মঙ্গলবার, ১২ই মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১৩ই জমাদিউস সানি, ১৪৪২ হিজরি

জুবায়ের আহমদ আনসারী রহ: বহুমুখী প্রতিভার এক অনন্য নাম

This entry is part 3 of 23 in the series মনীষীদের জীবনী


আল্লামা জুবায়ের আহমদ আনসারীরহ.। একটি নাম। একটি চেতনা। একটি ইতিহাস। এ দেশের শত শত আলেম-উলামা ও ওয়ায়েজদের প্রেরণার উৎস,আলোর বাতিঘর। ইসলামের শাশ্বত-অনুপম সৌন্দর্য ও দ্বীনের মৌলিক আদর্শ প্রাঞ্জল ও সহজবোধ্য ভাষায় তুলে ধরার মাধ্যমে এদেশের লাখো-কোটি তৌহিদী জনতা ও আলেম-উলামার কাছে তিনি দীর্ঘকাল স্মরণীয় ও বরণীয় হয়ে থাকবেন।তিনি ছিলেন এক উজ্জ্বল জ্যোতির্ময়। যে জ্যোতি দিয়ে তিনি এ দেশের মুসলমানদেরকে আলোর পথ দেখিয়েছেন।সুমিষ্ট ভাষায় প্রভুর কথা ও নবীজীর বাণী প্রচার-প্রসার করেছেন। উম্মাহর বিভোর চিন্তায় হেদায়াতের মশাল নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন দিক্বিদিক।

মুসলমানদের ঈমান-আক্বায়েদ,আমলী সংশোধন,আত্মিক পরিশুদ্ধি ও দ্বীনের প্রচার-প্রসারের লক্ষ্যে তিনি প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রতিটি গ্রাম-গঞ্জ ও পাড়া-মহল্লায় চষে বেড়াতেন।সকালে বাড়ি থেকে রওয়ানা দিয়ে পায়ে হেঁটে সন্ধ্যাবেলা ওয়াজ-মাহফিলে গিয়ে পৌঁছার শতশত নজির একমাত্র আনসারী সাহেবের জীবনেই ঘটেছে। গ্রামীণ জনপদের প্রতিটি মানুষের কাছে প্রাঞ্জল ও সরল আলোচনার জন্য তিনি ছিলেন বেশ জনপ্রিয়।তাঁর মাহফিল মানেই ছিল খোদাভীতির ক্লাস।প্রতিটি মাহফিলেই তিনি প্রভুর ভয়ে স্বজনহারা মানুষের ন্যায় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামীর মত ডুকরে ডুকরে কাঁদতেন।

বৃহত্তর সিলেট ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার প্রতিটি অঞ্চলে রয়েছে হুজুরের অসংখ্য ভক্ত ও শুভাকাঙ্ক্ষী। বিশেষ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার প্রতিটি অঞ্চলের ষোলআনা নারী-পুরুষ হুজুরের মুরিদ,ভক্ত অথবা শুভাকাঙ্ক্ষী। ক্ষণজন্মা মহান এই আল্লাহর ওলী মাওলানা জুবায়ের আহমদ আনসারী রহ. এর পদচারণা পড়েনি এমন এলাকা বৃহত্তর সিলেট ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে খুব কমই আছে। হুজুরের প্রতিটি মাহফিলে এলাকার নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ উৎসুক হয়ে ভিড় জমাতেন। এমন নজির এ যামানার আর কোন পীর-বুযুর্গ বা জ্ঞানী-গুণির আছে কি না আমার জানা নেই।

স্বর্ণপ্রসবিনী ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা যে ক’জন ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ জন্ম দিয়েছেন, তাদের একজন আল্লামা জুবায়ের আহমদ আনসারী রহ.। চতুর্মুখী প্রতিভার এই জ্ঞানপুরুষ ১৯৬২ সালের ৫ ই জুলাই নাসিরনগর উপজেলার অালীয়ারা গ্রামের পিতা হাজী হাবিবুর রহমান ও রত্নগর্ভা মাতা জাহানারা বেগমের কোল আলোকিত করে জন্মগ্রহণ করেন।প্রখর মেধার এই মনিষী শৈশবেই ‘জিন্দাবাজার হাফিজিয়া মাদ্রাসায় হেফজ শেষ করেন। পরবর্তীতে তিনি দারুল উলুম বাহুবল মাদরাসায় ভর্তি হন। সবশেষে উচ্চশিক্ষার জন্য সিলেট ‘জামিয়া ইসলামিয়া হোসানিয়া গহরপুর মাদ্রাসায় আল্লামা নুরুদ্দিন গহরপুরী রহ. এর শরণাপন্ন হন। সেখান দাওরা হাদিস ও ইলমে তাফসীরের উপর বিশেষ ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন।

পড়ালেখার পাশাপাশি অলিকুল শিরোমনি, উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাদীস বিশারদ,শাইখুল হাদিস আল্লামা নুরুদ্দিন গহরপুরী রহ. এর কাছ থেকে আধ্যাত্মিকতার সবকএ রপ্ত করে নেন। তিনি ছিলেন গহরপুরী রহ. এর একান্ত স্নেহধন্য শিষ্য ও অন্যতম খলিফা।নুরুদ্দিন গহরপুরী রহ. হাতেই হুজুরের জীবনের প্রথম ওয়াজ- নসিয়ত ও দ্বীন প্রচারের হাতেখড়ি। ১৯৯১ সালে বন্ধু-আহবাব ও কিছু ধর্মানুরাগী মুরুব্বীদের সক্রিয় সহযোগিতায় নিজ উদ্যোগে সরাইল উপজেলার বেড়তলা গ্রামে ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি বিদ্যাপীঠ ‘জামিয়া রহমানিয়া বেড়তলা’ মাদ্রাসার গোড়াপত্তন করেন। বর্তমানে এটি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলার উল্লেখযোগ্য একটি দ্বীনি প্রতিষ্ঠান ও মারকায।

দ্বীনের নিরলস এই খাদেম বাংলাদেশ ছাড়াও বহির্বিশ্বেরর আমেরিকা,কানাডা, যুক্তরাজ্যসহ মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ রাষ্ট্রেই দ্বীনি বিভিন্ন প্রোগ্রাম ও ওয়াজ-নসিহত করেছেন। সেখানেও রয়েছে অসংখ্য-অগণিত ভক্ত-মুরিদ ও শুভাকাঙ্ক্ষী।এতসবের পাশাপাশি রাজনীতির ময়দানেও তিনি ছিলেন আকাবিরদের এক উজ্জ্বল নমুনা।

ইসলামী শাসনতন্ত্র বাস্তবায়নে ১৯৯৫ সালে যোগদান করেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসে। চার দলীয় ঐক্যজোটের ব্যানারে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনে ১৯৯৬ সালে নির্বাচন করেন।আমরণ তিনি ছিলেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সিনিয়র নায়েবে আমীর।এছাড়াও তিনি ছিলেন বৃহত্তর সিলেট ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলার একাধিক মাদ্রাসা ও এতিমখানার দায়িত্বজ্ঞান জিম্মাদার।

বাংলাদেশের এই বর্ষীয়ান আলেমেদ্বীন, বিশ্বনন্দিত মুফাসসিরে কুরআন, জনপ্রিয় ওয়ায়েজ আল্লামা জুবায়ের আহমদ আনসারী রহ. হঠাৎ করে ২০১৬ সালে অসুস্থ হয়ে পড়েন। বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর গলায় ক্যান্সারের অস্তিত্ব ধরা পড়ে। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন চিকিৎসার পর কিছুটা স্বাভাবিক হলেও ২০১৯ সালের শেষ দিকে অস্বাভাবিক অসুস্থ হয়ে পড়েন।

চিকিৎসা সত্ত্বেও দিনদিন স্বাস্থ্যের অবনতি হতে থাকে।সবশষে গত ১৭ এপ্রিল রোজ শুক্রবার বিকাল ৫.৪০ মিনিটে দেশের হাজারো আলেম-উলামা ও ভক্তকুলকে কাঁদিয়ে প্রভুর সান্নিধ্যে পাড়ি জমান।মৃত্যুর সময় তিনি ৩ ছেলে, ৪ মেয়ে ও স্ত্রীকে রেখে গেলেন।আল্লাহ তা’আলা তাঁকে জান্নাতে আ’লা মাকাম দান করুক ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের সকল সদস্যকে ধৈর্যধারণের তৌফিক দান করুক।


লেখক:শাহীদুর রহমান কাসেমী।।

 শিক্ষার্থী, জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুছিয়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া‌।

 

Series Navigation<< আল্লামা হারুন ইসলামাবাদী রহ: একজন কীর্তিমান মনীষীআল্লামা শাহ আহমদ শফি (দা.বা.) -এর সংক্ষিপ্ত জীবনী >>

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Archives

January 2021
S S M T W T F
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031  
shares
%d bloggers like this: