বৃহস্পতিবার, ২২শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১৬ই জিলহজ্জ, ১৪৪১ হিজরী

রমযান ও রোযা বিষয়ক প্রচলিত কয়েকটি ভুল


■■ রমযান ও রোযা বিষয়ক প্রচলিত কয়েকটি ভুল ■■

একটি ভুল মাসআলা : রোযার নিয়ত কি মুখে করা জরুরী?
.
রোযার নিয়ত নিয়ে অনেকের মধ্যে একটা ভুল ধারণা কাজ করে। অনেকেই মনে করেন, রোযার নিয়ত মুখে করতে হয়। সমাজে যে আরবী নিয়ত প্রচলিত আছে তা বলতে হয়, নইলে কমপক্ষে মুখে এতটুকু বলতে হয় যে, আমি আগামীকাল রোজা রাখার নিয়ত করছি। অন্যথায় নাকি রোযা সহীহ হবে না।
তাদের এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। রোযার জন্য মৌখিক নিয়ত জরুরি নয়; বরং অন্তরে রোযার সংকল্প করাই যথেষ্ট।
এমনকি রোযার উদ্দেশ্যে সাহরী খেলেই রোযার নিয়ত হয়ে যায়। সুতরাং এ কথা ভাবার কোন সুযোগ নেই যে, মুখে রোযার নিয়ত না করলে রোযা হবে না।
[ মাসিক আলকাউসার, শাবান-রমযান ১৪৩৪ . জুন-জুলাই ২০১৩ ]
.
একটি ভুল ধারণা : সাতাশ রমজানের রাতেই কি শবে কদর ?
.
অনেকের মনে এই ভুল ধারণা রয়েছে যে, সাতাশের রাতই হচ্ছে শবে কদর। এই ধারণা ঠিক নয়। সহীহ হাদীসে এসেছে যে, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে লাইলাতুল কদর কোন রাত তা জানানো হয়েছিল। তিনি তা সাহাবীদেরকে জানানোর জন্য আসছিলেন, কিন্তু ঘটনাক্রমে সেখানে দুই ব্যক্তি ঝগড়া করছিল। তাদের ওই ঝগড়ার কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট থেকে সে রাতের ইলম উঠিয়ে নেওয়া হয়। এ কথাগুলো সাহাবীদেরকে জানানোর পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন- হতে পারে, এতেই তোমাদের জন্য কল্যাণ রয়েছে। এখন তোমরা এ রাত (অর্থাৎ তার বরকত ও ফযীলত) রমযানের শেষ দশকে অন্বেষণ কর। সহীহ বুখারী হাদীস নং ২০২০, সহীহ মুসলিম ১১৬৫/২০৯
অন্য হাদীসে বিশেষভাবে বেজোড় রাতগুলোতে শবে কদর তালাশ করার আদেশ দেওয়া হয়েছে। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ১১৬৫
তাই সাতাশের রাতকেই সুনির্দিষ্টভাবে লাইলাতুল কদর বলা উচিত নয়। খুব বেশি হলে এটুকু বলা যায় যে, এ রাতে লাইলাতুল কদর হওয়ার অধিক সম্ভবনা রয়েছে।
রমাযানের শেষ দশকের ফযীলতই সবচেয়ে বেশি। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শেষ দশকে ইতিকাফ করতেন। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ১১৭১
[ মাসিক আলকাউসার » মুহাররম-১৪৩৪ . ডিসেম্বর-২০১২ ]
.
একটি ভুল ধারণা : রোযা অবস্থায় স্বপ্নদোষ হলে কি রোযা ভেঙে যায়?
.
কেউ কেউ মনে করেন, রোযা অবস্থায় যদি স্বপ্নদোষ হয় তাহলে রোযা ভেঙে যাবে। তাদের এ ধারণা ঠিক নয়। স্বপ্নদোষের কারণে রোযা ভাঙে না।
একটি বর্ণনায় এসেছে, তিনটি বস্তু রোযা ভঙ্গের কারণ নয়; বমি, শিঙ্গা লাগানো ও স্বপ্নদোষ। (মুসনাদে বাযযার, হাদীস ৫২৮৭; নসবুর রায়াহ ২/৪৪৭; মাজমাউয যাওয়ায়েদ ৩/১৭০; জামে তিরমিযী, হাদীস৭১৯; সুনানে কুবরা, বাইহাকী ৪/২৬৪)
সুতরাং রোযা অবস্থায় স্বপ্নদোষ হলে রোযা ভেঙে যায়- এ ধারণা ঠিক নয়।
.
[ মাসিক আলকাউসার » জুমাদাল আখিরাহ ১৪৩৭ . মার্চ ২০১৬ ]
.
একটি ভুল মাসআলা : সফরের হালতে কি রোযা ভাঙ্গার অনুমতি আছে, না না-রাখার?
.
শরয়ী সফরে রোযা না রাখার অনুমতি রয়েছে, তবে পরে এই রোযার কাযা আদায় করতে হবে। উত্তম এই যে, শরয়ী সফরেও এই রুখসত অনুযায়ী আমল না করে রোযার হালতে থাকা। কেননা পরে কাযা আদায় করা হলেও তো রমযানের বরকত পাওয়া যাবে না।
এই মাসআলা কেউ কেউ এভাবে বলে থাকেন : ‘সফরের হালতে রোযা ভাঙ্গা জায়েয আছে।’ এভাবে বলা ঠিক নয়। কেননা, এতে ধারণা হয় যে, সফরের হালতে রোযা আরম্ভ করার পরও তা ভেঙ্গে ফেলা জায়েয কিংবা রোযা শুরু করার পর সফরে রওয়ানা হলে রোযা ভঙ্গ করা জায়েয। অথচ এটা ঠিক নয়। রোযা শুরু করার পর তা ভঙ্গ করা জায়েয নয়।
[ মাসিক আলকাউসার » শাওয়াল ১৪২৯ . অক্টোবর ২০০৮ ]
.
একটি ভুল ধারণা : যাকাত কি শুধু রমযান মাসে আদায় করতে হয়?
.
অনেক মানুষ মনে করে যে, যাকাত শুধু রমযান মাসে আদায়যোগ্য আমল। এ ধারণা ঠিক নয়। নিসাব পরিমাণ সম্পদের উপর এক চান্দ্র বছর অতিবাহিত হলেই সেই সম্পদের যাকাত দেওয়া ফরয। যাকাত ফরয হওয়ার পর দ্রুত আদায় করতে হবে। কিন্তু কোনো কোনো লোককে দেখা যায়, তাদের যাকাতবর্ষ রমযান মাসের আগে, এমনকি ৪/৫ মাস আগে হয়ে যায়। এরপরও তারা তখন যাকাত আদায় করে না; বরং রমযানেরঅপেক্ষা করতে থাকে। এমন করা আদৌ উচিত নয়। বরং গরীবের পাওনা যত দ্রুত আদায় করা যায় ততই শ্রেয়। হ্যাঁ, যাদের যাকাতবর্ষ রমযান মাসে পূর্ণ হয় তারা রমযানেই আদায় করবেন।
[ মাসিক আলকাউসার » মুহাররম-১৪৩৪ . ডিসেম্বর-২০১২ ]
.
একটি ভুল কথা : রোযাদারের খাবারের হিসাব হবে না
.
কোনো কোনো মানুষকে বলতে শোনা যায়, রোযাদারের খাবারের কোনো হিসাব হবে না। এটি একটি ভুল কথা।
খাবারের হিসাব বলতে সাধারণত খাবারের অপচয় বোঝায়। আর কুরআন হাদীসে এমন কোনো কথা নেই যে, রোযাদার যদি খাবারের অপচয় করে তাহলে তার কোনো হিসাব হবে না। যে ব্যক্তিই খাবার বা যেকোনো বস্ত্তই অপচয় করুক আল্লাহর দরবারে তাকে এর হিসাব দিতে হবে। সুতরাং রোযাদার হোক বা যেই হোক খাবার বা যেকোনো বস্ত্তর অপচয় থেকে বেঁচে থাকা জরুরি।
আর পানাহারের ক্ষেত্রে হারাম থেকে বেঁচে থাকা ফরয- তা তো সব সময় এবং সর্বাবস্থারই বিধান। হিসাবের প্রশ্ন আসে হালালের ক্ষেত্রে; নিয়ামতের যথাযথ ব্যবহার হলকি না এবং তার শোকর আদায় করা হল কি না। হারামের উপর তো সরাসরি শাস্তি হয়। তাই প্রচলিত এ বাক্য শুনে এরূপ মনে করা যে, হারাম খেলেও কোনো হিসাব নেই তা আরো ভয়াবহ।
[ মাসিক আলকাউসার, শাবান-রমযান ১৪৩৫. জুন-জুলাই ২০১৪ ]
.
একটি ভিত্তিহীন ধারণা : দাফনের পর জুমআ বা রমযান এলে কি কিয়ামত পর্যন্ত আযাব মাফ হয়ে যায়
.
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে কবরের আযাব থেকে রক্ষা করুন। আল্লাহ সকল মুমিন নর-নারীকে ক্ষমা করুন, সকলকে বরযখের আযাব থেকে মুক্তি দান করুন, আখিরাতের সকল মঞ্জিল সহজ ও নিরাপদে পার করিয়ে দিন।
কবরের আযাব সত্য। কুরআন ও হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। এই আযাব থেকে মুক্তির প্রথম শর্ত ঈমান। দ্বিতীয় শর্ত ঈমানের দাবি অনুযায়ী জীবন যাপন, বিশেষত যেসব গুনাহর কারণে কবরে আযাবের কথা বর্ণিত হয়েছে তা থেকে সর্বোতভাবে বেঁচে থাকা এবং যেসব আমলের দ্বারা কবরের আযাব থেকে মুক্তির প্রতিশ্রুতি বর্ণিত হয়েছে সেসব আমল গুরুত্বসহকারে করা।
এখানে আমি যে কথাটি বলতে চাচ্ছি তা এই যে, কাউকে বলতে শোনা যায়, কৃত গুনাহর কারণে যার কবরে আযাব হওয়ার কথা তার দাফনের পর যখনই কোনো জুমআ বা রমযান আসে তখন থেকে কিয়ামত পর্যন্ত তার আযাব বন্ধ হয়ে যায়।
অনেকে এ কথার পক্ষে আহসানুল ফাতাওয়ার উদ্ধৃতিও দিয়ে থাকেন।
বাস্তবে এ ধারণা ভিত্তিহীন। এ ধরনের কথা কোনো সহীহ হাদীস বা শরীয়তের কোনো দলীল দ্বারা প্রমাণিত নয়। আহসানুল ফাতাওয়ায় (৪/২০৮) যদিও এমন কথা আছে, কিন্তু আহসানুল ফাতাওয়ার তাতিম্মা (পরিশিষ্ট) অর্থাৎ আহসানুল ফাতাওয়ার দশম খন্ডে (পৃষ্ঠা : ৪৩৩-৪৩৫)-এ দলিল-প্রমাণসহ এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে এবং আগের কথাটিকে ভিত্তিহীন বলা হয়েছে।সুতরাং এই ভিত্তিহীন কথা বিশ্বাস করা ও বলা থেকে বিরত থাকা উচিত। আর কবর ও আখিরাতকে সর্বোচ্চ সুন্দর বানানোর চেষ্টায় সর্বদা নিয়োজিত থাকা উচিত। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাওফীক দান করুন। আমীন।
[ মাসিক আলকাউসার » এপ্রিল-২০১২, জুমাদাল উলা-১৪৩৩ ]
.
#রমাযানুল_মুবারক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Archives

August 2020
S S M T W T F
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031  
shares