শনিবার, ২৪শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১৮ই জিলহজ্জ, ১৪৪১ হিজরী

নওমুসলিমদের সাক্ষাৎকার [পর্ব-১৩] ::মুহাম্মদ আকরাম (বিক্রম সিং)-এর সাক্ষাৎকার


পৃথিবীর সকল মানুষ একই মা-বাবার সন্তান। আমরা একই রক্তের ভাইবোন। যদি কেউ ভুল বুঝে কিংবা না বুঝার কারণে ইসলামকে ঘৃণা করে, তাহলে মনে রাখতে হবে আমরা তো সর্বশেষ নবী এবং পবিত্র কুরআনের অনুসারী। তাই তাদের কাছে দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছানো আমাদের দায়িত্ব। বিশেষ করে আমাদের ভারতে ‘দলিত’ বলে যে তেত্রিশ কোটি আদম সন্তান রয়েছে যাদের ধর্মের ঠিকাদাররা অচ্ছুত করে অপমান করে রেখেছে আমি মনে করি এদের মধ্যে কাজ করা খুব সহজ। এদের ভেতরটা ভেঙ্গেচুরে পড়ে আছে। আমরা যদি ইসলামের ভ্রাতৃত্ব ও সমতার শিক্ষা তাদের সামনে তুলে ধরতে পারি তাহলে আমরা তাদের অন্তর জয় করতে পারবো। এর দ্বারা আমাদের রাষ্ট্রও উপকৃত হবে।


আহমদ আওয়াহ: আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু!
মুহাম্মদ আকরাম: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ!

আহমদ আওয়াহ: আকরাম ভাই! আরমুগানের পাঠকদের জন্য আপনার সঙ্গে কিছু কথা বলতে চাই।
মুহাম্মদ আকরাম: হ্যাঁ, অবশ্যই বলুন।

আহমদ আওয়াহ: প্রথমেই আপনার পরিচয় বলুন।
মুহাম্মদ আকরাম: এখন তো মুহাম্মদ আকরাম। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে আমার নাম ছিল বিক্রম সিং। মিরাঠ জোলার একটি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছি। অবশ্য সেই গ্রামটি এখন শহরেই অন্তর্ভুক্ত। আমার পিতাজীর নাম শ্রী তিলক রাম। তিনি একজন মাঝারী মানের কৃষক। আমরা চার ভাই ও তিন বোন। আমি নানক চাঁদ কলেজ থেকে ইতিহাসে এমএ করেছি। তারপর এলএল বিতে ভর্তি হয়েছিলাম। দ্বিতীয় বর্ষে এমন কিছু অবস্থার মুখোমুখি হয়েছি যার জন্য বাধ্য হয়ে আমাকে মাঝখানে এসে লেখাপড়া ছাড়তে হয়েছিল। তারপর ২০০২ সালের ১২ অক্টোবর আমি ইসলাম গ্রহণ করি।

নওমুসলিমদের সহযোগিতার জন্য এগিয়ে আসুন

আহমদ আওয়াহ: কোনো বিষয়টি আপনাকে ইসলামের প্রতি আকর্ষণ করেছিল একটু বিস্তারিত বলবেন কি?
মুহাম্মদ আকরাম: আমার ছেলেবেলাটা কেটেছে খুবই অদ্ভুতভাবে। আমার পরিবার ছিল খুবই ধার্মিক। আমি যখন সামান্য বড় হয়েছি তখন আমার চিন্তা-ভাবনায় সৃষ্টিকর্তার অনুসন্ধান বেশ শক্তিশালী হয়ে ওঠে। মাঝে মাঝে আমি একাকী বসে চিন্তা করতামÑ আচ্ছা, এই বিশাল জগত সংসার কে সৃষ্টি করেছেন? বিশাল মানবগোষ্ঠীর সৃষ্টিকর্তা কে? পৃথিবীর প্রত্যেকটি মানুষ সম্পূর্ণ আলাদা। এমন কি এক মায়ের সন্তানদের মধ্যেও কী বিচিত্র পার্থক্য! কোনো একটি কোম্পানি যখন কিছু গাড়ি তৈরি করে তখন সবগুলো গাড়ি হয় একই রকম, নম্বর প্লেট দেখে আমাদের পার্থক্য নির্ণয় করতে হয়। অথচ এই পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষ। এর সৃষ্টিকর্তা একজন। মালিক একজন। কিন্তু, এই মানুষকে চেনার জন্য কোনো নম্বর প্লেটের প্রয়োজন হয় না। এমন নিখুঁত সৃষ্টিকর্তা কে? সূর্য ওঠে। মাথার উপর থেকে যেন আগুন ঝরে। চাঁদ ওঠে। পুরো পৃথিবী স্নিগ্ধ আলোয় শীতল হয়ে পড়ে। বিশাল আকাশ অথচ কোনো খুঁটি নেই। কোনো দেয়াল নেই। কে ধরে রেখেছেন এই বিশাল আকাশ? এই যে মানুষের শরীরে চোখ, কান এবং পা। এত চমৎকার এক জীবনব্যবস্থা। কে এই জীবন ব্যবস্থার পালনকর্তা? কোনো মানুষের একটি চোখ যদি নষ্ট হয়ে যায় তাহলে ডাক্তার বড় জোর একটি পাথরের চোখ বসাতে পারে। কিন্তু পৃথিবীর সকল ডাক্তার মিলেও একটি প্রকৃত চোখ বানাতে পারে না।

মূলত এই প্রশ্নগুলো ছোটকাল থেকেই আমাকে তাড়া করে ফিরতো। মালিকের যে কোনো সৃষ্টির দিকে তাকালেই আমার ভেতর এসব প্রশ্ন জেগে ওঠতো। সৃষ্টিকর্তাকে অনুসন্ধান করতে বাধ্য করতো। আমি আমার অন্তরের সুখ ও স্বস্তির জন্য মনে করতাম ধর্মই একমাত্র ভরসা। প্রথম দিকে আমি মন্দিরে যেতাম। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখতাম, মানুষ হাতের তৈরি মূর্তিগুলোর পূজা করছে। কিছুটা আশ্চর্য হতাম। পূজারীদের বিবেকের উপর আমার আক্ষেপ হতো। আমার পরিবারের লোকজন মূর্তিদের খেতে দিত আবার শীতের সময় কাপড় দিত। গরমের সময় বাতাস করতো। আমি মাঝে মাঝে বলতাম, তোমরা এদেরকে খেতে পরতে দাও অথচ প্রসাব-পায়খানার জন্য একটু জঙ্গলে নিয়ে যাওনা কেন? তারা তখন আমাকে শাসাতো, বলতোÑ এই ছেলে পাগল হয়ে গেছে। ভগবান এর আকল বুদ্ধি ছিনিয়ে নিয়ে গেছেন।

একবার আমি আমার ছোটভাইকে নিয়ে হরিদুয়ার গেলাম। আমরা মূলত গিয়েছিলাম নীলকণ্ঠ পাহাড় দর্শনে। সেখানে গিয়ে একজায়গায় প্রচুর পুলিশ দেখতে পেলাম। জিজ্ঞেস করলাম, এখানে এতো পুলিশ কেন? তারা বললো এই পাহাড়ে ভগবান শিবাজির একটি স্বর্ণের তৈরি সাপমূর্তি রাখা আছে। মূর্তিটি ভারী এবং মূল্যবান। এজন্য এতো পুলিশ মিলে পাহারা দিচ্ছে। ভগবানের মূর্তি আবার কেউ চুরি করে নিয়ে না যায়।
তাদের এ কথা শুনে মনে মনে আমি বেশ ধাক্কা খেলাম। ভাবলাম ভগবান শিবাজি নিজের মূর্তিটাকে রক্ষা করতে পারছে না। সে তার পূজারীদের রক্ষা করবে কিভাবে? নিজের আত্মরক্ষার জন্য যার পুলিশের দরকার হয় সে কীভাবে পূজা পেতে পারে? আমি বুঝে উঠতে পারছিলাম না। আমি বরং ভাবছিলাম মূর্তিগুলোর যদি অনুভূতি থাকতো কিংবা যদি এদের কোনভাবে জীবন দেয়া যায় তাহলে বরং এরাই আমাদের পূজা করবে। কারণ আমরা এদের বানিয়েছি।

অনেকবার খবরে পড়েছি আজ অমুক মন্দিরে রূপার তৈরি অমুক ভগবানের মূর্তি চুরি হয়ে গেছে। আবার কখনও বা পড়েছি অমুক মন্দিরে অমুক ভগবানের ত্রিশূল চুরি হয়ে গেছে। এসব শুনে শুনে আমার মনে মন্দিরের প্রতি একটা ঘৃণার সৃষ্টি হয়েছে। তারপর আমি আমার মনের শান্তির জন্য সৎসঙ্গে যেতে শুরু করেছি। সৎসঙ্গে গিয়ে দেখলাম যখন গুরু মহারাজ প্রাচন প্রদান করেন তখন অন্যদের উদ্দেশ্যে বলেন, মোহ-মায়া অর্থাৎ, জগতের লোভ-লালসা থেকে দূরে থেকো। অথচ যখন কোনো ব্যক্তি তাকে পাঁচশ রুপির একটি নোট দেয় তখন সে খুব খুশি হয়। নোটটি তাড়াতাড়ি পকেটে পুরে নেয়। তাদের আদর করে পাশে বসায়। যারা কিছু দেয় না তাদের প্রতি ফিরেও তাকায় না। এই অবস্থা দেখে আমার মনে হলো এ কেমন ধর্ম? নিজে সম্পদের প্রতি লোভী আর অন্যদের বলে এসবের লোভ থেকে দূরে থাকো। আমি গুরুদের বহু অপরাধ এবং যুবতীদের সাথে তাদের হাস্য-রসিকতা সবই দেখেছি। আমি দেখেছি গুরুরা ভক্তদের উপদেশ দেয় তাদের মৃত্যুর পর যেন সমাধী নির্মাণ করা হয়। তাদের যেন পোড়ানো না হয়। অথচ তাদের সামনে যখন লোকদের মৃতদেহ পোড়ানো হয় তখন তারা বাঁধা দেয় না।

এসব দেখে আমার মনে হতো এই গুরু সমাজ আসলে ভেতরে ভেতরে মুসলমান। অথচ অন্যদের এরা ইসলাম থেকে দূরে রাখে। এসব দেখে, সৎসঙ্গের প্রতিও আমি আগ্রহ হারিয়ে ফেলি। আমি হিন্দুধর্ম ছেড়ে খৃষ্টধর্মের প্রতি মনোযোগী হই। কিন্তু সেখানেও গিয়ে দেখি হযরত ঈসা এবং মরিয়মের ছবির পূজা করা হয়। আমি ভেবে পাই না খোদার আবার পুত্র হয় কী করে! খৃষ্টানদের দেখি তারা ঈসা আ.-এর মূর্তির পূজা করে তার কাছে প্রার্থনা করে। অথচ তারাই মনে করে প্রভু ঈসা আ.-কে শুলিতে চড়ানো হয়েছিল। যাকে শুলিতে চড়ানো হয়েছে তার পূজা করা কীভাবে বিবেকে আসে আমি বুঝে উঠতে পারি না। তাছাড়া খোদ সৃষ্টিকর্তাকে ছেড়ে তার পুত্রের কাছে প্রার্থনা করা এটাই বা কেমন কথা? আমি এখানেও নিরাশ হই।

একদিন গির্জা থেকে নিরাশ মনে ফিরছিলাম। পথে দেখলাম, জৈন মুনিদের একটা কাফেলা যাচ্ছে। চার-পাঁচজন উলঙ্গ মানুষ নির্লজ্জভাবে হেঁটে যাচ্ছে। পথে এক জায়গায় তাদের সংবর্ধনা হওয়ার কথা। তারা সেখানে যাওয়ার পর যুবতী মেয়েরা তাদের উদোম শরীর ধুয়ে সেই পানি পান করেছিলো। আমি এই দৃশ্য দেখে খুবই হতাশ হলাম। ভাবছিলাম, মানুষের বিবেক যখন অন্ধ হয়ে যায় তখন প্রচলিত প্রথার সামনে কিভাবে বলি হতে পারে!

আমি সবদিক থেকে নিরাশ হয়ে ইসলাম সম্পর্কে অনুসন্ধান শুরু করি। আমাদের গ্রামে প্রচুর মুসলমানদের বাস, যখন আমি ইসলাম সম্পর্কে জানতে শুরু করলাম তখন আমার মধ্যে সবকিছু স্পষ্ট হয়ে উঠতে লাগলো এটাই প্রাকৃতিক ধর্ম। ইসলামের পরকাল বিশ্বাস আমাকে সবচে’ বেশি প্রভাবিত করেছে। এই পৃথিবীর সব কিছুই ধ্বংস হয়ে যাবে। আল্লাহ তায়ালার সামনে সবকিছুরই হিসাব দিতে হবে। ইসলাম মানুষকে মানুষ হিসেবেই রেখেছে, দেবতা বানায়নি এই ব্যাপারটি আমার খুবই ভালো লাগে। এই জগত ছেড়ে সবাইকে একদিন চলে যেতে হবে এবং উপস্থিত হতে হবে এক মালিকের সামনে যিনি সমগ্র জগতের সৃষ্টিকর্তা, জগতের সকলেই যার দাস। ইসলামের রাসূল হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ তায়ালার একজন বান্দা এবং মানুষ।

আমি ইসলামকে জানার জন্য কয়েকজন মুসলমান ছেলের সাথে বন্ধুত্ব পাতি। আমার বন্ধুর নাম ছিল ফারুক। তার নানী মারা গেলে আমি তার দাফনে শরীক হলাম। কিভাবে একজন মুসলমানকে কবরে দাফন করা হয় তাই দেখলাম। পদ্ধতিটা আমার খুব ভালো লাগলো। আমাদের হিন্দু সমাজে একজন মৃত ব্যক্তিকে যেভাবে পুড়িয়ে ফেলে সেই তুলনায় ইসলামের এই পদ্ধতি আমার কাছে একেবারে স্বর্গের মতো মনে হলো। এরপর আমি যখন ঘরে ফিরে ঘুমালাম স্বপ্নে দেখলাম দুটি কবর। কয়েকজন ভালো মানুষ আমাকে খুলে দেখাতে লাগলো। দেখলাম, এক ব্যক্তি নতুন কাপড় পরে আরামে ঘুমিয়ে আছে। অপরজনের কবরে রক্ত। উপস্থিত লোকেরা আমাকে বললো, ঘুমিয়ে আছে যে লোকটি সে একজন সৎ মুসলমান। আর রক্তে পড়ে থাকা ব্যক্তিটি একজন মন্দ মানুষ। তারপর আমি আমার বন্ধুর নানীকে দেখলাম। তাকে দেখে মনে হলো যেন আনিন্দ্য সুন্দরী এক শাহজাদী। অথচ তিনি ছিলেন একজন বৃদ্ধা। তার গায়ের রং-ও ছিল কালো। আমি অবাক হলাম। তারা আমাকে বললো, এই মহিলা সৎকর্মপরায়ণ ছিলেন। তার কৃতকর্মের কারণেই তাকে সুন্দরী করে দেয়া হয়েছে।

তারপর আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। এই স্বপ্ন আমাকে মরণ পরবর্তী জীবনকে সত্যের মতো বিশ্বস্ত করে তুললো। এরপর আমি আরো সুন্দরসুন্দর স্বপ্ন দেখতে লাগলাম। এদিকে মুসলমানদের সাথে অতিরিক্ত মেশার কারণে আমার পরিবার আমাকে সন্দেহ করতে শুরু করলো। তারা যখন আমাকে শাসাতে লাগলো তখন আমি বলে দিলাম আমি মুসলমান হয়ে যাবো আমাকে কেউ ফিরাতে পারবে না। তারপর আমার প্রতি আল্লাহ তায়ালা অনুগ্রহ করলেন। ২০০২ সালের ১২ অক্টোবর আমাদের গ্রামে আগমন করলেন আল্লাহ তায়ালার নেক বান্দা, মানবতার সত্যবন্ধু মাওলানা কালিম সিদ্দিকী। আমার বন্ধুরা আমাকে তাঁর কাছে নিয়ে গেল। মৃত্যুর ভয়ে দেরি করা তিনি পছন্দ করলেন না। আমাকে কালেমা পড়িয়ে দিলেন। নাম জিজ্ঞেস করলেন এবং বললেন ইসলামের দৃষ্টিতে নাম পরিবর্তন করা তেমন জরুরী বিষয় নয়। কিন্তু আমি আমার নাম বদলে ফেলার জন্য পীড়াপীড়ি করতে লাগলাম। তখন তিনি বললেন, তোমার নাম মুহাম্মদ আকরাম।

আহমদ আওয়াহ: তারপর কী হলো?
মুহাম্মদ আকরাম: ইসলাম গ্রহণ করার পর আমার উপর পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয হয়ে গেল। আমি নামায শিখতে লাগলাম। মসজিদে গিয়ে নামায পড়তে লাগলাম। কথাটা আশপাশের গ্রামের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লো। কিছু কিছু মুসলমানও শংকিত হয়ে পড়লো। আমি বললাম, তোমরা ভয় পাচ্ছো কেন? পুলিশ কিছু বললে আমিই তার জবাব দিব। আমি সাবালক। পোস্ট গ্রাজুয়েট। আমি কোনো মুর্খ মানুষ নই। আমি জেনে বুঝে সবগুলো ধর্মের ব্যাপারে চিন্তা করে তারপর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এরপর আমার পরিবারের লোকেরা আমার সাথে কঠোর আচরণ শুরু করলো। এমনও হয়েছে, আমার বাবা পাঁচদিন পর্যন্ত আমাকে ঘরে বন্দি করে রেখেছেন। কিন্তু বন্ধ ঘরেও আমি নামায ছাড়িনি । আমি তখন ভাবতাম, মানুষ অন্যায় করে জেলখানায় বন্দী হয়। পুলিশের নির্যাতন ভোগ করে। আর আমি আমার মালিকের সত্যধর্ম মেনে বন্দী হয়ে রয়েছি। মার খাচ্ছি শুধু মালিকের কথা মানার কারণে। তখন আমি ঐ অত্যাচারের মধ্যে বিস্ময়কর সুখ অনুভব করতাম।

একদিন সুযোগ বুঝে আমি ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লাম। নিযামুদ্দীন মারকাযে গিয়ে এক চিল্লার জন্য জামাতে চলে গেলাম। ফিরে এসে আমার গ্রামের মুসলমানদের সাথে বসবাস শুরু করলাম। পরিণতিতে আমার এলাকায় দাঙ্গা শুরু হলো। আমার পরিবারের লোকেরা আমাকে মেরে ফেলতে চাইছিল। আমি তখন আদালতে এবং থানায় জীবনের আশংকার কথা জানিয়ে ডায়েরী করলাম। পুলিশ তখন আমাকে প্রতাপপুর থানায় নিয়ে গেল। আমাকে চাকরীর লোভ দেখালো। বললো, তুমি স্বধর্মে ফিরো এসো তোমাকে আমরা দারোগা বানাবো। আমি বললাম, দুই দিন দারোগাগিরি করে অনন্তকাল জাহান্নামে জ্বলবো? আমাকে জাহান্নামের জেল থেকে কে রক্ষা করবে? আমাকে বিয়ে-শাদির লোভ দেখানো হলো।

আমার সামেনে ছিল আল্লাহর নিকট উপস্থিত হওয়ার বিশ্বাস। পরকালের সফলতার বাণী আমার সামনে উজ্জ্বল ছিল। ফলে তারা আমাকে কোনভাবেই টলাতে পারেনি। এসপিসিটি আমাকে প্রশ্ন করলো তুমি কি তোমার গ্রাম থেকে অন্য কোথাও চলে যেতে পারবে? আমি বললাম দিল্লী নিযামুদ্দিনে চলে যেতে পারি। কিন্তু ওখানের লোকেরা আমার দায় গ্রহণ করতে অপারগতা প্রকাশ করলো। পুলিশ রাগান্বিত হয়ে বললো, এখন আমরা তোমাকে কী করতে পারি? আমি বললাম ফুলাত নামে একটি গ্রাম আছে। সেখানকার লোকেরা হয়তো আমাকে রাখতে রাজি হবে। দুজন পুলিশ আমাকে নিয়ে রওয়ানা হলো। তারা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। ক্ষুর্ধাতও ছিল। যখন খাতুলি নদীর তীরে আমরা পৌঁছলাম তখন তারা পরস্পর আলোচনা করতে লাগলো, একে মেরে নদীতে ফেলে দিই। এ খামোখাই আমাদের পেরেশান করছে। আমি বললাম, আমার আল্লাহ যদি বাঁচিয়ে রাখেন তাহলে পৃথিবীর কোনো শক্তি আমার কিছু করতে পারবে না। তারা বললো, মাত্র চল্লিশ দিনে মুসলমানরা একে মৌলভী বানিয়ে ফেলেছে। যখন ফুলাত পৌঁছলাম তখন অনেক রাত, মাদরাসায় মাওলানা কালিম সিদ্দীকি ছিলেন না। পুলিশ মাদারাসার দায়িত্বশীলদের বললো, আপনারা যদি এর হেফাযতের ভার গ্রহণ করেন এবং একথা লিখে দেন তাহলে একে আমরা এখানে রেখে যাবো। তা না হলে মেরে একে নদীতে ফেলে দেব। আল্লাহ তায়ালা ভাই ইলিয়াস এবং ভাই সাখাওয়াতকে উত্তম প্রতিদান দিন। তারা আমার দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। পুলিশকে লিখেও দিলেন। আলহামদুলিল্লাহ এখন ফুলাতে বেশ সুখেই আছি। আমাদের আব্বু মাওলানা কালিম সিদ্দীকি তিনি আমাকে মা-বাবার চে’ও বেশি আদর করেন। বাড়ির কথা আমার মনেও পড়ে না।

আহমদ আওয়াহ: তারপর কি আপনি পরিবারের লোকদের সাথে আর যোগাযোগ রাখেননি?
মুহাম্মদ আকরাম: আমার বাবা এবং আত্মীয়-স্বজনরাও এখানে আসে। আমাকে পুরোনো ধর্মে ফিরে যেতে বলে। প্রথম দিকে আমি খুব কঠোর জবাব দিতাম। পরে হযরত আমাকে বুঝালেন, তোমার পরিবারের লোকজন বিশেষ করে তোমার মা-বাবা তোমার শ্রদ্ধার পাত্র। তারা তোমাকে লালন-পালন করেছেন। তোমার উপর তাদের অধিকার রয়েছে। আদব ও শ্রদ্ধার সাথে তাদের জাহান্নাম থেকে বাঁচাবার চেষ্টা করতে হবে। তার এই কথা আমার ভালো লেগেছে। এখন আমার পরিবারের কেউ এলে অত্যন্ত সম্মান করি। তারা আমাদের এখানে খানাপিনাও করেন। তাদের হেদায়েতের জন্য আল্লাহ তায়ালার কাছে দুআও করছি।

আহমদ আওয়াহ: এছাড়াও কি আপনি দাওয়াতের কথা চিন্তা করেছেন?
মুহাম্মদ আকরাম: হ্যাঁ, পরিবারের বন্ধু-বান্ধব এবং আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে দাওয়াতের কাজ শুরু করেছি। আলহামদুলিল্লাহ! তাদের মধ্যে কয়েকজন এ পর্যন্ত ইসলাম গ্রহণ করেছেন। আমি আশাবাদী আরও অনেকেই ইসলাম গ্রহণে ধন্য হবেন।

আহমদ আওয়াহ: আরমোগানের পাঠকদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন!
মুহাম্মদ আকরাম: আমি শুধু এতোটুকুই বলতে চাই পৃথিবীর সকল মানুষ একই মা-বাবার সন্তান। আমরা একই রক্তের ভাইবোন। যদি কেউ ভুল বুঝে কিংবা না বুঝার কারণে ইসলামকে ঘৃণা করে, তাহলে মনে রাখতে হবে আমরা তো সর্বশেষ নবী এবং পবিত্র কুরআনের অনুসারী। তাই তাদের কাছে দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছানো আমাদের দায়িত্ব। বিশেষ করে আমাদের ভারতে ‘দলিত’ বলে যে তেত্রিশ কোটি আদম সন্তান রয়েছে যাদের ধর্মের ঠিকাদাররা অচ্ছুত করে অপমান করে রেখেছে আমি মনে করি এদের মধ্যে কাজ করা খুব সহজ। এদের ভেতরটা ভেঙ্গেচুরে পড়ে আছে। আমরা যদি ইসলামের ভ্রাতৃত্ব ও সমতার শিক্ষা তাদের সামনে তুলে ধরতে পারি তাহলে আমরা তাদের অন্তর জয় করতে পারবো। এর দ্বারা আমাদের রাষ্ট্রও উপকৃত হবে।

আহমদ আওয়াহ: জাযাকাল্লাহ! আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
মুহাম্মদ আকরাম: আপনি আমাকে সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে সম্মানিত করেছেন। আপনাকে ধন্যবাদ।

সাক্ষাৎকার গ্রহণে
মাও. আহমদ আওয়াহ নদভী
মাসিক আরমুগান, অক্টোবর- ২০০৩

Series Navigation<< নওমুসলিমদের সাক্ষাৎকার [পর্ব-১২] :: মুহাম্মদ আকবর (মহেশচন্দ্র শর্মা)-এর সাক্ষাৎকারনওমুসলিমদের সাক্ষাৎকার [পর্ব-১৪] :: শেখ মুহাম্মদ উসমান (সতীশ চন্দ্র গোয়েল)-এর সাক্ষাৎকার >>

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Archives

August 2020
S S M T W T F
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031  
shares