শনিবার, ৮ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৭ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪২ হিজরি

নওমুসলিমদের সাক্ষাৎকার [পর্ব-১৫] :: আলাউদ্দীন(রাজেশ্বর)-এর সাক্ষাৎকার


সারা পৃথিবী এখন হেদায়েতের পিপাসায় কাতর। আমার মতো পাপীকেই দেখুন, শরাবের মতো নাপাক বস্তু আমার হেদায়েতের উপলক্ষ হয়েছে। আমরা সর্বশ্রেষ্ঠ নবীর উম্মত। আমাদের কর্তব্য এই উম্মত হওয়ার হক আদায় করা। পৃথিবীর সকল মানুষই তো এই নবীর উম্মত। অথচ আমরা তাদের পর মনে করে তাদের পর্যন্ত দ্বীন পৌঁছাইনি। এটা বড় জুলুম। মসুলমানদের জালেম হওয়া উচিত নয়। তাদের তাদের আমানত পৌঁছে দেয়া এবং তাদের জাহান্নাম থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করা আমাদের কর্তব্য।


আহমদ আওয়াহ: আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু!
আলাউদ্দীন: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু!

আহমদ আওয়াহ: আলাউদ্দীন ভাই! এখন আপনি কোথা থেকে এসেছেন?
আলাউদ্দীন: আমি নন্দীগ্রাম থেকে এসেছি। হযরতের সাথে সাক্ষাত করার জন্য অস্থির হয়ে পড়েছিলাম। দীর্ঘদিন হলো দেখা হয়নি। এদিকে আমরা অনেক বড় হাঙ্গামার মধ্যে পড়েছিলাম। আল্লাহ তায়ালা অনুগ্রহ করেছেন, হযরতের দুআর বরকতে আল্লাহ তায়ালা আমাদের এলাকায় এখন শান্তি ও নিরাপত্তা প্রদান করেছেন।

আহমদ আওয়াহ: আপনি দুই বছর পূর্বে ফুলাত এসেছিলেন। তখনই আব্বাজ্জান আরমুগানের জন্য আপনার একটা ইন্টারভিউ নেয়ার করা কথা বলেছিলেন। আমি তখন জরুরী একটা কাজে খাতুলি চলে গিয়েছিলাম। ফিরে এসে দেখি আপনি নেই।
আলাউদ্দীন: হ্যাঁ, ভাই আহমদ! হযরতও আমাকে বলেছিলেন। আমি সেই অপেক্ষায় ছিলাম। তারপর হযরত বললেন এখনও যাও, পরে আবার কখনও আসলে ইন্টারভিউ নেয়া হবে।

নওমুসলিমদের সহযোগিতার জন্য এগিয়ে আসুন

আহমদ আওয়াহ: আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে সব কাজেরই একটা নির্ধারিত সময় আছে। হয়তো আজই আপনার ইন্টারভিউ নেয়ার কথা আল্লাহ তায়ালার কাছে নির্দিষ্ট ছিল। ভালোই হলো। দেরীতে হলেও ভালো হলেই ভালো। প্রথমেই আমি আপনার নিকট আপনার পারিবারিক পরিচয় জানতে চাইবো।
আলাউদ্দীন: আল্লাহ আপনার কল্যাণ করুণ।
আমি হরিয়ানার পানিপথ জেলার একটি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছি। আমি একজন দিনমজুরের ছেলে। পিতাজী আমার নাম রেখেছিলেন রাজেশ্বর। দুই তিন ক্লাস পড়ার পর আমি আমার পিতাজীর সাথে মাঠে যেতে শুরু করি। আমাদের কিছু জমি ছিল। সেখানেই সামান্য সবজি চাষ করা হতো। এটাই ছিলো আমাদের পারিবারিক জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম। আমি ছিলাম পিতার একমাত্র ছেলে। আমার দুই বোন ছিল আমার বড়।

আহমদ আওয়াহ: মুসলমান হওয়ার কথা আপনার মাথায় কিভাবে এলো? কিভাবে এবং কেন মুসলমান হলেন এ বিষয়ে কিছু বলুন।
আলাউদ্দীন: আহমদ ভাই! ইসলাম গ্রহণের কথা আমি কিভাবে ভাববো! আমার মালিক আমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। প্রার্থনা ছাড়াই তিনি আমাকে খান্দানী মুসলমানদের মতোই ইসলাম দান করেছেন। আগেই বলেছি, আমার দুজন বোন ছিল। তাদের বিয়ের পর আমারও বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। আমাদের হরিয়ানায় মদপান একটা স্বাভাবিক ব্যাপার। বন্ধুদের সাথে মদের আড্ডা আমার কাছে একটু বেশিই প্রিয় হয়ে উঠেছিল। যমুনার তীরে খুব কম দামে কাঁচা মদ পাওয়া যায়। আমার বিয়ের তিন বছর পর পিতাজী মারা যান। পরের বছর মাও মারা যান।

মা-বাবার মৃত্যুকষ্ট ভোলার জন্য আমি আরও বেশি মদ্যপ হয়ে পড়ি। শরাবের নেশায় আমি একেবারে অকর্মণ্য হয়ে পড়ি। আমার স্ত্রী ছিল খুবই ভালো। স্বাভাবগতভাবেই অত্যন্ত পরিশ্রমী। আমি নেশা করে পড়ে থাকতাম আর আমার স্ত্রী আমাকে খোঁজ করে নিয়ে আসতো। বেচারী না খেয়ে থাকতো। এদিকে আমার একের পর এক সন্তান হতে থাকলো। আল্লাহ তায়ালা আমাকে পাঁচজন ছেলে এবং তিনজন মেয়ে সন্তান দিয়েছেন। সন্তান প্রসবকালে আমি আমার স্ত্রীকে কখনও এক পোয়া ঘিও এনে খাওয়াতে পারিনি। তাছাড়া ভালো কোনো খাবারেরও ব্যবস্থা করিনি। এদিকে শরাবের নেশায় আমি আমার পিতার রেখে যাওয়া জমিটুকুও একটু একটু করে বিক্রি করে দিই। আমার স্ত্রীকে সন্তানদের খাবারের জন্য মজদুরী করতে হয়েছে। অবেশেষে সে কিছু পয়সা সঞ্চয় করে গ্রামেই একটি সবজির দোকান খুলে বসেছে। এভাবে প্রায় তিন বছর কেটে গেছে। আমার স্ত্রীকে একাধারে দোকান করতে হয়েছে। সন্তানদের লালন-পালন করতে হয়েছে। আবার আমাকে খুঁজেখুঁজে তুলে আনতে হয়েছে। মদ আমার জীবনকে জাহান্নাম বানিয়ে রেখেছিল। মদ্যপ অবস্থায় আমি তাকে মাঝে মাঝে মারপিটও করতাম।

আমাদের গ্রামে একজন হাফেয সাহেব ছিলেন। তিনি একটি মাদ্রাসা চালাতেন। এক রাতে মদ খেয়ে আমি পুকুর পাড়ে বেহুশ হয়ে পড়ে ছিলাম। আমার স্ত্রী আমাকে সেখান থেকে গভীর রাতে তুলে এনেছে। সকালে সে হাফেয সাহেবের নিকট গিয়ে খুবই কান্নাকাটি করলো। অনুনয় বিনয় করে বললেন, হাফেয সাহেব! আমার স্বামীকে মদ ছাড়াবার একটি তাবিজ লিখে দিন। হাফেয সাহেব আমার স্ত্রীকে বললেন ঠিক আছে আমি তোমাকে আমাদের হযরতের সাথে সাক্ষাত করিয়ে দিব। তিনি তাবিজ নয় দুআ দেন। তিনি মালিকের খুবই প্রিয় বান্দা। মালিক তার কথা শোনেন। আমি আশাবাদী তিনি দোআ দিলে তোমার স্বামী শরাব ছেড়ে দেবে। তবে শর্ত হলো, তারপর তোমাদের সকলকে মুসলমান হতে হবে। আমার স্ত্রী বেচারী বললো, হাফেয সাহেব আগে শরাব ছাড়িয়ে দিন। মুসলমান কেন প্রয়োজনে আমাদের আপনাদের মেথর বানিয়ে নেবেন। আমার কোনো আপত্তি নেই।
হাফেয সাহেব মাওলানা কালিম সিদ্দীকী সাহেকে ফোন করলেন। আমার স্ত্রীকে ফুলাত নিয়ে আসার অনুমতি চাইলেন। সাথে আমার স্ত্রীর সকল পেরেশানীর কথাও তাকে জানালেন। হযরত বললেন, মানুষ হিসেবে পৃথিবীর সকল মানুষের ব্যাথায় অংশীদার হওয়া আমাদের কর্তব্য। কিন্তু তার স্বামী সুস্থ হলে সকলকে মুসলমান হতে হবে এ কথা আপনি ঠিক বলেননি। তার এই পেরেশানি দূর হওয়ার পর আখেরাতের পেরেশানি থেকে বাঁচার জন্য তাকে দাওয়াত দেয়া যায়।

তারপর মাওলানা সাহেব বললেন, আমি অবশ্যই তার স্বামীর জন্য দুআ করবো। সাথে এ-ও বলে দিলেন, এই অসহায় পরিবারের প্রতি আপনি আন্তরিকভাবে খেয়াল রাখুন এবং শংকর ক্লিনিকে গিয়ে ডাক্তার ভিসি আগরওয়ালকে আমার কথা বলুন। তিনি মদ ছাড়ার ভালো ভালো ঔষধ দেন। তিনি আমাকে বলেছিলেন, যদি আমার দ্বারা ধর্মীয় কোনো কাজ হয় তাহলে আমি বিনা মূল্যে করতে প্রস্তত আছি। আপনি ডাক্তার সাহেবকে আমার সালাম বলবেন এবং আমার নাম বলে ঔষুধ নিয়ে আসবেন। এমনিতেও তিনি পয়সা কম নেন। এই পরামর্শের পর হাফেয সাহেব মুজাফফরনগর যান। ডাক্তার সাহেবের সাথে দেখা করেন। ডাক্তার সাহেব হযরতের নাম শুনে খুব খুশি হন এবং পনের দিনের ঔষুধ দেন। অনেক পীড়াপীড়ির পরও তাকে ঔষুধের দাম দেয়া যায়নি। তিনি বলেন, মাওলানা সাহেব মানুষের জন্য এতো কাজ করেন। আর আমরা এই সামান্য কাজও করতে পারবো না। ডাক্তার সাহেব ওষুধ দিয়ে নিয়মমত খাওয়াতে বলেন। আমার স্ত্রী সেই ওষুধ দুধ চায়ের মধ্যে মিশিয়ে দশ দিন খাওয়ায়। দশ দিনের মধ্যেই আমি সুস্থ হয়ে উঠি। আমার শরাবের নেশা কেটে যায়।

১৯৯৬ সালের পহেলা জানুয়ারী হাফেয সাহেব আমাকে এবং আমার স্ত্রীকে হযরতের সাথে সাক্ষাত করানোর জন্য সোনিপথে নিয়ে যায়। সেখানে প্রতি মাসের প্রথম দিন হযরত তাশরিফ আনেন। প্রচন্ড ভীড় ছিল। অনেক কষ্টে হাফেয সাহেব হযরতের কাছ থেকে সময় নিয়ে আমাদের আলাদা সাক্ষাতের ব্যবস্থা করেন। আমার স্ত্রী হযরতের পায়ের উপর পড়ে বলতে থাকে, হযরতজী আপনি আমাদের ভগবান। হযরত এতে খুব পেরেশান হয়ে যান। তাকে পায়ের উপর থেকে উঠিয়ে অত্যন্ত যত্মের সাথে বুঝিয়ে বলেন। দেখ, ভগবান বা খোদা কেবল তিনিই যিনি আমাদের সকলকে সৃষ্টি করেছেন। তিনিই অনুগ্রহ করে তোমাকে পেরেশানি থেকে উদ্ধার করেছেন। তারপর তিনি বলেন, যেভাবে একজন মদ্যপ ভালো মন্দের পার্থক্য করতে পারে না।

একই ভাবে যারা বাপ-দাদাদের থেকে ভুল পথ পেয়ে এসেছে, তারাও পারে না নিজেদের ভালো-মন্দ উপলব্ধি করতে। মদ খাওয়ার চেয়েও কোটি গুণ বড় অপরাধ হল সৃষ্টিকর্তা অদ্বিতীয় মালিক ব্যতীত অন্য কাউকে ভগবান কিংবা খোদা মনে করা এবং তার পূজা করা ও তার সামনে মাথা নত করা। হাফেয সাহেব হযরতকে বললেন, এরা কালেমা পড়ার জন্য এসেছে। হযরত তখন আমাকে বললেন, শরাবের নেশা তো ছুটেছে এবার তোমাকে মদ্যপদের সঙ্গ ছাড়তে হবে। এর জন্য অবশ্য কালেমা পড়ার প্রয়োজন নেই। হাফেয সাহেব না বুঝেই বলে দিয়েছেন মুসলমান হতে হবে। তবে মালিককে রাজি করা এবং মৃত্যুর পর অনন্তকালের নরক থেকে বাঁচার জন্য অবশ্য ইসলাম গ্রহণ করে মুসলমান হতে হবে। তবে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে সকলকে নিজের মন থেকে। আমার স্ত্রী তখন বললো, আপনার কথা সত্য, এ যদি মদ না-ও ছাড়ে তবু আমাকে মুসলমান বানিয়ে নিন।
হযরত তখন আমাদের কালেমা পড়ালেন। আমার নাম রাখলেন আলাউদ্দিন। আর স্ত্রীর নাম রাখলেন ফাতেমা। আমার ছেলের নাম রাখলেন, মুহাম্মদ আলীম, মুহাম্মদ সালীম, মুহাম্মদ কালিম মুহাম্মদ নাঈম এবং মুহাম্মদ নাসীম। মেয়েদের নাম রাখলেন শামীমা, সারা এবং জাকিয়া। আমার স্ত্রীকে পরামর্শ দিলেন একে জামাতে পাঠিয়ে দাও। অন্তরে আল্লাহর ভয় সৃষ্টি হলে তখন আর মদ ছাড়াবার জন্য ঔষধ খাওয়ানো লাগবে না। সে জানতে চাইল কত খরচ হবে? হযরত বললেন, বেশি না এক হাজার রুপিই যথেষ্ট। আমার স্ত্রী আটশ রুপি হযরতের সামনে পেশ করলো এবং বললো একে আজই পাঠিয়ে দিন। আমি আরও দুইশ রুপির ব্যবস্থা করে দিব।

আহমদ আওয়াহ: জামাতে কোথায় সময় কাটালেন?
আলাউদ্দীন: আমি প্রথমে হযরতের সাথে ফুলাতে গেলাম। তারপর মিরাঠে গিয়ে সার্টিফিকেট তৈরি করলাম। তাপর নিজামুদ্দীন থেকে বাহরাইচে চিল্লা কাটালাম। বিহারের এক মাওলানা সাহেব আমাদের আমীর ছিলেন, তিনি আমার পিছনে অনেক মেহনত করেছেন এবং চিল্লার মধ্যে পুরো নামায শিখিয়েছেন। খানাপিনার আদবও ভালো করে শিখিয়ে দিয়েছেন। এই চিল্লার মধ্যেই আমি ছয় নম্বর পুরোপুরি শিখেছি।

আহমদ আওয়াহ: তারপর গ্রামে গিয়ে কী করলেন? আপনার খান্দানের লোকেরা বিরোধিতা করেনি?
আলাউদ্দীন: প্রথম দিকে তারা খুশিই ছিল। কারণ, আমার অবস্থা তখন আজ এখানে পড়ে থাকি তো কাল ওখানে। তারা ভেবেছে যাক, যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়া গেল। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই পুরো খান্দানের লোকেরা আমাকে পেরেশান করে তোলে। হাফেয সাহেবকেও কষ্ট দিতে থাকে। তখন হযরতের পরামর্শে আমরা গ্রাম ছেড়ে দিতে বাধ্য হই। মাদ্রাসায় গিয়ে চৌকিদারের চাকরি নেই। বাচ্চাদের ঐ মাদ্রাসায় ভর্তি করে দিই। আমার স্ত্রী হাফেয সাহেবের স্ত্রীর কাছে থেকেই নামায শিখে নিয়েছিল।

আহমদ আওয়াহ: আপনার বাচ্চাদের লেখাপড়ার কী অবস্থা?
আলাউদ্দীন: আমার বাচ্চারা আলহামদুলিল্লাহ হাফেয হয়ে গেছে। এক ছেলে মাদ্রাসায় পড়ছে। তিনজন এখনও স্কুলে আছে। মেয়েরা তিনজনই মাদ্রাসায় মাওলানা পড়ছে। দ্বিতীয় ছেলে সালিম শয়তানের প্ররোচনায় পালিয়ে গিয়েছিল। এ হলো আমার স্ত্রীর সবচেয়ে, প্রিয় সন্তান। সে তার জন্য প্রায় পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিল। আমি বিভিন্ন জায়গা থেকে তাবিজ এনে দিয়েছি কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। লোকেরা আমার স্ত্রীকে বলেছে, ওকে তোমার খন্দানের লোকেরা মেরে ফেলেছে। এ কথা শুনে তার অবস্থা আরও মারাত্মক হয়ে পড়েছিল।
আমি তখন খুবই পেরেশান হয়ে হযরতের কাছে চলে যাই। হযরত বললেন, তাবিজ তো খুবই পুরানো ব্যাপার স্যাপার। তাছাড়া এগুলো হলো দুর্বল ও অসুস্থ মুসলমানদের জন্য। তুমি নতুন এবং তাজা ঈমানদার। আল্লাহ তায়ালা সবকিছু করতে পারেন। বললেন, জামাতে তোমাকে সালাতুল হাজতের কথা শেখানো হয়নি? সাহাবায়ে কেরাম তাদের যেকোন প্রয়োজনে সালাতুল হাজত পড়ে আল্লাহ তায়ালার কাছে দুআ করতেন। তারপর আমি ফুলাতের জামে মসজিদে গিয়ে এশার পর দুই রাকাত সালাতুল হাজত পড়লাম। আল্লাহ তায়ালার কাছে খুব কান্নাকাটি করে দুআ করলাম, হে আল্লাহ! সাহাবায়ে কেরামের প্রতিপালক তো তুমিই। আমার মতো পাপীদের প্রভুও তুমিই। তুমিই একমাত্র দাতা। দান করও তুমি এবং ছিনিয়েও নাও তুমি। তুমি দয়া করে আমাদের সন্তানকে সুস্থ ফিরিয়ে দাও।

আমি বারবার বলছিলাম। হে আল্লাহ! আমি তো আমার ছেলেকে তোমার কাছ থেকে ডেকে আনবোই। কখনও আমি কাঁদতে কাঁদতে সেজদায় পড়ে যাচ্ছিলাম। আমার প্রতি আমার মালিকের করুণা হলো। তিনি তো সকলের ডাকই শোনেন। সকাল আটটার সময় হযরত আমাকে বললেন, আলাউদ্দিন! তোমাকে মুবারকবাদ! তোমার বাড়ি থেকে ফোন এসেছে। সালিম বাড়ি ফিরেছে। আমি আনন্দে আমার পকেটের সবগুলো পয়সা দান করে একজন অন্ধ ফকিরের হাতে তুলে দিই। তারপর ঋণ করে আমি বাড়ি ফিরে যাই। ঘরে এসে দেখি, আলহামদুলিল্লাহ! আমার ছেলে উপস্থিত। তারপর পড়াশোনায় তার মন বসলো। এ বছর সে তারাবীহ পড়িয়েছে। পুরো কুরআন শরীফে মাত্র সাতটি ভুল গেছে।
ভাই আহমদ! এটা আল্লাহ তায়ালার করুণা। কোথায় আমার মতো কাফের ব্যক্তি আর কোথায় আমার ছেলে কুরআনের হাফেয। দ্বিতীয় মেয়ে সারাকেও এ বছর হেফয করতে দিয়েছি। সে-ও কুরআন শরীফ মুখস্থ করতে শুরু করেছে।

আহমদ আওয়াহ: এখন আপনি কোথায় থাকেন? নন্দীগ্রামের কথা বলেছিলেনÑ সেখানে কী উদ্দেশ্যে থাকছেন?
আলাউদ্দীন: হযরত আমাকে কোলকাতার একজন ঠিকাদারের কাজে লাগিয়ে দিয়েছেন। আগে তো আমি মজুরি করতাম। পরে কোলকাতার ঐ ভদ্রলোক আমাকে স্টোরকিপার বানিয়ে দেন। নওমুসলিম হওয়ার কারণে আমার প্রতি তার বিশেষ খেয়াল ছিল। নন্দীগ্রামে সে একটি ফ্যাক্টরির ঠিকা নিয়েছিল। আমাকেও সাথে নিয়ে গিয়েছিল। আল্লাহর ইচ্ছা, হঠাৎ সেখানে ফ্যাসাদ সৃষ্টি হলো। দাঙ্গার খবর রেডিও-টেলিভিশনে এবং পত্রপত্রিকায় ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে। পুলিশের গুলিতে অসংখ্যা লোক মারা গেছে। আমরাও তখন খুব পেরেশান ছিলাম। আমার দুর্ভাগ্য, দীর্ঘ এক বছরে হযরতের সাথে ফোনে পর্যন্ত কোনো যোগাযোগ করতে পারিনি। অথচ আমি অন্তর থেকে তার মুরীদ। সেখানকার অবস্থা যখন ভয়াবহ আমার স্ত্রী তখন ফোন করে হযরতের কাছে দুআ চেয়েছে। আমি যোগাযোগের অনেক চেষ্টা করেছি।
এক সপ্তাহ পর হযরতকে পেলাম। হযরত আমাকে বললেন, সাহাবায়ে কেরামের মতো দুই রাকাত সালাতুল হাজত পড়ে দুআ করার কথা ভুলে গেলে কেন? আমি বললাম, হযরত! আমার দুআয় কাজ হবে না। আপনি দুআ করুন। হযরত বললেন, আমি তো করবো, দাতা তো একমাত্র আল্লাহ। তিনি কি তোমার দুআ শুনবেন না। বললাম, আচ্ছা আমি আজই দুআ করছি। তারপর সেদিনই এশার নামায পড়ে মসজিদে খুব দুআ করলাম। আল্লাহ তায়ালা আমার দুআ শুনেছেন।

হঠাৎ দাঙ্গার আগুন এমনভাবে নিভে গেল যেন কেউ পানি ঢেলে দিয়েছে। আমি আমার সঙ্গীদের বললাম, আজ রাতেই আল্লাহ তায়ালার কাছে দুআ করবো। ইনশাআল্লাহ! কাল হতে দেখবে অবস্থা স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। আমি সাহাবায়ে কেরামের মতোই আল্লাহ তায়ালাকে আমার প্রার্থনা মানিয়ে নেব। প্রার্থনাকারীই তো পরিবর্তিত হয়েছে, প্রার্থনা যিনি শোনেন তিনি তো এক অদ্বিতীয়। পরের দিন দেখা গেল সব সঙ্গী আমাকে সম্মান করতে লাগলো। আমি তাদের বললাম, আমি তো হযরত কালিম সিদ্দীকির নির্দেশে দুআ করেছি। প্রকৃত অর্থে দুআ তো করেছেন হযরত। আমাকে তো অন্তরে একিন সৃষ্টি করার জন্য হযরত দুআ করতে বলেছেন। আমি হযরতকে ফোন করে জানাই দাঙ্গা থেমে গেছে। এদিকে আমার সঙ্গীরা আমার ভক্ত হয়ে গেছে। হযরত তখন আমাকে বললেন, এদের মধ্যে যদি অমুসলিম থাকে তাহলে তুমি এ সুযোগকে কাজে লাগাতে পারো। তারা তোমার কথা মন দিয়ে শুনবে। এদের জাহান্নাম থেকে বাঁচিয়ে ঈমানদার বানানোর চেষ্টা কর। আমি তাদের সাথে কথা বলতে শুরু করি। আলহামদুলিল্লাহ! চারজন মজদুর ইসলাম গ্রহণ করে। তাদের সাথে একজন রাজ ও একজন পেলেম্বরও ইসলাম কবুল করে।

আহমদ আওয়াহ: আপনি কি নন্দীগ্রামে স্থায়ীভাবে থাক শুরু করেছেন?
আলাউদ্দীন: আলহামদুলিল্লাহ! আমি একটি প্লট কিনেছি। কিছু পয়সাও জমিয়েছি। আল্লাহ তাআলা যদি কবুল করেন আর সেখানকার দানাপানি যদি ভাগ্যে থাকে তাহলে আল্লাহই হয়তো ঘরের ব্যবস্থা করে দেবেন।

আহমদ আওয়াহ: সেখানে জামাতের কাজও তো করছেন?
আলাউদ্দীন: আলহামদুলিল্লাহ! তিন দিন তো প্রতি মাসেই লাগাচ্ছি। অবশ্য প্রতি বছর চিল্লায় যেতে পারছি না। প্রতিদিন তালিম এবং মসজিদের গাশত শুরু করেছি। মানুষও কিছু কিছু যোগ দিচ্ছে।

আহমদ আওয়াহ: আরমুগানের পাঠকদের উদ্দেশ্যে বিশেষ কিছু বলুন।
আলাউদ্দীন: আহমদ ভাই! সারা পৃথিবী এখন হেদায়েতের পিপাসায় কাতর। আমার মতো পাপীকেই দেখুন, শরাবের মতো নাপাক বস্তু আমার হেদায়েতের উপলক্ষ হয়েছে। আমরা সর্বশ্রেষ্ঠ নবীর উম্মত। আমাদের কর্তব্য এই উম্মত হওয়ার হক আদায় করা। পৃথিবীর সকল মানুষই তো এই নবীর উম্মত। অথচ আমরা তাদের পর মনে করে তাদের পর্যন্ত দ্বীন পৌঁছাইনি। এটা বড় জুলুম। মসুলমানদের জালেম হওয়া উচিত নয়। তাদেরকে তাদের আমানত পৌঁছে দেয়া এবং তাদের জাহান্নাম থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করা আমাদের কর্তব্য।

আহমদ আওয়াহ: আপনাকে অনেক অনেক শুকরিয়া আলাউদ্দীন ভাই! আসসালালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ!
আলাউদ্দীন: ওয়া আলাইকুম সালাম ওয়ারাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু!

সাক্ষাৎকার গ্রহণে
মাও. আহমদ আওয়াহ নদভী
মাসিক আরমুগান, জানুয়ারী- ২০০৮

Series Navigation<< নওমুসলিমদের সাক্ষাৎকার [পর্ব-১৪] :: শেখ মুহাম্মদ উসমান (সতীশ চন্দ্র গোয়েল)-এর সাক্ষাৎকারনওমুসলিমদের সাক্ষাৎকার [পর্ব-১৭] :: শেঠ মুহাম্মদ উমর (রামজী লাল গুপ্তা)-এর সাক্ষাৎকার >>

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Archives

October 2020
S S M T W T F
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31  
shares