শনিবার, ২৩শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১৪ই শাওয়াল, ১৪৪১ হিজরী

নাফ নদীর তীরে কাঁদে মানবতা (০১) আল্লামা মামুনুল হক

সবুজ বাংলার পথেপ্রান্তরে…

এবারের ঈদুল আযহায় আমরা যখন পশু জবেহ করার মাধ্যমে কুরবানি আদায় করছিলাম, একই সময়ে আমাদের পার্শবর্তী মুসলিম জনপদ আরাকানের রোহিঙ্গা মুসলিমরা তাদের বুকের তাজা খুন দিয়েই কুরবানির দাবি পূরণ করছিল। ঈদের ঠিক এক সপ্তাহ আগে থেকে শুরু হয়েছিল তাদের কুরবারির এ বারের পর্ব। যা চলছে এখনও। আরও চলবে কতদিন তা একমাত্র মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহই জানেন। ঈদ কেন্দ্রিক মাদরাসা ও পারিবারিক ব্যস্ততার মধ্যেও বারবার বুকটা হাহাকার করে উঠছিল রোহিঙ্গা মুসলিমদের কথা ভেবে, মনের মধ্যে তাদের জন্য কিছু করার তীব্র তাগিদ অনুভূত হচ্ছিল। পরামর্শক্রমে সিদ্ধান্তের জন্য একটু অপেক্ষা করলাম। প্রতি মাসের ন্যায় সেপ্টেম্বরের প্রথম বৃহস্পতিবার ছিল আমাদের ইসলাহি মজলিস। যুব মজলিসের মূল শাখার কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীলগণ অধিকাংশই ছিলেন বাড়িতে। একই দিনে আবার ঢাকার বাইরে ছিল দুটি কর্মসূচি। উত্তরবঙ্গে সফরে ছিলেন জনাব মহসিন ভূঞা ভাই। আর নরসিংদী গিয়েছিলেন মাওলানা আবুল হাসানাত জালালী ভাই। ঢাকার ইসলাহি মজলিসে ছাত্র শাখার দায়িত্বশীলরা উপস্থিত ছিল। তাদেরকে নিয়েই মিটিং করে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম কেন্দ্রীয়ভাবে ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার। প্রাথমিকভাবে ফেসবুক পেইজে একটা পোস্ট লিখে দিলাম। আর পরদিন জুমার নামাজে আমার মসজিদ থেকে কালেকশন করলাম। ফেসবুকের ঘোষণায় অনেকে সহযোগিতার টাকা পাঠাতে আরম্ভ করল। প্রাথমিক ফান্ড গঠন হয়ে গেল দুদিনের মধ্যেই। ১১ সেপ্টেম্বর সোমবার দিন বিকালে বসে সিদ্ধান্ত নিলাম ঐদিন রাতেই অগ্রবর্তী একটা দল সরেজমিনে পাঠিয়ে দেয়ার। সেমতে মাওলানা শরীফ হোসাইন আর মাওলানা হাশমতুল্লাহ রাতের ট্রেনে পথ ধরল চট্টলার। ফেনী থেকে গিয়ে পর দিন সকালে তাদের সাথে মিলিত হলো আব্দুল কাদের ও আবুল হাসানাত। চট্টগ্রাম থেকে যোগ দিল নাবিল। পাঁচ জনের কাফেলা ১২ তারিখ মঙ্গলবার দুপুর নাগাদ পৌঁছে গেল মুহাজিরদের আশ্রয়স্থল সীমান্তশহর টেকনাফে। উপস্থিত খোঁজ-খবর নিয়ে প্রাথমিক কর্মস্থল নির্ধারণ করল শাহপরীর দ্বীপ। অগ্রবর্তী দলের এ তৎপরতাটা ছিল আমাদের কাজের জন্য খুবই সহায়ক। যে কোনো কাজই সুন্দর ও সুষ্ঠু হওয়ার জন্য যথাযথ পূর্ব প্রস্তুতিটা খুবই সহায়ক। আমাদের সংগৃহিত যৎসামান্য ত্রাণসহযোগিতার যেন সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করা যায় সে জন্য উপযুক্ত জায়গা নির্ধারণ করতেই পাঠানো হয়েছিল অগ্রবর্তী দল। মঙ্গলবার রাত নয়টার সেন্টমার্টিন পরিবহনে রওয়ানা করলাম আমরা আরও পাঁচজন। আমি, জহিরুল ইসলাম ভাই, আল আবিদ শাকির, মোরশেদুল আলম আর নেযামুদ্দীন আরকানী। ত্রাণের টাকা যেন ব্যক্তিগত আরামপ্রিয়তার কাজে খরচ না হয় সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত ছিল আগে থেকেই। এ জন্য যৎসামান্য মামুলী রাহখরচ বাবদ ত্রাণ ফান্ড থেকে আর বেশিরভাগ খরচ ব্যক্তিগত ও সংগঠনের ফান্ড থেকে সরবরাহ করা হয়।

আমাদের বহনকারী বাস মধ্যখানে কুমিল্লার নুরজাহান হোটেলে একবার মধ্য বিরতি দিয়ে সারারাত টানা চলল। ফজর নামাজ আদায় করলাম কক্সবাজার গিয়ে। সেখানেও বিরতি হলো একটি হোটেলে। যাত্রীদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন ত্রাণের উদ্দেশ্যে গমনকারী। ফজরের জামাত তাই বেশ বড় হলো। ত্রাণের উদ্দেশ্যে যাত্রাকারী সকলেই নামাজি। যারা ধার্মিক তারাই বেশি মানবিক হয়, আমার কাছে এমনই মনে হলো। আরও ভালো লাগল যখন দেখলাম, দ্বিতল ভবন বিশিষ্ট হোটেলের দ্বিতীয় তলায় নামাজের জায়গার পাশেই বেশ বড় জায়গাজুড়ে হোটেলের মালিকের পক্ষ থেকে ত্রাণ বিতরণের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। দশ-পনেরজন মানুষ রুটি কলা প্রভৃতি শুকনো খাবারের প্যাকেট তৈরি করছে। তারা সবাই হোটেলের কর্মচারী হবে।

বিশাল স্তুপ লেগে গেছে খাবারের প্যাকেট দিয়ে। হোটেল মালিকের জন্য মন থেকে দোয়া এল, তিনি যেমন শুধু নিজের ব্যবসায় ডুবে না থেকে মানুষের সাহায্যে এগিয়ে এসেছেন, আল্লাহ গাফুরুর রহিমও যেন তেমনি উভয় জাহানে তার প্রয়োজন পূরণে এগিয়ে আসেন।

ফজর নামাজ আদায়ান্তে বাস আবার ছুটে চলল টেকনাফের পথে। শুভ্র সকালের আকাশে হালকা মেঘের আবরণ, সেই সাথে মাঝে মাঝে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পরিবেশটাকে গম্ভীর করে রেখেছিল। বাসের সিটে বসেই বাদ ফজরের অযিফাগুলো আদায় করছিলাম। কিছুক্ষণের মধ্যে বাস পৌঁছে গেল উখিয়ার কাছাকাছি। দূর্দান্ত গতিতে ঢাকা থেকে কক্সবাজার পাঁচশ কিলোমিটার পথ চলা গাড়ির গতি মন্থর হয়ে গেল। মানবতা যেখানে বিপর্যন্ত সেখানে শুধু গাড়ির গতি কেন, গোটা পৃথিবীর অগ্রযাত্রাই থমকে যেতে বাধ্য। রাস্তার দুপাশে বৃষ্টিভেজা মাটিতেই যে যেখানে পেরেছে অবস্থান নিয়েছে আরাকান থেকে বিতাড়িত মজলুম মানুষগুলো। মাইলের পর মাইল কেউ সামান্য পলিথিনের তাবু তৈরি করে কেউ কোনো গাছের নিচে আর কেউ কেউ স্রেফ খোলা আকাশের নিচে শুয়ে বসে সময় পার করছে। কত সময় এভাবে পার করতে হবে ভাগ্যহত এ মানুষগুলোকেÑ তা একমাত্র আলেমুল গায়েব আল্লাহই জানেন। উখিয়ার মধ্য দিয়ে চলে যাওয়া টেকনাফের প্রায় সারা পথজুড়েই এমন দৃশ্য। তবে যেখানে যেখানে পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে উদ্বাস্তু শিবির গড়ে উঠেছে সেই জায়গাগুলোর দশা একটু বেশিই বেহাল। হাজার হাজার পায়ে হাঁটা মানুষ আর যানবাহন যেন রাস্তার উপর একাকার। এটাকে যানজট বলব না জনজট বলব! যাই বলি না কেন, সারা রাতের দীর্ঘ যাত্রার পর এমন প্রচ- জ্যামের মধ্যে সাধারণত সবারই মেজাজ গরম হওয়ার কথা। কিন্তু উখিয়ার পথে পথে এ জ্যামের মধ্যে বিরক্তির পরিবর্তে হৃদয়ে বেদনার উদ্রেক হচ্ছিল। হাজার বছরের আপন জন্মভূমি থেকে হিজরত করে আসা অসহায় মানুষের করুণ দুর্দশা দেখে নিজের অজান্তেই অশ্রুসজল হয়ে উঠছিল চোখ। সাড়ে তিনশত বছর ইসলামি সালতানাত চলেছে যেই ভূমিতে, ইসলামি ঐতিহ্যের লালনকেন্দ্র এককালের সেই স্বাধীন আরাকান, বর্তমানে রাখাইন রাজ্য নামে যা মায়ানমারের অধীন, সেই মাটিতে এরা বসবাস করছিল হাজার বছর ধরে। যেখানে তাদের বাড়ি ঘর ছিল, ছিল সুন্দর সাজানো সংসার। কিন্তু উগ্র সাম্প্রদায়িকতার নির্মম শিকার আর সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর স্বার্থের বলি হয়ে ভিটে মাটি সব হারানো মানুষগুলোর অসহায় নিঃস্ব অবস্থা কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল আমার ভিতরটাকে। বেদনার নীল পথ পাড়ি দিতে দিতে আমাদের বাস আমাদের নিয়ে ছুটছিল টেকনাফের কেন্দ্রস্থল বাসস্টপেজের দিকে। এক ঘণ্টার পথ তিন ঘণ্টায় চলে অবশেষে বেলা সাড়ে দশটা নাগাদ আমরা পৌঁছলাম টেকনাফে।

ইস্তেঞ্জা-ওজুর জরুরত সারার জন্য মসজিদের গিয়ে দেখলাম সেখানেও করুণ অবস্থা। অসহায় নারী শিশুদের জটলা লেগে আছে মসজিদের বাইরের চত্বরে। মসজিদের বারান্দায় শুকনো খাবারের স্তুপ। মসজিদ যেন শুধু ইবাদতখানা নয়, মানবসেবার প্রাণকেন্দ্রও বটে। জরুরত সেরে নাস্তার জন্য হোটেলের সন্ধান করতে লাগলাম। একটু এগিয়ে যেতেই গোটা গোটা অক্ষরে ‘সোনারগাঁও হোটেল’ লেখা সাইনবোর্ডের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো। মামুলি সাধারণ গোছের হোটেল। কিন্তু নাম তার সোনারগাঁও! হোটেলে ঢুকে হতাশ হতে হলো আমাদের। নাস্তা শেষ! অগত্যা বেরিয়ে অন্য হোটেলের সন্ধান করতে লাগলাম। কয়েক কদম এগিয়ে যেতেই পেয়ে গেলাম আরেকটি হোটেল। এবারের হোটেল হলো ‘শেরাটন’! নিদারুন কষ্টের মধ্যেও সোনারগাঁও থেকে সেরাটন যেতে কৌতুকের অনুভূতি পেলাম। হাসিখুশি ভাব নিয়ে ঢুকলাম ভেতরে। কিন্তু বিধিবাম! শেরাটনের অবস্থাও সোনারগাঁয়ের তথৈবচ। ভাবলাম, দুর্ভিক্ষের দেশে বুঝি আজ আমাদের কপালে আর নাস্তাই জুটবে না। কিন্তু মনে সান্তনা ছিল যে আমরা না হয় একবেলা উপোস থাকব বা মামুলি কিছু খেয়ে নিব। অত্যাচারের জনপদ ছেড়ে শুধু জীবন বাঁচানোর তাগিদে লক্ষ লক্ষ মানুষ যেখানে না খেয়ে দিনের পর দিন পথ চলতে পারে, মানবতার ভয়াল বিপর্যয়ের সেই সময়ে দু’চার বেলা এমনিতেই না খেয়ে থাকা উচিৎ। তবে আলহামদুলিল্লাহ আমাদেরকে একবেলাও না খেয়ে থাকতে হয়নি। এমন কি যেন-তেন খাবারও খেতে হয়নি। উন্নত খাবারের ব্যবস্থাই আল্লাহ করেছেন। সোনারগাঁও-শেরাটনে নাস্তা না পেলেও বাজারের একটু ভেতরের দিকে যেতেই উন্নতমানের ডেকোরেশনসমৃদ্ধ হোটেল কস্তুরি পেলাম। তৃপ্তিসহ নাস্তা হলো।

নাস্তার পর্ব শেষে এবার আমাদের শাহপরীর দ্বীপের পথে রওয়ানা হওয়ার পালা। আমাদের অগ্রবর্তী দলের সাথে ফোনালাপের মাধ্যমে যাতায়তমাধ্যম ও ভাড়ার বিষয়ে ধারণা নিয়েছিলাম। সিএনজি চালিত অটোরিক্সাযোগে পনের বিশ মিনিটেই আমরা পৌঁছে গেলাম হারিয়াখালী ঘাটে। সেখানে অপেক্ষমান ছিল মাওলানা শরীফ আর মাওলানা হাশমতুল্লাহ। তারা আমাদের নিয়ে চলল শাহপরীর দ্বীপের দিকে। আমরা যাচ্ছিলাম আর একই পথ ধরে আসছিল নির্যাতিত রোহিঙ্গা মুহাজিরদের অনিঃশেষ মিছিল। এই সেই পথ, বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে যা ব্যাপক প্রচার হয়েছে। হারিয়াখালী থেকে শাহপরী দ্বীপ পর্যন্ত একসময় পিচঢালা পাকা রাস্তা ছিল। মধ্যখানে বড় ছোট মাঝারি বেশ কয়েকটি ব্রিজ কালভার্টও ছিল। কিন্তু সমূদ্রের তীরবর্তী নদীর স্রোতের তোড়ে সে রাস্তা এখন স্রেফ অতীত এক ইতিহাস। রাস্তার দু’ধারে কিছু ভগ্নস্তুপ এখনো দাঁড়িয়ে আছে অতীতের সরকারি সড়ক নির্মাণের সাক্ষী হয়ে। স্থানীয়দের অভিমত হলো, বর্তমান নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি শাহপরীর দ্বীপবাসীর ওপর রুষ্ঠ। তাই দ্বীপের হাজার হাজার মানুষের চলাচলের একমাত্র পথ এই রাস্তাটি মেরামতের কোনো উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না এবং অদূর ভবিষ্যতে সে সম্ভাবনাও নেই। যাই হোক, সড়ক না থাকলেও পানিপথে যাওয়ার জন্য ট্রলারের অভাব নেই। ট্রলারযোগে মিনিট দশেকর মধ্যে আমরা দ্বীপে গিয়ে পৌঁছলাম… চলবে ৷

সৌজন্য:
মাসিক রাহমানী পয়গাম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Archives

June 2020
S S M T W T F
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930  
shares