রবিবার, ১৪ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১৪ই রবিউস সানি, ১৪৪২ হিজরি

ব্যবসা-বাণিজ্যে আসা উচিত আলেমদেরও – মুফতি সাঈদ আহমদ পালনপুরী

বর্তমানে মাদরাসায় পড়ানো কিংবা মসজিদে ইমামতি করার পাশাপাশি রোজগারের জন্য কোনো ব্যবসা-বাণিজ্যে জড়ানো অনেকেই খারাপ মনে করে থাকেন। ভাবেন, আলেম মানেই তো শুধু মাদরাসা, মসজিদ, খানকা নিয়েই পড়ে থাকা এক গোষ্ঠীর নাম। সাধারণের পাশাপাশি এমনটা আলেমরাও ধারণা করে বসছেন আজকাল। অথচ নিজ হাতে জীবিকা উপার্জন করা একটা উত্তম কাজ। এটা তাকওয়া, পরহেজগারির বিপরীত কোনো বিষয় নয়। বুখারি শরিফের ২৭৮ নম্বর পৃষ্ঠায় এ সম্পর্কে একটি স্বতন্ত্র অধ্যায়ও রয়েছে।

তা ছাড়া নবী-রাসুল সা. সাহাবায়ে কেরাম ও আকাবিরদের প্রায় প্রত্যেকেই ধর্মীয় কাজের পাশাপাশি সংসার পরিচালনার জন্য কোনো একটি পেশা বা কাজ বেছে নিয়েছিলেন। হজরত দাউদ আ. রাষ্ট্র পরিচালনার পাশাপাশি লৌহবর্ম তৈরি করতেন। হজরত সোলাইমান আ. ঝুড়ি বানাতেন। রাসুল সা. ও সাহাবায়ে কেরামের অনেকেই নানা ধরনের ব্যবসা করেছেন। এই তো কয়েক শ বছর আগেও বাদশাহ আওরঙ্গজেব রহ. নিজ হাতে কোরআন শরিফ লিপিবদ্ধ করতেন এবং তা বিক্রি করতেন।

আজও দারুল উলুম দেওবন্দের কুতুবখানায় তাঁর হাতে লেখা কোরআনে কারিমের সেই কপি হুবহু বিদ্যমান। দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার আগে শাইখুল ইসলাম হজরত মাওলানা কাসেম নানুতুবি রহ. মিরাঠের একটি ছাপাখানায় প্রুফ দেখার কাজ করতেন। দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার পর তা ছেড়ে দেওয়ার তাগাদা দিয়ে চিঠি দেওয়া হলো। তিনি আরজ করলেন, ‘সব ছেড়ে দিলে আমার পরিবারের খরচ বহন করব কী করে!’ তাহলে কি তাঁর মাঝে কোনো তাকওয়া, পরহেজগারি ছিল না? অবশ্যই ছিল। অধিক তাকওয়ার ফলেই দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে তিনি কোনো দিনও বেতন গ্রহণ করতেন না।

বর্তমানে আমাদের পথপ্রদর্শক দারুল উলুম দেওবন্দের আসাতিজায়ে কেরাম অধ্যাপনার পাশাপাশি কোনো না কোনো ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে আছেন। আমি নিজেও বহুদিন কুতুবখানায় কাজ করেছি। ছাপানো, বাইন্ডিং সব নিজ হাতে করেছি। কারো সহযোগিতা নেইনি কখনো। দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে ভাতা গ্রহণ করে আবার লিল্লাহ ফান্ডে ওয়াকফ করে দিই আজ অবধি।

আলেমরা মাদরাসা-মসজিদ, মক্তব, খানকা সবই দেখবেন। পাশাপাশি প্রয়োজনমাফিক জীবিকা উপার্জনের জন্য যেকোনো একটি কাজে লেগে যাবেন। তবে খেয়াল রাখতে হবে, যেন ধর্মীয় কাজে কোনো ব্যাঘাত না ঘটে। আর মাদরাসা ও মসজিদ থেকে যা পাবে, তাকে গনিমত মনে করা চাই। পড়া, পড়ানো, খাওয়া, ঘুম ছাড়া আমাদের হাতে যথেষ্ট সময় থাকে। সে সময়টা অযথা নষ্ট না করে উপার্জনের উদ্দেশ্যে কোনো না কোনো কাজে ব্যয় করা উচিত। কাগজ কিনে লেখালেখি করা বা সেলাই মেশিন কিনে ঘরে বসে কাজ করা চাই। এতটুকু শ্রমও সংসার পরিচালনার জন্য যথেষ্ট। প্রথম তো আসবাব গ্রহণ করতে হবে আমায়। তারপর না হয় তাওয়াক্কুলের পর্ব।

তিরমিজি শরিফের একটি হাদিসে রয়েছে, এক সাহাবি রাসুল সা.-কে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমি কি উটের পায়ে রশি লাগিয়ে তার ওপর ভরসা করে ঘরে বসে থাকব?’ রাসুল সা. বললেন, ‘আগে তো হেফাজতের জন্য আসবাব গ্রহণ করো। তারপর না হয় ভরসা করো। ’ এ কারণে প্রথমে আসবাব এখতিয়ার করা দোষণীয় নয়, বরং আমরা আমাদের আকাবিরদের থেকেও এ শিক্ষাই পাই। এ জন্য জীবিকার উদ্দেশ্যে শুধু মাদরাসায় পড়ানো বা মসজিদে ইমামতি করার ওপর ভরসা করা উচিত নয়। এতে কোনো বুজুর্গি নেই; বরং নিজ হাতে উপার্জন করে বৈধপন্থায় সম্মানের সঙ্গে জীবন যাপন করাই মোমিনের উত্তম কাজ। বি. দ্র. এটি দারুল উলুম দেওবন্দে দেয় বক্তব্যের অনুবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Archives

November 2020
S S M T W T F
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930  
shares