মঙ্গলবার, ১৯শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ১৬ই জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

রোহিঙ্গা মুহাজির ক্যাম্পের পথে প্রান্তরে! [পর্ব-৩] – লুৎফর ফরায়েজী

২য় পর্বের পর থেকে

ভোরবেলা বের হলাম উনছিপ্রাং এর উদ্দেশ্যে। পথে দেখা পটিয়া ফারিগ এক মাওলানার সাথে। তিনিও যাবেন উনছিপ্রাং। একসাথে বাসে উঠলাম। বাসে দেখা হল চারজন রোহিঙ্গা উলামার সাথে।

একজনের নাম কামাল হুসাইন আরকানী। যিনি শিক্ষকতা করতেন বার্মার উদং জামিয়া আশরাফুল উলুম মাদরাসায়। যার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন শাইখুল ইসলাম হুসাইন আহমাদ মাদানী রহঃ এর সাগরিদ মাওলানা আব্দুস সুবহান আরাকানী রহঃ। মাদরাসাটি পুড়িয়ে দিয়েছে মগ সৈন্যরা। অসংখ্য উলামাকে গুলি করে ও পুড়িয়ে হত্যা করেছে নরপশুরা। মংডু তাবলীগের মার্কাযও পুড়ে ছাই।

Default Ad Content Here

কোন মতে পালিয়ে এসেছেন এ মাওলানা। সাথে বৃদ্ধ বাবা। মা গুলিতে শহীদ হয়েছেন। শহীদ হয়েছেন ভাইটাও। তার বিবিও আলেমা। বড় কষ্টে আছেন ল্যাদা ক্যাম্পে। তার বিবি বার্মার এক বড় আলেমের মেয়ে। অজু ইস্তিঞ্জাসহ পর্দার সমস্যা হওয়ায় বিবি ক্যাম্পে থাকতে নারাজ। কিন্তু তিনি কী করবেন? কি’ইবা করতে পারেন?

আলাপ হল, অন্যান্য উলামাদের সাথেও। বার্মার এক মাদরাসার শাইখুল হাদীস পদে নিয়োজিত এক বিজ্ঞ আলেমকে দেখলাম লাজুক ভঙ্গিতে বসে থাকতে। পরিবারের সদস্যদের অনেকেই শহীদ হয়েছেন। কী বলে শান্ত্বনা দিবো? ভাষা নেই। শুধু বললামঃ আপনারা আলেম। জানেন ও বুঝেন আপনারা। আমাদের নবীও মুহাজির হয়েছিলেন। মুহাজির হলে কারো দাম কমে না রবের দরবারে। বরং বেড়ে যায়। আমাদের নবীর মর্যাদা নির্যাতিত হওয়ায়, দেশান্তরিত হওয়ায় কমেনি। বৃদ্ধি পেয়েছে কোটি গুণ। নবীর সুন্নত যিন্দায় আপনারাও মুহাজির। আল্লাহ তাআলা উত্তম বদলা অবশ্যই আপনাদের দিবেন।

ফোন নাম্বার নিলাম তাদের। তাদের হাতে পাঁচ হাজার টাকা ধরিয়ে দিয়ে নেমে পড়লাম।

হৃদয় ভরা হতাশায়। এমন হাজারো উলামা পরিবার আজ রাস্তায়। আমাদের ক্ষুদ্র সামর্থ দিয়ে কতজনকে শান্ত্বনা দিতে পারি?

সিলেট হবিগঞ্জ থেকে বন্ধুবর মাওলানা জাবের আলহুদা চৌধুরী স্থানীয় প্রায় ৩৯জন আলেমের এক কাফেলা নিয়ে এসেছেন। সেই কাফেলা বিতরণ করবে “কম্বল, শিশু খাদ্য, আপেল, তাঁবু, মশারী, কয়েল ইত্যাদি”। তাদের পরিকল্পনা পছন্দ হওয়ায় পঞ্চাশ হাজার টাকা সেই ফান্ডে জমা রেখেছিলাম। যাতে উক্ত ত্রাণ কার্যের সাথেও জড়াতে পারি।

সকাল থেকে হবিগঞ্জের কাফেলা ত্রাণ বিতরণ করছিল উনছিপ্রাং এলাকায়। জাবের ভাই ত্রাণ নিয়ে গিয়েছেন পালংখালিতে।

নিয়ত ছিল উনছিপ্রাং ত্রাণ বিতরণে হবিগঞ্জ জামাতের সাথে শরীক হবো। কিন্তু আমরা আসতে আসতে তাদের এখানকার ত্রাণ বিতরণ সমাপ্ত হয়ে যায়। এবার আমরা রওয়ানা হলাম উনছিপ্রাং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের দিকে। কর্দমাক্ত পথ। সারি সারি শরণার্থীদের আনাগোনা। স্থানীয় স্কুল মাঠে সেনাবাহিনীর মাধ্যমে বিতরণ চলছে ত্রাণ।

ছোট্ট এক শিশু সঙ্গী হল। বললাম কোথায় থাকো? ইশারায় দেখাল সামনে। হাটতে থাকলাম। বললামঃ নাম কি তোমার? কিছুই বলল না। হয়তো ভাষা বুঝে না।

কিছুদূর যাবার পর ছোট্ট বাজার পড়ল। শিশুটিকে বললামঃ কিছু খাবা? খুশিতে মাথা নাড়ল। তাকে নিয়ে ঢুকলাম এক ভাঙ্গা হোটেলে। দু’টি রুটি আর ছোলা। তৃপ্তি ভরে খেল বালকটা। তার ক্ষুধার্ত চেহারায় আমার বড় ছেলেটা যেন ভেসে উঠল। ভিজে আসা চোখটা আড়াল করলাম অন্যদের থেকে।

এমন হাজারো শিশু পেটে ক্ষুধা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে পথে পথে। কারো বাবা নেই। নেই পরিবারের কোন সদস্য। কেউ চাচার সাথে, কেউবা প্রতিবেশি কারো সাথে পাড়ি জমিয়েছে অজানার পথে। এখন ঘুরছে পথে পথে। কি হবে এদের ভবিষ্যত? কি অপরাধ এ নিষ্পাপ শিশুদের?

কোন অপরাধে আজ তারা মায়ের আদর আর বাবার স্নেহ থেকে বঞ্চিত?

যে শিশুর আজ হাসি আনন্দে জীবন কাটানোর কথা। সেই শিশুটা আজ এক পেট খাবারের জন্য হন্যে হয়ে রাস্তায় ঘুরপাক খাচ্ছে। কেন? কে দিবে এর জবাব?

আবার শুরু হল ক্যাম্পের পথে যাত্রা। কিছুদূর যেতেই আরো একদল শিশু দেখে থমকে দাঁড়ালাম। মনে পড়ল দোকান দেখলেই আমার ছেলে মুয়াবিয়ার আবদারের কথা। এরাও শিশু। মায়ের আদরের দুলাল একেকজন। কিন্তু তাদের আবদার পূরণের কেউ নেই। দোকানে রাখা ছোট পিঠার মত কি যেন বিক্রি চলছে। হাতে ধরিয়ে দিলাম শিশুদের। কয়জনকে দিবো? উপস্থিত একজনকে দিতেই আরেকজন ছুটে আসছে।

হতাশা। শুধুই হতাশা। বুকটা যেন ভেঙ্গে যাবে। কি এক ব্যাথায় চৌচির বুকের পাজর।

এইতো। এইতো সামনে ক্যাম্প। ক্যাম্পে ঢুকতেই হাজারো হাত ঘিরে ধরল। মনে চায় সব কিছু দিয়ে দেই। কিন্তু তা কি সম্ভব? নিজের ইচ্ছেকে পাথরচাপা দিয়ে এগিয়ে যাই। পাহাড়ী ঢালুর এপাশ ওপাশে অপরিকল্পিত অগণিত তাঁবু। আমরা এগিয়ে চলছি পাহাড়ের চূড়ার দিকে।

এক তাঁবু থেকে বেরিয়ে এল দাড়িওয়ালা এক যুবক। মনে হল আলেম। আপনি কি আলেম? বললেন, আমি হাফেজ। সঙ্গী করলাম তাকে। চলতে চলতে শুনলাম তার হৃদয়বিদারক কাহিনী। কতজনের কষ্টের কথা বলবো। প্রতি একজন ব্যক্তির কষ্টের দিক নিয়ে একেকটি উপাখ্যান রচনা সম্ভব।

প্রচণ্ড রোদে ঘেমে নেয়ে শরীরের অবস্থা কাহিল। উঠছিতো উঠছি। শেষ যেন নেই এ পথের। তাবুর গলি পেড়িয়ে যত সামনে যাচ্ছি ততই মনে হচ্ছে পথ যেন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। এবার শুরু হল শ্বাসকষ্ট। আমি শ্বাসকষ্টের রোগি। ডাক্তার বলেছিল অনেক দিন আগে। কিন্তু তা গায়ে মাখিনি। বুঝিওনি তীব্রভাবে। কিন্তু আজ তা টের পেলাম। ভয়ানকভাবে। যখন উপরে উঠছি হঠাৎ মনে হল, আমি আর ফিরে যেতে পারবো না। শ্বাস এখনি বন্ধ হয়ে যাবে। হাঁপাতে লাগলাম। মুখ দিয়ে নিঃশ্বাস নিয়েও কুল পাচ্ছি না। আর কতদূর? আমাদের টার্গেট ছিল পাহাড়ের চুড়ার মসজিদ। কিন্তু সেই পর্যন্ত যাওয়া হবে কি? নাকি এর আগেই শ্বাস বন্ধ হয়ে যাবে?

হাঁপাতে হাঁপাতে অবশেষে পাহাড়ের চূড়ার মসজিদে উপস্থিত হলাম। ধপাস করে বসে পড়লাম মসজিদের মেঝে। ছোট্ট মসজিদ। নির্মাণের পথে। কাজ করছেন কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবী মুরুব্বী। যোগ হল স্থানীয় বেশ কয়েকজন। পানি পান করলাম।

বললামঃ আপনারা যারা স্থানীয় তাদের বলছি! আজ রোহিঙ্গাদের উপর যে নির্যাতন আর নিপীড়ন নেমে এসেছে। তা আমাদের উপরও আসতে পারতো। নিজের ঘরবাড়ী, নিজের বসত ভিটা রেখে, গুলিবিদ্ধ নিহত আত্মীয়দের রেখে আজ রোহিঙ্গারা পথে নেমেছে। তাদেরও আমাদের মত ঘরবাড়ি ছিল। কিন্তু আজ তারা নিঃস্ব। সর্বস্বান্ত। তারা আমাদের মেহমান। তাদের যথাসাধ্য খিদমাত করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করা নিকৃষ্ট পশুর চেয়েও খারাপ হবে। তাই সদা খেয়াল রাখতে হবে যেন কোনভাবেই তাদের কষ্ট না হয়। আমাদের কোন আচরণে যেন তারা দুঃখ না পায়। স্থানীয়রা মাথা নেড়ে সায় দিল।

সময় কম। আবার রওয়ানা হলাম। এবার যেতে হবে উনছিপ্রাং দারুল ইরফান মাদরাসায়। সেখানে থাকা ঢাকার ইদারাতুল উলুম মাদরাসার শিক্ষক মাওলানা নাজমুল হাসানকে একটি মসজিদের জন্য যায়গা দেখতে দায়িত্ব দিয়েছিলাম। তিনি কতদূর কী করেছেন তা দেখতে হবে। পাহাড় থেকে নামতে নামতে সিদ্ধান্ত নিলাম যেখানে সাধারণত ত্রাণ নিয়ে কেউ আসতে চায় না এমন সব পরিবারকে আমরা টাকা দিবো। শুরু হল টাকা বিতরণ। এক টিলা থেকে আরেক টিলায়। প্রচণ্ড খরতাপে মনে হয় মাথা ফেটে ঘিলু বেরিয়ে আসবে। সে এক অমানুষিক পরিশ্রম। কোন পরিবারে গুলিবিদ্ধ সদস্য। কোন পরিবারে কোন পুরুষই নেই। শুধু নারী ও শিশু। আমাদের কাছে যা আছে, তার পুরোটাই এক পরিবারকে দিয়ে দিলেও হয়তো এক পরিবারের প্রয়োজন পূর্ণ হবে না। কিন্তু আমাদের সামর্থ যে অপ্রতুল। তাই কাউকে এক হাজার। কাউকে আরো বেশি, কাউকে পাঁচশত। কাউকে তিনশত করে টাকা দিতে থাকলাম। অবশেষে পাড় হলাম উনছিপ্রাং ক্যাম্পের শেষ মাথা। আবার কাঁদা মাটি পাড় হয়ে উনছিপ্রাং দারুল ইরফান মাদরাসায়।

গলা শুকিয়ে কাঠ। মাদরাসায় এসে খানিক নিঃশ্বাস নিলাম।

আগামী পর্বে সমাপ্য ইনশাআল্লাহ

Archives

June 2026
S S M T W T F
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930