শনিবার, ২৫শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২৬শে রমজান, ১৪৪২ হিজরি

এক রোহিঙ্গা তরুনীর আর্তনাদ

রোহিঙ্গাদের নিয়ে একজন ফটো সাংবাদিকের অনুভূতি
রোহিঙ্গাদের নিয়ে একজন ফটো সাংবাদিকের অনুভূতি

তাদের কান্নার সময়ও নেই

আরাকান রাজ্যে রোহিঙ্গারা বর্মি সেনা আর স্থানীয় বৌদ্ধদের এমন সব ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুরতার শিকার যে, চোখের সামনে অনেকের আপনজনকে মেরে ফেলা হলেও কারোর জন্য এক ফোঁটা চোখের পানি ফেলারও কোনো সুযোগ পাননি তারা। বরং আপনজনের লাশ ফেলে জীবন নিয়ে পালাতে হয়েছে অনেককে।

বিভিন্ন স্থানে ঘরে আগুন দিয়ে পরিবারের সবাইকে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে পরিবারের সবাইকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্বিচারে হত্যার সময় ঘরের বাইরে থাকায় বা পালিয়ে রক্ষা পেয়েছেন কেউ কেউ। হত্যার পর ঘরে ফিরে আপনজনের লাশ দেখে কান্নার পরিবর্তে ঘর ছেড়ে ছুটে পালাতে হয়েছে জীবন নিয়ে। কখনো ঘরের সবাইকে চোখের সামনে হত্যা করে যুবতীদের গণধর্ষণ করে অজ্ঞান অবস্থায় মৃত ভেবে ফেলে গেছে সেনারা। জ্ঞান ফেরার পর আপনজনের লাশ রেখে রুদ্ধশ্বাসে বিবস্ত্র অবস্থায় পালানোর ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে।

মোহসিনা বেগম নামে তামি গ্রামের একজন নারী বলেছেন, তার ১৯ বছর বয়সী বোনকে সেনারা ধরে নিয়ে গিয়েছিল ক্যাম্পে। সে দেখতে সুন্দর ছিল। এলাকার চেয়ারম্যানের মধ্যস্থতায় তাকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলেও ক্যাম্পে দিনের পর দিন ধর্ষণের কারণে সে খুব অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং বাংলাদেশে আসার পথে মারা যায়। তার লাশ দাফন ছাড়া জঙ্গলে পথে ফেলে চলে আসতে হয়েছে।

রোহিঙ্গাদের প্রতি এমনই সব নির্মমতার বিবরণ সংগ্রহ করে তা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরছেন দেশী-বিদেশী সাংবাদিকেরা। এসব খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হচ্ছেন অনেকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টাইম ম্যাগাজিনের ফটো সাংবাদিক দার ইয়াসিন এ রকম একজন। তিনি কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের ছবি তুলতে গিয়ে যেসব নির্মম দৃশ্যের মুখোমুখি হয়েছেন এবং তার ফলে সৃষ্ট তার মানসিক অবস্থার বিবরণ দিয়ে একটি লেখা তৈরি করেছেন (চযড়ঃড় ঊংংধু), যা চলতি সংখ্যায় প্রকাশ হয়েছে।

দার ইয়াসিন টাইম ম্যাগাজিনের কাশ্মিরভিত্তিক একজন ফটো সাংবাদিক। তিনি লিখেছেন, আমি আফগানিস্তানে ক্যাম্পে বসবাসরত মানুষ দেখেছি। আমি আমার জন্মভূমি কাশ্মিরে প্রায় প্রতিদিন দেখেছি মৃত্যু ও ধ্বংসলীলা। কিন্তু গত ১৩ সেপ্টেম্বর আমি বাংলাদেশের কক্সবাজারে আসার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে যা দেখলাম আমি বলতে পারি তা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। যে দিকেই চোখ যায় সর্বত্র খাদ্য, পানি, আর আশ্রয়ের জন্য আকুল হয়ে ছোটাছুটি অবস্থা সবার মধ্যে।
ছবি তোলার সময় মানুষের সাথে আলাপ করা আমার একটি অভ্যাস। আমার সাথে যে অনুবাদক ছিল তার স্থানীয় ভাষা এবং রোহিঙ্গাদের ভাষা একই। তিনি আমাকে জানালেন, রোহিঙ্গারা কথা বলতে আগ্রহী; কিন্তু তারা এতটাই পরিশ্রান্ত আর বিধ্বস্ত যে, তাদের প্রকৃত অবস্থা বুঝিয়ে বলা এ মুহূর্তে তাদের জন্য কঠিন।
পরের দিন শাহপরীর দ্বীপে গেলাম। দূরে কিছু একটা গোলমাল চলছে বলে মনে হচ্ছে। কাছে গেলাম। একটি নৌকা ডুবে গেছে। কয়েকজন মহিলা অচেতন অবস্থায় পড়ে আছেন। একজন মহিলা কাঁদছিলেন। তার পরিবারের একজন ডুবে মারা গেছেন। আরো তিনজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। আমি জানি না তারা বাঁচবে কি না। আরেকজন মহিলা তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন।
যে মহিলা ক্রন্দনরত মহিলাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন একটু পরেই দেখলাম তিনি নিজেই বিলাপ করছেন। তার স্বামী তাদের দুই যমজ সন্তান নিয়ে হাজির হয়েছেন। তাদের বয়স মাত্র ৪০ দিন।

তাদের একজনের নাম আব্দুল মাসুদ। সে মৃত। বিলাপরত নারী তার দুই নবজাতক যমজ সন্তানকে জড়িয়ে ধরলেন। তাদের একজন জীবিত। আরেকজন কোনো নিঃশ্বাস নিচ্ছে না। এ দৃশ্য হৃদয়বিদারক। তীর থেকে মাত্র কয়েক মিটার দূরে নৌকাটি ডুবেছে। তারা একই বংশের মোট ৪৫ জন ছিলেন নৌকায়। ৪০ দিন বয়সী যে শিশুটি বেঁচে আছে তার অবস্থাও আশঙ্কাজনক।
এ অবস্থায় কী বলা বা করা উচিত সে বিষয়ে আমার কোনোই ধারণা নেই। আমি আর কিছুই নয়, ছবি তুলতে লাগলাম আর ঘুরতে লাগলাম। মৃত আব্দুল মাসুদের পিতা এবং তার কয়েকজন আত্মীয় গেলেন হাসপাতালে, যেখানে তাদের কয়েকজন আত্মীয়কে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কয়েকজন গেলেন মৃতদের দাফনের জন্য স্থানীয়দের অনুমতি আনতে। কয়েক ঘণ্টা পরই এ পরিবারের সবাইকে ছুটতে হলো খাবার, পানি আর আশ্রয়ের জন্য। এমন সময় আমার মনে হলো এই মানুষগুলোর শোক পালনের কোনো সময় নেই। তাদের ছোটাছুটি চালিয়ে যেতে হবে।

নৌকাভর্তি এই বিপন্ন মানুষগুলোর দৃশ্য আমাকে সব সময় তাড়া করে ফিরবে। বিশেষ করে ৪০ দিন বয়সী আব্দুল মাসুদের লাশ কোলে মা হামিদার নির্বাক ছবি আমাকে এখনো অস্থির করে তুলছে। নির্মম হিংস্রতা থেকে রক্ষা পেতে পলায়ন, নিরাপত্তার জন্য নৌকায় আরোহণ, নৌকাডুবি, এরপর মারা যাওয়া এক নবজাতকের জন্য শোক, একই সাথে বেঁচে যাওয়া আরেক নবজাতকের জন্য কৃতজ্ঞতা, তবু তো একজন অন্তত বেঁচে আছে।

দু’দিন পর আমি সৈকতে হাঁটার সময় আব্দুল করিম এবং আমেনা খাতুনকে দেখলাম। আমি তাদের থামালাম ছবি নেয়ার জন্য এবং আব্দুল করিমের সাথে কিছুক্ষণ কথা বললাম। করিম জানালেন কিভাবে তিনি তার গ্রাম থেকে পালিয়ে আসলেন এবং শেষ পর্যন্ত রাতের শেষে ঘন অন্ধকারে নৌকায় আরোহণ করলেন। বাঁচার জন্য এটাই ছিল তাদের শেষ আশা।

এরপর তিনি ক্যাম্পের দিকে হাঁটতে লাগলেন। তাদের কারোর সাথে আমার আর দেখা হলো না। এত বিশাল জনসমুদ্রে কোনো একটি নির্দিষ্ট পরিবার বা নির্দিষ্ট কোনো একজনকে খুঁজে বের করা দুঃসাধ্য। বিশাল জনসমুদ্রে তারা যেন একেকটি ফোঁটা মাত্র, যারা হাঁটছেন আরো অধিক অনিশ্চয়তার দিকে। তাদের চলাফেরা খুবই নিয়ন্ত্রিত। সঙ্কীর্ণ আশ্রয়, সীমিত খাবার এবং সীমিত চিকিৎসা। ভালো চিকিৎসা আর ভালো জীবনযাপন খুবই ব্যয়বহুল; আর তাদের হাতে নেই কোনো অর্থ। সামনে এগোনোর দিন শেষ। যে ঘর তাদের ছিল তা আর নেই। যে জীবন তাদের ছিল তা আর নেই। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে যে পরিবার তাদের ছিল তা-ও নেই।

কাশ্মিরে আমি আমার মেয়ের স্কুলের কর্তৃপক্ষের সাথে প্রায়ই বিতর্ক করতাম তাদের কতগুলো বই বহন করতে হয় এবং তার ব্যাগটা কত ভারী সে বিষয়ে। আর এখানে দেখলাম শিশুরা তাদের বয়স্ক মা-বাবাকে বহন করে নিয়ে আসছে পচা কাদা, পানি আর পাহাড়ের ঢাল বেয়ে। গত কয়েক দিনে আমি এখানে যা দেখলাম তাতে আমার পায়ের নিচের মাটি সরে গেছে।

সুত্রঃ নয়াদিগন্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Archives

May 2021
S S M T W T F
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031  
shares
%d bloggers like this: