শনিবার, ২৪শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১৮ই জিলহজ্জ, ১৪৪১ হিজরী

আমরা কেন সৌদি আরবের সাথে ঈদ করি না {পর্ব-০১} – রেজাউল করিম আবরার

  • আমরা কেন সৌদি আরবের সাথে ঈদ করি না {পর্ব-০১} – রেজাউল করিম আবরার


আমরা যে কারনে সৌদি আরবের সাথে ঈদ করি না

বর্তমানে এ মাসআলা নিয়ে আলোচনা হয় অনেক৷ চাঁদপুরসহ আমাদের দেশের আরও কিছু মানুষ সৌদি আরবের সাথে মিল রেখেই ঈদ উদযাপন করেন৷

লা মাজহাবিদের কিছু হাইব্রিড শায়খ সৌদির সাথে মিল রেখে একই দিনে রোজা এবং ঈদ পালনের পক্ষে কথা বলেন৷ যদিও কেয়াসকে তারা তোড়াই কেয়ার করেন, কিন্তু এ মাসআলায় এসে তারা কেয়াসের স্রোত বইয়ে দেন৷

প্রযুক্তির কল্যাণে জনসাধারণ সবকিছু গিলে চোখ বন্ধ করে৷ এ মাসআলা নিয়ে এখন হইচই হয়৷ কেন আমরা তাদের সাথে মিলে ঈদ করি না? অথচ আমরা নিশ্চিতভাবে জানি যে, সেখানে ঈদের চাঁদ উঁদিত হয়েছে! সংক্ষিপ্তভাবে এখানে কিছু কথা পেশ করব ইনশাআল্লাহ৷

এ মাসআলায় মূলকথা হল, পৃথিবীর কোথাও যদি চাঁদ উঁদিত হয়,তাহলে দূর দূরান্তের মুসলমানদের উপর ঈদ এবং রোজী রাখা আবশ্যক হয় কিনা?যেমন, সৌদিতে
আজ চাঁদ উঠল, তাহলে বাংলাদেশের
মুসলমানের উপর পরের দিন ঈদ এবং রোজা রাখা আবশ্যক হবেকিনা?

আমাদের মাযহাব মতে ওয়াজিব হবে না। বরং
বাংলাদেশের আকাশে চাঁদ যখন দেখা যাবে,তখন
আমদের ওপর রোযা এবং ঈদ করা ফরজ হবে। এটাই হল হানাফি মাজহাবের গ্রহণযোগ্য ফতোয়া৷ আবদুর রশিদ বুখারি “খুলাসাতুল ফতোয়া” তে ভুলক্রমে আবু হানিফা রাহি. থেকে ভুল মাসআলা বর্ণনা করেছেন৷ ইবনে আবিদিন শামি রাহি. ভুলে সে মত উল্লেখ করেছেন৷ কিন্তু জাহিরুর রেওয়ায়াহ এবং হানাফি মাজহাবের পুরাতন কিতাবাদি থেকে এটা প্রমাণিত হয় যে, নিজের উঁদয়স্থলে চাঁদ দেখার পর রোজা এবং ঈদ ওয়াজিব হবে৷ ২য় পর্বে এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব৷

কোন ব্যাপার সামনে আসলে প্রথমে আমরা দেখব রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইওয়াসাল্লাম বা সাহাবায়ে কেরাম থেকে এ ব্যাপারে কোন দিক নির্দেশনা পাওয়া যায় কিনা? এখানে প্রথমে কুরাইব এর একটি ঘটনা উল্লেখ করছি৷ তিনি বলেন,

ﺑَﻌَﺜَﺘْﻪُ ﺇِﻟَﻰ ﻣُﻌَﺎﻭِﻳَﺔَ ﺑِﺎﻟﺸَّﺎﻡِ ﻗَﺎﻝَ ﻓَﻘَﺪِﻣْﺖُ ﺍﻟﺸَّﺎﻡَ ﻓَﻘَﻀَﻴْﺖُ ﺣَﺎﺟَﺘَﻬَﺎ ﻭَﺍﺳْﺘُﻬِﻞَّ ﻋَﻠَﻰَّ ﺭَﻣَﻀَﺎﻥُ ﻭَﺃَﻧَﺎ ﺑِﺎﻟﺸَّﺎﻡِ ﻓَﺮَﺃَﻳْﺖُ ﺍﻟْﻬِﻼَﻝَ ﻟَﻴْﻠَﺔَ ﺍﻟْﺠُﻤُﻌَﺔِ ﺛُﻢَّ ﻗَﺪِﻣْﺖُ ﺍﻟْﻤَﺪِﻳﻨَﺔَ ﻓِﻰ ﺁﺧِﺮِ ﺍﻟﺸَّﻬْﺮِ ﻓَﺴَﺄَﻟَﻨِﻰ ﻋَﺒْﺪُ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﺑْﻦُ ﻋَﺒَّﺎﺱٍ – ﺭﺿﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻨﻬﻤﺎ – ﺛُﻢَّ ﺫَﻛَﺮَ ﺍﻟْﻬِﻼَﻝَ ﻓَﻘَﺎﻝَ ﻣَﺘَﻰ ﺭَﺃَﻳْﺘُﻢُ ﺍﻟْﻬِﻼَﻝَ ﻓَﻘُﻠْﺖُ ﺭَﺃَﻳْﻨَﺎﻩُ ﻟَﻴْﻠَﺔَ ﺍﻟْﺠُﻤُﻌَﺔِ . ﻓَﻘَﺎﻝَ ﺃَﻧْﺖَ ﺭَﺃَﻳْﺘَﻪُ ﻓَﻘُﻠْﺖُ ﻧَﻌَﻢْ ﻭَﺭَﺁﻩُ ﺍﻟﻨَّﺎﺱُ ﻭَﺻَﺎﻣُﻮﺍ ﻭَﺻَﺎﻡَ ﻣُﻌَﺎﻭِﻳَﺔُ . ﻓَﻘَﺎﻝَ ﻟَﻜِﻨَّﺎ ﺭَﺃَﻳْﻨَﺎﻩُ ﻟَﻴْﻠَﺔَ ﺍﻟﺴَّﺒْﺖِ ﻓَﻼَ ﻧَﺰَﺍﻝُ ﻧَﺼُﻮﻡُ ﺣَﺘَّﻰ ﻧُﻜْﻤِﻞَ ﺛَﻼَﺛِﻴﻦَ ﺃَﻭْ ﻧَﺮَﺍﻩُ . ﻓَﻘُﻠْﺖُ ﺃَﻭَﻻَ ﺗَﻜْﺘَﻔِﻰ ﺑِﺮُﺅْﻳَﺔِ ﻣُﻌَﺎﻭِﻳَﺔَ ﻭَﺻِﻴَﺎﻣِﻪِ ﻓَﻘَﺎﻝَ ﻻَ ﻫَﻜَﺬَﺍ ﺃَﻣَﺮَﻧَﺎ ﺭَﺳُﻮﻝُ ﺍﻟﻠَّﻪِ – ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ -.
আমাকে আমার মালিক মুয়াবিয়া রা. এর কাছে সিরিয়ায়পাঠান। আমি আামার প্রয়োজন যখন শেষ
করলাম, এমতাবস্থায় রমজান চলে আসল। আমরা সিরিয়ায় জুমআর রাত্রিতে চাঁদ দেখলাম। মাসের শেষ দিকে আমি মদিনায় প্রত্যাবর্তন করলাম। ইবনে
আব্বাস রা. তখন আমাকে চাঁদ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা
করলেন?
আমি বললাম, আমরা জুমআর রাতে চাঁদ
দেখছি।
তিনি বললেন, তুমি নিজে দেখেছ?
আমি বললাম, হ্যাঁ! আমি নিজে দেখেছি এবং লোকেরা
দেখে রোজা রেখেছে। এমনকি মুয়াবিয়া রা. ও রোজা রেখেছেন।
তখন ইবনে আব্বাস বললেন, কিন্তু আমরা চাঁদ দেখেছি শনিবারে। সুতরাং আমরা মাস ৩০ দিন হওয়া পর্যন্ত অথবা ২৯ তারিখে
চাঁদ দেখা না পর্যন্ত রোজা ছাড়ব না।আমি তখন
তাকে বললাম, আপনার জন্য কি মুয়াবিয়ার চাঁদ দেখা এবং রোজা রাখা যথেষ্ঠ নয়?
তিনি বললেন, না। আমাদেরকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়াসাল্লাম এমনভাবে আমল করতে আদেশ
দিয়েছেন। (মুসলিম,১০৮৭. মুসনাদে
আহমদ,২৭৮৯.তিরমিজি, ২৩৩২)

হাদিসে একটু লক্ষ করুন। শামবাসীরা চাঁদ দেখেছে মদিনার একদিন আগে। সে হিসেবে মদিনাবাসীরা নিশ্চিত প্রথম রোজা ভেঙ্গেছে। কিন্তু ইবনে আব্বাস রা.
বলছেন, আমরা শামবাসীর চাঁদ দেখার উপর নির্ভরশীল নয়। বরং আমরা ঈদ করব মদিনায় চাঁদ
দেখা অনুসারে। এ হাদিস থেকে স্পষ্ট হল, সৌদি আরবে চাঁদ দেখা গেলে বাংলাদেশে রোজা এবং
ঈদ কোনটাই ফরজ হয় না। বাংলাদেশের মানুষ নিজেদের উঁদয়স্থলে চাঁদ দেখার পর ঈদ করবে৷

তাবেয়িনদের মধ্যে একটি বড় দলের মত ছিল
ইবনে আব্বাসের মতো। ইমাম ইবনে আবদিল বার
আল মালেকী রাহি. লিখেন,
ﻭﺭﻭﻱ ﻋﻦ ﺑﻦ ﻋﺒﺎﺱ ﺃﻧﻪ ﻗﺎﻝ ﻟﻜﻞ ﻗﻮﻡ ﺭﺅﻳﺘﻬﻢ ﻭﺑﻪ ﻗﺎﻝ ﻋﻜﺮﻣﺔ ﻭﺍﻟﻘﺎﺳﻢ ﺑﻦ ﻣﺤﻤﺪ ﻭﺳﺎﻟﻢ ﺑﻦ ﻋﺒﺪ ﺍﻟﻠﻪ ﻭﺇﻟﻴﻪ ﺫﻫﺐ ﺑﻦ ﺍﻟﻤﺒﺎﺭﻙ ﻭﺇﺳﺤﺎﻕ ﺑﻦ ﺭﺍﻫﻮﻳﻪ ﻭﻃﺎﺋﻔﺔ
অর্থাৎ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিতঈদ এবং
রোজার ক্ষেত্রে প্রত্যেক শহরে চাঁদ
দেখতে হবে। (এক জায়গায় দেখলে অন্য
জায়গায় আবশ্যক হবে না)এমনটি বলেছেন
ইকরিমা, ক্বাসিম বিন মুহাম্মাদ, সালিম বিন আবদুল্লাহ,আবদুল্লাহ বিন মুবারক, ইসহাক বিন রাহুয়াহ এবং আরও অনেকে। (আল ইসতিজকার,৪/২১১.শামেলা)

অপর আরেক গ্রন্থে তিনি বলেন,
ﺇﻟﻰ ﺍﻟﻘﻮﻝ ﺍﻷﻭﻝ ﺃﺫﻫﺐ ﻷﻥ ﻓﻴﻪ ﺃﺛﺮﺍ ﻣﺮﻓﻮﻋﺎ ﻭﻫﻮ ﺣﺪﻳﺚ ﺣﺴﻦ ﺗﻠﺰﻡ ﺑﻪ ﺍﻟﺤﺠﺔ ﻭﻫﻮ ﻗﻮﻝ ﺻﺎﺣﺐ ﻛﺒﻴﺮ ﻻ ﻣﺨﺎﻟﻒ ﻟﻪ
অর্থাৎ এমনটি হল আমারও মাজহাব।কেননা এর পক্ষে
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে আছার বর্ণিত আছে৷ উক্ত
হাদিসটি হল হাসান, দলিল দেওয়ার উপযুক্ত। (আত তামহীদ,১৪/৩৫৮.মুসতাফা বিন আহমদ তাহকিককৃত)

ইমাম তিরমিজি রাহি. তার কিতাবে “কিতাবুস সিয়াম” এর নবম পরিচ্ছেদের নামকরণ করেছেন এভাবে.
ﺑﺎﺏ ﻣﺎﺟﺎﺀ ﻟﻜﻞ ﺃﻫﻞ ﺑﻠﺪ ﺭﺅﻳﺘﻬﻢ
অর্থাৎ এ পরিচ্ছেদ হল প্রত্যেক শহরে তাদের
আকাশে চাঁদ দেখে রোজা এবং ঈদ করা
সম্পর্কে।সেখানে তিনি ইবনে আব্বাস রা. এর হাদিসটি
উল্লেখ করেছেন। যা প্রথমে উল্লিখিত
হয়েছে। এরপর ইমাম তিরমিজি রহ. বলেন,
ﺣﺪﻳﺚ ﺍﺑﻦ ﻋﺒﺎﺱ ﺣﺪﻳﺚ ﺣﺴﻦ ﺻﺤﻴﺢ ﻏﺮﻳﺐ ﻭﺍﻟﻌﻤﻞ ﻋﻠﻰ ﻫﺬﺍ ﺍﻟﺤﺪﻳﺚ ﻋﻨﺪ ﺃﻫﻞ ﺍﻟﻌﻠﻢ ﺃﻥ ﻟﻜﻞ ﺃﻫﻞ ﺑﻠﺪ ﺭﺅﻳﺘﻬﻢ
অর্থাৎ ইবনে আব্বাস রা. এর সুত্রে বর্ণিত
হাদিসটি হল সহিহ। এর উপর হল ইমামদের
আমল। তারা বলেন যে, প্রত্যেক শহরে চাঁদ
দেখা গেলে তাদের উপর আমল জরুরী হবে।
(যে কোন এক জায়গায় দেখা গেলে অন্য সবার
জন্য রোজা এবং ঈদ ফরজ হবে না।(তিরমিজি, হাদিস
নং. ২৩৩২)

এবার আপনি বলুন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শিক্ষা সাহাবি, তাবেয়ি এবং অধিকাংশ মুজতাহিদ ইমামের কথা হল যে, কোন এক জায়গায় চাঁদ দেখা গেলে বাকি সবার উপর রোজা এবং ঈদ আবশ্যক হয় না। তাহলে সৌদি আরবে চাঁদ দেখা গেলে আমরা বাংলাদেশীরা তাদের সাথে রোজী এবং ঈদ করব কোন দুঃখে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Archives

August 2020
S S M T W T F
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031  
shares