শনিবার, ১১ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৯ই সফর, ১৪৪২ হিজরি

সাহায্যের আড়ালে খ্রিষ্টান বানানো হচ্ছে রোহিঙ্গাদের; ৪-৫ মাসে খ্রিষ্টান হয়েছেন আড়াই হাজার

খুৎবাঃ রোহিঙ্গাদের অসহায়ত্বের সুযোগ ভালোভাবে কাজে লাগাচ্ছে খ্রিষ্টান মিশনারি গ্রুপগুলো। দারিদ্র্য, অশিক্ষা ও মানসিকভাবে বিধ্বস্ত রোহিঙ্গাদের সাহায্যের নামে সহজেই চলছে মিশনারি গ্রুপগুলোর ধর্মান্তরিত করার কাজ। কখনো গোপনে আবার কখনো প্রকাশ্যে খ্রিষ্টান ধর্মে দিক্ষিত করার কাজটি করছে কয়েকটি এনজিও। প্রাথমিক হিসেবে ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর থেকে এ পর্যন্ত দুই হাজারের বেশি রোহিঙ্গাকে প্রলুব্ধ করে খ্রিষ্টান বানানো হয়েছে।

রোহিঙ্গাদের খ্রিষ্টান বানানোর কাজে নেতৃত্ব দিচ্ছে ‘ঈসায়ী চার্চ বাংলাদেশ’ (আইসিবি) নামের একটি সংগঠন। এই সংগঠনের প্রায় ১৫ জন নেতা উখিয়া ও টেকনাফে দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছেন। নগদ টাকা দেয়া ছাড়াও ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করলে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ পাওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেয়া হচ্ছে রোহিঙ্গাদের। কক্সবাজার শহরের কয়েকটি অভিজাত হোটেলে তারা অবস্থান করে মুসলমানদের খ্রিষ্টান বানানোর কাজ করে যাচ্ছেন। উখিয়া ও টেকনাফ এলাকায় সরেজমিন অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে এমন তথ্য। একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে রোহিঙ্গাদের প্রলুব্ধ করে খ্রিষ্টান বানানোর বিবরণ।

প্রাপ্ত তথ্য মতে, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ভয়াবহ নির্যাতনে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গারা এখনো ট্রমায় আক্রান্ত। এ অবস্থায় প্রলোভনে পড়ে খ্রিষ্টান মিশনারি গ্রুপগুলোর নানা প্রস্তাব সহজেই লুফে নিচ্ছেন তারা। সামনে ঘোর অন্ধকার। তাই কোনটা ভালো, কোনটা মন্দ সে কথা বিবেচনা করার অবস্থা তাদের নেই। যেকোনো অবলম্বন ধরে তারা বাঁচতে চান। চান নিরাপত্তা। এ সুযোগ ব্যবহার করছে ধর্মান্তরিতকরণ গোষ্ঠী ও মানবপাচারকারী চক্র। পাচারের পাশাপাশি সুন্দরী রোহিঙ্গা নারীদের বিভিন্ন আবাসিক হোটেলে চাকরি দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে দেহব্যবসায় বাধ্য করছে ওই মানবপাচারকারী চক্রটি।

তথ্য মতে, খ্রিষ্টান বানানোর কাজে নিয়োজিত ‘ঈসায়ি চার্চ বাংলাদেশকে’ অর্থায়ন করছে নেদারল্যান্ডস ও আমেরিকাসহ কয়েকটি দেশ। এ সংগঠনটি রোহিঙ্গা মুসলিমদের ধর্ম ত্যাগ করার জন্য প্রলুব্ধ করতে ১১ থেকে ১৫ জন রোহিঙ্গাকে বাছাই করেছে যারা ইতোমধ্যে খ্রিষ্টান হয়ে গেছে। এসব রোহিঙ্গাকে ‘বিশেষ সুবিধার’ পাশাপাশি প্রতি মাসে পাঁচ হাজার টাকা করে দেয়া হয়। তাদের প্রতি মাসে কক্সবাজার শহরের একটি ব্যাপ্টিস্ট চার্চে পাঁচ দিনের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এই ১৫ জনকে সুপারভাইজ করেন কুতুপালং ব্লক বি-১ এ বসবাসরত জনৈক আবু তাহের (৪২)।

ধর্মান্তরিত রোহিঙ্গাদের খ্রিষ্টান নাম দেয়া হলেও কৌশল হিসেবে মুসলিম নাম উচ্চারণ করা হয়ে থাকে। তথ্য মতে, রোহিঙ্গাদের মধ্যে প্রথমে খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহণ করেন মিয়ানমারের মংডুর হাতিপাড়ার মৃত জালাল আহমদের ছেলে নুরুল ইসলাম ফকির (৫৫)। ব্যাপক অনুসন্ধানে জানা যায়, এই নুরুল ইসলাম ফকির (খ্রিষ্টান নাম জানা যায়নি) পরিবারের ১৭ জন সদস্য নিয়ে ২০০৭ সালে বাংলাদেশে আসেন। তিনি বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া তার রোহিঙ্গা আত্মীয়স্বজনকে খ্রিষ্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা চালিয়ে এ পর্যন্ত ৩০-৩৫টি পরিবারকে এ পথে নিয়ে যেতে সক্ষম হন।

২০১৭ সালের ২৪ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলার অভিযোগে ২৫ আগস্ট থেকে সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর নির্মম নির্যাতন, নারী ধর্ষণ, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ ও গণহত্যা শুরু করে। জীবন বাঁচাতে লাখ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে আশ্রয় নিলে খ্রিষ্টান হওয়া পরিবারগুলো অত্যন্ত কৌশলে রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন ব্লকে ঢুকে বসবাস শুরু করে করে এবং ধর্মান্তরের কাজ চালাতে থাকে। এ কাজে নেতৃত্ব দেয়া নুরুল ইসলাম ফকিরের ছেলে এহসান উল্লাহ (৩৫) বাংলাদেশী পাসপোর্ট নিয়ে কয়েক বছর আগে নরওয়ে পাড়ি দেন এবং সেখান থেকে টাকা পাঠাতে থাকেন ধর্মান্তরিত খ্রিষ্টান পরিবারগুলোর জন্য।

তার পাঠানো টাকায় কুতুপালং অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা শিবিরের বি ব্লকে একটি স্কুলপ্রতিষ্ঠা করা হয়। এই স্কুলে বর্তমানে ৩০ জন ছাত্র আছে এবং স্কুলের শিক্ষক হিসেবে নুরুল ইসলাম ফকিরের ছেলে সেলিম (১৭) কাজ করছেন। নুরুল ইসলাম ফকিরের নেতৃত্বে প্রতি রোববার চলে প্রার্থনা কার্যক্রম।

তথ্য মতে, কুতুপালংয়ের বিভিন্ন ক্যাম্পে ৭২টি পরিবার এবং বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ২৪টি পরিবারকে (প্রতি পরিবারে গড়ে আটজন সদস্য) ইতোমধ্যেই খ্রিষ্টান করা হয়েছে। এ ছাড়া থাইংখালীর জামতলি রোহিঙ্গা ক্যাম্পেও ৪২টি পরিবারকে খ্রিষ্টান বানানো হয়েছে। জামতলিতে নেতৃত্ব দেন জনৈক শরীফ (শরিফের বাড়ি বুচিদং) নামে এক রোহিঙ্গা। এ ছাড়া টেকনাফের জাদিমোরা নার্সারি এলাকায় ওবায়দুল হক নামে এক রোহিঙ্গার নেতৃত্বে ৪৫টি পরিবারকে খ্রিষ্টান ধর্মে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এসব পরিবারের সদস্যরা ওবায়দুল হকের বাসায় প্রতি রোববার এবং মাঝে মাঝে শুক্রবারও প্রার্থনা সভায় মিলিত হন।

এ ছাড়া নয়া মুছনি পাড়ায় ১২টি রোহিঙ্গা পরিবারকে ধর্মান্তরিত করার তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের দেখাশোনা করেন আলী জোহা নামে এক রোহিঙ্গা। আলী জোহার অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী ভাই রফিক (বাংলাদেশী পাসপোর্ট নিয়ে অস্ট্রেলিয়া গমন) এসব পরিবারের জন্য নিয়মিত আর্থিক সাহায্য পাঠান। অপর দিকে নয়া মোচনি পাড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নুরুল ইসলাম ফকিরের বোন হালিমা খাতুন পাঁচটি রোহিঙ্গা মুসলিম পরিবারকে নিয়ে নিয়মিত খ্রিষ্টান ধর্মীয় সভা করেন এবং তাদের আর্থিক সহায়তা দেন।

প্রাপ্ত তথ্য মতে, উখিয়া ও টেকনাফে রোহিঙ্গা আশ্রিত এলাকায় খ্রিষ্টান বানানোর কাজ মনিটরিং করেন মাবুদ নামের জনৈক খ্রিষ্টান। তিনি রোহিঙ্গাদের নগদ আর্থিক সহায়তা ছাড়াও বিভিন্ন সেবামূলক কাজ করে খ্রিষ্টান ধর্মের প্রতি প্রলুব্ধ করে থাকেন। এ পর্যন্ত প্রায় ৩৫০ পরিবারকে খ্রিষ্টান বানানো হয়েছে বলে জানা গেছে।

নয়া দিগন্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Archives

September 2020
S S M T W T F
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930  
shares