Today is Monday & September 16, 2019 (GMT+06)

New Muslim interview ebook

মহাসত্যের সন্ধানে শিবির ছেড়ে ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলনে – দেলাওয়ার সাকী

মহাসত্যের সন্ধানে…
কিভাবে শিবির ছেড়ে
ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলনে আসলাম!

১৯৯৪ সাল। আমি কাফিয়া জামাতের ছাত্র। বান্দরবান ইসলামী শিক্ষা কেন্দ্রে পড়ি। ছাত্র শিবিরের সাথে সম্পৃক্ত। চট্টগ্রামের সাতকানিয়া থানার সন্তান। সাতকানিয়া থানাটি জামাত-শিবিরের তথাকথিত ঘাটি হিসাবে পরিচিতি ছিল। আল্লাহর জমিনে আল্লাহর রাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে বংশ পরস্পরায় জামায়াত-শিবিরের রাজনীতিতে আসা। সেই বাচ্চা বয়স থেকে শ্লোগান শিখেছি “সৎ লোকের শাসন চাই, আল্লাহর আইন চাই”। কওমী মাদরাসায় পড়া সত্ত্বেও ছাত্র শিবিরের সাথে হাজারো বাধা উপেক্ষা করে কাজ করে যাচ্ছি। ১৯৯০ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত একজন নিবেদিতপ্রাণ সক্রিয় কর্মী হিসাবে সংগঠনের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছি। মাদরাসার সম্মানীত শিক্ষকদের হাজারও নসিহত এক কান দিয়ে শুনি আরেক কান দিয়ে বের করে দেই। “মওদুদি গোমরা”, “তাফহিমুল কুরআন একটি ভ্রান্ত তাফসির”, “এরা রাসুল সা.কে নিস্পাপ মনে করে না”, “সাহাবায়ে কেরাম রা.-এর সমালোচনা করে”- এরকম হাজার নসিহত গায়ে মাখি না। এভাবেই চলছে সক্রিয় ছাত্র রাজনীতি। ১৯৯৪ সালের মার্চ মাসে হঠাৎ বান্দরবান ফায়ার সার্ভিস মসজিদের ইমাম মাওলানা ফখরুল ইসলাম সাহেব ঈদগাঁহ মাঠের মাহফিলের দাওয়াত দিলেন। প্রধান অথিতি মাওলানা সৈয়দ ফজলুল করীম পীর সাহেব চরমোনাই রহ.। ‘পীর সাহেব চরমোনাই’ নামটা শুনার সাথে সাথে শরীরে আগুন জ্বলে উঠলো। কারণ আমি মনে করতাম মাইজভাণ্ডারী, দেওয়ানবাগী ও রাজারবাগীর মতই চরমোনাইরা সরলমনা মুসলমানদেরকে মুশরিক বানানোর ধান্ধায় আছে। ভন্ডপীরের আস্ফালন এই পার্বত্য চট্টগ্রামে! ইমাম সাহেব পরিচিতজন, তাই সম্মান করি, মনের ক্ষোভ মনেই রাখলাম। কিছুই বললাম না। কিন্তু তিনি আমার প্রতিক্রিয়া ভালোভাবে লক্ষ করেছেন। তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বান্দরবান আলিয়া মাদরাসায় গিয়ে দায়িত্বশীল বন্ধুদের সাথে পরামর্শ করলাম, এই ভন্ডকে কিভাবে ঠেকানো যায়! পরপর দুদিন মিটিং হলো। সিদ্ধান্ত হলো সরাসরি মুনাজারা করবো। অনেক গবেষণা, চিন্তাভাবনা করে ১০টি প্রশ্ন তৈরী করলাম। মাহফিলের দিন মাগরিবের সালাত আদায় করে চার সাথীসহ চললাম রেষ্ট হাউজে। সেখানে পীর সাহেব হুজুর অবস্থান করছেন। অনেক কষ্টে ভিতরে ঢুকে ভদ্রতার খাতিরে সালাম দিলাম। হুজুর সালামের উত্তর দেয়ার পর সুযোগ বুঝে হুজুরকে বললাম, আমাদের কিছু প্রশ্ন আছে। হুজুর বললেন, বাবারা, এখনতো মাহফিলের সময় হয়েছে। বয়ানের পর এসো।
আমরা রেষ্ট হাউজ থেকে বের হয়ে বাজারের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। পরস্পরে বলাবলি করলাম, এই ভন্ড কি উত্তর দিবে?


বাজারে কিছুক্ষণ আড্ডা পিঠানোর পর সাথীদের বললাম, চল ঈদগাঁহে গিয়ে ভন্ডপীর কি বলে শুনি। আমার প্রস্তাব প্রচন্ড হাসি তামাশার মাধ্যমে অনুমোদিত হলো। ঈদগাঁহে গিয়েই শুনলাম ‘নাজায়েজ’ হালকায়ে জিকির। কিছুক্ষণ পর পীর সাহেব হুজুর আসলেন। সংক্ষিপ্ত মুনাজাত দিয়ে শুরু করলেন বয়ান। আমরা প্যান্ডেলের বাহিরে দাড়িয়ে গল্পের ফাকে ফাকে ওয়াজও শুনছি। আমি সাথীদের বললাম, চলো, প্যান্ডলের ভিতরে গিয়ে বসি। এ কথা বলামাত্রই সবাই অট্টহাসি দিল। আমি বললান, দেখি না ভন্ডপীর কি বলেন? এক সাথী বললো, তুমি যাও। আমি রাওয়ানা দিতেই আরো দু’ সাথী আমার সাথে আসতে লাগলো।


প্যান্ডলের এক কর্ণারে বসে হুজুরের ওয়াজ শুনতে লাগলাম। তার প্রতিটি অক্ষর, প্রত্যেকটি শব্দ খুব ভালভাবে সতর্কতার সাথে গ্রহণ করছি। আধা ঘন্টার মতো ওয়াজ শুনেছি এর মধ্যে আমার বুক ভেঙ্গে কান্না আসতে লাগলো। অনেক কষ্টে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেছি। কিন্তু যখন হুজুর জাহান্নামের বিবরণ দিচ্ছেন, তখন আমি আমার নিয়ন্ত্রণহীন। পাগলের মতো লাফালাফি করছি। কখন বয়ান শেষ হলো, কখন তওবা পড়ালেন, কখন বায়াত ও মুনাজাত দিলেন, কিছুই জানি না। আমি বেহুশের মত মাঠে বসে আছি। লোকজন প্রায় চলে গেছে। হঠাৎ সাথী ভাইদের ডাকে সজাগ হলাম। শরীরে একটুও শক্তি নাই। এত বেশি কান্না করেছি যে আব্বু আম্মুর ইন্তিকালেও এত কান্না করিনি। সাথী ভাইদের সহযোগিতায় দাড়ালাম। এক সাথী বলল, কিরে মুনাজেরা করতে যাবে না? কোন রকম বললাম, যাচ্ছি, চল।


পীর সাহেব হুজুরের বয়ান আমাকে সম্পূর্ণ বদলে দিল। ভাবছি, এটা কিভাবে হলো। তিনি কী যাদু জানেন। তিনি কী জিনের মাধ্যমে বশীভূত করেন? মনের মধ্যে হাজারো প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। না, যাদু বা জিনের মাধ্যমে প্রভাবিত হলে, আমি আমার কৃতপাপের জন্য এত কান্না করলাম কেন? কেন জাহান্নামের ভয়ে হৃদয় কেঁপে উঠল? কেন তাওবা করলাম? কেন আগামীতে ভাল হয়ে চলার দ্বীপ্তশপথ নিলাম?


যাচ্ছি রেষ্টহাউজে পীর সাহেব হুজুরের সাথে সাক্ষাতের উদ্যেশ্যে। চিন্তা দিকভ্রান্ত। এক বন্ধু প্রশ্ন করলো; সাকী ভাই, তোমাকে কেমন জানি লাগছে? তুমি কি অসুস্থ? তাহলে থাক, যাব না! একথা শুনে মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল, না, পীর সাহেব হুজুর যাওয়ার জন্য বলেছেন, না গেলে বেয়াদবী হবে!


আমার কথা শুনে তারা হতভম্ভ! তুমি কি বলছ, না গেলে বেয়াদবী হবে? আমি নিজেও বিস্মিত! তাদেরকে বললাম, হুজুর যেহেতু বয়ানের পর যাওয়ার জন্য বলেছেন, না যাওয়াটা আমাদের পরাজয়। তাই চল। হেঁটে হেঁটে বাজর পর্যন্ত গেলাম। আমার পা চলে না। বাজার থেকে রিক্সা নিয়ে রেষ্টহাউজ পৌঁছলাম। ভিতরে গিয়ে দেখি পীর সাহেব হুজুর খানা খেতে বসেছেন। আমি দরজার কাছাকাছি যাওয়ার সাথে সাথে ফায়ার সার্ভিসের সেই ইমাম মাওলানা ফখরুল ইসলাম সাহেব আমাদের কাছে এসে বললেন, আপনাদের কথা হুজুর জিজ্ঞেস করেছেন। তিনি আমাদেরকে ভিতরে নিয়ে গেলেন। পীর সাহেব হুজুরের চোখে পড়ার সাথে সাথেই তিনি বললেন, ও তোমরা এসেছ? আগে খেয়ে নাও, খাওয়ার পর তোমাদের প্রশ্নের উত্তর দেব। খুবই নিরবে দস্তরখানে বসে গেলাম। খাওয়া শেষে হুজুর খাটের উপর বসলেন। তার চেহারায় দৃষ্টি পড়ার সাথে সাথে আমার বুক ভেঙ্গে সেই ঈদগাহ মাঠের কান্না পূণরায় শুরু হতে লাগলো। অনেক কষ্টে নিজকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলাম। হুজুর আমাদেরকে কাছে ডাকলেন, বললেন, “বাবারা, তোমাদের উত্তর কি জানা প্রয়োজন? দাও, কি প্রশ্ন এনেছ দেখি।” আমি আর নিজকে নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারলাম না। হু হু করে কান্না শুরু করলাম। আমার সাথে আমার বন্ধুরাও। হুজুর আমার মাথায় হাত রেখে দো‘আ করে দিচ্ছেন। আমি হুজুরকে বললাম, হুজুর আমাদের ক্ষমা করে দিন, আমরা বেয়াদবী করেছি। হুজুর বললেন, আমি কিছু মনে করিনি। তোমরাও কোন ভুল করনি। আমি তোমাদের জন্য দো‘আ করছি। পাশ্বে দাড়িয়ে ছিলেন আমার অপরিচিত কালো লম্বা একজন দায়িত্বশীল পর্যায়ের লোক। তাকে লক্ষ করে পীর সাহেব হুজুর বললেন, “হে মুস্তাফিজ সাহেব, আপনি এদেরকে ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলনরে সদস্য করে নিন।” পরে জানলাম তিনি ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমন্নয়কারী, বীর মুক্তিযোদ্ধা মাওলাননা মোস্তাফিজুর রহমান। আল্লাহ তাকে জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করুন, আমীন। হুজুরের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে তার সাথে রেষ্টহাউজের আরেকটি রুমে আসলাম। পারস্পরিক পরিচিত হলাম। তিনি ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলনন সম্পর্কে ধারণা দিলেন। জানালেন, তার কাছে ছাত্র আন্দোলনরে কোন প্রকাশনা এই মুহুর্তে নাই। চট্টগ্রাম গিয়ে পোষ্টে পাঠিয়ে দিবেন। আমি বললাম, সাদা কাগজে সদস্য বানিয়ে নিন, পরে ফরমে তুলে নিবেন। তিনি তাই করলেন। প্রাথমিক কাজ কিভাবে করবো, তার ধারণা দিলেন। দীর্ঘ সময় আলোচনার পর আমরা এক বন্ধুর বাসায় গেলাম। তখন রাত প্রায় ২টা। সারা রাত ঘুম হলো না। তিন বন্ধুর মাথায় দুনিয়ার টেনশন। এখন কি হবে? জোর করে মাথা থেকে সব টেনশন ঝেড়ে ফেলে অজু করে তাহাজ্জুদের জন্য জায়নামাজে দাড়িয়ে গেলাম। একসাথে মুনাজাত করলাম। মুনাজাত শেষে সিদ্ধান্ত নিলাম, যত বিপদ আসবে আসুক, ছাত্র শিবির আর নয়, এবার সহিহ ধারার দীন কয়েমের সংগঠন ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলনই করবো।


ফজরের পর থেকে শুরু হলো নতুন ভোর। নতুন পরিচিতি। নতুন সংগঠন। হামলা-মামলা, হুমকি-ধমকি উপেক্ষা করে আমাদের এই যাত্রা অপ্রতিরোধ্য। দুদিনের মাথায় মাওলানা ফখরুল ইসলাম সাহেবের মসজিদের গিয়ে আমাকে আহবায়ক করে বান্দরবান জেলা কমিটি গঠন করা হয়। সেই থেকে মরহুম শাইখ রহ.-এর দোয়া ও বরকতে আমার প্রাণস্পন্দন ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলনের সাথে আছি। সবর কাকে বলে, কত প্রকার ও কি কি, তা শিখেছি। অনুশীলনের চেষ্টা করছি। ততক
বান্দরবান থেকে চট্টগ্রাম দক্ষিন। দক্ষিণ থেকে কেন্দ্র। আলহামদুলিল্লাহ আজও মহান আল্লাহ অশেষ মেহেরবানী করে এই সহিহ আন্দোলনরে সাথে সম্পৃক্ত থাকার তাওফিক দিয়েছেন, তাই তার দরবারে অশেষ শুকরিয়া আদায় করছি।


কিন্তু যখনই সেই দিনের স্মৃতি মনে পড়ে ভেসে উঠে আমার শাইখ রহ.- এর সাদাসিদে নুরানী চেহারাটা। এখনো এই চেহারা আমাকে ভাবিয়ে তুলে। এখনো এই প্রিয় মুখ আমাকে শিহরিত করে। তার কণ্ঠ এখনো আমাকে অস্তির করে তুলে। আমার শাইখ পীর সাহেব চরমোনাই রহ.- এর প্রতি হৃদয়ের অদৃশ্য আকর্ষণ শব্দে-বর্ণে, কলমকাগজে ও মুখের ভাষায় বর্ণনা করা অসম্ভব …।

মুফতি Delower Saki
…………………………………………………..
মুহাম্মদ দেলাওয়ার হোসাইন সাকী
সাবেক কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক,
(২০০৪-২০০৫ সেশন)
ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *