শনিবার, ২৪শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১৮ই জিলহজ্জ, ১৪৪১ হিজরী

নওমুসলিমদের সাক্ষাৎকার [পর্ব-১৯] :: মুহাম্মাদ লিয়াকত (চৌবল সিং)-এর সাক্ষাৎকার


আমার জন্য আমার পরিবারের জন্য সকলের কাছে দুআ চাই। আল্লাহ তায়ালা যেন পৃথিবীর সকল মানুষকে হেদায়াত দান করেন। আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে যখন হেদায়েতের ফয়সালা হয় তখন এই পৃথিবীতে কোনো না কোনো উপলক্ষ এমনিতেই বেরিয়ে আসে। তবে তার জন্যে সাধনা করা চাই।


আহমদ আওয়াহ: আসাসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু!
মুহাম্মদ লিয়াকত: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু!

আহমদ আওয়াহ: লিয়াকত সাহেব! ভালোই হলো আপনি এসেছেন। আসলে আরমুগানের পক্ষ থেকে আপনার সাথে কিছু কথা বলার প্রয়োজন ছিল।
মুহাম্মদ লিয়াকত: ফুলাত তো বরাবরই আসা হয়। কিন্তু আপনার আব্বার সাথে দেখা করা ভারি কঠিন হয়ে পড়েছে। যখনই আসি শুনি, তিনি সফরে আছেন। একদিন ইফতেখার ভাইকে ফোনে জিজ্ঞেস করলাম- মাওলানা সাহেবকে কোথায় পাবো? তিনি এখন কোথায় থাকেন? ভাই ইফতখার বললেন, ৬৩০১-এ থাকেন। অর্থাৎ, গাড়িতেই থাকেন। যাই হোক, ভাই আহমদ! এবার বলো আমাকে কী বলতে হবে?

আহমদ আওয়াহ: অনুগ্রহ পূর্বক প্রথমেই আপনার সংক্ষিপ্ত পরিচয় বলুন।
মুহাম্মদ লিয়াকত: ভাই আহমদ! আমি অতটা শিক্ষিত মানুষ নই। তাছাড়া দেশি ভাষায় ভালো করে কথাও বলতে পারি না।

নওমুসলিমদের সহযোগিতার জন্য এগিয়ে আসুন

আহমদ আওয়াহ: আসলে আমি আপনার কাছে আপনার ব্যক্তিগত কিছু বিষয় জানতে চাচ্ছি। প্রথমেই আপনার পরিবার ও বংশ সম্পর্কে কিছু বলুন।
মুহাম্মদ লিয়াকত: আলহামদুলিল্লাহ! এখন আমার নাম মুহাম্মদ লিয়াকত। কয়েক বছর আগেও আমার না ছিল চৌবল সিং। মুজাফফরনগর জেলার তফসিল জাঁউস-এর একটি গ্রামের অধিবাসী। বংশগতভাবে আম গোজার বংশের মানুষ। আমরা গৃহস্থ লোক। আল্লাহর মেহেরবানী আমরা পাঁচ ভাই। চার ভাই পুরো পরিবারসহ ইসলাম গ্রহণের সৌভাগ্য লাভ করেছি। আমার বড় ভাই গ্রামের বড় চৌধুরী। কংগ্রেসের আঞ্চলিক লিডার। তিনি এখনও হিন্দু। আমি দ্বিতীয় আমার ছোট ভাই যার প্রথম নাম ছিল রাম সিং এখন তার নাম মুহাম্মদ রিয়াসত। তার ছোট যার পূর্ব নাম ছিল প্রকাশ চাঁদ। তার নাম এখন ফিরাসত। আর একেবারে ছোট ভাই যার নাম ছিল রাজেন্দ্র সিং তার বর্তমান নাম বাশারত। আমি দুই ছেলে এবং দুই মেয়ের জনক। আমার ভাই রিয়াসতের দুই ছেলে এক মেয়ে। ফিরাসতের তিন ছেলে আর বাশারতের দুই ছেলে এবং চার মেয়ে। আল্লাহ তায়ালার মেহেরবানী এ পর্যন্ত আমাদের পরিবারের চব্বিশজন ইসলাম গ্রহণ করেছে। আমাদের সন্তানরা সবাই পড়াশোনা করছে। আমাদের চার ভাইয়ের পাঁচ ছেলে এবং তিন মেয়ে এখন কুরআন হিফজ করছে।

আহমদ আওয়াহ: কিভাবে মুসলমান হলেন? একটু বিস্তারিত বলুন।
মুহাম্মদ লিয়াকত: ভাই, এটা আসলে আমার মালিকের মেহেরবানী। তাই আমি মুসলমান হয়েছি।

আহমদ আওয়াহ: শিবাজির মূর্তি কিভাবে মুসলমান হতে বললো? এমন কথাতো শুনিনি।
মুহাম্মদ লিয়াকত: এখন থেকে প্রায় নয় বছর আগের ঘটনা। সে বছর আমাদের আম খুব ভালো হয়েছিল। ফসল যেমন ভালো হয়েছিল, দামও ছিল ভালো। আমরা আমাদের পুরনো বাড়ি ভেঙ্গে নতুন বাড়ি বানালাম। নতুন বাড়িতে ছোট একটি কক্ষ পূঁজার জন্য নির্মাণ করলাম। টাইলস দিয়ে চমৎকার করে সাজালাম। বলতে গেলে ঘরে একটি ক্ষুদ্র মন্দির তৈরি করলাম। এই মন্দিরে স্থাপন করার উদ্দেশ্য শিবাজির মূর্তি কিনতে গেলাম মুজাফফরনগর এবং পাঁচ হাজার রুপিতে একটি মূল্যবান মূর্তি কিনলাম। দোকানী মূর্তিটিকে ভালো কাগজ দিয়ে সুন্দর করে প্যাকেট করে দিলো। মুজাফফর নগর থেকে বাড়ি ফিরছি। শিবচকের আগে একটি মসজিদ আছে। আমি যখন মসজিদের সামনে দিয়ে আসছি, হঠাৎ করে আমার মনে হলো, বরং আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে আমার মনে হেদায়াতের বাতাস বইতে শুরু করলো। ভাবতে লাগলাম, যদি এই মূর্তিটি আমার হাত থেকে পড়ে যায়। তাহলে নিশ্চিত ভেঙ্গে যাবে। আচ্ছা যে নিজেই হাত থেকে পড়ে গেলে টুকরো টুকরো হয়ে যায়, সেই ভগবান আমাকে কী উপকার করতে পারে? আমি একথা যখন ভাবছি ঠিক সেই মুহূর্তে কিভাবে যেন আমার হাত থেকে মূর্তিটি ছুটে পড়ে গেলো। মাটিতে পড়ার সাথে সাথে টুকরো টুকরো হয়ে গেলো। দেখে মনে হচ্ছিল, যেন কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে মূর্তিটিকে চূর্ণবিচূর্ণ করে ফেলেছে। আমার মনে, আমার চিন্তায় হঠাৎ ঝড় বইতে লাগলো। আমি আমাকেই শুধাতে লাগলাম এরচেয়ে তো বরং মুসলমানদের ধর্মই ভালো। তাদের খোদা পড়েও না, ভাঙ্গেও না, চূর্ণও হয় না। অথচ সব জায়গায়ই আছে। একজনের পূজা করো। তারপর আরামে বসে থাকো।

আসলে আমি কেন যেন অনেকটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ি। আমার সামনেই মসজিদ, রাস্তা থেকে মসজিদটি বেশ উঁচু। সিঁড়ি বেয়ে আমি মসজিদে উঠে গেলাম। সেখানে এক ব্যক্তিকে দেখতে পেলাম। তিনি কান্ধালার হযরতদের মুরীদ। কালো কাপড় পরিহিত। তাকে গিয়ে বললাম, মিয়াজী! আমাকে মুসলমান বানিয়ে দাও। সে বিব্রতবোধ করলো। আমি তাকে সাহস দিয়ে বললাম, সন্দেহ করো না। ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমি বুঝেশুনেই মুসলমান হওয়ার জন্য এসেছি। মুসলমানদের ধর্মই সাচ্চা ধর্ম। তাদের খোদা ভাঙ্গেও না, ফাটেও না। সদা সর্বত্র বিরাজমান। তিনি সদা সকলকে দেখেন। আমাকে মুসলমান করে নাও। আমার আবেগে সেও প্রভাবিত হলো। আমাকে কালেমা পড়ালো। নাম রাখলো মুহাম্মদ লিয়াকত। কালেমা পড়ার পর এবং ইসলাম ধর্মে প্রবেশের পর আমি পরম শান্তি অনুভব করি। আমি আনন্দ চিত্তে ঘরে ফিরে আসি। ফিরে আসার সাথে সাথে সকলেই আমাকে জিজ্ঞেস করতে থাকে, মূর্তি কোথায়? মূর্তি আনোনি কেন? বললাম, সবই বলবো।

সেই রাতেই সর্বপ্রথম আমি আমার স্ত্রীকে পুরো কাহিনী বলি। আমার ঘটনা শুনে আমার স্ত্রী খুবই আনন্দিত হলো। বললো, দীর্ঘদিন ধরে আমি নিজেই তো মুসলমান হবো ভাবছি। মুসলমান মেয়েদের নামায পড়তে দেখি, তখন খুব ভালো লাগে। শায়েস্তা নামের একটি মেয়ে আমাকে তাবলীগের কিতাব পড়ে শোনাতো। সে বছর আমি তিন শুক্রবার রোযাও রেখেছি। যা হোক তার কথায় আমি বেশ স্বস্তিবোধ করলাম। পরের শুক্রবারে তাকে নিয়ে গ্রামের মসজিদের ইমাম সাহেবের কাছে গেলাম। ইমাম সাহেব আমার স্ত্রীকে এবং আমার সন্তানদের কালেমা পড়িয়ে দিলেন। আমার স্ত্রীর নাম রাখলেন ফাতেমা। আমার সন্তানদের নাম রাখলেন আয়েশা, জায়নাব, মুহম্মদ, হামেদ এবং মাহমুদ আহমদ।

আহমদ আওয়াহ: তারপর আপনার অন্য ভাইয়েরা কিভাবে মুসলমান হলেন?
মুহাম্মদ লিয়াকত: আমার তিন ভাই এবং তাদের পরিবার তোমার আব্বার হাতে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। যখন আমার স্ত্রী এবং আমার সন্তানেরা মুসলমান হলো তখন আমি আমার সবচে’ ছোট ভাই রাজেন্দ্রকে ডেকে পরম ভালোবাসা এবং আন্তুরিকতার সাথে বিষয়টি বলি। সে তার স্ত্রীর সাথে পরামর্শ করে। তার স্ত্রী মুসলমান হওয়ার জন্য রাজি হয়ে যায়। এদিকে আমাদের গ্রামের আগের ইমাম সাহেব চলে গেছেন। সেখানে একজন নুতন ইমাম এসেছেন। তাকে আবদার করার পর তিনি কালেমা পড়াতে অপারগতা প্রকাশ করেন। আসলে বেচারা ভয় পেয়েছিল। তখন আমি আমার গ্রামের অন্য মুসলমানদের সঙ্গে আলোচনা করি। তারা আমাকে ফুলাত যাওয়ার পরামর্শ দেয়। দুপুরে ফুলাতে এসে যখন পৌঁছাই তখন মাওলানা কালিম সাহেব সফরের উদ্দেশ্যে গাড়িতে ওঠে বসেছেন। আমি গাড়িতে গিয়েই তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করি। আমার ভাই এবং ভাবীকে পরিচয় করিয়ে দিই। তিনি গাড়ি থেকে নেমে আসেন। কালেমা পড়ান, আইনি কাগজপত্র কিভাবে তৈরী করতে হবে এ বিষয়ে পরামর্শ দেন। নিজে উপস্থিত থেকে আমাদের খানাপিনা করান। চা পান করান। প্রায় দেড় ঘণ্টা পর সফরের উদ্দেশ্যে বের হন। আমাদের পড়ার জন্যে কিছু হিন্দি বইপত্র দেন। অন্য ভাইদের কিভাবে দোযখের আগুন থেকে রক্ষা করা যায়, সে বিষয়ে ভাবতে বলেন।
আমরা ওয়াদা করি, তাদের অবশ্যই ইসলামের দাওয়াত দেবো। ঘরে ফিরে আমি বইগুলো পড়তে শুরু করি। তারপর পরিবারের সকলকে পড়ে শোনাই। বিশেষ করে ‘আপকি আমানত’ পুস্তিকাটি মাওলানা সাহেব অন্তর দিয়ে লিখেছেন। পুস্তিকার প্রতিটি কথাই যেন হৃদয়ে করাঘাত করতে থাকে। এটা পড়ার পর আমি ইসলামের মূল্য বুঝতে পারি। তারপর দুই বছর চেষ্টা চালিয়ে যাই। আল্লাহ তায়ালা অনুগ্রহ করে আমার দুই ভাই এবং তাদের সন্তানদেরও ইসলাম গ্রহণের জন্য প্রস্তুত করে দেন। আমি তাদের ফুলাত নিয়ে আসি। তারা এখানে এসেই কালেমা পাঠ করে।

আহমদ আওয়াহ: পরিবারের লোকেরা আপনার কথা রেখেছে? বিশেষ করে মেয়েদের মানানো তো খুবই কঠিন।
মুহাম্মদ লিয়াকত: মূলত আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে হেদায়েতের বাতাস প্রবাহিত হচ্ছিল। দেখ, শিবাজির মূর্তিই তো আমাকে বলে দিল- আমি পূজার উপযুক্ত নই। ইসলামই সত্য ধর্ম। মূর্তিটি যখন ভেঙ্গে গেলো। তখন তো আমি খৃস্টান হয়ে যেতে পারতাম। বস্তুত মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে তখন আমার অন্তরে অন্য কোনো চিন্তাই উদিত হয়নি। আসলে আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে তখন আমার হেদায়েতের ফয়সালা হয়ে গিয়েছিল। এটা তাঁর করুণা। প্রকাশের স্ত্রী মায়া তো শুরুতে প্রচন্ড বিরোধিতা করেছে। আমাদের একথা বলেও শাসিয়েছে যে, আমি পুরো এলাকা জ্বালিয়ে দেবো। আমরা তার পা পর্যন্ত ধরেছি। রাতের পর রাত দুআ করেছি। আল্লাহ তায়ালাই তার অন্তর ফিরিয়ে দিয়েছেন।

আহমদ আওয়াহ: ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি যখন জানাজানি হলো তখন হিন্দুরা বিরোধিতা করেনি? বিশেষ করে খান্দানের লোকেরা আপনার প্রতি কোনরূপ চাপ প্রয়োগ করেনি?
মুহাম্মদ লিয়াকত: আসলে আমি এটাই চাচ্ছিলাম। আমার ছোট ভাই রাজেন্দ্র যখন মুসলমান হলো, তখন বিষয়টি আমার বড় ভাই নেতাজি জানতে পারলেন। জানার পর তিনি অনেকটা আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললেন। লাঠি হাতে আমাদের দ্ইু ভাইকে খুব পিটালেন। আমরা মার খাচ্ছিলাম আর তাকে বিনয়ের সাথে খোশামুদ করছিলাম যে, আগে ইসলাম সম্পর্কে জানুন, তারপর আমাদের মারুন। কিন্তু আমাদের কোনো কথাই তিনি শুনতে প্রস্তুত ছিলেন না। আমাদের চাপে ফেলার জন্যে এলাকার থানাকে দুই হাজার রুপি দেন। টের পেয়ে আমি পালিয়ে ফুলাত চলে আসি। আমার ছোট ভাইকে পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। তাকে খুব মারধর করে। কিন্তু আমার ছোট ভাই মুহাম্মদ বাশারাত কোনোভাবেই ইসলাম ছাড়তে রাজি নয়। পুলিশ তাকে নানাভাবে নির্যাতন করে অবশেষে শেকল দিয়ে বেঁধে ফেলে রাখে। দুই জায়গায় পায়ের হাড় পর্যন্ত ভেঙ্গে যায়। দুই দিন পর কোনোভাবে অনুসন্ধান করে রাতের অন্ধকারে তাকে আমি বের করে আনি। মুজাফফরনগরে ডাক্তার খান সাহেবের কাছে নিয়ে যাই। প্লাস্টার করাই। মাওলানা কালিম সাহেবের সিøপের কারণে ডাক্তার খান সাহেব আমাদের কাছ থেকে পয়সা পর্যন্ত নেননি। বরং আমাদের খানাপিনারও ব্যবস্থা করেছেন। তারপর আমরা আইনি কাগজপত্র তৈরি করি। পরামর্শ করে এসপি এবং কালেক্টর বরাবর আবেদন করি। তখন মুজাফফারনগরে জয়েন সাহেব নামে একজন এসপি ছিলেন। বড় ভালো মানুষ ছিলেন। তিনি মুজাফফারনগর থেকে আমাদের থানায় একজন দারোগা পাঠিয়ে জানিয়ে দেন, আমাদের বড় ভাই কিংবা আমাদের এলাকার কেউ যেন আমাদের সাথে কোনো ধরনের খারাপ আচরণ না করে। তার সতর্ক বাণীর উসিলায় আমরা বিপদ থেকে বেঁচে যাই।

আহমদ আওয়াহ: এখন আপনার বড় ভাইয়ের কী অবস্থা বলুন?
মুহাম্মদ লিয়াকত: আমার বড় ভাই মূলত নিঃসন্তান। তিনি আমার ছোট ভাই রাম সিং এখন মুহাম্মদ রিয়াসত এর ছোট ছেলেকে দত্তক নিয়েছিলেন। এই ঘটনার পর আমরা পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেই, আমরা আমাদের ছেলেকে তার কাছ থেকে নিয়ে আসবো। আমরা তাকে নিয়ে আসি এবং পরিষ্কার নিষেধ করে দিই তুমি নেতাজির ঘরে যেতে পারবে না। বড় ভাই তখন খুবই আদর করতেন। আদর করে তাকে সব সময় গুড্ডু ডাকতেন। তার নাম ছিল রামপাল। এখন মুহাম্মদ বেলাল। আমরা তাকে বড় ভাইয়ের কাছ থেকে এনে মাদরাসায় ভর্তি করে দিই। একদিন বড় ভাই খুবই অসুস্থ হয়ে পড়েন। পেট ব্যথা। ইঞ্জেকশন দেয়া হলো। ব্যাথা কমলো না। আমি মুজাফফরনগরে তাবলীগে গিয়েছিলাম। সংবাদ পেয়ে গুড্ডু তাকে দেখতে যায়। বড় ভাই তখন ব্যাথায় যন্ত্রণায় কাঁদতেন। গুড্ডুকে দেখে জড়িয়ে ধরেন এবং খুব কাঁদেন। গুড্ডু তখন তাকে বলে, ডেডি! তুমি লিয়াকত চাচাকে ডেকে দুআ করাও। গুড্ডু আগে থেকেই তাকে ডেডি ডাকতো। তার কথায় বড় ভাই খুবই নারাজ হন।
এক সপ্তাহ পর্যন্ত মুজাফফরনগর এবং বিভিন্ন ডাক্তারের অধীনে চিকিৎসা চলতে থাকে। কিন্তু ব্যাথা যেই সেই। ঔষুধ খেলে সামান্য সময় ভালো থাকে। তারপর আবার ব্যাথা। বড় ভাই যন্ত্রণায় কঁকাতে থাকেন। গুড্ডু বার বার তাকে একই কথা বলতে থাকে লিয়াকত চাচাকে দিয়ে দুআ করাও। একদিন এমনও বলে ডেডি তুমি রিয়াসত চাচার কাছে মাফ চাও। দশ দিন তাবলীগে কাটিয়ে আমি বাড়ি ফিরে আসি। এসে জানতে পারি, ভাই সাহেব দুই বার আমার ঘরে এসেছিলেন। ভাবতে থাকি, এখনই তাকে দেখতে যাওয়া উচিত। এটা আমার ধর্মীয় কর্তব্য। এরই মাঝে তিনি আমার ঘরে চলে আসেন এবং আমাকে জড়িয়ে ধরেন। আমরা সকলেই তখন কাঁদতে শুরু করি। আমি সুযোগ বুঝে বলে ফেলি ভাইয়া! এই সামান্য যন্ত্রণা সইতে পারছেন না, অনন্তকাল নরকের যন্ত্রণা কিভাবে সইবেন? আপনি মুসলমান হয়ে যান। তিনি বললেন- ঠিক আছে, আগে ভালো হই; তারপর চিন্তা করবো। তুমি তোমার খোদার কাছে প্রার্থনা করো আমাকে যেন ভালো করে দেন। ভাই সাহেব চলে গেলেন। আমি দুই রাকাত নামায পড়লাম। অন্তর থেকে আল্লাহ তায়ালার কাছে দুআ করলাম। করুণাময় আল্লাহ আমার নাম মনে রাখলেন। সন্ধ্যার মধ্যে আমার ভাই সাহেব সুস্থ হয়ে উঠলেন। আলহামদুলিল্লাহ! এখনও পর্যন্ত সুস্থ আছেন।

আহমদ আওয়াহ: তারপর আর তাকে দাওয়াত দেননি?
মুহাম্মদ লিয়াকত: হ্যাঁ, দাওয়াত দিয়েছি। ওয়াদার কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছি। এ পর্যন্ত বলেছি, যে আল্লাহ আপনাকে সুস্থতা দান করেছেন তিনি চাইলে আবার অসুস্থও করে দিতে পারেন। কিন্তু সত্যকথা হলো, এখনও পর্যন্ত আল্লাহর পক্ষ থেকে তার হেদায়েতের ফয়সালা হয়নি। হেদায়েত তো উপর থেকে আসে। তারপরও ভাই সাহেব এখন আমাদের সাথে ভালো আচরণ করেন। মনে হয়, আমাদের অসন্তুষ্ট করতেও ভয় পান। আরেকটি বড় কথা হলো, আমাদের সকল জায়গা জমি এ পর্যন্ত এক সাথেই ছিল। আর সবই ছিল তার কব্জায়। গত বছর আমাদের চার ভাইয়ের জমিজমা আলাদা করে দিয়ে দিয়েছেন।

আহমদ আওয়াহ: আপনি আপনার পরিবারের লোকদের দীনি শিক্ষা-দীক্ষার কোনো ব্যবস্থা করেছেন?
মুহাম্মদ লিয়াকত: আল্লাহ তায়ালার অনুগ্রহ। আমাদের চার ভাইয়ের পরিবারেই পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ আছে। আমাদের পাঁচ ছেলে এবং তিন কন্যা এখন কুরআন শরীফ হেফয করছে। আমাদের স্বপ্ন, তাদের সকলকেই আলেম এবং দা‘য়ী বানাবো। বেলাল খুবই মেধাবী। আত্মীয়-স্বজনকে নির্বিঘেœ মুসলমান হওয়ার কথা বলে। ঘরে নিয়মিত তালিম হচ্ছে। আমরা চার ভাই পালাক্রমে একের পর এক জামাতে যাই।

আহমদ আওয়াহ: ইসলাম গ্রহণ করার পর আপনার কেমন লেগেছে? যখন অতীত দিনের কথা মনে হয়, তখনই বা কেমন লাগে?
মুহাম্মদ লিয়াকত: আমাদের ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি আসলে আল্লাহ তায়ালার একান্ত অনুগ্রহ। আল্লাহ তায়ালার বিশেষ কৃপা না হলে স্বয়ং শিবাজির মূর্তি আমাকে মুসলমান হওয়ার দাওয়াত দিত না। যখন ভাবি, কতটা সহজে আল্লাহ তাআলা আমাকে এবং আমার এ বিশাল খান্দানকে হেদায়েত দান করেছেন তখন কৃতজ্ঞতায় আমার অন্তর ঝুঁকে পড়ে। আমি তো মাঝে মধ্যে চলতি পথে সেজদায় পড়ে যাই। আল্লাহ না করুন- যদি তিনি আমাকে হেদায়েত না দিতেন, আমাদের প্রতি যদি তাঁর করুণা না হতো, আমরা যদি কাফের এবং হিন্দু অবস্থায় মারা যেতাম তাহলে তো আমাদের করার কিছু ছিল না। আমাদের প্রতি আমাদের করুণাময়ের এ এক অসামান্য অনুগ্রহ। (চোখের পানি ছেড়ে) কোথায় আমাদের মতো অপবিত্র মানুষ, আর কোথায় ঈমানের মতো মহান ধন! আলহামদুলিল্লাহ! আলহামদুলিল্লাহ!

আহমদ আওয়াহ: আপনার এবং আপনার পরিবার সম্বন্ধে আরও কিছু বলুন।
মুহাম্মদ লিয়াকত: আমাদের জীবনের প্রতিটি পল আল্লাহ তায়ালার রহমতের নিদর্শন। প্রতিদিনই আল্লাহর রহমতের কোনো না কোনো কারিশমা দেখতে পাই। আসলে কেবলমাত্র আমাদের জীবন কেনো পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের জীবনে তার প্রতিটি পলে আল্লাহ তায়ালার কোনো না কোনো রহমত ও অনুগ্রহ বিকশিত হয়। তবে সবার দেখার মতো চোখ থাকে না। মানুষ যদি এক আল্লাহর জন্যে নিজেকে সমর্পণ করে দিতে পারে, কেউ যদি এক আল্লাহর জন্য হয়ে যায়, জীবনের সকল প্রয়োজন সকল সংকটে কেবল তাঁর কাছেই হাত পাতে, হিম্মত করে জীবনের সকল ক্ষেত্রে দীনের পথে চলতে চেষ্টা করে তাহলে আল্লাহর পক্ষ থেকে সকল প্রার্থনাই পূরণ করা হয়।

আহমদ আওয়াহ: আপনি বরাবরই আল্লাহ তায়ালার কাছে দুআ করে থাকেন। আপনার অধিকাংশ দুআই কবুল হয়ে থাকে। এ সম্পর্কে কোনো ঘটনা আমাদের শোনান।
মুহাম্মদ লিয়াকত: প্রতিটি মানুষেরই উচিত আল্লাহর তায়ালার কাছে প্রার্থনা করা। কিছু চাওয়ার থাকলে কেবল তাঁরই কাছে চাওয়া উচিত। আল্লাহ তায়ালা তো সকলের দুআই কবুল করেন। এ পর্যন্ত আমার কোনো দুআই তিনি ফিরিয়ে দেননি। আমার মনে হয়, আমার প্রতিটি দিনই আল্লাহর তায়ালার কোনো না কোনো রহমত নিয়ে হাজির হয়। আমি প্রতিদিন সকাল থেকে অপেক্ষায় থাকি, দেখি আজ কোন্ রহমতের মুখোমুখি হই।

দুই দিন হলো জামাত থেকে চিল্লা শেষ করে ফিরেছি। জামাতে যাওয়ার আগে আমার স্ত্রী অসুস্থ ছিল। তাকে অপারেশন করাতে হয়েছে। প্রায় পঁচিশ ত্রিশ হাজার রুপি খরচ হয়েছে। সাথে আরও কিছু সমস্যা ছিল। এলাকায় তখন জোড় চলছিল। তাবলীগি সাথীরা আমাকে স্মরণ করিয়ে দেয়, এবার আপনার জামাতে যাওয়ার পালা। সুযোগ নেই বলে আমি আমার অপারগতার কথা বলি। জাসউ-এর এক বন্ধু জোর করে আমার নাম লিখিয়ে দেয়। বলে, খরচের কথা তোমাকে ভাবতে হবে না। খরচের দায়িত্ব আমার। হয়তো নওমুসলিম মনে করেই আমাকে একথা বলেছে। নওমুসলিম মনে করে যখনই কেউ আমার সাথে সহযোগিতার আচরণ করে, তখন কেন যেনো আমি খুব আহত হই। আমরা তো অন্যের সামনে ভিখারির মতো হাত পাতার জন্য মুসলমান হইনি। তাছাড়া এটা ইসলামের শিক্ষাও নয়। আলহামদুলিল্লাহ! আজ পর্যন্ত এই ধরনের কোনো সাহায্য আমি নিজেও কবুল করিনি। আমার ভাই বেরাদরকেও কবুল করতে দিইনি। সংকটে পড়েছি ধৈর্য ধরেছি। শুরুর দিকে অর্থসংকট গেছে। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা অবিচল থাকার শক্তি দিয়েছেন। আমার ভাইদের সাহস দান করেছেন। যখন নাম লিখিয়েই দিল তখন ভাবলাম, আচ্ছা দেখি। খরচের ব্যবস্থা হলে চলে যাবো। ব্যবস্থা না হলে নিষেধ করে দেবো। কারও কাছ থেকে ধার করবো না। জামাত বের হওয়ার দিন পর্যন্ত আমার কাছে তেমন কোনো টাকা পয়সা নেই। পকেটে মাত্র দুইশ রুপি। সঙ্গীদের পক্ষ থেকে পীড়াপীড়ি। তাদের দাবির মুখে নাও করতে পারছি না। মনে মনে ভাবলাম আমি তো কারও কাছে চাইনি। তারা নিজ থেকেই দিতে চাচ্ছে। সুতরাং সমস্যা কী! জামাতে চলে গেলাম। পুরো চিল্লায় পনেরশ রুপি খরচ হওয়ার কথা। মারকায থেকে জামাত গুজরাটের পালিনপুর হালকায় গেল।

সাথীরা খরচের টাকা জমা করছিল। আমার পক্ষ থেকে কেউ কেউ টাকা দিতে চাইলো। কিন্তু কেন যেন তাৎক্ষণিকভাবে আমার মন রাজি হলো না। আমি না করে দিলাম। বললাম, ইনশাআল্লাহ অবশিষ্ট খরচ আমিই দেবো। জামাত পালনপুরে পৌঁছালো। প্রতিদিন খরচের পয়সা দিতে হবে। আমি দুই রাকাত সালাতুল হাজত পড়লাম। আল্লাহ তায়ালার কাছে ফরিয়াদ করলাম। রাতের বেলা স্বপ্নে হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাক্ষাৎ হলো। আমাকে সান্তনা দিয়ে বললেন- ভয় করো না। আল্লাহ তায়ালা তোমাকে লজ্জিত করবেন না। পরের দিন জোহর নামাযের পর আমি তো বিস্ময়ে অবাক। দেখি, আমাদের বড় ভাই অমুসলিম নেতাজি পালনপুর মারকাযের এক সঙ্গীকে নিয়ে আমাকে খুঁজছেন। খুঁজতে খুঁজতে আমার সামনে এসে উপস্থিত। আমি অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি। তিনি আমাকে বললেন- দুই দিন আগে দেখলাম, তুমি খুব কান্নাকাটি করছো। ভাবলাম, তোমার কাছে হয়তো টাকা-পয়সা নেই। আমি তোমার ঘরে গেলাম। জানতে পারলাম তুমি জামাতে গেছো।

মুন্সী রিয়াজকে নিয়ে দিল্লি নেজামুদ্দীন মারকাযে গেলাম। খোঁজাখুঁজি করে জানতে পারলাম, তুমি পালনপুর আছো। আহমদাবাদ মেইলে পালনপুর চলে এলাম। এ কথা বলে তিনি আমার হাতে দুই হাজার রুপি তুলে দিলেন। বললেন, আমার কাছে তোমার দশ হাজার রুপি পাওনা ছিল। এই নাও দুই হাজার। বাড়িতে এসে বাকি আট হাজার নিয়ে নিও। একদিন তিনি আমাদের সাথে থাকলেন। পরের দিন বাড়ি চলে গেলেন। আমি বার বার আল্লাহ তায়ালার কৃতজ্ঞতায় শুকরিয়ার নামায পড়তে লাগলাম। আসলে মুসলমান হওয়ার আগে আমি আমার বড় ভাইয়ের কাছে দশ হাজার রুপি পাওনা ছিলাম। তিনি পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছিলেন এই রুপি তিনি আমাকে দিবেন না। অথচ আজ নিজেই তিনি কত পথ খুঁজে আমার সামনে সেই পাওনা রুপি নিয়ে উপস্থিত। জীবনব্যাপী এমন কত ঘটনা ছড়িয়ে আছে!

আহমদ আওয়াহ: লিয়াকত ভাই সত্যিই আপনার প্রতি আল্লাহ তায়ালার করুণা অসামান্য। তাছাড়া আল্লাহ তায়ালার সাথে আপনার সম্পর্কও গভীর। আমাদের জন্যেও দুআ করুন।
মুহাম্মদ লিয়াকত: মৌলবী আহমদ ভাই! আল্লাহ তায়ালার অনুগ্রহ তো সকলের প্রতিই হচ্ছে। আল্লাহর অনুগ্রহ ছাড়া কেউ বাঁচতে পারে না। আমাদের প্রতি আল্লাহর তায়ালার বিশেষ করুণা হলো তিনি তাঁর করুণা উপলব্ধি করার শক্তি আমাদের দান করেছেন। তোমার জন্য দুআ করবো না কেন? আমি তো তোমাদের পুরো বংশের জন্যেই দুআ করি। মাওলানা কালিম সাহেব আমাদের রাহবার। আমাদের প্রতি তাঁর অনুগ্রহ কম নয়। আল্লাহ তায়ালা উভয় জাহানে তোমাদের ভালো রাখুন। শান্তিতে রাখুন।

আহমদ আওয়াহ: মুসলমানদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন!
মুহাম্মদ লিয়াকত: কথা তো একটিই। আমার জন্য আমার পরিবারের জন্য সকলের কাছে দুআ চাই। আল্লাহ তায়ালা যেন পৃথিবীর সকল মানুষকে হেদায়াত দান করেন। আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে যখন হেদায়েতের ফয়সালা হয় তখন এই পৃথিবীতে কোনো না কোনো উপলক্ষ এমনিতেই বেরিয়ে আসে। তবে তার জন্যে সাধনা করা চাই।

আহমদ আওয়াহ: ধন্যবাদ আপনাকে ।
মুহাম্মদ লিয়াকত: আপনাকেও অনেক কনেক ধন্যবাদ।

সাক্ষাৎকার গ্রহণে
মাও. আহমদ আওয়াহ নদভী
মাসিক আরমুগান, মার্চ- ২০০৪

Series Navigation<< নওমুসলিমদের সাক্ষাৎকার [পর্ব-১৮] :: নওমুসলিমা ডাক্তার উর্মির সাক্ষাৎকারনওমুসলিমদের সাক্ষাৎকার [পর্ব-২০] :: মুহতারামা খাইরুন নিসা (শালিনী দেবী)-এর সাক্ষাৎকার >>

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Archives

August 2020
S S M T W T F
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031  
shares