Today is Friday & October 18, 2019 (GMT+06)

New Muslim interview ebook

শাইখুল হাদীস আল্লামা উবায়দুল্লাহ ফারুক দা.বা. আলোকিত জীবনের উপাখ্যান

— ফযলে রাব্বী মাকসুদ

উম্মতের একটি নির্বাচিত আলোকিত কাফেলা; যারা যুগে যুগে সবটুকু শক্তি ও সামর্থ ব্যয় করে দিয়েছেন আল্লাহর পথে৷ ইসলামের কোনো অংশই বাদ পড়ছেনা যাদের কর্মময় ও ব্যপৃত জীবনাদর্শ থেকে৷ ধর্ম, শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, সমাজ, রাষ্ট্র, দর্শন, ইতিহাস সবকিছুই! সন্দেহ নেই তারা সত্যিকার অর্থেই একেকটি প্রদীপ্ত মশাল, হিদায়াতের আলোকবর্তিকা৷ আপন লক্ষে স্বার্থক সফল এই দীপ্তিময় কাফেলার অন্যতম পথিকৃত শাইখুল হাদীস আল্লামা উবায়দুল্লাহ ফারুক দা.বা.

জন্ম ও বংশ :
যুগের এ মহান মনিষী ১৯৪৭ সালের ০৯ই আগস্ট সিলেট জেলার কানাইঘাট থানাধীন ঐতিহ্যময়ী আকুনি গ্রামে জন্ম গ্রহন করেন৷ প্রভাবশালী শিকদার বংশে তাঁর জন্ম। পিতা, শাইখুল হাদীস ওয়াততাফসীর, কায়েদে জমিয়ত, আল্লামা শফিকুল হক আকুনি রহ.৷ দাদা: মাওলানা ইবরাহীম আলী রহ.৷ নয় ভাইবোনের মাঝে তিনি সবার বড়।

শিক্ষাজীবন :
পিতা আল্লামা শফিকুল হক প্রতিষ্ঠিত নিজ গ্রামের মাজাহিরুল উলূম আকুনি মাদরাসায় মকতব থেকে মেশকাত পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। এরপর হাটহাজারি মাদরাসা থেকে ১৯৬৯ সালে দাওরায়ে হাদীস সম্পন্ন করেন। ফারেগের পর দাওয়াত ও তাবলীগে এক সাল সময় দেন। ইমানের মেহনত কে বাংলার গ্রাম থেকে গ্রামে পৌঁছে দিতে অশেষ পরিশ্রম করেন।
এরপর ১৯৭২ সাল পর্যন্ত ফাতেহপুর মাদরাসায় এবং ১৯৭৩ সালে ভারতের আসাম প্রদেশের নোয়াগাং মাদরাসায় শিক্ষকতা করেন। কিন্তু ইলমের পিপাসায় চিরকাতর এই মনীষী উচ্চতর শিক্ষালাভের আশায় কর্মজীবনের বিরতি দিয়ে ভারতের ইউ পিতে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী দীনী শিক্ষাকেন্দ্র দারুল উলুম দেওবন্দে গমন করেন। সেখানে তিনি ১৯৭৪-৭৫ সাল পর্যন্ত দুই বছরে উচ্চতর পড়াশোনা সম্পন্ন করেন

বর্নাঢ্য কর্মজীবন :
১৯৭৫ সালে শায়খ দা.বা. দেশে ফিরে আসেন৷ ১৯৭৭ সালে হজ্জে গমন করেন৷ ১৯৭৮ সাল থেকে ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ফরিদাবাদ মাদরাসায় অধ্যাপনা মধ্য দিয়ে কর্মজীবনের এক আলোকিত অধ্যায়ের শুভসূচনা করেন। এরপর পর্যায়ক্রমে ১৯৮৪-৮৭ সাল পর্যন্ত মালিবাগ জামিয়ায়, ১৯৮৭-৯৪ইং পর্যন্ত বাবার প্রতিষ্ঠিত নিজ গ্রামের মাজাহিরুল উলূম আকুনি মাদরাসায়, ১৯৯৫ থেকে বারিধারা জামিয়ায় এবং মাঝে ১৯৯৬-২০০১ ইং পর্যন্ত জামিয়া সুবহানিয়ায় থেকে পূণরায় বারিধারা জামিয়ায় ফিরে আসেন এবং অদ্যাবধি জামিয়ার শাইখুল হাদীসের মসনদ অলঙ্কৃত করে আছেন।

উল্লেখ্য যে ফরিদাবাদ ও মালিবাগে থাকাকালীন অনেক তালিবে ইলমকে হুজুর দেওবন্দ নিয়ে নিজ তত্ত্বাবধানে ভর্তি করে দিতেন এবং তাদের খোঁজখবর রাখতেন৷ এভাবে বাংলাদেশী ছাত্রদেরকে ব্যাপকভাবে দেওবন্দের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করার ক্ষেত্রে হুজুরের অবদান অনস্বীকার্য৷

ইসলাহী সম্পর্ক :
শায়েখ দা.বা. ছাত্র জীবন থেকেই মুরুব্বীদের ছায়ায় লালিত হয়েছেন। দেওবন্দে অবস্থানকালে ফেদায়ে মিল্লাত সাইয়েদ আসআদ মাদানী রহ. এর সাথে ইসলাহী সম্পর্ক স্থাপন করেন। মহান এই বুযুর্গের সাথে ঐতিহাসিক ছাত্তা মসজিদে দীর্ঘ আঠারো বছর রমজানে ই’তেকাফ করেছেন। তার ইন্তিকালের পর খলীফায় মাদানী শায়েখ আব্দুল মুমিন ইমামবাড়ি দা.বা. এর হাতে বাইয়াত হন এবং পরবর্তীতে খিলাফত লাভ করেন।

লেখালেখি ও রচনাবলী :
দীনের এই মহান খাদেম দরস তাদরীস, মাদরাসা পরিচালনা, রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক অজস্র ব্যস্ততার মাঝেও রচনা করেছেন কয়েকটি গবেষনাধর্মী গ্রন্থ। যেমন ১. খুলাসাতুল আছার, (চমৎকার বিন্যাসের এ গ্রন্থে তিনি হানাফী মাযহাবের মৌলিক মাসআলাগুলোর সমর্থনের শক্তিশালী হাদীসসমূহ সাজিয়েছেন) ২. ইসলাম ও মওদুদিবাদের সংঘাত, ৩. কুরআন-হাদিসের আলোকে আমাদের নামায, ৪. তাহকীক ও তাকলীদ, ৫. শিক্ষা। এছাড়াও হুজুরের লিখিত ছোটো ছোটো বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পুস্তিকা এবং বিভিন্ন ম্যাগাজিন ও স্মারকে প্রকাশিত অসংখ্য প্রবন্ধ রয়েছে।

পারিবারিক জীবন :
১৯৮০ সনের মাঝামাঝি সময়ে কানাইঘাট থানাধীন মাস্টার ফজলুল হক সাহেবের কনিষ্ঠ কন্যার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তিনি দুই পুত্র ও দুই কন্যার জনক। উভয়পুত্র আলেম হয়ে বর্তমানে ইসলাম, দেশ ও জাতির খেদমতে নিয়জিত আছেন৷ বিগত ২১/১২/২০১৬ইং তারিখে তার প্রিয় সহধর্মিনি পরলোক গমন করেন। আমাদের মুহতারামা আম্মাজানকে আল্লাহ তাআলা জান্নাতুল ফিরদাউস নসীব করুন, আমীন!

রাজনৈতিক জীবন:
১৯৬৬ সাল থেকে প্রায় পাঁচ দশক অবধি তিনি এদেশের রাজনীতি ও ইসলামী আন্দোলনের এক নিবেদিতপ্রাণ ব্যাক্তিত্ব। মূলত পারিবারিক সূত্রে বাবার হাত ধরে ছাত্রকাল থেকেই তিনি জমিয়তের সক্রিয় কর্মী। সময়ের প্রবহমান গতিধারায় জমিয়তের কেন্দ্রীয় কমিটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৬ সাল থেকে অদ্যাবধি প্রায় দুই যুগ ধরে তিনি জমিয়তের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। স্মর্তব্য যে, মাঝে কিছুদিন ছাত্র জমিয়ত বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ছিলেন। ২০১৭ ঈ. সালে অনুষ্ঠিত জামিয়তে উলামায়ে ইসলাম পাকিস্থানের শতবর্ষী সম্মেলনে তিনি বাংলাদেশের মুখপাত্র হিসেবে অংশগ্রহণ করে এক ঐতিহাসিক ও বিরল সম্মাননা লাভ করেন৷ হযরতের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা দেখে পাকিস্তান জমিয়তের সভাপতি মাওলানা ফজলুর রহমান দা.বা. অত্যন্ত অভিভূত হন এবং ভূয়সী প্রশংসা করেন৷

ইতিহাস, দর্শন ও ভূগোল :
ইতিহাস, দর্শন ও ভূগোলের ক্ষেত্রে হযরতের বিস্ময়কর অনুরাগ ও পাণ্ডিত্ব দেখে যে কেউ অবাক হবে৷ দরসগাহ হতে শুরু করে হযরতের যে কোনো আলোচনা মজলিসেই ইতিহাসের ছোঁয়া থাকবেনা— এটা বিশ্বাসযোগ্য হতে পারেনা৷ হযরতের বয়ানের এই এক চমৎকার বৈশিষ্ট্য৷ জীবনের ঊষালগ্ন হতে বাবার কাছেই তিনি ইতিহাস, দর্শন ও ভূগোলের পাঠ গ্রহণ করেন৷

বিদেশ সফর:
হযরত তার সুদীর্ঘ কর্মময় জীবনে মহান হজব্রত পালনের লক্ষে তিনবার সৌদি আরব গমন করেন, একাধিকবার পাকিস্থানে দীনী ও রাজনৈতিক সফর করেন এবং শিক্ষামূলক, সাংগঠনিক ও ইসলাহী প্রোগ্রামে অসংখ্যবার ইন্ডিয়া সফর করেন৷

শেষকথা :
আল্লামা উবায়দুল্লাহ ফারুক দা.বা. বাংলার ইলমে নববীর সোনালি দিগন্তে এক প্রোজ্জ্বল তারকা৷ নিসবত ইলাল্লাহ আর খোদাপ্রেমে প্রকম্পিত বান্দা৷ অন্যায়, অনাচার আর ইসলামবিরোধী জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের মোকাবেলায় এক আপোষহীন সৈনিক৷ এ যেনো রজনীর সাধক আর দিবসের ঘোড়সওয়ার! মুসলিম উম্মাহর উপর তার নিঃস্বার্থ খেদমতের বারিধারা আরো বহুদিন অব্যাহত থাকুক— মহিয়ান বিধাতার কাছে এই আমাদের প্রার্থনা৷
_______________________________________
জীবনী লেখার পটভূমি:
জীবনীটি বারিধারা জামিয়ার বিগত ১৪৩৭-৩৮ হি. শিক্ষাবর্ষের তাকমীল সমাপনী ছাত্রদের উদ্যোগে প্রকাশিত আল-কাসিম ডায়েরিতে প্রথম ছাপা হয়৷ আমি অধম সেই বিদায়ী কাফেলারই একজন সদস্য এবং আল-কাসিম ডায়েরির নির্বাহী পরিষদের একজন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বশীল হিসেবে আমার হাতেই অর্পিত হয় হুজুরের জীবনী লেখার দায়িত্ব৷ আমাদের অনুসন্ধান অনুপাতে একেবারে সংক্ষিপ্ত হলেও মোটামোটি পূর্ণাঙ্গ আকারে সর্বপ্রথম এটিই ছাপার অক্ষরে আসা হুজুরের জীবনী৷ আমার একজন বিখ্যাত উসতাদের সর্বপ্রথম জীবনী লিখতে পেরে আমি কতটা আনন্দিত ও গর্বিত সেটা প্রকাশের ভাষা আমার নেই৷

জীবনীটি তৈরির পেছনে তথ্য ও তত্ত্বগত দিক থেকে বিশেষভাবে যাদের অক্লান্ত সহযোগিতা পেয়েছি তাদের মধ্যে আছেন হজুরের বড় সাহেবজাদা মুহতারাম Kaleem Mahfuz সাহেব, হুজুরের ভাগিনা বন্ধুপ্রতিম Abdurrahman Nadim ভাই, আমার মেধাবী বন্ধুদের মধ্যে সবার আগে যার নাম আমি উল্লেখ করে থাকি Foyejullah Faisal, বন্ধুবর HM Saidul Alam এর কথা না বললেই নয়, এবং সার্বক্ষনিকভাবে যিনি পাশে থেকে উৎসাহ দিয়েছেন ও সাহস যোগিয়েছেন, শিক্ষাজীবনে আমার দেখা সবচে’ সফল ছাত্রআমীর Abdullah Al Mahmud ভাই, সর্বশেষ #উবায়দুল্লাহ_ফারুকসাহেব হুজুরের কথা আর কী বলবো! খাতা কলম নিয়ে বারবার হুজুরের কাছে গিয়ে বিরক্ত করেছি, অজস্র ব্যস্ততার মাঝেও হুজুর কিছুদিন পরপর আমাদেরকে অল্প অল্প সময় দেয়ার চেষ্টা করেছেন৷

তারা পাশে না থাকলে বলা যায় নিশ্চিতভাবেই এই জীবনী লেখা হতোনা৷ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তাদেরকে বিরক্ত করার সাহস আমার নেই৷ আল্লাহ সবাইকে উত্তম জাযা দান করুন৷ আমীন…!!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

shares