শুক্রবার, ৭ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৬ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪২ হিজরি

গত রাতে আসলে কি ঘটেছিল ? – সরাসরি রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে

Khutbah Tv 

আনাস বিন ইউসুফঃ  আমরা অবস্থান করছিলাম পাহাড়ের উপরে একটি মসজিদে ৷ ইশার পর আমাদের কিছু পেকেটিংয়ের কাজ ছিল, যা আজ সকালে মক্তবে আসা বাচ্চাদের মাঝে বিতরণ করার কথা ছিল ৷ প্রায় দেড় ঘন্টা সময় নিয়ে আমরা আমাদের কাজ সমাপ্ত করি ৷ অন্যান্য সাথীরা পেকেটগুলো মসজিদের একপাশে সাজাচ্ছিল ৷ আমি ক্যাম্প (মসজিদ) থেকে বের হয়ে একটু বাহিরে যাই ৷ ০৯: ৫৩ তে আব্বুর সাথে আমার ফোনে কথা হয় ৷ এরপর মসজিদটির উত্তর পার্শে দাঁড়িয়ে রাতের ঠান্ডা পরিবেশটা উপভোগ করছিলাম কিছু সময়ের জন্য ৷ কাজ করতে গিয়ে গরম ঘেমে গিয়েছিলামও ৷

হঠাত লক্ষ করলাম, ক্যাম্পের ভিতরে ঠুস-ঠাস কিছু শব্দ হচ্ছে ৷ কেউ লাঠি দিয়ে বিভিন্ন বস্তুর উপর আঘাত করছে আর বলছে- “এই বের হ! তারাতারি বের হ…”

প্রথমে মনে করেছিলাম, আমাদের লোকেরাই হয়তো রোহিঙ্গা লোকদেরকে বের করছে ৷ কেউ যাতে ভীর জমাতে না পারে ৷ কয়েক মিনিট পর বুঝলাম, ভিতরে মনে হয় কেউ নেই ৷ নিরবতা বিরাজ করছে ৷ কোন কৌতুহল ছাড়াই এগিয়ে গেলাম মসজিদের মূল গেটের দিকে ৷ এগিয়ে গিয়ে যে দৃশ্যটি দেখলাম তাতে আর বুঝতে বাকি থাকে নি যে, “ক্যাম্পে আর থাকা যাচ্ছে না!”

১১ জন সেনা সদস্য আমাদের সাথীদেরকে ঘিরে রেখেছে! মেজাজ খুব উত্তেজিত ৷ তুই-তোকারি করেই শ্বাসাচ্ছে ৷ আমাকে দেখা মাত্রই “ঐ যে আরেকটা এসেছে” বলেই দিল ধমক;
“কোত্থেকে এসেছিস? এদিকে আয়!”

সেনা সদস্যদের এমন কর্কষ ভাষা এবং রূঢ় আচরণে আমি ভীত কিংবা চিন্তিত কোনটিই হই নি ৷ বিকাল থেকেই কিছু একটা আন্দাজ করতে পারছিলাম ৷ তবে আমীর সাহেবের উপর ভরসা ছিল আমাদের ৷
রাত দশটার কিছু পর সেনাদের এমন হঠাত উপস্থিতি দেখে ভয়ও পাই নি ৷ কারণ, তাদের প্রতি আমার ভাল আস্থা ছিল- “তারা অহেতুক কোন কিছু করবে না…”

অল্প সময়ের মধ্যেই মসজিদের আশপাশের কয়েকজন মাঝি (রোহিঙ্গা নেতা) কে ডাকা হল ৷ এরপর তাদেরকে কিছু পাহাড়াদার নিযুক্তের নির্দেশ দিল ৷ আমাদেরকে বলা হল, ব্যক্তিগত সামানপত্র নিয়ে দ্রুত বের হওয়ার জন্য ৷ আমরা প্রস্তুত হতে হতেই মাঝিরা পাহাড়াদার নিয়ে উপস্থিত ৷ জরুরী অষুধ-পত্র, তাবু-ককশিট, স্যানিটারি মালামাল, খাদ্য-সামগ্রি, কিছু বোরকা-হিজাব সহ কয়েক লক্ষ টাকার মালামাল মাঝিদের পাহাদাড়িতে রেখে আমাদেরকে সাথে নিয়ে ক্যাম্পের দিকে চলল এগারোজন সেনা সদস্য…. (সংক্ষেপন)

প্রায় চল্লিশ মিনিট বসিয়ে রেখে বিভিন্নভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করে আমাদেরকে ৷ আমরা এখানে কী করি, কতদিন যাবৎ আছি, কোত্থেকে এসেছি, ইত্যাদি ইত্যাদি ৷

শুরু থেকেই কয়েকজন সেনা সদস্য আমাদের উদ্দেশ্যে কিছু কথা বলছিল, যা অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত ৷ তাদের কথার সারমর্ম ছিল এমন- দিনের বেলা কাজ করি, ভাল কথা ৷ রাতেও কেন এখানে থাকার সাহস করি? অথচ, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা বারবার মাইকিং করে সতর্ক করেছে (আমি শুনি নি) ৷ তাছাড়া রোহিঙ্গারা হল বদের হাড্ডি (চরম সত্য) ৷ কখন কার উপর ত্রাণের জন্য আক্রমণ করে বসে তার কোন বিশ্বাস নেই ৷ এমতাবস্থায় আমাদের কারো কোন ক্ষতি হলে এর দায়ভার নিবে কে? সেনাবাহিনীর নিরাপত্তায় থেকে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাদের ভূমিকা নিয়ে বিশ্বব্যাপি প্রশ্ন উঠবে কিনা! দেশের সার্বভৌমত্ব তখন কোথায় গিয়ে ঠেকবে?….

সেনা সদস্যদের এধরণের কথাগুলো আমাকে খুব টাচ করে ৷ দেশের একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে বিষয়গুলো আমাদেরই চিন্তা করা উচিত ছিল ৷

দেশে থাকতে হলে দেশের আইন আমাদেরকে মানতেই হবে ৷ দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় নিজেরাও সচেষ্ট থাকতে হবে ৷ আইন অমান্য করে রাতে ক্যাম্পে অবস্থান করাটা আমাদের চরম ভুল হয়েছে ৷ দায়িত্বশীলগন হয়তো বিষয়টি এভাবে চিন্তা করেন নি ৷
অপরাধী হওয়া সত্তেও সেনা সদস্যরা আমাদের সাথে কোন মন্দ আচরণ করে নি ৷ প্রথমে কিছুটা রূঢ়তা দেখালেও পরে যথেষ্ট আন্তরিকতা দেখিয়েছেন ৷ মাত্র কিছু সময়ে তারা যে আচরণ করেছে তাতে বিস্মিত হয়েছিও বটে ৷ আমাদেরকে ক্লান্ত পরিশ্রান্ত দেখে ঠান্ডা পানির আপ্যায়ন করেছেন ৷ আমাদের মধ্যে কেউ কেউ খুব চিন্তিত হয়ে পড়লে তাদে রকে সর্বোচ্চ পর্যায়ের অভয় দিয়েছেন তারা ৷

জনৈক পন্ডিত মহাশয়ের “জ্বী স্যার, হ্যাঁ স্যার, ওকে স্যার” শব্দে সেনা সদস্য নিজেও বিরক্ত হয়েছেন ৷ তাদের আচরণের ফিরিস্তি দিতে গেলে পোস্ট বড় হয়ে যাবে ৷ যারা নিজেদের জীবন বাজি রেখে দেশ রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছেন তাদের আচরণে আমরা মুগ্ধ হয়েছি ৷

যাইহোক নিজেরা বিনা-বাক্যে তাদের কাছে আত্মসমর্পন করলাম ৷ নিজেদের ভুলও স্বীকার করে নিলাম…. ৷
এরপর আর্মিদের ভ্যানে করে আমাদেরকে নিয়ে যাওয়া হল সেনাবাহিনীর একটি অস্থায়ী (সমন্বয়) ক্যম্পে ৷ উখিয়া ডিগ্রি কলেজে ৷ পথে ছোট ছোট অনেক ঘটনা রয়েছে ৷ অন্য সময় বলবো ৷ ইনশা- আল্লাহ…. (সংক্ষেপন)
.
সেনাক্যাম্পে পৌছে সেখানকার চিত্র দেখে আমার চোখ কপালে উঠে যায় ৷ আমাদের মত একই অপরাধে অন্তত আরো দেড় শতাধিক মানুষকে আমাদের আগেই ক্যাম্পে নিয়ে আসা হয়েছে ৷ যাদের মধ্যে ৯০% আলেম-ত্বলাবা এবং তাবলীগি মেরে ভাই ৷
পরিস্থিতি একদমই স্বাভাবিক ৷ সবাই ওপেন হাটাহাটি করছে ৷ কোন বাধা নেই ৷ মোবাইলও টেপাটেপি করছে ৷

পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সেনা সদস্যদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত প্রশংসনীয় ৷ একটু পর পর এসে “সরি, আমরা দুঃখিত” বলে যাচ্ছে ৷ সাময়িক এই হয়রানী দেশের স্বার্থে সকলকে মেনে নেয়ার অনুরোধ করছে ৷ সকলকে পানি পান করানোর ব্যবস্থা করেছে ৷ সবশেষ ক্লান্ত-ক্লিষ্ট আনসাররদের শোয়ার জন্য ক্যাম্পের মাঠে কয়েকটি ত্রেপাল বিছিয়ে দিয়েছে ৷

এদিকে একটু পর পরই নতুন নতুন কাফেলাকে ধরে নিয়ে আসা হচ্ছে বিভিন্ন দিক থেকে ৷ ছোট-বড়, মাঝারি, সব ধরনের কাফেলা ৷ সর্বোচ্চ একটি কাফেলায় পঞ্চাশোর্ধ (৫৩) মানুষও ছিল ৷ ধীরে ধীরে পাকড়াও করে ধরে নিয়ে আসা লোকদের ভীড় আরো বেড়ে গেল ৷ অন্তত পাঁচ শতাধিক আলেম-ওলামা এবং তাবলীগী সাথী ক্যাম্পে অবস্থান করছে… ৷

প্রকৃত ঘটনা কী নানাভাবে বুঝার চেষ্টা করছিলাম ৷ কিন্তু কোন ক্লু খুঁজে পাচ্ছিলাম না ৷ পরিস্থিতি বুঝার জন্য আটক হয়ে এখানে আসা সাত-আটজনের সাথে কথা বলাম ৷ জানার চেষ্টা করলাম, সবাইকে ক্যাম্প থেকেই ধরেছে? নাকি অন্যত্র থেকেও ৷
তাদের সাথে কথা বলে জানতে পারলাম, যাকে যেখানে পেয়েছে, “আইন অমান্য করে” শরণার্থী এলাকায় অবস্থান করার অভিযোগে ধরে নিয়ে এসেছে ৷
এমনও হয়েছে, মহল্লার মসজিদে অবস্থানকারি কোন কোন তাবলীগ জামাতকে ঘুম থেকে উঠিয়ে ধরে নিয়ে আসা হয়েছে ৷ তবে আনার পথে কোন দুর্ব্যবহার করা হয় নি কারো সাথেই ৷ বরং এটা বলেছে- “আপনাদের কাজ হল দিনের বেলায় ৷ সন্ধ্যার পর আপনারা এসব এলাকায় কী করেন? এটা তো আপনাদের জীবনের জন্য হুমকি!”

এতসব কিছুর পরও সবার মধ্যে একটা অজানা আতংক বিরাজ করছিল ৷ যে আতংকটি পরবর্তীতে সোশ্যাল মিডিয়াতে ভাইরাল হয়েছে ৷ সবশেষ রাত পৌনে তিনটার দিকে আমাদের সকলকে ছেড়ে দিয়ে বলা হয়, ভোর পাঁচটার আগে শরণার্থী এলাকা ছেড়ে যেতে হবে!

মানুষজনও আদেশ অনুযায়ী এই গভীর রাতেই নিজ নিজ গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা করে ৷ যেখানে যা ছিল সব ফেলে দিয়েই রওনা করে সকলে ৷ আমরাও…

#একটি_বিনিত_অনুরোধঃ
আবেগে গা ভাসিয়ে দিয়ে কোন ধরনের অহেতুক আতংক সোশ্যাল মিডিয়াতে ছড়াবেন না কেউ ৷ যেকোন পরিস্থিতি নিরবে পর্যবেক্ষণ করুন ৷ এধরনের ইস্যুতে দেশীয় সংবাদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংবাদের দিকেও দৃষ্টি রাখুন ৷ যোগ বিয়োগ মিলিয়ে পরিস্থির বিচার করুন ৷ অনেক প্রশ্নের উত্তর মিলে যাবে ৷
ইনশা- আল্লাহ ৷

নোটঃ- গতরাতের ঘটনা আাদেরকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ করণীয় ঠিক করে দিয়ে গেছে ৷ “আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা, প্রশাসনের নির্দেশ মেনে কাজ করা, বড় কোন বিপদ ডেকে আনতে পারে এমন কাজ থেকে বিরত থাকা ৷”

আমাদের উচিত বিষয়গুলোর প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেয়া ৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Archives

October 2020
S S M T W T F
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31  
shares