শুক্রবার, ২০শে চৈত্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ৯ই শাবান, ১৪৪১ হিজরী

রোহিঙ্গা মুহাজির ক্যাম্পের পথে প্রান্তরে! [পর্ব-১] – লুৎফর ফরায়েজী

কক্সবাজারে আমাদের সাথে মিলিত হলেন পাবনা থেকে আসা একটি দল। সমঝদার আসাদুর রহমান, শান্ত-সৌম্য খালেদুল ইসলাম, উম্মাহ দরদী মেহেদী হাসান, কর্মতৎপর জিহাদুল ইসলাম এবং সরলমনা হাসীব হুসাইনের ছোট্ট জামাত সহযোগী হওয়ায় সফরটা প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছিল। সাথে ছিলেন আমার ছোট ভগ্নিপতি কর্মঠ মাওলানা মুয়াজ্জেম হুসাইন।
রওয়ানা হলাম শাহপরীর দ্বীপের উদ্দেশ্যে। প্রথমে রাস্তা খরচের জন্য নিজ নিজ পথ খরচ জমা দেয়া হল আসাদ ভাইয়ের কাছে। কক্সবাজার থেকে প্রথমে লিংক রোড। ফের সেখান থেকে লোকাল মাইক্রো হয়ে টেকনাফের উদ্দেশ্যে।
নির্ঘুম রাতের ক্লান্তিময় চোখে উখিয়া থেকে টেকনাফ পর্যন্ত দেখলাম রোহিঙ্গা শরণার্থীদের করূণ হাল। লাখো মানুষের ঢল। রাস্তার দু’পাশে সারিবদ্ধ হাজারো মানুষ। কোলে শিশু সন্তান। চোখেমুখে হতাশা। অনিশ্চিত ভবিষ্যত।
পথে পড়ল কুতুপালং, পালংখালি, বালুখালি এবং উনছিপ্রাং ক্যাম্প। যতই এগুচ্ছি হতাশা ততই ভর করছে মনে। কী নিয়ে আসলাম? কী দিয়ে সান্ত্বনা দেবো সর্বস্ব হারানো এসব বনী আদমকে? আমাদের সামর্থই বা কতটুকু? জবানটা বাকরুদ্ধ হয়ে এল। প্রচন্ড হতাশায় মূক হয়ে গেলাম। প্রচণ্ড রোদে ঘামে বিলাসী শরীরটা জবুথবু।
নামলাম টেকনাফ। সিএনজি করে এবার রওয়ানা শাহপরীর উদ্দেশ্যে। রৌদ্রের প্রখরতায়, ঘামে ভিজে মনে হল ভিতরটা মুচরে উঠছে। শুরু হল কাশি। পুরো শরীর যেন জ্বলে যাচ্ছে। বমি আসবে বলে। মাথা ঘুরে পড়ে যাবো কি?
সামনে বসা খালেদুল ইসলাম ভাই দ্রুত সিএনজি থামিয়ে পানি আনতে দৌড় দিলেন। কুলি করলাম। মাথায় কিছুটা পানি ঢাললাম। ঠান্ডা পানিতে মুখটা ভাল করে ধৌত করতেই কিছুটা আরাম অনুভূত হল।

আবার যাত্রা শুরু। ধিক্কার এল নিজের উপর। এই সামান্য কষ্ট সইতে নারাজ আরামপ্রিয় শরীরটা। হায়! আমার আরাকানী বোনেরা কিভাবে পেড়োল আট নয়দিনের পথ। পায়ে হেটে। তীব্র গরমে পাহাড়ী পথ বেয়ে। কি জবাব দেবো মালিকের দরবারে?

সিএনজি থামলো দ্বীপের এপাড়। এক মসজিদে এসে দাঁড়ালাম। চারপাশে হাজারো শরণার্থী। এর মাঝে বেশ কিছু স্থানীয়রাও সেজেছে রোহিঙ্গা। মুফতে ত্রাণ নেবার আশায়।
আসল রোহিঙ্গা আর নকল রোহিঙ্গা চেনা বড় দুস্কর এমন পরিস্থিতিতে। তাই এমন পরিস্থিতিতে দান করা থেকে বিরত থাকাই উচিত বলে মনে করি। পূর্ণ যাচাই ছাড়া শুধু আবেগের বশে ত্রাণের টাকা নষ্ট করা ঠিক হবে না।
এখান থেকে শাহপরীর দ্বীপ পর্যন্ত পিচঢালা পথ ছিল এক সময়। রাস্তাটি বন্যার পানিতে ভেঙ্গে গেছে। কোথাও ভেঙ্গে বিশাল গর্ত। আবার কিছুটা রাস্তা ভাসমান। এরপর পুরোটাই পানিতে ভরপুর।
এবার পাড় হতে হবে বাঁশের সাঁকু। নড়বড়ে আঁকাবাঁকা সাঁকু পেড়িয়ে যেতে হবে ভাসমান রাস্তাটাতে। এরপর নৌকা ভাড়া করে পেড়োতে হবে বাকি পথ।
শুরু হল যাত্রা। সাঁকু পাড় হয়ে নৌকায় চড়লাম। নৌকা ছুটছে। চোখে পড়ল প্রায় ডুবন্ত এক সেতু। কারেন্ট লাইনের লম্বা খাম্বা। বুঝা গেল, এটি রাস্তা। কিন্তু পানিতে ডুবে এখন সুবিশাল নদীর আকার ধারণ করেছে। চারিদিকে শুধু পানি আর পানি। শাঁ শাঁ শব্দে অতিক্রম করছে স্পিড বোট ও ইঞ্জিন চালিত নৌকা।
নামলাম শাহপরীর দ্বীপে। নামতেই চোখে পড়ল এক মাওলানা সাহেব একদল রোহিঙ্গা নারী ও শিশুদের নৌকায় তুলে দিচ্ছেন। জানলাম গতকাল রাতে সীমান্ত পেড়িয়েছেন তারা। রাতে দারুশ শরইয়্যাহ মাদরাসায় ছিলেন। এখন তাদের ক্যাম্পে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। মাদরাসায় এখনো অবস্থান করছেন বেশ কিছু রোহিঙ্গা শরণার্থী।
যোহর ছুঁই ছুঁই। নিয়ত করলাম যোহরটা উক্ত মাদরাসায় গিয়েই পড়ি। রওয়ানা হলাম সিএনজি যুগে। আঁকাবাঁকা পথ ও জনবসতি পেড়িয়ে গাড়ি প্রবেশ করল মাদরাসা মাঠে। এক গাড়ি বোঝাই শরণার্থী যাত্রী। অপরদিকে মাঠের এক কোণে পঁচিশ ত্রিশজনের মত রোহিঙ্গা নরনারী এবং শিশুদের জট। বিদেশী এক সংস্থা ত্রাণ দিচ্ছে তাদের।
সাথীদের কেউ কেউ এখানেই সহযোগিতা করতে চাইলেন। সিদ্ধান্ত হল, যেহেতু এখন একদল তাদের ত্রাণ দিচ্ছে তাই আমরা অন্য কোন দলকে দিবো।
যাইহোক, এগিয়ে গেলাম মাদরাসা অফিসের দিকে। অফিস রুমের দরজায় হাসিমুখে দাঁড়িয়েছিলেন উম্মাহ দরদী আলেম মাওলানা ইউসুফ মাহমূদী। সেই সাথে ঢাকা থেকে আসা আরো দুইতিনজন আলেম এগিয়ে এসে মুসাফাহা করলেন। বসালেন অফিস রুমে। মাদরাসার শিক্ষা সচিব আমাকে আগে থেকেই চিনেন বলে জড়িয়ে ধরলেন। অপরিচিত এক দ্বীপে চেনাজানা মানুষ পেয়ে মনটা খুশিতে ভরে গেল।

এবার শুরু হল আলোচনা। জানালামঃ শাহপরীর দ্বীপ আসতে আসতে মনটাই খারাপ হয়ে গেল। নিজেকে বড় অসহায় মনে হল। এই লাখো মানুষ। আমরা তাদের জন্য কী করতে পারি? আর যেভাবে বিশৃংখল ও যাচ্ছেতাইভাবে ত্রাণ বিতরণ চলছে এভাবে কি সবাই ত্রাণ পাচ্ছে? দেখা যাবে, কোন পরিবার কয়েকবার পেল। আর কোন পরিবার একবারও না।
কারণ, কোন সিষ্টেমতো নেই। আলাদা করার কোন পদ্ধতিতো নেই। যে যার মত দিয়ে যাচ্ছে। কেউ শুরুতে। কেউবা শেষে। কখনো শুরুরা বঞ্চিত। কখনো মাঝখানের। কখনো শেষের। এ ভজঘট পরিস্থিতি সামাল দেয়া কি সম্ভব? কিভাবে?
প্রায় সবাই সায় দিলেন আমার কথায়। জি, পরিস্থিতি বড়ই ঘোলাটে। এর মাঝে এক ভাই কথা বলে উঠলেন। ভাইটার নাম আব্দুর রকীব লিমন। বাড়ী কুমিল্লায়। পেশায় ব্যবসায়ী।
তিনি বললেন, আমি তাবলীগের সাথী। আমার মাথায় একটি বুদ্ধি এসেছেঃ সেটি হল, যদি পুরো ক্যাম্পগুলোকে ইজতিমা মাঠের মত ছকে আনা যায়। খিত্তাওয়ারী বন্টন করা হয়। কথার কথা আমাদের ৬৪ জিলা অনুপাতে চৌষট্টি জোন করা হয়। প্রতিটি জোনের যিম্মাদারী একেক জেলাকে দেয়া হয়। উক্ত জোনে ত্রাণ বিতরণ, দ্বীন প্রচার, মসজিদ নির্মাণ, চিকিৎসা সেবা প্রদানসহ যাবতীয় দেখভাল করবে উক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত জেলার দাতারা।

খুশি হলাম ভাইটার প্রস্তাবে। বললামঃ ভাল কথা বলেছেন আপনি। এভাবে করতে পারলে এ ভজঘট আর থাকবে না। সেই সাথে থাকবে প্রতিযোগিতা। কে কার জেলার দায়িত্বপাওয়া জোনের বেশি থেকে বেশি খিদমাত করতে পারে। এর মাধ্যমে যেমন ত্রাণ কেউ পেল, আবার কেউ পেল না, এ ঝামেলা থাকবে না, তেমনি ত্রাণ বন্টনে হিমশিম খেতে হবে না। সরকারের দায়িত্বও তখন কমে যাবে অনেক। কিন্তু এটি বাস্তবায়নে সরকারী সহযোগিতা অতিব জরুরী।
ভাইটা জানালেন, আমি চেষ্টা করছি বিষয়টি কক্সবাজার মার্কাযকে জানাতে। তারা চেষ্টা করলে সরকারী লোকদের সাথে আলাপ করে তা করতে পারে।

ভাইটার সাথে আলাপ করে ভাল লাগায় পরিচয় জানতে চাইলাম। যা বললেন, তাতে আমি হতবাক। এই ভাই এসেছিলেন ত্রাণ দিতে। ত্রাণ দেয়া শেষে যখন ফিরে যাবার সময় হল, তখন তিনি আগ্রহের বশে এসেছিলেন শাহপরীর দ্বীপ ঘুরে দেখতে। গায়ে ছিল শুধু একটি ট্রাউজার ও পাঞ্জাবী। আর কিছু নেই। কিন্তু ঘুরতে এসে যখন দেখলেন টাকার জন্য অনেকে সীমান্ত পাড় হতে পারছে না। পাড় হবার পর তাদের খানার ইন্তিজামসহ অনেক কাজ করার লোকবলের অভাব। তখন তিনি আর তার সাথীদের কাছে ফেরত যাননি। আজ দশদিন হতে চলল এক কাপড়ে মানুষটা এ দ্বীপে পড়ে আছেন। গায়ের জামা ঘামে ভিজে ছিড়ে গেছে অনেকটা। এক জামা পড়েই মানুষটা রয়ে গেলেন আজো।

কী আজীব! এমন সোনালী মানুষ আজো আছেন। শহুরে পাথুরে দিলের মানুষের মাঝে এমন কিছু মানবিক মানুষেরাও জিন্দা আছেন ভাবতেও অবাক লাগল।

কোন এক অনলাইন নিউজপোর্টাল নাকি “রোহিঙ্গা ক্যাম্পের হিরো” শিরোনামে লেখা ছাপছে। যারা ফেইসবুকে বেশি বেশি ছবি আপলোড, আর কিছুক্ষণ পর পর লাইভ দেখাতে পারে, তাদেরই উপস্থাপিত করা হয় হিরো নামে। কিন্তু এমন হাজারো হিরো প্রচারণার বাইরে রয়ে গেছেন। যারা সত্যিকার হিরো। যারা প্রচারণা নয়, মাঠের কাজেই নিজেকে নিয়োজিত করে রেখেছেন। নাওয়া খাওয়া, স্বীয় ব্যবসা বাণিজ্য সব লাঠে তুলে।
আল্লাহ তাআলা ভাইদের কবুল করেন।
এবার আলোচনার মোড় ঘুরে গেল। ব্ষিয় সীমান্ত পারাপার এবং কি ঘটছে নাফ নদীর উপারে? চাক্ষুস কতিপয় ভয়ানক কারগুজারী শিরদাঁড়ায় ঠান্ডা শিহরণ বইয়ে দিল বারবার।
এক জন বলতে লাগলেনঃ হযরত! ভয়ানক সংবাদ হল, যারা আসছেন, তারা বলছেন পাহাড়ের উপার মগ দস্যুরা সুন্দরী যুবতীদের…..।

চলবে

One thought on “রোহিঙ্গা মুহাজির ক্যাম্পের পথে প্রান্তরে! [পর্ব-১] – লুৎফর ফরায়েজী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Archives

April 2020
S S M T W T F
« Jan    
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
252627282930  
shares