শনিবার, ২৪শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১৮ই জিলহজ্জ, ১৪৪১ হিজরী

নওমুসলিমদের সাক্ষাৎকার [পর্ব-১৭] :: শেঠ মুহাম্মদ উমর (রামজী লাল গুপ্তা)-এর সাক্ষাৎকার


১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর আমি নিজে অযোধ্যায় গিয়েছি। পুরো একটি টিমের নেতৃত্বে ছিলাম আমি। বাবরি মসজিদ ভাঙ্গার পর ঘরে ফিরে এসে আমি অনেক বড় একটা ভোজের আয়োজন করি। আমার ছেলে যোগেশ তখন রাগ করে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। আমি খুব ধুমধাম করে বিজয় উৎসব পালন করি। রামমন্দির নির্মাণের জন্য মুক্ত হস্তে খরচ করি। কিন্তু সত্য বলতে কী, আমার ভেতর কেমন যেন একটা ভয় কাজ করতে থাকে। আমার যেন বারবার মনে হতো- কোনো আসমানী গজব আমাকে গ্রাস করতে চাচ্ছে। ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বরের ঘটনা। আমার দোকান এবং গুদাম মোটামুটি দূরত্বেই অবস্থিত। কিন্তু দেখা গেল, সকালে বিদ্যুতের শার্টসার্কিটে দুই জায়গায় আগুন লেগে গেল। এতে আমার অন্তত দশ লাখ রুপির সম্পদ পুড়ে ছাই হয়ে গেল। এরপর আমার মনটা আরও ভেঙ্গে গেল। ৬ হিসেম্বরের বিপদ হয়তো আমার পরিবার কোনো ভাবে কাটিয়ে উঠতো। কিন্তু ২০০৫ সালের ৬ ডিসেম্বর আমার ছেলে যোগেশ কোনো একটি কাজে লক্ষনৌ যাচ্ছিল। রাস্তায় ট্রাকের সাথে তার গাড়ি এক্সিডেন্ট করে। সেখানেই ড্রাইভারসহ সেও মারা যায়। তার নয় বছরের একটি ছেলে ও ছয় বছরের একটি মেয়ে রয়েছে। এ ঘটনা মেনে নেয়া আমার জন্য সহজ ছিল না। আমি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলি।


আহমদ আওয়াহ: আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু!
শেঠ মুহাম্মদ উমর: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু!

আহমদ আওয়াহ: শেঠ সাহেব! দুই তিন মাস যাবৎ আব্বু আপনার কথা খুব বলছিলেন। বারবার আলোচনা করছিলেন যে, আল্লাহ তায়ালা তার বান্দাদের হেদায়াতের উদ্দেশ্যে যে কাউকেই বা যে কোনো বস্তুকেই কাজে লাগাতে সক্ষম।
শেঠ মুহাম্মদ উমর: মাওলানা আহমদ! হযরত সত্য কথাই বলেছেন। আমার জীবনটাই তো আল্লাহ তায়ালার দয়া ও করুণার একটি সুস্পষ্ট নিদর্শন। আমার মতো খোদা ও খোদার দুশমন আর এদিকে আমার প্রতি মালিকের করুণা ও অনুগ্রহ। আহা! পূর্বেই যদি আমি হযরতের কিংবা হযরতের কোনো লোকের সাক্ষাত পেতাম তাহলে আমার প্রাণাধিক প্রিয় পুত্রকে ঈমান ছাড়া মরতে হতো না। (এ কথা বলে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। দীর্ঘক্ষণ পর কাঁদতে-কাঁদতেই বলেন) সে আমাকে কতো রকম করে বোঝাতো। মুসলমানদের সাথে তার সম্পর্ক কত সুন্দর ছিল। আর আজ সে আমাকে এই বার্ধক্যে ঈমান ছাড়া মৃত্যুবরণ করে এক অসহ্য কষ্টের মধ্যে রেখে চলে গেল।

নওমুসলিমদের সহযোগিতার জন্য এগিয়ে আসুন

আহমদ আওয়াহ: শেঠ সাহেব! প্রথমেই আপনার ব্যক্তিগত পরিচয় জানতে চাইবো।
শেঠ মুহাম্মদ উমর: আমি লাখনৌ নিকটবর্তী একটি গ্রামে ব্যবসায়ী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছি। আমার প্রথম জন্ম হয়েছে এখন থেকে ৬৯ বছর আগে ১৯৩৯ সালের ৬ ডিসেম্বর। আমাদের বংশের নাম গুপ্তা। আমার পিতাজি কেরানায় পাইকারি ব্যবসা করতেন। আমার ষষ্ঠ পুরুষ থেকে প্রত্যেকের ঘরে একটি করে সন্তান হতো। আমি আমার পিতার একমাত্র পুত্র ছিলাম। নবম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ে ব্যবসায় লেগে পড়েছি। আমার পারিবারিক নাম ছিল রামজি লাল গুপ্তা।

আহমদ আওয়াহ: ৬ ডিসেম্বর প্রথমবার জন্ম হওয়ার অর্থ?
শেঠ মুহাম্মদ উমর: আসলে এই বছর ২২ জানুয়ারী আমি দ্বিতীয় বার জন্মগ্রহণ করেছি। যদি আমার পূর্বেকার জীবন শুমার না করা হয় তাহলেই ভালো। সেটা তো আমার অন্ধকার জীবন।

আহমদ আওয়াহ: জী, আপনার খান্দানী পরিচয় সম্পর্কে বলছিলেন…
শেঠ মুহাম্মদ উমর: আমার পারিবারিক পরিবেশ ছিল খুবই ধার্মিক। আমার পিতাজী ছিলেন জেলা বিজেপির প্রধান। যা পূর্বে জনসংঘ নামে পরিচিত ছিল। যার কারণে ইসলাম এবং মুসলমানদের প্রতি শত্র“তা ছিল আমাদের পারিবারিক বৈশিষ্ট্য। মুসলমানদের প্রতি শত্র“তা আমাদের রক্তে মিশে গিয়েছিল। ১৯৮৬ সালে বাবরি মসজিদে তালা ঝুলানো থেকে শুরু করে বাবরি মসজিদের শাহাদাতের ঘৃণ্যতম ঘটনা পর্যন্ত আমি পরিপূর্ণ উন্মাদনার সাথে শরীক ছিলাম। আমার বিয়ে হয়েছিল খুবই ভদ্র এবং ধর্ম নিরপেক্ষ এক পরিবারে। আমার স্ত্রীর স্বভাবও ছিল সেকুলার। মুসলমানদের সাথে তাদের পারিবারিক সম্পর্ক ছিল খুবই ঘনিষ্ট। তাদের বাড়িতে যখন আমরা বিয়ে করতে গেলাম তখন দেখলাম খানা-পিনাসহ বিয়ের যাবতীয় ইন্তেজাম করছেন আমার শ্বশুরের এক বন্ধু খান সাহেব। দাড়িওয়ালা অনেক অতিথি সেখানে উপস্থিত। তার বরং মূল ব্যবস্থাপনায় অংশীদার। এটা আমাদের কাছে খুবই খারাপ লাগে। আমি তো এক পর্যায়ে খানা খেতে অস্বীকার করে পরিষ্কার বলে দিই, মুসলমানদের হাত লেগেছে, আমি এ খাবার খাবো না। আমার পিতাজীর এক বন্ধু ছিলেন পন্ডিতজী। তিনি তখন আমাকে বুঝান যে, হিন্দুধর্মের কোথায় এ কথা লেখা আছে, মুসলমানদের হাত লাগা খাবার খাওয়া যাবে না? আমি অত্যন্ত ঘৃণার সাথে খাবার গ্রহণ করি।
আমার বিয়ে হয়েছিল ১৯৫২ সালে । নয় বছর পর্যন্ত আমাদের কোনো সন্তান হয়নি। নয় বছর পর ১৯৬১ সালে মালিক আমাকে একটি পুত্র সন্তান দান করেন। আমি তার নাম রাখি যোগেশ। তাকে লেখাপড়া শিখিয়েছি ভালো স্কুলে। আমার ইচ্ছা ছিল আমি তাকে পার্টি এবং আমার জাতির জন্য উৎসর্গ করবো। তাকে সামাজিক বিষয়ে পি.এইচ.ডি করিয়েছিলাম। প্রথম থেকেই সে ছিল ভালো ছাত্র। তবে তার স্বভাব ছিল মায়ের মতোই। হিন্দুর তুলনায় মুসলমানদের প্রতি তার আগ্রহ বেশি ছিল। দলীয় মনোভাব এবং দাঙ্গা-হাঙ্গামাকে মোটেও পছন্দ করতো না। আমাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতো। তার পরও এসব বিষয় নিয়ে আমার সাথে তর্ক করতো। রাম মন্দির আন্দোলন এবং এই উদ্দেশ্যে আমার অর্থ খরচ এসব বিষয়ে অসন্তষ্ট হয়ে সে দুইবার এক সপ্তাহের জন্য ঘর ছেড়ে চলে গিয়েছিল। তার মা ফোনে কান্নাকাটি করে ফিরিয়ে এনেছে।

আহমদ আওয়াহ: আপনার ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে একটু বিস্তারিত বলবেন?
শেঠ মুহাম্মদ উমর: আমি সবসময়ই মুসলমানদের আমাদের এই দেশের শত্র“ ভাবতাম। তাছাড়া রাম জন্মভূমিতে মন্দির ভেঙ্গে মসজিদ বানানোর কারণে আমার মাথা সর্বদা চড়ে থাকতো। আমি যে কোনো মুল্যে রামমন্দির বানাতে অঙ্গীকারাবদ্ধ ছিলাম। এজন্য আমি আমার শরীর, মন, জ্ঞান, সবকিছু বিসর্জন দিয়ে রেখেছিলাম। ১৯৮৭ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত রামমন্দির আন্দোলন এবং বাবরি মসজিদ ভাঙ্গার নানা উপলক্ষে অন্তত ২৫ লাখ রুপি নিজের পকেট থেকে খরচ করেছি। আমার স্ত্রী এবং পুত্র এতে চরম অসন্তষ্ট হয়েছে। যোগেশ বলতো, এ দেশে তিন শ্রেণীর মানুষ বাইর থেকে এসে রাজত্ব করেছে। এক আর্য গোষ্ঠি। এরা এদেশে এসে জুলুম করছে। এখানকার শূদ্রদের দাসে পরিণত করেছে। নিজেদের আখের গুছিয়েছে। দেশের জন্য কিছুই করেনি। বরং চূড়ান্ত পর্যায়ের অবিচার করেছে। অসংখ্য মানুষকে মৃত্যুর তীরে নিয়ে দাঁড় করিয়েছে। দ্বিতীয় আরেকটি শ্রেণী ইংরেজ। এরা এদেশে এসে এখানকার অধীবাসীদের গোলাম বানিয়েছে। এখানকার সম্পদ লুট করে ইংল্যান্ড নিয়ে গেছে। ভারতবাসীর উপর সীমাহীন অত্যাচার করেছে। অসংখ্য মানুষকে খুন করেছে। অসংখ্য মানুষকে ফাঁসি দিয়েছে। তৃতীয় একটি শ্রেণী হলো মুসলমান। এরা এদেশে এসে এদেশকে নিজেদের দেশ মনে করে এখানে লাল কেল্লা বানিয়েছে। তাজমহলের মতো গর্বের ভবন নির্মাণ করেছে। এখানকার মানুষকে কাপড় পরা শিখেয়েছে। কথা বলা শিখিয়েছে। চলার জন্য রাস্তা নির্মাণ করেছে। সরাইখানা বানিয়েছে। ডাকপ্রথা চালু করেছে। নহর খনন করেছে। রাষ্ট্রের ছোট-ছোট বিচ্ছিন্ন শাসনব্যবস্থাকে ভেঙ্গে দিয়ে এক বিশাল ভারত নির্মাণ করেছে। এক হাজার বছর সংখ্যালঘু থেকে সংখ্যাগুরুদের শাসন করেছে। ধর্মীয় স্বাধীনতা দিয়েছে।

আমার পুত্র আমাকে ইতিহাসের বরাত দিয়ে মুসলমান শাসকদের ইনসাফের ঘটনাবলী শোনাতো। কিন্তু কী বলবো, আমার রক্তে মিশে গিয়েছিল ইসলামের প্রতি শত্র“তা। ফলে আমার মেযাজে কোনো পরিবর্তন আসেনি। ১৯৯০ সালের ৩০ ডিসেম্বরের আন্দোলনেও আমি ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ করেছি। ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর আমি নিজে অযোধ্যায় গিয়েছি। পুরো একটি টিমের নেতৃত্বে ছিলাম আমি। বাবরি মসজিদ ভাঙ্গার পর ঘরে ফিরে এসে আমি অনেক বড় একটা ভোজের আয়োজন করি। আমার ছেলে যোগেশ তখন রাগ করে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। আমি খুব ধুমধাম করে বিজয় উৎসব পালন করি। রামমন্দির নির্মাণের জন্য মুক্তহস্তে খরচ করি। কিন্তু সত্য বলতে কী, আমার ভেতর কেমন যেন একটা ভয় কাজ করতে থাকে। আমার যেন বারবার মনে হতো- কোনো আসমানী গজব আমাকে গ্রাস করতে চাচ্ছে।

১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বরের ঘটনা। আমার দোকান এবং গুদাম মোটামুটি দূরত্বেই অবস্থিত। কিন্তু দেখা গেল, সকালে বিদ্যুতের শার্টসার্কিটে দুই জায়গায় আগুন লেগে গেল। এতে আমার অন্তত দশ লাখ রুপির সম্পদ পুড়ে ছাই হয়ে গেল। এরপর আমার মনটা আরও ভেঙ্গে গেল। ৬ হিসেম্বরের বিপদ হয়তো আমার পরিবার কোনো ভাবে কাটিয়ে উঠতো। কিন্তু ২০০৫ সালের ৬ ডিসেম্বর আমার ছেলে যোগেশ কোনো একটি কাজে লাখনৌ যাচ্ছিল। রাস্তায় ট্রাকের সাথে তার গাড়ি এক্সিডেন্ট করে। সেখানেই ড্রাইভারসহ সেও মারা যায়। তার নয় বছরের একটি ছেলে ও ছয় বছরের একটি মেয়ে রয়েছে। এ ঘটনা মেনে নেয়া আমার জন্য সহজ ছিল না। আমি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলি। ব্যবসা-বাণিজ্য ছেড়ে মানুষের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরতে থাকি। আমার স্ত্রী আমাকে অনেক মাওলানার কাছে নিয়ে যায়। হারদুইয়ের বড় হযরতের কাছে নিয়ে যায়। এরপর আমার মানসিক অবস্থা ঠিক হলেও মনের মধ্যে এটা রয়ে যায় যে আমি ভুল পথে আছি। ইসলাম সম্পর্কে আমার জানা উচিত। তারপর আমি ইসলাম সম্পর্কে পড়াশোনা শুরু করলাম।

আহমদ আওয়াহ: ইসলাম সম্পর্কে জানার জন্য আপনি কী পড়েছেন?
শেঠ মুহাম্মদ উমর: সর্বপ্রথম আমি হযরত মুহাম্মদ সা. সম্পর্কে একটি ছোট বই পড়েছি। তারপর মাওলানা মনযুর নোমানীর ‘ইসলাম কিয়া হ্যায়’ পড়েছি। তারপর মাওলানা আলী মিয়া নদবীর ‘ইসলাম এক পরিচয়’ পড়েছি। তারপর ২০০৬ সালের ৫ ডিসেম্বর একটি ছেলে আমাকে মাওলানা কালিম সিদ্দীকির ‘আপকি আমানত’ বইটি এনে দেয়। পরের দিন মানে ৬ ডিসেম্বর আমি মনে মনে ভয় করছিলাম আগামীকাল কী ঘটতে যাচ্ছে। এই বই আমার মনের ভেতর একথা প্রতিষ্ঠিত করে দিয়েছিলো যে কেবল মুসলমান হওয়ার মধ্যেই আমি আমার জীবনকে আশংকার হাত থেকে রক্ষা করতে পারি। ৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় আমি পাঁচ-ছয় ব্যক্তির কাছে গেলাম। আবদার করলাম, আমাকে মুসলমান করে দাও। কিন্তু তারা ভয় পাচ্ছিলো। কেউ আমাকে মুসলমান করতে প্রস্তুত হলো না।

আহমদ আওয়াহ: আপনি তাহলে ২০০৬ সালের ৬ ডিসেম্বর মুসলমান হয়ে গিয়েছিলেন? একটু আগে তো বলছিলেন এখন থেকে কয়েক মাস আগে ২০০৯ সালের ২২ জানুয়ারী আপনি মুসলমান হয়েছেন।
শেঠ মুহাম্মদ উমর: আসলে ২০০৬ সালের ৫ ডিসেম্বর আমি মুসলমান হয়ে যাওয়ার পাক্কা সিদ্ধান্ত নিয়ে ছিলাম। । কিন্তু ২০০৯ -এর ২২ জানুয়ারী পর্যন্ত কেউ আমাকে মুসলমান করতে প্রস্তুত হয়নি। আমাদের অঞ্চলের এক ছেলে ফুলাত গিয়ে মুসলমান হয়েছিল। সে মূলত হযরতকে জানিয়েছে। সে হয়তো বলেছে, এক লালাজি বাবরী মসজিদ ভাঙ্গার জন্য অনেক অর্থ খরচ করেছে। এখন সে মুসলমান হতে চায়। একথা শোনার পর হযরত আমার কাছে এক মাস্টার সাহেবকে পাঠান। এই মাস্টার সাহেব বাবরী মসজিদ ভাঙ্গার সময় সর্বপ্রথম কোদাল চালিয়েছিল। সে যাওয়ার সময় ভালো করে ঠিকানাও জেনে যায়নি। ফলে তিনদিন পর্যন্ত তাকে ঠিকানার সন্ধানে ঘুরে বেড়াতে হয়েছে। তিন দিন পর ২২ জানুয়ারী সে আমাকে পায়। সেই আমাকে কালেমা পড়ায়। হযরতের পক্ষ থেকে আমাকে সালাম বলে।

সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হুযুরকে ফোনে পাওয়ার চেষ্টা করে। হযরত মহারাষ্ট্র সফরে ছিলেন। অনেক চেষ্টার পর হযরতকে পাওয়া যায়। তিনি বলেন, সেই লালাজী আলহামদুলিল্লাহ! কালেমা পড়ে মুসলমান হয়েছে। এখন আপনার সাথে কথা বলতে চায়। আপনি তাকে দ্বিতীয় বার কালেমা পড়িয়ে দিন। হযরত আমাকে দ্বিতীয় বার কালেমা পড়ালেন এবং হিন্দিতে অঙ্গীকার করালেন। আমি যখন হযরতের কাছে বললাম, আমি জালেম! আমার মালিকের ঘর ভাঙতে এবং সেখানে শিরকের ঘর বানাতে পকেট থেকে পঁচিশ লাখ রুপি খরচ করেছি এখন ইচ্ছা করেছি এই পাপের প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে পঁচিশ লাখ রুপি খরচ করে একটি মসজিদ ও একটি মাদ্রাসা বানাবো। আপনি আমার জন্য দুআ করবেন। যে দয়াময় মালিক আমাকে তাঁর ঘর ভাঙ্গা এবং শহীদ করার উসিলায় হেদায়েত দান করলেন সেই মালিক যেন আমার নামটা মসজিদ ধ্বংসকারীদের তালিকা থেকে উঠিয়ে তাঁর ঘর নির্মাণকারীর তালিকায় দিয়ে দেন। আমি বলি, আমার একটি ইসলামী নাম রেখে দিন। হযরত ফোনেই আমাকে মোবারকবাদ দেন, দুআ করেন। আমার নাম রেখে দেন মুহাম্মদ উমর। আমার মালিকের কী অপরিসীম করুণা আমার প্রতি। মাওলানা সাহেব! যদি আমার অস্তিত্বের প্রতিটি কণা এবং আমার সমুদয় সম্পদ আমার মালিকের জন্য উৎসর্গ করে দিই তবুও আমার মালিকের শোকরিয়া আদায় করতে পারবো না। এত বড় জুলুম এবং বড় পাপকে তিনি আমার হেদায়াতের উসিলা বানিয়েছেন।

আহমদ আওয়াহ: এখন ইসলামকে জানার জন্য আর কী পড়ছেন?
শেঠ মুহাম্মদ উমর: আলহামদুলিল্লাহ! ঘরে একজন শিক্ষক রেখেছি। তিনি একজন খুব ভালো মাওলানা। তিনি আমাকে কুরআন শরীফ পড়াচ্ছেন এবং বুঝাচ্ছেনও।

আহমদ আওয়াহ: আপনার স্ত্রী এবং নাতি-নাতনীর কী হলো?
শেঠ মুহাম্মদ উমর: আমার মালিকের অনুগ্রহে আমার স্ত্রী, যোগেশের স্ত্রী এবং আমার নাতি-নাতনী সকলেই মুসলমান হয়ে গেছে। এখন আমরা সকলেই এক সাথে কুরআন পড়ছি।

আহমদ আওয়াহ: দিল্লীতে কোনো কাজে এসেছিলেন?
শেঠ মুহাম্মদ উমর: না, মাওলানা সাহেব ডেকেছিলেন। এক ব্যক্তি আমাকে আনার জন্য গিয়েছিল। হযরতের সাথে ফোনে কথা হয়েছে। দেখা করার ইচ্ছা ছিল।

আহমদ আওয়াহ: আব্বুর সাথে কী কথা হয়েছে?
শেঠ মুহাম্মদ উমর: হযরত আমাকে এই বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন- আপনার মতো কত ভাই না বুঝে বাবরি মসজিদ শহীদ করার মতো ঘটনায় শরীক হয়েছে। আপনাকে তাদের জন্য কাজ করতে হবে। তাদের কাছে সত্য পৌঁছে দেয়ার চেষ্টা আপনাকে করতে হবে। আমি মনে মনে একটা তালিকাও তৈরি করেছি। আমার স্বাস্থ্য এখন আর আগের মতো নেই যে, নিজে ছুটাছুটি করতে পারবো। তবে এতটুকু বুঝি, যতদিন বেঁচে আছি আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের কালেমা মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার কাজেই লেগে থাকতে হবে।

আহমদ আওয়াহ: মুসলমানদের জন্য কোনো পয়গাম আছে কি?
শেঠ মুহাম্মদ উমর: আমার যোগেশের বেদনা সর্বদা আমাকে ব্যথিত করে রাখে। মরতে তো হবে সকলকেই। মৃত্যু তার নির্দিষ্ট সময়ে আসবেই। তাছাড়া বাহানাও পূর্ব থেকেই ঠিক করা রয়েছে। কিন্তু ঈমান ছাড়া আমার এমন প্রিয় সন্তান দুনিয়া থেকে বিদায় গ্রহণ করলো- আমার মতো জালেম ইসলাম দুশমন বরং খোদার দুশমন পিতার ঘরে জন্ম নিয়েও যে সর্বদা মুসলমানদের পক্ষে কথা বলতো, সে ইসলাম ছাড়া মারা গেল, যখন এ কথা ভাবি তখন মনে হয় মুসলমানগণ তাদের হক যথাযথভাবে আদায় করেনি। এই যন্ত্রণা আমাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। জানি না, এমন আরো কতো যুবক এবং বৃদ্ধ মৃত্যুর দিকে ছুটে যাচ্ছে।

আহমদ আওয়াহ: শেঠজী আপনাকে অনেক অনেক শোকরিয়া। তবে যোগেশ সম্পর্কে বলবো- আব্বু এ জাতীয় লোকদের ব্যাপারে বলেন, যারা স্বভাবগতভাবেই ইসলামের চরিত্রের উপর প্রতিষ্ঠিত, মৃত্যুর সময় ফেরেশতা এসে তাদের কালেমা পড়িয়ে দেন। এমন অনেক ঘটনা প্রকাশিত হয়ে থাকে। আল্লাহ তায়ালার রহমের কাছে আশা রাখুন। যোগেশ যেন মুসলমান হয়েই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়ে থাকে।
শেঠ মুহাম্মদ উমর: আল্লাহ তায়ালা আপনার কথা সত্য করুন। আমার ফুলের মতো এই সন্তানকে যেন আমি বেহেশতে গিয়ে দেখতে পাই।

আহমদ আওয়াহ: আমীন! অবশ্যই বেহেশতে গিয়ে আপনার ছেলের সাথে মিলিত হবেন ইনশাআল্লাহ! আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুতল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু!
শেঠ মুহাম্মদ উমর: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু!

সাক্ষাৎকার গ্রহণে
মাও. আহমদ আওয়াহ নদভী
মাসিক আরমুগান, জুন- ২০০৯

Series Navigation<< নওমুসলিমদের সাক্ষাৎকার [পর্ব-১৫] :: আলাউদ্দীন(রাজেশ্বর)-এর সাক্ষাৎকারনওমুসলিমদের সাক্ষাৎকার [পর্ব-১৮] :: নওমুসলিমা ডাক্তার উর্মির সাক্ষাৎকার >>

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Archives

August 2020
S S M T W T F
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031  
shares