শনিবার, ১৩ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১৩ই রবিউস সানি, ১৪৪২ হিজরি

মাওলানা কালীম সিদ্দিকি হাফিঃ সম্পর্কে ২ টি কারগুজারী


২০০৩ ইংরেজি সনে ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান দারুল উলুম দেওবন্দে (ভারত) ভর্তি পরিক্ষা শেষে মনে করলাম ফলাফল বের হবার আগে আমাদের বুযুর্গদের স্মৃতি বিজড়িত ঐতিহাসিক স্থানসমূহ জিয়ারত করে আসি। সেই নিয়তেই প্রথমে নির্বাচন করলাম মুজাফফরনগর জেলার খাতুয়াল্লি থানার ‘ফুলাত’ নামক সুপ্রসিদ্ধ গ্রামটিকে। যেখানে রয়েছে শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী ও শাহ ইসমাঈল শহীদ (রহ.) এর স্মৃতিবিজরিত জন্মভূমি। যেই ঘরে শাহ ওয়ালিউল্লাহ রহ. জন্মগ্রহণ করেছিলেন, সে ঘরটি এখনও সেভাবেই বিদ্যমান। আরো রয়েছে দেখার মত আরো প্রসিদ্ধ স্থান সেখানে আছে। সেখানে গিয়ে একটি খানকায় অবস্থান করলাম। একব্যক্তির সঙ্গে দেখা হলো। তাঁর সাথে কথাবার্তা বললাম। আমার মনে হচ্ছিল, এমন মানুষ ইতোপূর্বে কখনো দেখিনি। যেমন তাঁর নূরানী চেহারা, তেমনি তাঁর সুন্নতের পাবন্দী। তাঁর অন্তরে ছিল একরাশ বেদনা, হৃদয়ে তপ্তজ্বালা দাউদাউ করে জ্বলছিলো যা তাঁর আলোচনা থেকেই প্রতীয়মান হয়। আগ্রহ জন্মালো এই মানুষটির সাথে কাজ করার। সেখানেই জানতে পারলাম, তিনি হলেন বিশ্বখ্যাত দা‘য়ী ও শায়খ হযরত মাওলানা আবুল হাসান আলী নদভী (রহ.) ও শায়খুল হাদিস যাকারিয়া (রহ.)-এর বিশিষ্ট খলীফা হযরত মাওলানা কালীম সিদ্দিকী। আরও জানতে পারলাম, তাঁর মাধ্যমে এ পর্যন্ত লক্ষাধিক অমুসলিম ইসলামের সুশীতল ছাঁয়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেছেন। তাঁকে আমার খুবই পছন্দ হলো। মনে মনে এমন একজন শায়খেরই সন্ধানে ছিলাম। আলহামদুলিল্লাহ! আল্লাহ আমাকে মিলিয়ে দিলেন। পরবর্তীতে তাঁর সাথে ইসলাহী সম্পর্ক কায়েম করলাম এবং যাওয়া-আসা করতে থাকলাম। ইসলাহী সম্পর্কের বদৌলতে তো অনেক ঘটনা ঘটে যায় সেগুলো বিস্তারিতভাবে বললে কলেবর অনেক বড় হয়ে যাবে। আমি দু’একটা ঘটনা এখানে উল্লেখ করছি।

১) ভারতের পাঞ্জাবের হরিয়ানায় হযরতের সাথে আমার সফর ছিলো। সেখানে একটা প্রোগ্রামের আয়োজন করা হয়েছিলে মুসলিম ও অমুসলিম উভয়ই সেখানে উপস্থিত ছিলো। হযরত তাদের অন্তরকে উদ্দেশ্যে করে দিল থেকে যখন বয়ান পেশ করলেন আমি স্টেজেই হযরতের পাশে বসা ছিলাম। মুসলমানদেরকে দাঈ হওয়ার বয়ান করলেন, সবার নিকট ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরলেন। ঠিক সেই মজলিসেই উপস্থিত কয়েকশ বিধর্মী কালিমা পাঠ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলো।

২) এটা সৌভাগ্যের বিষয় যে আমি হযরতে সাথে হজ্ব ওমরা করার তৌফিক লাভ করেছি। পৃথিবীর নানা প্রান্তের বড়রা হযরতকে কদর করেন, মুহাব্বাত করেন, ভালোবাসেন সেটা আমি দেখেছি। ২০১০ সালে আমি হজ্বের সফরে একই হোটেলে অবস্থান করছিলাম। আলহামদুলিল্লাহ! হজ্বের সফরে হযরতের সাথেই থাকা হয়, আল্লাহ পাকের রহমতে। একদিন রাতের ২ টার দিকে হযরত বললেন, “চলো, মাতাফ তো খালি দেখা যায় !” আমরা মাতাফে গেলাম, তাওয়াফ করলাম। তাওয়াফ শেষে হযরত মুলতাজিমায় যাবেন। সাধারণত মুলতাযিমায় বেশ ভীর। মানুষ একজনের উপর আরেকজন পড়ে যায় যায় অবস্থা । আমি দেখলাম হযরত নিচের দিকে তাকিয়ে আছেন, নিচু স্বরে দুআ পাঠ করছেন। উনি কাউকে ঠেলা দিচ্ছেন না, কেউ উনার উপরও এসে পড়ছে না। একটু সময় নিয়ে আস্তে আস্তে ধীর পায়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। এর মধ্যে খেয়াল করলাম যে জায়গা অনেকটা খালি হয়ে এসেছে, ভীড় অনেক কমে গেলো। হযরত খুব আরামসে পৌঁছে গেলেন আমিও হযরতের সাথে পৌছে গেলাম। সেখানে গিয়ে আমি হাউমাউ করে আওয়াজ করে কাঁদছিলাম। হযরত আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে সতর্ক করে দিলেন- এটা মালিকের দরবার, এখানে কান্নারও আদব আছে, আবেগের প্রকাশের কিছু আদব আছে। এইভাবে কান্নাকাটি করতে আমাকে নিষেধ করলেন। যাইহোক সেখানে আমি হযরতের সাথে দুআ করলাম। তাওয়াফ, দুআ শেষ করে নামাজ আদায়ান্তে হযরত আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, পীর যুলফিকার আহমাদ নকশবন্দী’কে চিনেন আপনি ? আমি বললাম, হযরত উনার নাম তো অনেক শুনেছি;কিন্তু সরাসরি দেখিনি। তবে ছবিতে দেখেছি। তখন হযরত বলেনন, তিনি এখন তাওয়াফ করছেন। তাওয়াফ শেষ করে তিনি এই দুই জায়গার কোন এক জায়গায়তে নামাজ আদায় করবেন। হযরত কালীম সিদ্দিকী সাহেব কিছুক্ষন অপেক্ষা করার পর জরুরত থাকায় তিনি আমাকে চলে যান। চলে যাওয়ার পূর্বে বলে যান। নামায আদায় করার পর আমার সালাম পৌছাবেন। আপনার জন্য দুআ চাইবেন, আপনার দেশের জন্য দুআ চাইবেন। আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলাম। হযরত যেখানে বলেছিলেন সেখানের এক জায়গায় ভীড় থাকায় ঠিক অন্যস্থানেই নামাজ আদায় করলেন। নামায আদায় শেষ করে তিনি ফিরে যাচ্ছিলেন। আমি পেছন থেকে সালাম দিচ্ছিলাম কিন্তু খাদেম সাহেব অপারগতার কারণে বোধহয় সুযোগ দিতে চাচ্ছিলেন না। তিনি সালামের উত্তর দিলেন। আমার দিলের তামান্না ছিলো যে, আমাকে তো হযরতের পয়গামটা পৌছাতে হবে। আমাকে তো উনার কাছে দোয়া চাইতেই হবে। আমি পিছনে পিছনে ছুটলাম আর একটু জোরে আওয়াজে বললাম যে, হযরত আমাকে মাওলানা কালীম সিদ্দিকী সাহেব আপনার সাথে সাক্ষাতে পাঠিয়েছেন। ‘হযরত কালীম সিদ্দিকী সাহেব’ এর নামটা বলতে দেরী হলো, মনো হলো উনি ‘হার্ড ব্রেক’করলেন। সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে গেলেন, চেহারা ঘুরিয়ে আমার সাথে মোসাহাফা করলেন। আমিও সুযোগ পেয়ে গেলাম, আমার হযরতের সব শিখানো কথা শোনালাম। বাংলাদেশের দাওয়াতি কাজের কিছু কারগুজারি শোনালাম। হুজুর দোআ করলেন, আমার সাথে মোআনাকা করলেন। হযরত আমাকে তার বাসস্থান আমাকে দেখিয়ে দিলেন এবং বললেন সময় পেলে যাওয়ার আমন্ত্রণ করলেন।
ঐ সফরেই মাওলানা তারিক জামিল সাহেব এবং জুনায়েদ জামশেদ রহিমাহুল্লাহর সাথে দেখা হয়। মাওলানা তারিক জামিল সাহেব এবং হযরত বসা ছিলেন ঠিক সেই সময় জুনায়েদ জামশেদ রহিমাহুল্লাহকে হযরত বসার জন্য বলছিলেন কিন্তু জুনায়েদ জামশেদ সাহেব হযরতের সামনে বসেন নি।

সেই সফরে হযরতের কাছে, পীর জুলফিকার আহমেদ সাহেবের কাছে দোয়া চেয়েছি জামালপুরের মাদারগঞ্জ থানার একভাই লেবু ডাক্তার যিনি মুসলিম থেকে খ্রিষ্টান হয়ে প্রায় ৩০,০০০ হাজার মুসলিম খ্রিষ্টান হয়েছে। তার উদ্দেশ্যে দাওয়াতি সফর চলছিলো। সেখানে গিয়ে দোয়া করেছিলাম। হজ্বের সফর থেকে ফিরে এসে শুনেছি যে সে মুসলমান হয়েছে। তাওবা করেছে। আলহামদুল্লিাহ। গত কয়েকদিন আগেও তার বন্ধু ডাক্তার সাহেবও ফিরে এসেছে আলহামদিুলিল্লাহ।
এরকম অনেক ঘটনা আছে যেগুলো আমাকে বেশ নাড়া দিয়েছে হযরতের প্রতি ভক্তি এবং ভালোবাসার অনুপম উদাহরণ রয়েছে অনেক।

মুফতি যুবায়ের আহমাদ 

পরিচালকঃ ইসলামী দাওয়াহ ইন্সটিটিউট , ঢাকা ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Archives

November 2020
S S M T W T F
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930  
shares