হবে – “আসলেই তো! এর উত্তর কি হবে? হায় হায়! আমি কি তাহলে ভুল বিশ্বাস করি?” তাদের আসল সমস্যা হচ্ছে তারা ভাষা এবং বিজ্ঞান ঠিকমত বোঝে না এবং তাদের প্রশ্নগুলো যে ভাষাগতভাবে ভুল এবং বৈজ্ঞানিকভাবে অবাস্তব, সেটা তারা নিজেরাই ঠিকমত চিন্তা করে দেখেনি। এরা আপনাকে ভাষাগত ভাবে ভুল বাক্য তৈরি করে, বৈজ্ঞানিক ভাবে অবৈজ্ঞানিক একটা প্রশ্ন করে, তারপর আপনার কাছে দাবি করবে একটা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেওয়ার।
  • আগের পর্বে আমরা বিস্তারিত দেখিয়েছি, কেন এরকম অসীম পর্যন্ত পুনরাবৃত্তি হওয়া সম্ভব নয়। অসীম একটি ধারণা মাত্র, এর কোনো বাস্তব অস্তিত্ব নেই।
  • হতাশাগ্রস্থ নাস্তিক: আল্লাহ  থাকলে এত খারাপ কিছু হয় কেন?
  • নাস্তিকদের দেওয়া তর্কটি এরকম—
  • স্রষ্টা একজন পরম করুণাময়, ন্যায়পরায়ণ সত্তা, যিনি সবকিছু করতে পারেন।
  • সৃষ্টিজগতে অন্যায় হয়।
  • সুতরাং সৃষ্টিকর্তা ন্যায়পরায়ণ নন, তিনি পরম করুণাময়ও নন, এবং তিনি অন্যায় প্রতিরোধ করতে পারেন না। সুতরাং স্রষ্টা বলে কেউ নেই।
  • যুক্তিটা বেশ ভালোই। কিন্তু এর মধ্যে দুটো ব্যাপার ধরে নেওয়া হয়েছে, যা প্রকাশ করা হয়নি—
  • স্রষ্টা এমন একটি জগৎ সৃষ্টি করতে বাধ্য, যেখানে কোনো অন্যায় থাকবে না।
  • স্রষ্টা পরম করুণাময়, ন্যায়পরায়ণ হলে তিনি কোনোভাবেই অন্যায় হতে দিতে পারেন না।
  • আল্লাহ ﷻ যদি এমন একটা জগৎ সৃষ্টি করেন, যেখানে কেউ কোনো অন্যায় করতে পারে না, তাহলে সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা বলে কিছু থাকবে না। মানুষ হয়ে যাবে ফেরেশতা অথবা অন্যান্য পশুদের মত আরেকটি সৃষ্টি, যাদের সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা নেই। যারা নিজেদের ইচ্ছামত কিছুই করতে পারেনা। মানুষকে সৃষ্টি করার উদ্দেশ্য সেটা ছিল না।
  • সূত্র:
  • [২২০] Appendix in Morris, J. and F. Sherwin. 2009. The Fossil Record. Dallas, TX: Institute for Creation Research.
  • [২২১] Nüsslein-Volhard, C. and E. Wieschaus. 1980. Mutations affecting segment number and polarity in Drosophila. Nature. 287 (5785): 795-801.
  • [২২২] Burke, M. K. et al. 2010. Genome-wide analysis of a long-term evolution experiment with Drosophila. Nature. 467 (7315): 587-590.
  • [২২৩] Barrick, J. E. et al. 2009. Genome evolution and adaptation in a long-term experiment with Escherichia coli. Nature. 461 (7268): 1243- 1247.
  • [২২৪] Sanford, J. 2008. Genetic Entropy & the Mystery of the Genome. Waterloo, NY: FMS Publications.
  • [২২৫] Kong, A. et al. 2012. Rate of de novo mutations and the importance of father’s age to disease risk. Nature. 488 (7412): 471-475.
  • [২২৬] Thomas, B. Do New Dinosaur Finger Bones Solve a Bird Wing Problem? ICR News. Posted on icr.org July 9, 2009, accessed March 9, 2012.
  • [২২৭] Leonard, B. Critical Analysis of Evolution — Grade 10. Draft Reflecting Changes Made at March 2004 State Board of Education Meeting, page 314. Ohio Department of Education. www.texscience.org.
  • [২২৮] Allaby, M. (ed.) 1992. The Concise Oxford Dictionary of Zoology. New York: Oxford University Press.
  • [২২৯] Nathaniel T. Jeanson, Ph.D. “Is Evolution an Observable Fact?” http://www.icr.org/article/7165/
  • [২৩০] Henry, Roger “Synchronized Chronology: Rethinking Middle East Antiquity” http://goo.gl/kDfpHK, page 24.

নাস্তিকদের যুক্তি খন্ডন – দার্শনিকঃ মহাবিশ্ব অনন্তকাল থেকে রয়েছে

দার্শনিক: মহাবিশ্ব অনন্তকাল থেকে রয়েছে। পদার্থ এবং শক্তি অবিনশ্বর। এদের সৃষ্টি বা ধ্বংস হয় না। এদের শুধু রূপান্তর হয়। সময় অসীম। মহাবিশ্ব যে একদিন ছিল না, সময় যে একসময় শুরু হয়েছে, এবং একে যে কোনো এক অতিসত্তা সৃষ্টি করেছে, তার প্রমাণ কী?

  • উত্তরঃ মহাবিশ্ব অনন্তকাল থেকে রয়েছে Bertrand Russell এর মতো কিছু বিখ্যাত ফিলসফার এই ধারণাটিকে বেশ জনপ্রিয় করার চেষ্টাকরেছেন। তাদের দাবি হচ্ছে, মহাবিশ্ব আদি এবং অনন্ত। এটি অসীম সময় ধরে চলবে, এবং চলছে। ‘অসীম’ ধারণাটি আসলে একটি ধারণা মাত্র। বাস্তব জীবনে কোনো ‘অসীম’ বলে কিছু নেই, কারণ অসীম ধারণাটি নানা সমস্যার জন্ম দেয়— ১) ধরুন আপনার অসীম সংখ্যক বল রয়েছে। যদি সেখান থেকে দুটি বল নিয়ে নেওয়া হয়, তাহলে কীদাঁড়ায়? “অসিম – ২ = ?” সংখ্যক বল রয়েছে? যদি তাই হয়, তাহলে আমাদের গুণতে পারা উচিত কয়টা বল বাকি থাকলো। যদি গুণতে পারি, তার মানে দাঁড়ায় সেটাএমন একটা সংখ্যা, যার সাথে ২ যোগ করলে হঠাৎ করে সেটা অসীম সংখ্যা হয়ে যায় —যা অবাস্তব। আর যদি গুণতে না পারি, তাহলে অসীম ধারণাটাই অবাস্তব। সুতরাং, অসীম ধারণাটা একটি ধারণা মাত্র, প্রকৃতিতে এর কোনো অস্তিত্ব নেই। বিখ্যাত জার্মান গণিতবিদ David Hilbert বলেছেন— “The infinite is nowhere to be found in reality. It neither exists in nature nor provides a legitimate basis for rational thought…the role that remains for the infinite to play is solely that of an idea.” বাস্তবতায় অসীমের কোনো অস্তিত্ব নেই। এর প্রকৃতিতে কোনো অস্তিত্ব নেই, এটা কোনো যুক্তিযুক্ত চিন্তাভাবনার গ্রহণযোগ্য ভিত্তিও দেয় না… অসীমের একমাত্র ভূমিকা হলো এটি একটি ধারণা মাত্র।[২১৮] ২) ধরুন আপনি একজন সৈনিক। আপনাকে গুলি করার আগে আপনার পেছনের একজন সৈনিকের অনুমতি নিতে হবে। কিন্তু তাকেও তার পেছনের সৈনিকের অনুমতি নিতে হবে, আপনাকে অনুমতি দেওয়ার আগে। এভাবে পেছনের দিকে অসীম সময় পর্যন্ত অনুমতি নেওয়া চলতে থাকবে। যদি তাই হয়, তাহলে আপনি কি কোনোদিন গুলি করতে পারবেন? পারবেন না। এটা প্রমাণ করে যে, এরকম পেছনের দিকে অসীম পর্যন্ত চলতে থাকা — এটি একটি অবাস্তব ধারণা। এরকম হলে কোনোদিন কোনো ঘটনা ঘটতো না। সুতরাং, কখনই অসীম পর্যন্ত কোনো ঘটনার পেছন দিকে যাওয়া যায় না। ৩) আপনাকে এক মিটার লম্বা একটা লাঠি দেওয়া হলো। এখন আপনাকে বলা হলো, তাকে সমান দুইভাগ করতে। তার একটি ভাগকে আবার সমান দুই ভাগ করতে। তার একটি ভাগ নিয়ে আবার সেটাকে সমান দুই ভাগ করতে। এভাবে অসীম সময় পর্যন্ত ভাগ করে যেতে হবে। আপনিকি কোনোদিন অসীম-ক্ষুদ্রতম ভাগটি পর্যন্ত যেতে পারবেন? সুতরাং দেখা যায়, অসীম একটি অবাস্তব ধারণা। এর কোনো বাস্তবতা নেই। এরিস্টটল বলেছেন— “…the infinite is potential, never actual” “অসীম একটি সম্ভাবনা মাত্র, এর কোনো বাস্তব অস্তিত্ব নেই”[২১৯] সুতরাং আমরা দেখতে পাই, কোনো ঘটনার পেছন দিকে অসীম সময় পর্যন্ত যাওয়া যায় না। সুতরাং মহাবিশ্ব কখনই অসীম সময় পর্যন্ত ছিল না, মহাবিশ্ব সসীম। সুতরাং মহাবিশ্বের একটি সূচনা রয়েছে। "সত্য অস্বীকারকারীরা কি দেখে না যে, সবগুলো আকাশ এবং পৃথিবী একসময় একসাথে একটি সত্তা ছিল, তারপর আমি তাদেরকে বিচ্ছিন্ন করেছি? তারা কি দেখে না: আমি প্রতিটি প্রাণ সৃষ্টি করেছি পানি থেকে? এরপরও কি তারা বিশ্বাস করবে না?" [আল-আম্বিয়া ২১:৩০]

নাস্তিকদের যুক্তি খন্ডন – পদার্থবিজ্ঞানীঃ মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়েছে এক অতি-মহাবিশ্ব Multiverse (মাল্টিভার্স)থেকে

পদার্থবিজ্ঞানী: মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়েছে এক অতি-মহাবিশ্ব থেকে। একে কোনো সৃষ্টিকর্তা বানায় নি। এক অতি-মহাবিশ্ব, যাকে মাল্টিভার্স বলা হয়, সেখানে প্রতিনিয়ত সকল ধরনের সৃষ্টি জগত তৈরি হয়। সকল সম্ভাবনা সেখানে বিদ্যমান। এরকম অসীম সংখ্যক মহাবিশ্বের একটিতে আমরা রয়েছি। আরেকটি মহাবিশ্বে হয়ত আমারই মত একজন রয়েছে, যে আমার থেকে একটু লম্বা। আরেকটিতে আমার থেকে একটু খাটো। মোট কথা যত কিছুই ঘটা সম্ভব, তার সবই ঘটেছে, ঘটছে এবং ঘটবে। এই মহাবিশ্বই একমাত্র মহাবিশ্ব, যাকে কোনো একক সত্তা সৃষ্টি করেছে, এর প্রমাণ কী?

  • উত্তরঃ মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়েছে এক অতি-মহাবিশ্ব Multiverse (মাল্টিভার্স)থেকে আজকাল মিডিয়াতে ব্যাপকভাবে নতুন এক ধারণার প্রচারণা শুরু হয়েছে – মাল্টিভার্স থিওরি। বিজ্ঞানীরা দাবি করছে এই মহাবিশ্বের কোনো সৃষ্টিকর্তা নেই। আমাদের মহাবিশ্বটি এক মহা-মহা-মহাবিশ্বের বা মাল্টিভার্স-এর মধ্যে থাকা ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন মহাবিশ্বের মধ্যে একটি। বিজ্ঞানীরা কোনোভাবেই ব্যাখ্যা করতে পারছেন না: কীভাবে আমাদের এই মহাবিশ্বটি এত নিখুঁতভাবে, এত পরিকল্পিতভাবে প্রাণের সৃষ্টির জন্য অত্যন্ত সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করে তৈরি করা হয়েছে। অভিকর্ষ বল যদি ১০০ কোটি ভাগের এক ভাগ বেশি বা কম হতো, তাহলে কোনো গ্রহ সৃষ্টি হতো না, প্রাণের সৃষ্টির কোনো সম্ভাবনাই থাকতো না। বিগ ব্যাংগের সময় যে শক্তির প্রয়োজন ছিল, সেটা যদি ১০^৬০ ভাগের এক ভাগ এদিক ওদিক হতো, তাহলে অভিকর্ষ বলের সাথে অসামঞ্জস্য এত বেশি হতো যে, এই মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়ে বেশিক্ষণ টিকে থাকতে পারতো না। ১০^৬০ হচ্ছে ১ এর পরে ৬০টি শূন্য বসালে যে বিশাল সংখ্যা হয়, সেটি। বিগ ব্যাংগের মুহূর্তে প্ল্যাঙ্ক সময়ের পর মোট পদার্থের যে ঘনত্ব ছিল, সেটা যদি ১০^৫০ ভাগের এক ভাগও এদিক ওদিক হতো, তাহলে মহাবিশ্ব সৃষ্টি হতো না, যাতে আজকের মতো নক্ষত্র, গ্রহ এবং প্রাণ সৃষ্টি হতো।[১০২] — এরকম শত শত ভারসাম্য কীভাবে কাকতালীয় ভাবে মিলে গেলো? কীভাবে এগুলো সব অত্যন্ত নিখুঁতভাবে নির্ধারণ করা হল, যেন নক্ষত্র, গ্রহ, পানি, ভারী মৌলিক পদার্থ সৃষ্টি হয়ে একদিন প্রাণের সৃষ্টি হয়, যেই প্রাণ বিশেষভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়ে একদিন মানুষের মতো বুদ্ধিমান প্রাণীর জন্ম দিবে? — এর পক্ষে তারা কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারছে না। এতগুলো সূক্ষ্ম ভারসাম্য এক সাথে মিলে যাওয়া যে কোনোভাবেই গাণিতিক সম্ভাবনার মধ্যে পড়ে না —এটা তারা বুঝে গেছে। তারা এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে এক নতুন থিওরি নিয়ে এসেছে: আমাদের মহাবিশ্ব আসলে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন মহাবিশ্বের মধ্যে একটি। একেক মহাবিশ্বে পদার্থ বিজ্ঞানের ধ্রুবকগুলোর একেক মান রয়েছে। কিছু মহাবিশ্ব বেশিদিন টিকে থাকতে পারে না, কারণ সেই মহাবিশ্বে পদার্থবিজ্ঞানের ধ্রুবকগুলোর মানগুলোর মধ্যে ভারসাম্য থাকে না। আর কিছু মহাবিশ্বে পদার্থবিজ্ঞানের ধ্রুবকগুলোর মান এমন হয় যে, সেখানে কোনোদিন সূর্যের মতোএকটি তারা এবং পৃথিবীর মতো একটি গ্রহ তৈরি হতে পারে না। যার ফলে সেই সব মহাবিশ্বে কোনো প্রাণ সৃষ্টি হয় না। পদার্থবিজ্ঞানের সুত্রগুলোর যতগুলো সম্ভাব্য সম্ভাবনা হওয়া সম্ভব, সেটা যতই কল্পনাতীত, অবাস্তব একটা ব্যাপার হোক না কেন, যা কিছু হওয়া সম্ভব তার সবকিছুই সেই মাল্টিভারসের ‘ল্যান্ডস্কেপ’-এ কোথাও না কোথাও হয়েছে এবং হয়ে যাচ্ছে। আমরা মানুষেরা, সেই অসীম সংখ্যক সম্ভাবনাগুলোর একটি, যেখানে পদার্থবিজ্ঞানের হাজার হাজার নিয়ম কাকতালীয়ভাবে, কল্পনাতীত সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করে কোনোভাবে মিলে গেছে এবং যার কারণে আজকে আমরা এই মহাবিশ্বে দাঁড়িয়ে নিজেদেরকে উপলব্ধি করতে পারছি।[১০৩] তাদের দাবিটা হচ্ছে এরকম: ধরুন কোনো এক সমুদ্রের তীরে বালুতে আপনি একটি মোবাইল ফোন পড়ে থাকতে দেখে তাদেরকে জিগ্যেস করলেন, এই মোবাইল ফোনটা নিশ্চয়ই কোনো বুদ্ধিমান সত্ত্বা বানিয়েছে। তারা বলবে, “না, কোটি কোটি বছর ধরে সমুদ্রের পানি বালুতে আছড়িয়ে পড়তে পড়তে এবং ঝড়, বৃষ্টি, বজ্রপাতের ফলে বালুতে রায়ায়নিক বিক্রিয়া হয়ে একসময় এই মোবাইল ফোনটি তৈরি হয়েছে। এটি কোনো বুদ্ধিমান সত্ত্বা বানায়নি, এটি পদার্থবিজ্ঞানের সুত্রগুলোর অসীম সব সম্ভাবনাগুলোর একটি। এরকম কোটি কোটি সমুদ্রের তীর আছে যেগুলোর একটিতে হয়তো শুধুই একটা প্লাস্টিকের বাক্স তৈরি হয়েছে, পুরো মোবাইল ফোন তৈরি হতে পারেনি। কিছু তীর আছে যেখানে হয়তো একটা স্ক্রিন পর্যন্ত তৈরি হয়েছে, কিন্তু কোনো বাটন তৈরি হয়নি। আপনি, আমি আসলে সেই অসীম সব সমুদ্রের তীরগুলোর বিশেষ একটিতে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে পদার্থ বিজ্ঞানের সব সম্ভাবনা কাকতালীয় ভাবে মিলে গেছে, যে কারণে এইতীরে একটি সম্পূর্ণ মোবাইল ফোন সৃষ্টি হয়েছে।” এই হচ্ছেমাল্টিভার্স থিওরি। মাল্টিভার্সথিওরির পক্ষে বিন্দুমাত্র প্রমাণ নেই। কিন্তু এনিয়ে শত শত বই, ডিসকভারি চ্যানেলে শত শত প্রোগ্রাম, হাজার হাজার লেকচার এমন ভাবে দেওয়া হচ্ছে যে, এটা বিগ ব্যাং থিওরির এর মতই একটা ফ্যাক্ট। বিজ্ঞানীদের এক বিশেষ দল, যাদের মধ্যে সবাই নাস্তিক, এবং শুধু নাস্তিকই নয়, এদেরকে বিশেষ ভাবে Militant Atheist বলা হয়, এরা উঠে পড়ে লেগেছে ডারউইনের বিবর্তনবাদের মতো মাল্টিভার্স থিওরিকেও মানুষের মধ্যে গলার জোরে ফ্যাক্ট বলে চালিয়ে দেওয়ার। কারণ একমাত্র মাল্টিভার্স থিওরিই পারে – “মহাবিশ্বের কোনো সৃষ্টিকর্তা নেই” – সেটার পক্ষে কোনো ধরণের ‘বিশ্বাসযোগ্য’ চমকপ্রদ ব্যাখ্যা দিতে, যেটা পড়ে সাধারণ মানুষ, যার মহাকাশ বিজ্ঞান নিয়ে ভালো জ্ঞান নেই, অবাক হয়ে ভাবে, “আরে! এতো দেখি চমৎকার এক ব্যাখ্যা! মহাবিশ্বের দেখি সত্যিই কোনো সৃষ্টিকর্তার দরকার নেই!” একারণেই আল্লাহﷻ আমাদেরকে মু’মিন হবার জন্য প্রথম শর্ত দিয়েছেন – "যারা মানুষের চিন্তার ক্ষমতার বাইরে এমন সব বিষয়ে বিশ্বাস করে।" [আল-বাক্বারাহ: ৩] আমাদেরকে মানতে হবে যে, আমরা কোনোদিন প্রমাণ করতে পারবো না: কীভাবে, কী কারণে এই মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়েছে। আমরা কোনোদিন কোনো রেডিও এন্টেনা দিয়ে জান্নাত, জাহান্নাম খুঁজে পাবো না। আমরা কোনোদিন এক্সরে করে ফেরেশতাদেরকে দেখতে পারবো না। আমরা কোনোদিন পদার্থ বিজ্ঞানের কোনো সুত্র দিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারবো না: কীভাবে আমরা মরে, ধ্বংস হয়ে, মহাবিশ্বে ছড়িয়ে যাওয়া আমাদের দেহের অণু পরমাণুগুলো থেকে একদিন আমাদেরকে আবার একই অবস্থায় ফেরত আনা হবে। আমাদেরকে এই সব কিছু বিশ্বাস করতে হবে, কোনোই বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ছাড়া, শুধুই কু’রআনের প্রমানের উপর ভিত্তি করে এই শর্তে যে কু’রআন সন্দেহাতীত ভাবে আল্লাহর ﷻ বাণী। যদি কোনো প্রমাণ না থাকার পরেও বিবর্তনবাদ, ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি, স্ট্রিং-থিওরিতে ঠিকই বিশ্বাস করতে পারি, তাহলে কু’রআনের বাণীর উপর বিশ্বাস না করার পেছনে কোনো যুক্তি থাকতে পারে না, যেখানে কি না কু’রআন যে মানুষের পক্ষে তৈরি করা সম্ভব না, এর পক্ষে শত শত প্রমাণ আছে। একারণে আমরা যদি অদেখায় বিশ্বাস করতে না পারি, তাহলে আমরা কোনোদিন মু’মিন হতে পারবো না।

নাস্তিকদের যুক্তি খন্ডন – মহাকাশ বিজ্ঞানী: মহাবিশ্ব শূন্য থেকে নিজে থেকেই সৃষ্টি হয়েছে

মহাকাশ বিজ্ঞানী: মহাবিশ্ব শূন্য থেকে নিজে থেকেই সৃষ্টি হয়েছে। এর আগে কিছু ছিল না। মহাবিশ্বের কোনো সৃষ্টিকর্তা নেই। Quantum Vaccum কোয়ান্টাম শূন্যতা থেকে মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়েছে। মহাবিশ্ব কোনো স্রস্টা বানিয়েছে, তার প্রমাণ কী?  

  • উত্তরঃ  মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়েছে শূন্য থেকে সবচেয়ে অবৈজ্ঞানিক এবং ফিলসফির দিক থেকে অবাস্তব দাবি হলো: মহাবিশ্ব নিজে থেকেই, শূন্য থেকে সৃষ্টি হয়েছে, এর কোনো কারণ/উৎপাদক নেই। এর মানে দাঁড়ায়: কোনো জিনিস একই সাথে অস্তিত্ব থাকতে পারে, আবার অস্তিত্ব নাও থাকতে পারে। একে সহজ ভাষায় বললে, আপনার মা নিজেই নিজেকে জন্ম দিয়েছেন, কেউ তাকে জন্ম দেয়নি। একদিন তিনি ছিলেন না। তারপর হঠাৎ করে তিনি নিজেই নিজেকে জন্ম দিলেন। P. J. Zwart তার বইয়ে দেখিয়েছেন, এটা কত অবাস্তব একটা দাবি— “If there is anything we find inconceivable it is that something could arise from nothing.” যদি অবিশ্বাস্য বলে কিছু থাকে, তাহলে সেটা হলো যে, কোনো কিছু শূন্য থেকে উৎপত্তি হতে পারে।[২১৬] এরপর বিজ্ঞানীরা তাদের খেলা পালটিয়ে ফেলেন। প্রফেসর স্টিফেন হকিন্স, লরেন্স ক্রাউস-এর মতো বিখ্যাত বিজ্ঞানীরা বলেন, শূন্য বলতে আসলে Quantum Vaccum বা কোয়ান্টাম শূন্যতা বোঝানো হচ্ছে। কোয়ান্টাম শূন্যতা হলো ভৌত কোনো কিছুর অনুপস্থিতি। এটি সব জায়গায় বিরাজমান একটি স্পন্দিত শক্তির ক্ষেত্র। “…is not‘nothing’; it is a structured and highly active entity.” “এটা ঠিক ‘শূন্য’ নয়; এটি বিশেষ গঠনের অত্যন্ত সক্রিয় অস্তিত্ব”[২১৭] মহাবিশ্ব তৈরি হয়েছে একদম শূন্য থেকে, কোয়ান্টাম ফ্ল্যাকচুয়েশানের মাধ্যমে। তখন 'সময়' (Time) এর আচরন আজকের সময়ের মতো ছিলো না। তখন সময়ের আচরন ছিলো 'স্থান' (Space) এর মতো। কারন, এই ফ্ল্যাকচুয়েশান হবার জন্য প্রাথমিকভাবে সময়ের দরকার ছিলো না, স্থানের দরকার ছিলো।কিন্ত এর সমস্যা হল, তারা এই কথা বলেন নি যে,যে সময় (Time) মহাবিশ্বের একদম শুরুতে 'স্থান' এর মতো আচরন করেছে, সেই 'সময়' পরবর্তীতে ঠিক কেন আবার Time এর মতো আচরন শুরু করল। তারা বলেছেন প্রকৃতি শূন্যস্থান পছন্দ করেনা। তাই, শূন্যস্থান পূরণ করতে আপনা আপনি কোয়ান্টাম ফ্ল্যাকচুয়েশান হয়ে মহাবিশ্ব তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন হলো- যেখানে শূন্যস্থান নিয়ে কথা হচ্ছে, যখন সময় ছিলো না,স্থান ছিলো না, তখন প্রকৃতি কোথা থেকে আসল? এই কোয়ান্টাম শূন্যতা আসলো কোথা থেকে? কে একে সৃষ্টি করলো? কীভাবে এটি এমন সব গুণ পেল, যা থেকে এটি এক বিশাল মহাবিশ্ব বিশেষভাবে ডিজাইন করে তৈরি করতে পারে? কোয়ান্টাম শুন্যতার কি কনশাসনেস বা বুদ্ধিমত্তা রয়েছে? কোয়ান্টাম বিজ্ঞানের সেই নিয়মগুলো আসলো কোথা থেকে? এগুলো সবই হচ্ছে স্রস্টাকে অস্বীকার করার জন্য নানা অজুহাত। মহাবিশ্বের যে সৃষ্টি হয়েছে, সেটার কোনো সঠিক ব্যাখ্যা বিজ্ঞানীরা দিতে পারছে না।আবার একই সাথে মানতে পারছে না যে, স্রস্টা বলে কেউ আছে। তাহলে কী করা যায়? ‘কোয়ান্টাম ভ্যাকুয়ম’ নামের এক মহাজটিল অস্তিত্ব জন্ম দেই। তাহলে বেশ কিছুদিন এটানিয়ে মানুষকে ঘোল খাওয়ানো যাবে। আপনি মহাবিশ্বের অনেক বৈজ্ঞানিক ব্যাখা দিতে পারেন। কিন্তু সমস্যাটা হচ্ছে আপনার ব্যাখা গুলো শুধু কিভাবে হয়েছে তা নিয়ে। কিন্তু কেন হয়েছে তার ব্যাখা আজ পর্জন্ত বিজ্ঞ্যান দিতে পারেনি। আপনাকে জিজ্ঞেস করা হল আপনি কেন ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম গেলেন। আপনি বললেন ঢাকা-চট্ট রুটের বাসে উঠেছি। বাস এসে নামিয়ে দিয়ে গেছে। তাহলে তো উত্তর হল না।

খ্রিষ্টানদের দাবী তাওরাত, ইঞ্জিল কেউ পরিবর্তন করতে পারবে না

খ্রিস্টানদের দাবি: আল্লাহ তা‘আলার  বাণী কেউ পরিবর্তন করতে পারে না। তাওরাত, ইঞ্জিল, কিতাবুল মুকাদ্দাস আল্লাহ তা‘আলার কালাম। এইগুলো কেউ পরিবর্তন করতে পারবে না।


খ্রিস্টানদের প্রমাণঃ لَهُمُ الْبُشْرَى فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآَخِرَةِ لَا تَبْدِيلَ لِكَلِمَاتِ اللَّهِ ذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ অর্থ: তাদের জন্য সুসংবাদ পার্থিব জীবনে ও পরকালীন জীবনে। আল্লাহ তা‘আলার কথার কখনো হের-ফের হয় না। এটাই হলো মহা সফলতা। وَلَقَدْ كُذِّبَتْ رُسُلٌ مِنْ قَبْلِكَ فَصَبَرُوا عَلَى مَا كُذِّبُوا وَأُوذُوا حَتَّى أَتَاهُمْ نَصْرُنَا وَلَا مُبَدِّلَ لِكَلِمَاتِ اللَّهِ وَلَقَدْ جَاءَكَ مِنْ نَبَإِ الْمُرْسَلِينَ “আপনার পূর্ববর্তী অনেক পয়গাম্বরকে মিথ্যা বলা হয়েছে। তাদের কাছে আমার সাহায্য পৌঁছা পর্যন্ত তারা নির্যাতিত হয়েছেন। তারা এতে সবর করেছেন আল্লাহ তা‘আলার বাণী কেউ পরিবর্তন করতে পারে না। আপনার কাছে পয়গাম্বরদের কিছু কাহিনী পৌঁছেছে।” আয়াতের সঠিক তাফসীর : আপনার পূর্বে অনেক রাসূলকে অবশ্যই মিথ্যাবাদী বলা হয়েছে; কিন্তু তাদেরকে মিথ্যাবাদী বলা ও (বিভিন্ন ধরনের) কষ্ট দেওয়া সত্ত্বেও তাঁরা ধৈর্যধারণ করেছিল যে পর্যন্ত না আমার সাহায্য তাদের নিকট এসেছে। (যার মাধ্যমে বিরোধীরা পরাজিত হয়েছে) (এমনিভাবে আপনিও ধৈর্যধারণ করুন, আল্লাহ তা‘আলার সাহায্য আপনার কাছে আসবে।) কারণ আল্লাহ তা‘আলার কথার ( সাহায্য-সফলতার ওয়াদা সমূহ) কোনো পরিবর্তনকারী নেই। (সূরা আন-আম: ৩৪) وَلَا مُبَدِّلَ لِكَلِمَاتِ اللَّهِ সুতরাং, ‘আল্লাহ তা‘আলার কথা’ বলতে দুনিয়া আখিরাতে সাহায্য ও সফলতার কথা বুঝানো হয়েছে।  
  • যেভাবে অপব্যাখ্যা করে : খ্রিস্টানদের রচিত বই “গুনাহগারদের বেহেস্তে যাওয়ার পথ” এর ৮নং পৃষ্ঠায় এই আয়াতের অপব্যাখ্যা করেছে এভাবে “তাই যখন আমি বলি খ্রিস্টান, ইহুদীগণ কিতাব বদলাইয়া ফেলিয়াছে তখন আমি উপরি উক্ত আয়াত অস্বীকার করিতেছি না? আমরা যদি বলি শুধু কুরআন শরীফই আল্লাহ তা‘আলার কালাম, তখন কি আমরা আল্লাহ তা‘আলার কালামকে অস্বীকার করিতেছি না? তাওরাত, ইঞ্জিল ও কিতাবুল মুকাদ্দাস এইগুলো আল্লাহ তা‘আলার কালাম। আর আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন যে তাঁর বাণী কেউ পরিবর্তন করতে পারবে না। সুতরাং, এই গ্রন্থগুলো প্রতিষ্ঠা করতে হবে এইগুলো পরিবর্তন হয়নি।
 
  • ১নং উত্তর : উপরোক্ত আয়াতে কালেমা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো-ওয়াদা (প্রতিশ্রুতি)। আয়াতের শুরুতে যেই ওয়াদা গুলো করা হয়েছে সেই ওয়াদা কেউ পরির্বতন করতে পারবে না। وَلَا مُبَدِّلَ لِكَلِمَاتِ اللَّهِ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনে আব্বাস রা. বলেন: “আল্লাহ তা‘আলারবাণী কেউ পরিবর্তন করতে পারে না।” অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলার ওয়াদাহ সমূহ। এই ওয়াদাগুলো মজুবত করা”
 
  • ২নং উত্তর : খ্রিস্টান ভাইদেরকে আমি বলব, প্রথমে আপনি প্রমাণ করুন বাইবেল, কিতাবুল মুকাদ্দাস, তাওরাত-ইঞ্জিল এগুলো আল্লাহ তা‘আলার কালাম। একথা কুরআন ও বাইবেলে কোথাও নেই। তাওরাত, ইঞ্জিল, কিতাবুল মুকাদ্দাস আল্লাহ তা‘আলার কালাম একথা হলো মুসলমানদের বিভ্রান্ত করার জন্য খ্রিস্টান প্রচারকদের মনগড়া বানানো একটা কথা। যার কোনো প্রমাণ নেই। উপরি উক্ত আয়াত থেকে একথা কখনো প্রমাণিত হয় না যে, তাওরাত-ইঞ্জিল আল্লাহ তা‘আলার কালাম।
 
  • ৩নং উত্তর : প্রচলিত তাওরাত, ইঞ্জিল বা বাইবেল কোনটিই যেহেতু আল্লাহ তা‘আলার কালাম নয়, তাই এগুলো পরির্বতন হতেই পারে। বর্তমান তাওরাত-ইঞ্জিল ও বাইবেলে যে পরিবর্তন সাধিত হয়েছে তার অসংখ্য প্রমাণ বাইবেলে বিদ্যমান। তার কিছু প্রমাণ নি¤েœ উল্লেখ করছি।
 
  • সেগুলো থেকে মাত্র একটি প্রমাণ এখানে পেশ করছি
  • ১. কেরী বাইবেলের ভূমিকাতেই লেখা হয়েছে “গত দুইশত বৎসরে বেশ কয়েকবার এই বাইবেল সংশোধিত হয়েছে এবং প্রায় ৫০ বৎসর পূর্বে শেষ বারের মতো সংশোধিত হইয়া ছিল বলিয়া জানা যায়। বেশ কয়েক বৎসর পূর্বে দুই বাংলার বাইবেল সোসাইটির নীতি নির্ধারকগণ বর্তমান প্রজন্মের জন্য বাইবেলের আরও একটি সংশোধনের প্রয়োজন আছে বলে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেন।
 
  • প্রিয় পাঠক! আপনি-ই বলুন- আল্লাহ তা‘আলারকালামের কি কোনো সংশোধনের প্রয়োজন হয়?। আর যেটা সংশোধনের প্রয়োজন হয়, সেটা আল্লাহ তা‘আলার কালাম নয়। বাইবেল বা কিতাবুল মুকাদ্দাস ইত্যাদির যেহেতু সংশোধনের প্রয়োজন হয়। তাই সেটা আল্লাহ তা‘আলারকালাম নয়। এর মধ্যে পরিবর্তন পরিবর্ধন হয়। এর জ্বলন্ত একটি প্রমাণ নি¤েœ পেশ করছি। ‘বাইবেলের ২বংশাবলী ২১:২০; এ আছে অহসিয়র পিতা যিহুরাম রাজার বিবরণ। তিনি ৩২ বছর বয়সে রাজত্ব লাভ করেন। ৮ বছর রাজত্ব করেন। এরপর তিনি মারা যান। মৃত্যুকালীন সময়ে তার বয়স ছিল ৪০ বছর। তার মৃত্যুর পর তারই কনিষ্ঠ ছেলে অহসিয় রাজত্বভার গ্রহণ করেন। সে সময় তার বয়স ছিল ৪২ বছর । তাহলে বোঝা গেল পিতার চেয়ে ছেলে দুই বছরের বড়’। আর পিতা পুত্রের চেয়ে দুই বছরের ছোট।
  • প্রিয় পাঠক! এটা ছিল কেরী বাইবেলের তথ্য। মজার বিষয় হলো, বাইবেলের পরবর্তী সংস্করণে(জেনারেল ভার্সন) ৪২বিয়াল্লিশ এর স্থানে ২২ বাইশ বছর লাগিয়ে দিয়েছে। এবার আপনারা বলুন, এটা যদি আল্লাহ তা‘আলার কালাম হয় তাহলে ৪২ বিয়াল্লিশ বছর পরিবর্তন করে ২২ লাগানোর বা পরিবর্তনের দায়িত্ব মানুষের কাঁধে তুলে নিল কেন?
  • ৪নং উত্তর :
  • প্রচলিত তাওরাত-ইঞ্জিল আল্লাহ তা‘আলারকালাম নয় বরং পরিবর্তিত একটি গ্রন্থ। এখানে কুরআন থেকেই তার প্রমাণ পেশ করছি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন , مَا نَنْسَخْ مِنْ آَيَةٍ أَوْ نُنْسِهَا نَأْتِ بِخَيْرٍ مِنْهَا أَوْ مِثْلِهَا أَلَمْ تَعْلَمْ أَنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ (১০৬) “আমি কোনো আয়াত রহিত করলে অথবা বিস্মৃত করিয়ে দিলে তদপেক্ষা উত্তম অথবা তার সমপর্যায়ের আয়াত আনয়ন করি। তুমি কি জানো যে, আল্লাহ তা‘আলা ্ সব কিছুর ওপর শক্তিমান?” প্রচলিত তাওরাত-ইঞ্জিল আল্লাহ তা‘আলারকালাম নয় বরং; বিকৃত ও মানবরচিত গ্রন্থ কুরআনে তার অনেক প্রমাণ পাওয়া যায়। পাঠকদের বোঝার সুবিধার্থে নি¤েœ কয়েকটি প্রমাণ উল্লেখ করলাম।
 
  • ১ নং প্রমাণ: وَمِنْهُمْ أُمِّيُّونَ لَا يَعْلَمُونَ الْكِتَابَ إِلَّا أَمَانِيَّ وَإِنْ هُمْ إِلَّا يَظُنُّونَ (৭৮) فَوَيْلٌ لِلَّذِينَ يَكْتُبُونَ الْكِتَابَ بِأَيْدِيهِمْ ثُمَّ يَقُولُونَ هَذَا مِنْ عِنْدِ اللَّهِ لِيَشْتَرُوا بِهِ ثَمَنًا قَلِيلًا فَوَيْلٌ لَهُمْ مِمَّا كَتَبَتْ أَيْدِيهِمْ وَوَيْلٌ لَهُمْ مِمَّا يَكْسِبُونَ (৭৯) তোমাদের কিছু লোক নিরক্ষর। তারা মিথ্যা আকাক্সক্ষাছাড়া আল্লাাহ্র গ্রন্থের কিছুই জানে না। তাদের কাছে কল্পনা ছাড়া কিছুই নেই। অতএব, তাদের জন্য আফসোস। যারা নিজ হাতে গ্রন্থ লেখে এবং বলে, এটা আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ- যাতে এর বিনিময়ে সামান্য অর্থ গ্রহণ করতে পারে। অতএব, তাদের প্রতি আক্ষেপ তাদের হাতের লেখার জন্যে এবং তাদের প্রতি আক্ষেপ তাদের উপার্জনের জন্যে।” প্রিয় পাঠক! উপরোক্ত কুরআনের বিবরণী থেকে বুঝতে পেরেছেন তারা কীভাবে তাদের ধর্মগ্রন্থের পরিবর্তন করেছে। এখনও পোপ বা ফাদারগণ টাকার বিনিময়ে পাপ ক্ষমা করিয়ে দেন। কোনো খ্রিস্টান যদি বড় ধরনের পাপকর্ম করে, তারা পোপের কাছে টাকা দিয়ে পাপ মার্জনা করিয়ে আনে। আয়াতের দ্বিতীয় অংশ তাদের বাস্তব কর্মের সাথে মিলে যায়। আল্লাহ তা‘আলা নিজেই তাদের জন্য আক্ষেপ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা সকল খ্রিস্টান ও অমুসলিম ভাই-বোনকে আল্লাহ তা‘আলারকথাগুলো অনুধাবন করার তৌফিক দিন এবং হেদায়াত দান করুন। আমিন।
 
  • ২নং প্রমাণ: প্রচলিত তাওরাত-ইঞ্জিল আল্লাহ তা‘আলার কালাম নয়। এগুলোর পূর্বের কিতাবে যা কিছু ছিল সেগুলোও তারা পরিবর্তন করেছে। দেখুন আল্লাহ তা‘আলা বলেন- يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ لَا يَحْزُنْكَ الَّذِينَ يُسَارِعُونَ فِي الْكُفْرِ مِنَ الَّذِينَ قَالُوا آَمَنَّا بِأَفْوَاهِهِمْ وَلَمْ تُؤْمِنْ قُلُوبُهُمْ وَمِنَ الَّذِينَ هَادُوا سَمَّاعُونَ لِلْكَذِبِ سَمَّاعُونَ لِقَوْمٍ آَخَرِينَ لَمْ يَأْتُوكَ يُحَرِّفُونَ الْكَلِمَ مِنْ بَعْدِ مَوَاضِعِهِ. “হে রসূল, তাদের জন্যে দুঃখ করবেন না যারা দৌড়ে গিয়ে কুফুরিতে পতিত হয়, যারা মুখে বলে: ‘আমরা মুসলমান’ অথচ তাদের অন্তর মুসলমান নয় এবং যারা ইহুদি, মিথ্যা বলার জন্যে তারা গুপ্তচর বৃত্তি করে। তারা অন্যদলের গুপ্তচর বৃত্তি করা, যারা আপনার কাছে আসেনি। তারা বাক্যকে স্বস্থান থেকে পরিবর্তন করে।” এই আয়াতের প্রথম অংশের সম্বোধনটি মিলে যায় বর্তমান কিছু খ্রিস্টানদের সাথে। তারা নিজেদের মুসলমান হিসেবে দাবি করতে চায়। নিজেদেরকে ‘ঈসায়ী মুসলিম’ বলে। কোথাও আবার ‘আহলুল কুরআন’ বলে পরিচয় দেয়। মূলত, এরা খ্রিস্টান। মুসলমানদের ধোঁকা দেয়ার জন্যই এই নাম ব্যবহার করে। তারা মুসলমানদেরকে ‘কিতাবুল মোকাদ্দাস’ নামক একটি ধর্মীয় গ্রন্থ দেয়। গ্রন্থটি মূলত বাইবেল। মুসলমানদের ধোঁকা দেয়ার জন্য বাইবেলে যোগ করেছে ইসলামী পরিভাষা। বাদ দিয়েছে হিন্দুদের পরিভাষা। যেমন যীশুর স্থানে হযরত ‘ঈসা’ ইত্যাদি। হে আল্লাহ তা‘আলা ! তাদেরকে হেদায়াত দান করুন। মুসলমানদেরকে তাদের চক্রান্ত থেকে হেফাজত করুন। এব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআনে বলেন “তারা বাক্যকে স্বস্থান থেকে পরিবর্তন করে।” যেমন, বাইবেল পরিবর্তন করে বানিয়েছে কিতাবুল মুকাদ্দাস। এমন বহু প্রমাণ আমাদের কাছে আছে। বইটির কলেবর বৃদ্ধির জন্য এখানে উল্লেখ করা সম্ভব হলো না।
 
  • ৩নং প্রমাণ: يَا أَهْلَ الْكِتَابِ قَدْ جَاءَكُمْ رَسُولُنَا يُبَيِّنُ لَكُمْ كَثِيرًا مِمَّا كُنْتُمْ تُخْفُونَ مِنَ الْكِتَابِ وَيَعْفُو عَنْ كَثِيرٍ قَدْ جَاءَكُمْ مِنَ اللَّهِ نُورٌ وَكِتَابٌ مُبِينٌ. “ হে আহ্লে-কিতাবগণ! তোমাদের কাছে আমার রাসূল আগমন করেছেন। কিতাবের যেসব বিষয় তোমরা গোপন করতে, তিনি তার মধ্য থেকে অনেক বিষয় প্রকাশ করেন এবং অনেক বিষয় মার্জনা করেন। তোমাদের কাছে এসেছে একটি উজ্জ্বল জ্যোতি এবং একটি সমুজ্জ্বল গ্রন্থ।”
 
  • নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মাধ্যমে তাদের স্বরূপ উদঘাটিত হয়েছে। কুরআনে এসেছে- এ গ্রন্থকে খ্রিস্টানদের মানা উচিত। এটি একটি সমুজ্জল গ্রন্থ। পবিত্র কুরআনের বাণী দ্বারা পরিষ্কারভাবে আমরা জানতে পারলাম, ইহুদি-খ্রিস্টানগণ তাদের গ্রন্থের কিছু অংশ গোপন করেছে, নিজ হাত দ্বারা লিখে পরিবর্তন করে দিয়েছে। আর বলছে, এইগুলো আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। আল্লাহ তা‘আলা ্র বাণী। এছাড়া, আরও বহু প্রমাণ কুরআনে বিদ্যমান। এখানে, কয়টি উল্লেখ করলাম।
 
  • সুতরাং, উক্ত সংক্ষিপ্ত আলোচনার দ্বারা স্পষ্ট বুঝা গেল, বর্তমান প্রচলিত ইঞ্জিল যদি ঈসা আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর অবতারিত ইঞ্জিল হতো তাহলে কখনো তাতে আকাশে উঠিয়ে নেয়ার পরবর্তী ঘটনা থাকতো না। তাওরাত-ইঞ্জিল যদি আল্লাহ তা‘আলা ্র বাণী-ই হতো, তবে তাতে কোনো প্রকারের ভুল-ভ্রান্তি, বৈপরীত্য বা অশ্লীল কথা থাকতো না। অথচ, তাতে হাজারো ভুল ও বৈপরিত্য পরিলক্ষিত হয়। বহু ইহুদি-খ্রিস্টান-গবেষক তাদের গ্রন্থের উপর গবেষণা করে একথা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে-এই গ্রন্থ নবীগণের অনেক পরবর্তী যুগের কোনো ব্যক্তিবর্গের রচিত। ফলে, এতে রয়েছে ব্যাপক ভুল-ভ্রান্তি ও বৈপরিত্য। এ বিষয়ে সামনে আলোচনা করবো ইনশাআল্লাহ তা‘আলা ।
 
  • সুতরাং, বর্তমান কথিত তাওরাত, ইঞ্জিল ও কিতাবুল মুকাদ্দাস যেহেতু আল্লাহ তা‘আলার বাণী নয়, তাই পবিত্র কুরাআন তথা আল্লাহ তা‘আলার বাণী দ্বারা তাওরাত-ইঞ্জিল পরিবর্তিত না হওয়ার ব্যাপারে দলিল পেশ করা নিতান্তই হাস্যকর ব্যাপার। “কথায় আছে চুরির চুরি আবার সিনাজুরি।” আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে হেদায়াত দান করুন। আমিন।

ব্যভিচারের একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদন্ড

এমনকি পরনারীর প্রতি দৃষ্টিপাতকে ঈসা মসীহ ব্যভিচার বলে গণ্য করেছেন এবং উক্ত ব্যক্তিকে তার চোখ তুলে ফেলে দিতে বলেছেন। তিনি বলেন “যে কেহ কোনো স্ত্রীলোকের প্রতি কামভাবে দৃষ্টিপাত করে, সে তখনই মনে মনে তাহার সহিত ব্যাভিচার করিল। আর তোমার দক্ষিণ চক্ষু যদি তার বিঘœ জন্মায় তবে তাহা উপড়াইয়া দূরে ফেলে দাও, কেননা সমস্ত শরীর নরকে নিক্ষিপ্ত হওয়া অপেক্ষা বরং একটি অঙ্গের নাশ হওয়া তোমার পক্ষে ভালো। অন্যত্র মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেন قُلْ يَا أَهْلَ الْكِتَابِ تَعَالَوْا إِلَى كَلِمَةٍ سَوَاءٍ بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ أَلَّا نَعْبُدَ إِلَّا اللَّهَ وَلَا نُشْرِكَ بِهِ شَيْئًا وَلَا يَتَّخِذَ بَعْضُنَا بَعْضًا أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللَّهِ فَإِنْ تَوَلَّوْا فَقُولُوا اشْهَدُوا بِأَنَّا مُسْلِمُونَ অর্থ: বলুন, হে আহ্লে-কিতাবগণ! একটি বিষয়ের দিকে আস, যা আমাদের মধ্যে ও তোমাদের মধ্যে সমান; আমরা আল্লাহ তা‘আলা ্্ ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করব না; তার সাথে কোনো শরীক সাব্যস্ত করব না এবং একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাকে ছাড়া কাউকে প্রতিপালক বানাব না। তারপর যদি তারা স্বীকার না করে, তাহলে বলে দাও যে সাক্ষী থাক আমরা তো অনুগত। এবার আমি খ্রিস্টান ভাইদেরকে বলতে চাই, “ভাই! আপনাদের প্রতি কুরআন নির্দেশ দিয়েছে। আপনারা তাওরাত-ইঞ্জিলের বিধিবিধান প্রতিষ্ঠা করবেন, তাওরাত-ইঞ্জিলের নামে শিরক ও ব্যভিচার প্রতিষ্ঠা বা প্রচারের নির্দেশ দেননি। আগে আপনারা খ্রিস্টানগণ আপনাদের ব্যক্তি, দেশ ও রাষ্ট্রগুলিতে তাওরাত-ইঞ্জিলের তাওহীদ ও বিধি-বিধান প্রতিষ্ঠা করুন। শিরক, ব্যভিচার ইত্যাদি পাপের শাস্তি প্রতিষ্ঠা করুন-যা আপনাদের কিতাব নির্দেশ দেয়। সকল খ্রিস্টান চার্চে ঈসা মসীহ, তার মাতা মরিয়ম ও অন্যান্য অগণিত মানুষের প্রতিমা বিদ্যমান। তাওরাত-ইঞ্জিলের বিধান অনুসারে এগুলো ধ্বংস করুন। যারা এগুলিকে বানিয়েছে, এগুলোতে ভক্তি বা মানত-উৎসর্গ করেছে বা উৎসাহ দিয়েছে। তাদের সকলকে মৃত্যুদ- প্রদান করুন। এরপর তাওরাত-ইঞ্জিল নিয়ে আসুন।” আচ্ছা ভাই! আপনারা কোন তাওরাত ইঞ্জিলের কথা বলছেন? ঈসা আ.-কে আকাশে উঠিয়ে নেয়ার পর ৩০০ বছরের মধ্যে যেই ইঞ্জিল ছিল, এমন একটি ইঞ্জিল দেখাতে পারবেন কি? নিশ্চয়ই, আপনারা পারবেন না। আপনাদের পূর্ববর্তী লোকেরাও পারেনি। আরও একটি অনুরোধ রইল- আপনারা এভাবে কুরআনের অপব্যাখ্যা করবেন না। পারলে আপনাদের বাইবেল দ্বারা ধর্ম প্রচার করুন যদি আপনারা সেটাকে সঠিক বলে বিশ্বাস করেন। আপনাদের জন্য দুআ করি, আল্লাহ তা‘আলা আপনাদেরকে হেদায়াত দান করুন। ইসলাম গ্রহণ করার তৌফিক দান করুন। জাহান্নামের চিরস্থায়ী আগুন থেকে বাঁচার তৌফিক দান করুন। আমিন।

বাইবেলে কুফর-শিরক এর শাস্তি মৃত্যুদন্ড- 

বাইবেলে আছে-আর যদি ঐদিন কোনো ব্যক্তি, পুরুষ, নারী, ছোট-বড়, যে কেউ কোনো মূর্তি, প্রতিমা, ছবি প্রতিকৃতি প্রতিষ্ঠা করে, শিরক করে বা শিরকের প্রচারণা করে বা প্ররোচনা দেয়, তাহলে তাকে পাথরের আঘাতে হত্যা করতে হবে। এমনকি যদি কোনো নবীও অনেক মুজেযা দেখানোর পর কোনোভাবে শিরকের প্ররোচনা দেন, তাহলে তাকেও পাথরের আঘাতে হত্যা করতে হবে। যদি কোনো জনপদবাসী শিরকে পতিত হয়, তাহলে সে গ্রামের বা নগরের সকলকে অবশ্যই হত্যা করতে হবে এবং সে গ্রামের পশু-পক্ষি হত্যা করতে হবে। গ্রামের সকল সম্পদ ও দ্রব্যাদি পুড়িয়ে ফেলতে হবে। এক্ষেত্র তওবার কোনো সুযোগ নেই।

বাইবেল মতে খ্রিষ্টানরা বাংলাদেশে খৃষ্ট ধর্ম প্রচার করতে পারবেনা

খ্রিস্টান প্রচারকদের বলবো, আপনি এদেশে খ্রিস্টধর্ম প্রচার করতে পারবেন না। কারণ, আপনি যে ধর্মীয় গ্রন্থ বাইবেল বা কিতাবুল মোকাদ্দাস মানেন, তাতেই লেখা আছে যে যীশু শুধুমাত্র বনী  ইসরাইলদের নিকট প্রেরিত হয়েছেন। যেমন, যীশু বলেন- “আমাকে শুধু বনী ইস্রায়েলের হারানো মেষদের নিকট পাঠানো হয়েছে। আরো বলা হয়েছে- “তোমরা অইহুদীর নিকট যেয়ো না। বরং ইস্রায়েল জাতির হারানো ভেড়াদের কাছে যেয়ো। ” এ ধর্ম মানতে হলে আপনাদেরকে ইসরাঈলে যেতে হবে। কারণ, সেখানে বনি ইস্রায়েলের লোকজন থাকে বাংলাদেশে না ।

কুরআন শুধু মক্কা ও তার আশেপাশের লোকদের জন্য

খ্রিস্টানদের দাবি: কুরআন শুধুমাত্র মক্কা ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার লোকদের জন্য নাযিল হয়েছে। তাদের দলিল: وَكَذَلِكَ أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ قُرْآَنًا عَرَبِيًّا لِتُنْذِرَ أُمَّ الْقُرَى وَمَنْ حَوْلَهَا وَتُنْذِرَ يَوْمَ الْجَمْعِ لَا رَيْبَ فِيهِ فَرِيقٌ فِي الْجَنَّةِ وَفَرِيقٌ فِي السَّعِيرِ. অর্থ: এমনিভাবে আমি আপনার প্রতি আরবি ভাষায় কোরআন নাযিল করেছি, যাতে আপনি মক্কা ও তার আশে-পাশের লোকদের সতর্ক করেন এবং সতর্ক করেন সমাবেশের দিন সম্পর্কে- যাতে কোনো সন্দেহ নেই। একদল জান্নাতে এবং একদল জাহান্নামে প্রবেশ করবে। আয়াতের সঠিক ব্যাখ্যা : “হাওলাহু” শব্দের ব্যাখ্যায় তাফসীরে ইবনে কাসীর ৪নং খন্ডের. ১০৯নং পৃ: রয়েছে (‘মিন সায়িরিল বিলাদী শরকান ওয়া গরবান’) সারা পৃথিবীর পূর্ব থেকে পশ্চিমে। আর তাফসীরে কুরতুবীতে ১৬নং খন্ডের ৬নং পৃ: রয়েছে (‘মিন সায়িরিল খলকি’) সকল সৃষ্টি। আর তাফসীর বগভী ৪/১২০ রয়েছে (‘কুরাল আরযী কুল্লাহা’) পৃথিবীর সকল ভূমি। সুতরাং, এ সমস্ত তাফসীরের মাধ্যমে বুঝা গেল ‘হাওলাহু’ দ্বারা সমস্ত পৃথিবী বুঝানো হয়েছে। যেভাবে অপব্যাখ্যা করে: খ্রিস্টানগণ এই আয়াত দ্বারা প্রমাণ করতে চায়, কুরআন শুধুমাত্র মক্কাবাসী ও তার পার্শ্ববর্তী কয়েকটি এলাকার জন্য। যেমন তাদের বই ‘গুনাহগারদের জন্য বেহেস্তে যাওয়ার পথ’ নামক, বইয়ের ১৩নং পৃষ্ঠায় লেখা হয়েছে....“কুরআন শরীফ অবতীর্ণ করা হয়েছে আরবি ভাষায়, যাতে মক্কা ও তার চতুর্দিকের জনগণকে সতর্ক করতে পারে। এখানে মনে রাখা উচিৎ চতুুর্দিকের বলতে সমস্ত বিশ্বকে বুঝায় না। র্অথাৎ মক্কা ও তার চতুর্দিকের আরবি ভাষাভাষী লোকদের বুঝায়। ” আমরা হলাম বাংলাদেশি, মক্কা থেকে অনেক দূরে- সুতরাং কুরআন আমাদের জন্য নয়। দ্বিতীয় বিষয় হলো কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে আরবি ভাষায়, আরবদের জন্য। আমাদের ভাষা হলো বাংলা। আরবি আমাদের ভাষা নয়। অতএব, কুরআন আমাদের জন্য নয়। ১নং উত্তর : ১. حَوْلَهَঅর্থ চারপাশ, মক্কা হলো পৃথিবীর নাভি। মূল কেদ্রবিন্দু। ‘চারপাশ’ বলার দ্বারা নির্দিষ্ট কোনো স্থানে সীমাবদ্ধ থাকে না। যেমন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে মক্কা ছাড়াও কেসরা, কায়সার, শাম, য়েমেন ইত্যাদি দেশে দাওয়াত দিয়েছেন। আধুনিক বর্তমান বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন, গোলাকার পৃথিবীর মধ্যস্থল হলো মক্কা নামক নগরী। অতএব حَوْلَه দ্বারা পুরো পৃথিবীই উদ্দেশ্য। পুরো পৃথিবীর মানুষকেই কুরআন মানতে হবে। আর কুরআন হল সকল মানুষের জন্য। ২. কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে সমগ্র মানবজাতির জন্য। আল্লাহ তা‘আলা বলেন : شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآَنُ هُدًى لِلنَّاسِ অর্থ: “রমযান মাসই হল সে মাস, যাতে নাযিল করা হয়েছে কুরআন, যা ‘মানুষের’ জন্য হেদায়েত”। ২নং উত্তর : আল্লাহ তা‘আলা উল্লিখিত আয়াতে حَوْلَهَ দ্বারা কোনো সীমানা নির্দিষ্ট করেননি। বলেননি যে, চতুর্পাশে ৩০ মাইল বা ৪০ মাইল, ইত্যাদি। এমন কোনো সীমানা ধার্য করেননি। এই আয়াতই-প্রমাণ করে কুরআন হলো বিশ্বজনীন। ৩নং উত্তর : মক্কায় তৎকালীন সময়ে সকল জাতির লোক বসবাস করত। তাই তাকে উম্মুল কুরা বা প্রাণকেন্দ্র বলা হয়েছে। যেমন : ঢাকা বাংলাদেশের প্রাণকেন্দ্র। এখানে, পুরো দেশের সব জাতির লোক বসবাস করে। আর “উম্মুল কুরা” বলে কখনই প্রমাণ হয় না যে, কুরআন শুধুই মক্কাবাসীর জন্য । ৪নং উত্তর তারপরও যদি কেউ একথা মানতে না চাই যে, তিনি সমস্ত পৃথিবীর জ্বীন ও মানবের নবী ছিলেন। তাহলে, আমরা বলবো তোমার কথা যদি আমরা কিছুক্ষণের জন্যও মেনে নেই যে, তিনি মক্কা ও তার আশেপাশের লোকদের নবী ছিলেন গোটা পৃথিবীর নবী ছিলেন না। তবে স্মরণ রেখো যেহতু মক্কাবাসী ও তার আশে পাশের লোকেরা নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকটাত্মীয় প্রতিবেশী ও আশেপাশের মানুষ ছিলন। এই কারণে তারাই ইসলামের দাওয়াত পাওয়ার বেশী হকদার ছিল। কারণ কুরআন ও হাদীস দ্বারা নিকটাত্মীয় প্রতিবেশী আশেপাশের মানুষের সবচেয়ে বেশী অধিকার সাব্যস্ত হয়েছে। তাই, বিশেষ করে তাদের কথাই বলা হয়েছে। আর আমরা জানি বিশেষ ভাবে কাউকে বলার দ্বারা অন্যরা উক্ত হুকুম থেকে বের হয়ে যায় না। এর অসংখ্য প্রমাণ আমাদের সামনে রয়েছে। “ওয়ামা র্আসাল্নাকা ইল্লা কাফ্ফাতাল লিন্নাস” (সূরা সাবা আয়াত ২৮.) আমি আপনাকে সারা পৃথিবীর সকল মানুষের নবী ও রাসুল বানিয়ে পাঠিয়েছি। ( তাফসীরে কাসির ৯/৫৮০) মক্কা নগরীকে উম্মুল কুরা বলার কারণ হলো, ‘উম্মা’ অর্থ হলো মূল। উম্মুল কুরা অর্থ জনপদসমূহের মূল অর্থাৎ মক্কা। পৃথিবীর মধ্যে মক্কা সবচে বলা হয়েছে সম্মানিত ও মর্যাদাসম্পন্ন স্থান পাশাপাশি তার মধ্যে বায়তুল্লাহ থাকার কারণে এটা উম্মুল কুরা । আমি খ্রিস্টান প্রচারকদের জিজ্ঞাসা করবো, আপনাদের বাইবেলে কোথায় আছে ‘বাইবেল সকল মানুষের জন্য?’ আমি চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি, বাইবেলের কোথাও নেই তাওরাত-ইঞ্জিল সকল মানুষের জন্য বা বাংলাদেশিদের জন্য। আপনি যেই গ্রন্থকে বিশ্বাস করছেন সেটাই তো আপনার জন্য নয়। যেটা আপনার জন্য নয় সেটা বিশ্বাস করছেন কেন? মানছেন কেন? বিষয়টি নিয়ে একটু ভাবুন, চিন্তা-ফিকির করুন। এরপর সিদ্ধান্ত নিন। সত্যের উপর আছেন কি না মিথ্যার উপর চলছেন। পক্ষান্তরে কুরআন সকল মানুষের জন্য হেদায়াতনামা। চাই মানুষটি খ্রিস্টান হওক, হিন্দু হওক, মুসলমান হওক, যেই হোক না কেন, সকল মানুষের জন্য এই কুরআন। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, “রমযান মাস-ই হল সেই মাস, যাতে নাযিল করা হয়েছে কুরআন যা মানুষের জন্য হেদায়েত” হিন্দু, খ্রিস্টান, মুসলিম সকলেই মানুষ। আর কুরআনও সকল মানুষের জন্য। অতএব, কোনো খ্রিস্টান যদি মানুষ হয়ে থাকেন, তাহলে তাকে কুরআন মানতেই হবে। তবেই সে হেদায়াতপ্রাপ্ত হবে। খ্রিস্টান প্রচারকদের বলবো, আপনি এদেশে খ্রিস্টধর্ম প্রচার করতে পারবেন না। কারণ, আপনি যে ধর্মীয় গ্রন্থ বাইবেল বা কিতাবুল মোকাদ্দাস মানেন, তাতেই লেখা আছে যে যীশু শুধুমাত্র বনী ই¯্রাইলদের নিকট প্রেরিত হয়েছেন। যেমন, যীশু বলেন- “আমাকে শুধু বনী ই¯্রায়েলের হারানো মেষদের নিকট পাঠানো হয়েছে। আরো বলা হয়েছে- “তোমরা অইহুদীর নিকট যেয়ো না। বরং ই¯্রায়েল জাতির হারানো ভেড়াদের কাছে যেয়ো। ” এ ধর্ম মানতে হলে আপনাদেরকে ইসরাঈলে যেতে হবে। কারণ, সেখানে বনি ইস্রায়েলের লোকজন থাকে। ৫নং উত্তর: আমি খ্রিস্টান প্রচারকদের জিজ্ঞাসা করতে চাই “এই আয়াতটি কে বেশি বুঝেছেন? আপনি? না রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম? যার ওপর এই আয়াত নাযিল হয়েছে। যদি বলেন তিনি বুঝেছেন। তাহলে, বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়ে গেল- আপনার বুঝাটা ভুল, কুরআনই সঠিক।” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন আরবি। তাই, তাঁর ভাষাতেই কুরআন নাযিল করা হয়েছে। খ্রিস্টান ভায়েরা জিজ্ঞাসা করেন, কুরআন আরবি ভাষায় কেন? বাংলায় তো হতে পারতো? তাদের এই প্রশ্নের উত্তর আল্লাহ তা‘আলা নিজেই সুন্দরভাবে কুরআনে দিয়েছেন। দেখুন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, (*১) এবার খ্রিস্টানভাইদেরকে জিজ্ঞাসা করবো, “বলুন তো, আপনাদের বাইবেল, তাওরাত ও ইঞ্জিল কোন ভাষায়? ঈসা নবী কোন ভাষায় কথা বলতেন? তাহলে আপনারা বলবেন তাঁর ভাষা ছিল অরমীয়। বাইবেল লেখা হয়েছে কোন ভাষায়? আপনারা বলবেন হিব্রু ভাষায়। যেই ভাষায় ঈসা নবী কথা বলতেন, ইঞ্জিল প্রচার করতেন সেই ভাষায় ইঞ্জিল লেখা হলো না, লেখা হলো অন্য ভাষায়। এমনটি কেন? প্রথমেই ভাষার হেরফের হয়ে গেল পরবর্তীতে যেই ভাষায় র্অথাৎ হিব্রু ভাষায় ইঞ্জিল বা বাইবেল লেখা হলো, সেই ভাষা কি এখনো প্রচলিত আছে? নেই। সেই ভাষার প্রচলন এখন কোথাও নেই। আমি চ্যালেঞ্জ করলাম, ঈসা আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আসমানে উঠিয়ে নেয়ার পর থেকে ৩০০ বছরের মধ্যে কোনো ইঞ্জিল কেউ দেখাতে পারবে না। আমি বহু খ্রিস্টানভাইদের এই ওপেন চ্যালেঞ্জ দিয়েছি, কেউ দেখাতে পারেনি। আর পারবেই বা কিভাবে, নেই তো; যা আছে তার মধ্যে আবার অসংখ্য ভুল। বিকৃতির তো অভাবই নেই। বৈপরিত্যের তো কথাই নেই। যা সামনে বিস্তারিত বলা হবে ইনশাআল্লাহ তা‘আলা । বর্তমানে আমরা যেই বাইবেল দেখি তা হলো বাংলা অনুবাদ। কিন্তু, সাথে আসলটি দিয়ে দেয়া উচিত ছিল, সেটিও নেই। পক্ষান্তরে, কুরআন আরবি ভাষায়। যেই নবীর উপর কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে, তাঁর ভাষাও ছিল আরবি। প্রত্যেক নবীর উপর যেই কিতাব অবতীর্ণ করা হয়েছে তা সেই নবীর মাতৃভাষায় ছিল। প্রিয় পাঠক! একটি বিষয় ভালোভাবে বুঝার চেষ্টা করুন, তা হলো কুরআন মূলত লিখিতভাবে আসেনি। আল্লাহ তা‘আলা তা মানুষকে মুখস্থ করিয়ে অন্তরে অন্তরে সংরক্ষণ করেছেন। এই ভাষা মুখস্থ করাও সহজ। লক্ষ লক্ষ কুরআনের হাফেজ রয়েছে যাদের অন্তরে আল্লাহ তা‘আলা কুরআনকে সংরক্ষণ করেছেন। পৃথিবীর সকল কুরআনকে যদি বিলীনও করে দেওয়া হয়, তাহলে হুবহু সেই কুরআন লিপিবদ্ধ করা সম্ভব। একটি বিন্দু বা যের-যবরেও পরিবর্তন হবে না। পক্ষান্তরে পুরো পৃথিবীতে বাইবেলের একটি হাফেজও কোনো খ্রিস্টান দেখাতে পারবে না । এ আলোচনা দ্বারা বুঝা যায় কুরআন অবিকৃত ও সকল মানুষের জন্য। তাছাড়া, কুরআন যদি অন্য কোনো ভাষায় নাযিল হতো, তাহলে সেই এলাকা থেকে নবীর ভাষা শিখে, নিজ এলাকায় শিখাতে হতো, এতে এক বড় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতো। আর আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ رَسُولٍ إِلَّا بِلِسَانِ قَوْمِهِ لِيُبَيِّنَ لَهُمْ فَيُضِلُّ اللَّهُ مَنْ يَشَاءُ وَيَهْدِي مَنْ يَشَاءُ وَهُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ অর্থ: আমি সব পয়গাম্বরকেই তাদের স্বজাতির ভাষাভাষী করেই প্রেরণ করেছি, যাতে তাদেরকে পরিষ্কার বোঝাতে পারে। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন এবং যাকে ইচ্ছা সৎপথ প্রদর্শন করেন। তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। এই বিস্তারিত আলোচনা দ্বারা আমরা বুঝতে পারলাম, কুরআন সকল মানুষের জন্য । সঠিক পথ পেতে হলে সকল মানুষকে আল্লাহ তা‘আলার কালাম পবিত্র কুরআন পড়তে হবে, বুঝতে হবে এবং সেই অনুযায়ী আমল করতে হবে। আমি খ্রিস্টান ভাইদেরকে অনুরোধ করবো, “আপনারা কুরআনকে আপনার আল্লাহ তা‘আলার কালাম মনে করে পড়–ন। সাথে সাথে চিরস্থায়ী জাহান্নাম থেকে বাঁচার জন্য ইসলাম গ্রহণ করুন। আল্লাহ তা‘আলা আপনাকে ইসলাম গ্রহণ করার তৌফিক দান করুন। আমিন।”

তাওরাত-ইঞ্জিল প্রতিষ্ঠা করতে হবে

  • খ্রিস্টানদের দাবি: মুসলমানদেরকে তাওরাত-ইঞ্জিল অনুসরণ ও প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নতুবা প্রকৃত ঈমানদার হওয়া যাবে না।
তাদের দলিল: - قُلْ يَا أَهْلَ الْكِتَابِ لَسْتُمْ عَلَى شَيْءٍ حَتَّى تُقِيمُوا التَّوْرَاةَ وَالْإِنْجِيلَ وَمَا أُنْزِلَ إِلَيْكُمْ مِنْ رَبِّكُمْ وَلَيَزِيدَنَّ كَثِيرًا مِنْهُمْ مَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ مِنْ رَبِّكَ طُغْيَانًا وَكُفْرًا فَلَا تَأْسَ عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ অর্থঃ বলুন হে আহলে-কিতাবগণ, তোমরা কোনো পথের উপরই না, যে পর্যন্ত না তাওরাত-ইঞ্জিল ও তোমাদের রব হইতে অবতীর্ণ কিতাবের অনুসরণ কর, বস্তুতঃ তোমার রব হইতে অবতীর্ণ বিষয়সমূহে অনেকের অবাধ্যতা ও কুফরি বৃদ্ধির কারণ হয়। তাই, তুমি এই কাফের দলের প্রতি আদৌ দুঃখিত হইও না। সঠিক ব্যাখ্যা : হে আহলে কিতাবগণ! আমার রাসূল তোমাদের কাছে এসেছেন, তোমরা কিতাবের যা গোপন করতে তিনি তার অনেক কিছু তোমাদের কাছে প্রকাশ করেন এবং অনেক কিছু উপেক্ষা করে থাকেন। এখানে ”আহলে কিতাবগণ” দ্বারা ইহুদী-খ্রিস্টান উদ্দেশ্য। কুরআন স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, ইহুদী-খ্রিস্টানরা তাদের গ্রন্থ পরিবর্তন করেছে। এখানে আহলে কিতাব দ্বারা ইহুদী-খ্রিস্টানদের বুঝানো হয়েছে তারা যে তাওরাত ইঞ্জিলের অনেক বিষয়াদী গোপন করেছে এবং করেই চলছে কুরআন তাও স্পষ্ট করে দিয়েছে। যেমন, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি ঈমান আনা, তাঁর সঠিক গুণাবলী বর্ণনা করা, রজমের আয়াত গোপন করা ইত্যাদি। হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শেষ নবী হওয়ার ব্যাপারে ঈসা আ. যেই সুসংবাদ প্রদান করেছেন ইত্যাদি বিষয়াদী তারা তাওরাত-ইঞ্জিল থেকে গোপন করেছে। আর বিশ্বনবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধুমাত্র দ্বীনের সাথে সম্পৃক্ত বিষয়াদী ও তাঁর সত্য নবী হওয়ার ব্যাপারে প্রমাণ বহন করে, সে সমস্ত বিষয়াদী তারা তাওরাত-ইঞ্জিল থেকে গোপন করেছে। যা এ সমস্ত বিষয় তিনি বর্ণনা করেছেন। যেভাবে অপব্যাখ্যা করে: এই আয়াতে তারা তিন ভাবে অপব্যাখ্যা করে ১. আয়াতের নির্দেশ মোতাবেক তাওরাত-ইঞ্জিল ও কুরআন শরীফ অনুসরণ করতে হবে। মুসলমান হিসেবে কুরআনের আদেশ বাস্তবায়ন করতে হবে। ২। উপরোক্ত আয়াতের আলোকে আমরা যদি লক্ষ্য করি, তাহলে দেখব ‘অনুসরণ’ কাজটি বর্তমান কাল, অর্থাৎ উক্ত কিতাবে যাহা আছে তাহা সর্ব সময় আমল করিতে বলা হয়েছে। ” ৩। এই আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, قُلْ يَا أَهْلَ الْكِتَابِ لَسْتُمْ عَلَى شَيْءٍ حَتَّى تُقِيمُوا التَّوْرَاةَ وَالْإِنْجِيلَ হে আহলে-কিতাবগণ, যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা তাওরাত-ইঞ্জিল প্রতিষ্ঠিত না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের কোনো ভিত্তি নেই।” অতএব, মুসলমানদেরকে তাওরাত-ইঞ্জিল প্রতিষ্ঠা করতে হবে। উত্তর: ১. প্রথম দাবি, পূর্বের কিতাব অর্থাৎ “তাওরা-ইঞ্জিল” অনুসরণ করতে হবে। এই দাবির পক্ষে খ্রিস্টান প্রচারকগণ আয়াতের যেই অনুবাদ করেছে, তা সম্পূর্ণ ভুল। কারণ, এই আয়াতে কোথাও অনুসরণ করতে বলা হয়নি। তারা নিজেদের পক্ষ থেকে অনুসরণ শব্দটি যোগ করেছে। অতএব, ‘অনুসরণ’ করার যে দাবি তারা করেছিল তা নিতান্ত মনগড়া অনুবাদ। ধোঁকাবাজি ছাড়া আর কিছুই না। ২. তারা ব্যাখ্যা করেছেÑ‘অনুসরণ’ শব্দটি বর্তমান কাল.....’। তাদের এই ব্যাখ্যাটিও একেবারেই মনগড়া ও ভিত্তিহীন। এবার খ্রিস্টানভাইদের প্রতি আমার জিজ্ঞাসা আপনারা তো তাফসীর ও হাদিস মানেন না। বলে থাকেন কুরআন থাকতে ব্যাখ্যা কিসের? আপনারা উপরোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যা কিসের ভিত্তিতে করলেন? কোথায় পেলেন এই ব্যাখ্যা? আর কত দিন এভাবে ভুল অনুবাদ ও অপব্যাখ্যা করে মানুষকে জাহান্নামের পথ দেখাবেন? আসুন! ভুল ব্যাখ্যা বাদ দিয়ে সত্য জানুন। ইসলাম গ্রহন করুন। জান্নাতের পথে চলুন। ৩. উপরোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে খ্রিস্টান প্রচারকগণ লিখেছেন, ‘উক্ত আয়াত অনুযায়ী মুসলমানদেরকে কুরআনের আদেশ বাস্তবায়ন করতে হবে অর্থাৎ তাওরাত-ইঞ্জিল অনুসরণ ও মানতে হবে।’ তাদের এই ব্যাখ্যাটিও সম্পূর্ণ মনগড়া। এ পর্যায়ে খ্রিস্টানভাইদেরকে দাওয়াত দিতে চাই, ভাই! আপনি এসব মনগড়া ব্যাখ্যা বাদ দিয়ে ইসলাম গ্রহণ করুন। কারণ, ইসলাম-ই হলো আল্লাহ তা‘আলা পাকের নিকট একমাত্র মনোনীত ধর্ম। দেখুন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন:- إِنَّ الدِّينَ عِنْدَ اللَّهِ الْإِسْلَامُ وَمَا اخْتَلَفَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ إِلَّا مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَهُمُ الْعِلْمُ بَغْيًا بَيْنَهُمْ وَمَنْ يَكْفُرْ بِآَيَاتِ اللَّهِ فَإِنَّ اللَّهَ سَرِيعُ الْحِسَابِ (১৯) অর্থ: নিঃসন্দেহে আল্লাহ তা‘আলা ্র নিকট গ্রহণযোগ্য ধর্ম একমাত্র ইসলাম এবং যাদের প্রতি কিতাব দেয়া হয়েছে তাদের নিকট প্রকৃত জ্ঞান আসার পরও ওরা মতবিরোধে লিপ্ত হয়েছে, শুধুমাত্র পরস্পর বিদ্বেষবশতঃ যারা আল্লাহ তা‘আলা ্র নিদর্শন সমূহের প্রতি কুফরী করে তাদের জানা উচিত যে, নিশ্চিতরূপে আল্লাহ তা‘আলা ্ হিসাব গ্রহণে অত্যন্ত দ্রুত। وَمَنْ يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَنْ يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الْآَخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ . যে কেউ ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো ধর্ম তালাশ করে, কস্মিনকালেও তা গ্রহণ করা হবে না এবং আখেরাতে সে হবে ক্ষতিগ্রস্ত। আপনি খ্রিস্টধর্ম ছেড়ে দিন। যেহেতু আল্লাহ তা‘আলারনিকট ইসলাম-ই হলো একমাত্র মনোনীত ধর্ম। আপনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করুন। কারণ, ইসলাম ছাড়া আর কোনো ধর্র্ম আল্লাহ তা‘আলারনিকট গ্রহণযোগ্য নয়। কুরআনের নির্দেশ মানতে গিয়েই আপনাকে মুসলমান হওয়ার দাওয়াত দিচ্ছি। আরো শুনে রাখুন, আল্লাহ তা‘আলা আপনাকে কী বলেন।- قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ (১) اللَّهُ الصَّمَدُ (২) لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ (৩) وَلَمْ يَكُنْ لَهُ كُفُوًا أَحَدٌ অর্থঃ বলুন, তিনি আল্লাহ তা‘আলা, এক। ২.আল্লাহ তা‘আলা অমুখাপেক্ষী। ৩. তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং কেউ তাকে জন্ম দেয়নি। ৪. এবং তাঁর সমতুল্য কেউ নেই। অর্থাৎ. আপনি একত্ববাদকে গ্রহণ করুন। ত্রিত্ববাদ পরিত্যাগ করুন। আপনি যদি মুরতাদ হয়ে থাকেন অর্থাৎ মুসলমান থেকে খ্রিস্টান হয়ে থাকেন, তাহলে ইসলামে ফিরে আসুন। আপনি টাকার লোভে পড়ে তাদের শিখানো কিছু বুলি শিখে, মানুষকে ভুল ধর্মের দিকে দাওয়াত দিচ্ছেন। ফলে, আপনার দুনিয়া ও আখেরাত সবকিছুই নষ্ট করছেন। আমি চাই না আপনি আমার ভাই হিসেবে চিরস্থায়ী জাহান্নামী হোন। চাই না আপনি তপ্ত আগুনে জ্বলুন। ৪. উল্লিখিত আয়াতে يَا أَهْلَ الْكِتَابِবলে আহলে কিতাবদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে। (যাদেরকে পূর্বে কিতাব দান করা হয়েছে) অর্থাৎ, ইহুদী-খ্রিস্টানদেরকে। মুসলমানদেরকে নয়। তাদের নিজেদেরকেই তাওরাত-ইঞ্জিল প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এমন দৃষ্টান্ত কুরআনে অনেক আছে। যেমন- বলুন, হে কাফিরগণ! বলুন, হে আহলে কিতাবগণ অর্থাৎ ইহুদী-খ্রিস্টান। এমন বহু আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা ভিন্ন ভিন্ন জাতিকে সম্বোধন করে নির্দেশ প্রদান করেছেন। এই আয়াতে সম্বোধন করা হয়েছে ইহুদী-খ্রিস্টানদেরকে । ৫. (ক) এই আয়াতে ইহুদী-খ্রিস্টানদেরকে বলা হয়েছে, তাওরাত ও ইঞ্জিলে শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে যা বর্ণিত হয়েছে তা যেন প্রতিষ্ঠিত করে। অর্থাৎ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে শেষ নবী হিসেবে মেনে নেয় ও মুসলমান হয়ে যায়। (খ) তাওরাত-ইঞ্জিল বিকৃত ও রহিত হওয়ার পরেও যেসব বিধি-বিধান শরীয়তে মুহাম্মদীতে বিদ্যমান আছে। যেমন: একত্ববাদ ও দশ-আজ্ঞা, আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা সেগুলি প্রতিষ্ঠা করার নির্দেশ দিয়েছেন। আমি খ্রিস্টানভাইদেরকে বলবো-আপনারা যদি এই আয়াত অনুযায়ী তাওহীদ তথা একত্ববাদ ও দশ-আজ্ঞা প্রতিষ্ঠা করতেন, র্শিক ও ব্যভিচারের শাস্তি প্রতিষ্ঠা করতেন, তাহলে মানব সভ্যতা বর্তমানে এতো অবক্ষয়ের মধ্যে পড়তো না। নি¤েœ বাইবেল থেকে কুফর-শিরক ও ব্যভিচারের শাস্তির বিবরণ তুলে ধরা হলো। আপনারা তাওরাত-ইঞ্জিলের নি¤েœর বিধানগুলো প্রতিষ্ঠা করুন। বাইবেলে কুফর-শিরক এর শাস্তি মৃত্যুদন্ড-  বাইবেলে আছে-আর যদি ঐদিন কোনো ব্যক্তি, পুরুষ, নারী, ছোট-বড়, যে কেউ কোনো মূর্তি, প্রতিমা, ছবি প্রতিকৃতি প্রতিষ্ঠা করে, শিরক করে বা শিরকের প্রচারণা করে বা প্ররোচনা দেয়, তাহলে তাকে পাথরের আঘাতে হত্যা করতে হবে। এমনকি যদি কোনো নবীও অনেক মুজেযা দেখানোর পর কোনোভাবে শিরকের প্ররোচনা দেন, তাহলে তাকেও পাথরের আঘাতে হত্যা করতে হবে। যদি কোনো জনপদবাসী শিরকে পতিত হয়, তাহলে সে গ্রামের বা নগরের সকলকে অবশ্যই হত্যা করতে হবে এবং সে গ্রামের পশু-পক্ষি হত্যা করতে হবে। গ্রামের সকল সম্পদ ও দ্রব্যাদি পুড়িয়ে ফেলতে হবে। এক্ষেত্র তওবার কোনো সুযোগ নেই। ব্যভিচারের একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদন্ড- এমনকি পরনারীর প্রতি দৃষ্টিপাতকে ঈসা মসীহ ব্যভিচার বলে গণ্য করেছেন এবং উক্ত ব্যক্তিকে তার চোখ তুলে ফেলে দিতে বলেছেন। তিনি বলেন “যে কেহ কোনো স্ত্রীলোকের প্রতি কামভাবে দৃষ্টিপাত করে, সে তখনই মনে মনে তাহার সহিত ব্যাভিচার করিল। আর তোমার দক্ষিণ চক্ষু যদি তার বিঘœ জন্মায় তবে তাহা উপড়াইয়া দূরে ফেলে দাও, কেননা সমস্ত শরীর নরকে নিক্ষিপ্ত হওয়া অপেক্ষা বরং একটি অঙ্গের নাশ হওয়া তোমার পক্ষে ভালো। অন্যত্র মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেন قُلْ يَا أَهْلَ الْكِتَابِ تَعَالَوْا إِلَى كَلِمَةٍ سَوَاءٍ بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ أَلَّا نَعْبُدَ إِلَّا اللَّهَ وَلَا نُشْرِكَ بِهِ شَيْئًا وَلَا يَتَّخِذَ بَعْضُنَا بَعْضًا أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللَّهِ فَإِنْ تَوَلَّوْا فَقُولُوا اشْهَدُوا بِأَنَّا مُسْلِمُونَ অর্থ: বলুন, হে আহ্লে-কিতাবগণ! একটি বিষয়ের দিকে আস, যা আমাদের মধ্যে ও তোমাদের মধ্যে সমান; আমরা আল্লাহ তা‘আলা ্্ ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করব না; তার সাথে কোনো শরীক সাব্যস্ত করব না এবং একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাকে ছাড়া কাউকে প্রতিপালক বানাব না। তারপর যদি তারা স্বীকার না করে, তাহলে বলে দাও যে সাক্ষী থাক আমরা তো অনুগত। এবার আমি খ্রিস্টান ভাইদেরকে বলতে চাই, “ভাই! আপনাদের প্রতি কুরআন নির্দেশ দিয়েছে। আপনারা তাওরাত-ইঞ্জিলের বিধিবিধান প্রতিষ্ঠা করবেন, তাওরাত-ইঞ্জিলের নামে শিরক ও ব্যভিচার প্রতিষ্ঠা বা প্রচারের নির্দেশ দেননি। আগে আপনারা খ্রিস্টানগণ আপনাদের ব্যক্তি, দেশ ও রাষ্ট্রগুলিতে তাওরাত-ইঞ্জিলের তাওহীদ ও বিধি-বিধান প্রতিষ্ঠা করুন। শিরক, ব্যভিচার ইত্যাদি পাপের শাস্তি প্রতিষ্ঠা করুন-যা আপনাদের কিতাব নির্দেশ দেয়। সকল খ্রিস্টান চার্চে ঈসা মসীহ, তার মাতা মরিয়ম ও অন্যান্য অগণিত মানুষের প্রতিমা বিদ্যমান। তাওরাত-ইঞ্জিলের বিধান অনুসারে এগুলো ধ্বংস করুন। যারা এগুলিকে বানিয়েছে, এগুলোতে ভক্তি বা মানত-উৎসর্গ করেছে বা উৎসাহ দিয়েছে। তাদের সকলকে মৃত্যুদ- প্রদান করুন। এরপর তাওরাত-ইঞ্জিল নিয়ে আসুন।” আচ্ছা ভাই! আপনারা কোন তাওরাত ইঞ্জিলের কথা বলছেন? ঈসা আ.-কে আকাশে উঠিয়ে নেয়ার পর ৩০০ বছরের মধ্যে যেই ইঞ্জিল ছিল, এমন একটি ইঞ্জিল দেখাতে পারবেন কি? নিশ্চয়ই, আপনারা পারবেন না। আপনাদের পূর্ববর্তী লোকেরাও পারেনি। আরও একটি অনুরোধ রইল- আপনারা এভাবে কুরআনের অপব্যাখ্যা করবেন না। পারলে আপনাদের বাইবেল দ্বারা ধর্ম প্রচার করুন যদি আপনারা সেটাকে সঠিক বলে বিশ্বাস করেন। আপনাদের জন্য দুআ করি, আল্লাহ তা‘আলা আপনাদেরকে হেদায়াত দান করুন। ইসলাম গ্রহণ করার তৌফিক দান করুন। জাহান্নামের চিরস্থায়ী আগুন থেকে বাঁচার তৌফিক দান করুন। আমিন।

ইসলাম কাদের ধর্ম ?

মনে করুন! যদি কোনো অমুসলিম ভাইকে প্রশ্ন করা হয়, বলুনতো দেখি ইসলাম কাদের ধর্ম? নিশ্চয়ই তিনি উত্তরে বলবেন মুসলমানদের ধর্ম। একই প্রশ্ন যদি কোনো মুসলমান ভাইকে করা হয়, তারাও উত্তর দিবে, এতো আমাদের ধর্ম। কিন্তু একটু বুকে হাত রেখে চিন্তা করুন, আদৌ এই উত্তরটি কি সঠিক? আসুন এর বাস্তবতায় পৌঁছাতে আমরা কুরআনে হাকীমের মাঝে গভীরভাবে চিন্তা করি। কুরআনে হাকীমে আল্লাহ সুব্হানাহু তাআলা তাঁর ইবাদতের হুকুম দিতে গিয়ে ইরশাদ করেন يـٰۤـاَيُّـهَاالنَّاسُ اعْبُدُوْا رَبَّـكُمُ الَّذِىْ خَلَقَكُمْ وَالَّذِيْنَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَـتَّقُوْنَ (البقرة২১) এই আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা يٰۤـاَيُّهَا النَّاسُ শব্দ ব্যবহার করেছেন। যার অর্থ হয় হে মানবগণ! এখানে ‘ النَّاسُ’ শব্দের ভিতর রাসূলে কারীম থেকে নিয়ে কেয়ামাত পর্যন্ত যত মানুষ পৃথিবীতে আসবে সকলেই এই মানুষের অন্তর্ভুক্ত। এখানে না আছে কোনো যুগের শর্ত, না আছে কোনো অঞ্চল নির্দিষ্ট? বরং সকল মানুষকে আল্লাহ তা‘আলা নির্দেশ দিচ্ছেন (يٰۤـاَيُّهَا النَّاسُ) হে মানব সকল! পৃথিবীর ৬ শত কোটি মানুষ সকলেই মানুষের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু প্রশ্ন হলো ৬ শত কোটি মানুষ সকলেই কি আল্লাহর ইবাদত করে? অথবা কমপক্ষে এতটুকু কি তাদের জানা আছে যে, আমাদেরকে এক আল্লাহর ইবাদত করতে হবে? যদি উত্তর ‘না’ হয়। তাহলে কোনো মুসলমানের পক্ষ থেকে অমুসলিম ভাইদের কাছে এ কথা পৌঁছানো হয়েছে কি? তবে এ গুরুদায়িত্বটি কাদের?

.