মঙ্গলবার, ৩০শে আষাঢ়, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২২শে জিলক্বদ, ১৪৪১ হিজরী

হাসপাতালে যখন মদের পার্টি!

১৮ সেপ্টেম্বর রাত ৯টা। রাজধানীর মোহাম্মদপুর আবাসিক এলাকার বাবর রোডের একটি বাড়ি ঘিরে র‌্যাবের কড়া পাহারা। বাড়ির বাইরে হাসপাতালের বিশাল সাইনবোর্ড। নাম- নিউ ওয়েলকেয়ার হাসপাতাল। প্রস্তুতি শেষে র‌্যাব সদস্যরা একযোগে ঢুকে পড়ে হাসপাতালে। এরপর ভেতরে যা দেখা যায় তা রীতিমতো অবিশ্বাস্য। হাসপাতালে চলছে জমজমাট মদের পার্টি। জরাজীর্ণ বিভিন্ন কক্ষ থেকে ভেসে আসছে যন্ত্রণাকাতর রোগীদের আর্তচিৎকার। এমন চিত্র দেখে তখনই হাসপাতালের প্রধান ফটক ভেতর থেকে বন্ধ করে দেয় র‌্যাব। ঘোষণা দেয়া হয়- অনুমতি ছাড়া কেউ বের হবে না। বাইরে থেকেও কেউ ঢুকবে না।
তবে বিস্ময়ের তখনও অনেক বাকি। একটি কক্ষের জীর্ণ বিছানায় শুয়ে থাকা এক রোগীর দিকে এগিয়ে যান র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম। রোগীর পায়ের কাছে প্রেসক্রিপশনের মোটা ফাইল। তাতে লেখা- রোগীর নাম খাদিজা বেগম। তিনি অর্থোপেডিক্স ডা. আহমেদ শরীফের অধীনে এখানে ভর্তি আছেন। কিন্তু খাদিজা বেগমের প্রেসক্রিপশনের ফাইল দেখে র‌্যাবের সন্দেহ হয়। কারণ মাত্র ২০ দিন আগে ভর্তি হওয়া এই রোগীকে ওষুধ দেয়া হয়েছে অন্তত ১শ’ ধরনের। প্রতিদিন বিভিন্ন ধরনের ইনজেকশন দেয়া হয়েছে ১০টি করে। চিকিৎসা ব্যবস্থাপত্র গুনে পাওয়া যায় মোট ৬২ পাতা।
অস্বাভাবিক এই চিকিৎসা ব্যবস্থাপত্র দেখে চিকিৎসকের ওপর র‌্যাবের সন্দেহ হয়। তাই সংশ্লিষ্ট চিকিৎসককে ডেকে পাঠানো হয়। কিছুক্ষণ পর চিকিৎসক ডা. শরীফ র‌্যাবের সামনে হাজির হন। তিনি ম্যাজিস্ট্রেটকে তার ভিজিটিং কার্ডও দেন। কার্ডে তার নাম লেখা ডা. বিআর আহমেদ শরীফ, এমবিবিএস, এফসিপিএস (অর্থো) পার্ট-২। কিন্তু তার কথাবার্তা অসংলগ্ন। এজন্য র‌্যাবের সন্দেহ আরও বাড়ে। র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলমের দীর্ঘ জেরার মুখে পড়েন তিনি। দীর্ঘ ২ ঘণ্টা জেরার এক পর্যায়ে বেরিয়ে আসে ডা. শরীফ আসলে একজন ভুয়া চিকিৎসক। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডিই পার হননি। তবে ভুয়া চিকিৎসক ডা. শরীফের আসল পরিচয় বের করতে র‌্যাবের রীতিমতো ঘাম ছুটে যায়। তিনি নানা কৌশলে নিজেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করেন। তবে শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হন।
ভুয়া চিকিৎসককে র‌্যাবের জেরা ছিল অনেকটা এ রকম :
ম্যাজিস্ট্রেট : আপনি ডাক্তার?
ভুয়া ডা. শরীফ : জি।
ম্যাজিস্ট্রেট : খাদিজা আপনার পেসেন্ট?
ভুয়া ডা. শরীফ : জি, তার ভাঙা হাড়ের চিকিৎসা চলছে। ওষুধ দিয়ে দিয়েছি। সুস্থ হতে কয়েকটা অপারেশন লাগবে।
ম্যাজিস্ট্রেট : আপনি কোন মেডিকেল থেকে পাস করেছেন বলেন তো?
ভুয়া ডা. শরীফ : খুলনা মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করেছি। আমার সব কাগজপত্রের রেকর্ড হাসপাতালে আছে।
ম্যাজিস্ট্রেট : আপনার আইডি নম্বরটা (বিএমডিসি থেকে দেয়া পেশাগত পরিচিতি নম্বর) বলুন তো।
ভুয়া ডা. শরীফ : নম্বর, মানে-ইয়ে… এখন মনে পড়ছে না।
এবার র‌্যাব তার সনদ সংক্রান্ত সব কাগজপত্র দেখাতে বলেন। ডা. শরীফ খুলনা মেডিকেলের একটি প্রশংসাপত্র দেখান।
ম্যাজিস্ট্রেট : শুধু প্রশংসাপত্র। সার্টিফিকেট কই? তাছাড়া আপনি ডাক্তার। নিজের আইডি ভুলে গেছেন?
ভুয়া ডা. শরীফ : জানতাম, কিন্তু এখন মনে পড়ছে না।
ম্যাজিস্ট্রেট : বাড়িতে কাউকে জিজ্ঞেস করুন।
ভুয়া ডা. শরীফ : বাবার কাছে ফোন করে জানান তার আইডি নম্বর ৫৫৩৩৫।
র‌্যাবের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক নম্বরটি ইন্টারনেটে চেক করা হয়। দেখা যায় নম্বরটি শাহনেওয়াজ জেসমিন নামের এক চিকিৎসকের। ভুয়া ডাক্তার শরীফকে এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে তার চেহারা বদলে যায়। তিনি হাতজোড় করে বলেন, স্যার সরি। র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তাৎক্ষণিক তাকে ২ বছরের জেল দেন।
তখন রাত ২টা। ভুয়া চিকিৎসকের শাস্তির পালা শেষ। র‌্যাব টিম এবার হাসপাতালের মালিকের খোঁজ শুরু করে। একটি কক্ষের দরজা খুলতেই হতবাক হয় র‌্যাব সদস্যরা। দরজা লাগিয়ে ভেতরে তখন মদের পার্টি করছিলেন স্বয়ং হাসপাতালের মালিক। মাতাল অবস্থায় কয়েকজন সঙ্গীসহ তাকে বের করে আনা হয়।
র‌্যাবের ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম যুগান্তরকে বলেন, হাসপাতালের নামে ওই বাড়ির বিভিন্ন কক্ষে কয়েকজন রোগীর জীর্ণদশার মধ্যেই মদপান করছিলেন মালিক। তার নাম বাবুল হোসেন। তবে তিনি ওই এলাকায় কালা বাবু নামে পরিচিত। তার বাড়ি কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ থানার পূর্ব বাঘবাড়িয়া গ্রামে। হাসপাতালের লাইসেন্স তার বাবা দেলোয়ার হোসেনের নামে। র‌্যাবের এক কর্মকর্তা বলেন, রোগী ভর্তি হাসপাতালে মালিক নিজেই মদের পার্টিতে মেতে থাকতে পারেন এমন চিত্র না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। তাছাড়া গোপনে নয়- তারা রীতিমতো বিদেশি মদের বোতল ও গ্লাস সাজিয়ে জমজমাট আড্ডা জমিয়ে বসেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হাসপাতালটির বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসার অভিযোগও আছে। র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত দেলোয়ার ওরফে কালা বাবুকে মোট ৩ বছরের কারাদণ্ড দেন। বিভিন্ন কক্ষে তল্লাশি চালিয়ে উদ্ধারকৃত কাগজপত্র পরীক্ষা করে দেখা যায় হাসপাতালের কাগজপত্রও ঠিক নেই। লাইসেন্সের মেয়াদ অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে। অবৈধভাবে হাসপাতাল পরিচালনার অপরাধে কালা বাবুর পিতা দেলোয়ার হোসেন ওরফে কালা মিয়াকে তাৎক্ষণিক ২ লাখ টাকা জরিমানা করেন আদালত। এরপর র‌্যাব সদস্যরা অপচিকিৎসার শিকার গুরুতর অসুস্থ রোগী খাদিজা বেগমসহ আরও ৬ জন রোগীকে উদ্ধার করে। পরে তাদের সবাইকে উন্নত চিকিৎসার জন্য পার্শ^বর্তী পঙ্গু (জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন কেন্দ্র) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অভিযানে অংশ নেয়া র‌্যাব-২ এর কর্মকর্তারা জানান, হাসপাতালে সার্বক্ষণিক ডাক্তার থাকার নিয়ম থাকলেও কোনো ডাক্তারকেই পাওয়া যাইনি। বিভিন্ন চিকিৎসা ব্যবস্থাপত্রে ডা. নিজাম নামের একজন চিকিৎসকের নাম ব্যবহার করা হয়েছে। এই জনৈক ডা. নিজাম বর্তমানে টাঙ্গাইল জেলার কোনো একটা হাসপাতালে কর্মরত আছেন। তিনি টাকার বিনিময়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে অভিযুক্ত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে তার নাম ব্যবহারের সুযোগ দেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Archives

July 2020
S S M T W T F
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031
shares