শনিবার, ৮ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৭ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪২ হিজরি

তাকওয়াই হল শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মাপকাঠি – তারাবীহ ২৩তম পাঠ


আজ ২৩তম তারাবিতে সূরা আহকাফ, সূরা মুহাম্মদ, সূরা ফাতহ, সূরা হুজুরাত, সূরা কাফ এবং সূরা জারিয়াত (১-৩০) পঠিত হবে। পারা হিসেবে পড়া হবে ২৬তম পারা।

৪৬. সূরা আহকাফ: (মক্কায় অবতীর্ণ, আয়াত ৩৫, রুকু ৪)

সূরায় আল্লাহ তায়ালার একত্ববাদ, মুহাম্মদ (সা.) এর রিসালাত এবং আখেরাত প্রসঙ্গে আলোচনা রয়েছে। সঙ্গে মোশরেকদের মূর্তি-প্রতিমার অক্ষমতা তুলে ধরা হয়েছে। কোরআন এবং নবী মুহাম্মদের (সা) ব্যাপারে কাফেরদের উত্থাপিত বিভিন্ন আপত্তির জবাব দেওয়া হয়েছে। এরপর সূরায় মোমিন ও বাবা-মার অনুগত এবং অবিশ্বাসী ও বাবা-মার অবাধ্য সন্তানের বিবরণ দেওয়া হয়েছে। অবাধ্যতার প্রসঙ্গ ধরেই আদ জাতি এবং তাদের বিনাশের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।

নবীজির মুখে কোরআন শুনে মুগ্ধ হয়েছিল- এমন একটি জিন দলের আলোচনাও রয়েছে সূরায়। মহান আল্লাহর কুদরতের বর্ণনা দিয়ে সূরাটি সমাপ্ত হয়েছে।

৪৭. সূরা মুহাম্মদ: (মদিনায় অবতীর্ণ, আয়াত ৩৮, রুকু ৪)

সূরায় জিহাদ ও কিতাল প্রসঙ্গে বিভিন্ন আলোচনা থাকায় সূরাটির আরেক নাম সূরা কিতাল। মোমিন ও কাফের- এ দুই শ্রেণির আলোচনা রয়েছে সূরাটিতে। সত্যের অনুসারী মোমিন এবং মিথ্যার পূজারি কাফেরদের মধ্যে চলমান চির সংঘাতের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। যুদ্ধের ময়দানে কাফেরদের গর্দানে জোরে আঘাতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যুদ্ধ শেষে বন্দিদের সঙ্গে অনুসৃত নীতি প্রসঙ্গে বলা হয়েছে।

আরো পড়ুন: ‘সদকাতুল ফিতর নগদ অর্থে আদায় করা গরিবের জন্য বেশি সুবিধাজনক’

এরপর ঈমানদারদেরকে আল্লাহর সাহায্য এবং জান্নাতে মোত্তাকিদের পুরস্কারের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। সূরায় মোমিন-মোনাফেকের মধ্যে একটা পার্থক্য নির্ণয় করা হয়েছে যে, জিহাদ সম্পর্কিত আয়াত শুনে মোমিন বান্দাদের ঈমান বৃদ্ধি পায় আর মোনাফেকরা মৃত্যুভয়ে বিহ্বল হয়ে পড়ে। আল্লাহর রাস্তায়, বিশেষত জিহাদে সম্পদ ব্যয়ের উৎসাহ প্রদানের মাধ্যমে সূরাটি সমাপ্ত হয়েছে।

৪৮. সূরা ফাতহ: (মদিনায় অবতীর্ণ, আয়াত ২৯, রুকু ৪)

হুদায়বিয়া সন্ধির সময় সূরাটি নাজিল হওয়ায় হুদায়বিয়া সন্ধি এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে সূরায় আলোচিত হয়েছে। সূরায় নবীজিকে মক্কা বিজয়ের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে এবং মোমিন নর-নারীদের জন্য জান্নাতের ওয়াদা এবং কাফের ও মোনাফেকদের জন্য শাস্তির ঘোষণা করা হয়েছে। হুদায়বিয়া সন্ধিকালে নবীজির সঙ্গে উপস্থিত সাহাবিদের প্রতি আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে এবং তাদেরকে খায়বার বিজয়ের সুসংবাদ প্রদান করা হয়েছে। এরপর নবীজির আনীত ধর্ম সব ধর্মের ওপর বিজয় লাভ করবে মর্মে আলোচনার পর সাহাবিদের কিছু গুণাগুণের বর্ণনা দিয়ে সূরাটি সমাপ্ত হয়েছে।

৪৯. সূরা হুজরাত: (মদিনায় অবতীর্ণ, আয়াত ১৮, রুকু ২)

‘হুজরাত’ শব্দটি ‘হুজরা’ শব্দের বহুবচন। অর্থ ঘর, কামরা। সূরায় সেসব গ্রাম্য লোকদের কথা আলোচনা করা হয়েছে, যারা রাসুলের হুজরা মোবারকের পাশে দাঁড়িয়ে নিজেদের গ্রাম্য ভাষায় নাম ধরে রাসুলকে ডাক দিত। তাই এ সূরাকে ‘সূরা হুজরাত’ বলা হয়।

আরো পড়ুন: বিদায়ের পথে বরকতময় রমযান: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির হিসাব মিলাই

একজন মুসলিমের এবং একটি মুসলিম সমাজের মাঝে কী কী গুণ থাকা দরকার- এ প্রসঙ্গটি খুব গুরুত্বের সঙ্গে বিস্তারিতভাবে এ সূরায় আলোচিত হয়েছে। তাই আমলের নিয়তে ব্যাখ্যাসহ সূরাটি বারবার পড়া উচিত। নবীজির সঙ্গে আদব-শিষ্টাচারের বিবরণ দিয়ে সূরাটির সূচনা।

এরপর সূরায় ধারাবাহিকভাবে সামাজিক বিভিন্ন শিষ্টাচারের বিবরণ দেওয়া হয়েছে- উড়ো কথাবার্তায় কান দেওয়া যাবে না, প্রতিটি তথ্য-সংবাদ যাচাই-বাছাইয়ের পর গ্রহণ করতে হবে। ঠাট্টা-বিদ্রুপ, অহংকার, একে অন্যের দোষ ধরা, কারও ছিদ্রান্বেষণ, গিবত-গালমন্দ করা, কারও প্রতি খারাপ ধারণা পোষণ- মোটকথা সমাজের লোকজনের পারস্পরিক সম্পর্কে ফাটল ধরে, এমন প্রতিটি কাজ করতে নিষেধ করা হয়েছে। মোমিনদের দুটি দলে কখনও ঝগড়া-বিবাদ হলে মিলিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে, মোমিনরা পরস্পর ভাই ভাই। আর মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মাপকাঠি হলো তাকওয়া তথা খোদাভীতি। এরপর আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য ঈমানের মানদণ্ডের আলোচনার মাধ্যমে সূরাটি সমাপ্ত হয়েছে।

৫০. সূরা কাফ: (মক্কায় অবতীর্ণ, আয়াত ৪৫, রুকু ৩)

ইসলামের মৌলিক আকিদা-বিশ্বাসের বর্ণনা রয়েছে এ সূরায়। কাফের-মোশরেকদেরকে সতর্ক করা হয়েছে। সতর্ক না হলে পূর্ববর্তী কাওমে নুহ, আসহাবুর রস সামুদ, আদ, কাওমে লুত, ফেরাউন এবং কাওমে শুয়াইব ও কওমে তুব্বার মতো অনিবার্য ধ্বংসের হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে। (১২-১৪)।

আরো পড়ুন: ২২তম তারাবি: মানুষ বড়ই অকৃতজ্ঞ

সূরাটি মানুষকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করে। মানুষের মনে যে ওয়াসওয়াসা এবং বিভিন্ন ধ্যানধারণা জন্মে সে সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা পরিপূর্ণরূপে অবহিত। মানুষের সঙ্গে দুজন ফেরেশতাকে নিযুক্ত করে দেওয়া হয়েছে, যারা তার প্রতিটি নড়াচড়ারও খেয়াল রাখে। মৃত্যুর সময় তারা মানুষের আমলনামা বন্ধ করে দেবে আর কেয়ামতের দিন হাশরের ময়দানে মানুষকে নিজের আমলের জওয়াব দিতে হবে। (১৬-৩৭)। সূরায় জান্নাত-জাহান্নামের বিবরণ শেষে নবীজিকে মোশরেকদের অসংলগ্ন কথাবার্তার ব্যাপারে সবরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং সকাল-সন্ধ্যা আল্লাহর ইবাদত ও তসবির নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। (৩৯-৪০)।

৫১. সূরা জারিয়াত: (মক্কায় অবতীর্ণ, আয়াত ৬০, রুকু ৩)

সূরার সূচনায় চারটি কসমের বর্ণনা আছে। এ শপথের পর আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, যে জিনিসের ওয়াদা তোমাদের সঙ্গে করা হচ্ছে, তা সত্য আর ইনসাফ তথা কেয়ামতের দিন অবশ্যই সংঘটিত হবে। এরপর আসমানের শপথ করে কাফেরদের স্ববিরোধিতার কথা বলা হয়েছে। সূরায় মোত্তাকিদের উত্তম পরিণতি এবং উন্নত গুণেরও বিবরণ দেওয়া হয়েছে। মোত্তাকিদের গুণের বিবরণ দেওয়ার পর আল্লাহ তায়ালার আজমত ও বড়ত্বের কিছু নিদর্শন পেশ করা হয়েছে। ইবরাহিম (আ.) এর কাছে ফেরেশতাদের আগমনের বিবরণের মাধ্যমে পারাটি সমাপ্ত হয়েছে।

লেখক:মাওলানা রাশেদুর রহমান ।। পেশ ইমাম ও খতীব, কেন্দ্রীয় মসজিদ, বুয়েট

Series Navigation<< মানুষ বড়ই অকৃতজ্ঞ – তারাবীহ ২২তম পাঠরবের কোন কোন নেয়ামত অস্বীকার করবে? – তারাবীহ ২৪তম পাঠ >>

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Archives

October 2020
S S M T W T F
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31  
shares