সোমবার, ৩রা কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২রা রবিউল আউয়াল, ১৪৪২ হিজরি

নওমুসলিমদের সাক্ষাৎকার [পর্ব-০৮] :: মুহাম্মদ শাহেদ (রামধন)-এর সাক্ষাৎকার


সত্যকথা হলো, পৃথিবীব্যাপী মানবতা আজ তৃষ্ণাকাতর। প্রয়োজন হলো মানবতার কল্যাণে মুসলমানদের বেরিয়ে আসা। মুসলমানদের প্রমাণ করতে হবে আমরা মানুষের নিখাঁদ বন্ধু। বিশেষ করে ভারতবর্ষের এই হিন্দু সমাজকে বুঝিয়ে দিতে হবে আমরা তাদের অকৃত্রিম বন্ধু। এটা প্রমাণিত যে, যখনই তাদের সামনে এই বন্ধুত্বের রূপ মূর্ত হয়ে উঠেছে তখনই তারা মুসলমানদের গোলামে পরিণত হয়েছে। আমার জন্য দুআ করবেন। পৃথিবীর সকল মানুষের জন্য দুআ করবেন। আরও দুআ করবেন, আল্লাহ তায়ালা যেন ভারতবর্ষের সকল হিন্দু ভাইকে আমার মতো ঈদ নসীব করেন।


আহমদ আওয়াহ: আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু!
মুহাম্মদ শাহেদ: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু!

আহমদ আওয়াহ: শাহেদ সাহেব! আপনার আসাতে খুবই খুশি হয়েছিল। আব্বু বলছিলেন, আপনি জামাত থেকে ফিরছেন। আরমুগানের পক্ষ থেকে একটা সাক্ষাতকার নিতে হবে। কিন্তু আপনি সোজা বাড়ি চলে গিয়েছিলেন। খুব আফসোস করেছিলাম। আল্লাহ তাআলা আবার সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।
মুহাম্মদ শাহেদ: আসলে মালিয়ার কোটলায় আমরা জামাতে ছিলাম। শেষ দিন আমি বাড়িতে ফোন করে জানতে পারলাম আমার ছেলে খুবই অসুস্থ। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তখন আমি ফোনে মাওলানার সাথে আলাপ করলাম। তিনি আমাকে বললেন এখন সোজা বাড়িতে চলে যান। পরে ইন্শাআল্লাহ সাক্ষাত হবে। আল্লাহ পাকের শোকর বাসার সবাই এখন সুস্থ। আমি কোম্পানীর একটি কাজ উপলক্ষে দিল্লী এসেছি। মনের মধ্যে অস্থিরতা ছিল, মাওলানার সাথে দেখা করবো। আলহামদুলিল্লাহ দেখা হয়েছে।

আহমদ আওয়াহ: অনুমতি দিলে আসল কথা শুরু করতে পারি।
মুহাম্মদ শাহেদ: অবশ্যই আমার পক্ষে সম্ভব এমন যে কোনো খিদমতের জন্য প্রস্তুত আছি।

নওমুসলিমদের সহযোগিতার জন্য এগিয়ে আসুন 

আহমদ আওয়াহ: প্রথমে আপনার বংশ পরিচয় বলুন।
মুহাম্মদ শাহেদ: আমি এলাহাবাদে ব্রা‏‏হ্মণ পরিবারে জন্মেছি ১৯৫৭ সালের ৯ নভেম্বর। আমার পারিবারিক নাম রামধন; আমার পিতাজীর রাখা নাম। তিনি স্কুলের হেড মাস্টার ছিলেন। আমরা দুই ভাই ও দুই বোন। আমিই সবার বড়। যদিও গুণ বিচারে আমিই সবার ছোট। আমি আমার পিতাজীর স্কুল থেকেই হাই স্কুল কমপ্লিট করেছি। তারপর সায়েন্সে ইন্টার করেছি। ইন্টারে রেজাল্ট ভালো হয়নি। ফলে সাবজেক্ট বদলাতে হয়েছে। পরে বি.কম পড়েছি। তারপর একটি ফ্যাক্টরিতে চাকরি নেই। তারপর কাজের সন্ধানে ছিলাম। এখন একটি কোম্পানিতে প্রডাকশন ম্যানেজার হিসেবে কাজ করছি। বিয়ে করেছি বেনারসের আরেক ব্রা‏‏হ্মণ খান্দানে। আমার স্ত্রী ইন্টার পাস। আমি জেনে-বুঝেই একজন সংসারী মেয়েকে বিয়ে করেছি। পারিবারিক শান্তি এবং স্বস্তিই ছিল আমার কাম্য। আমার তিন সন্তান। বড় ছেলের নাম নলিত কুমার, এখন আল-হামদুলিল্লাহ মুহাম্মদ জাভেদ, দুই মেয়ে তাদের নাম, কমলা ও গীতা। বর্তমান নাম, আয়েশা ও ফাতেমা। আমার স্ত্রীর নাম খাদীজা।

আহমদ আওয়াহ: আপনার ইসলাম গ্রহণের ঘটনা সবিস্তারে বলুন।
মুহাম্মদ শাহেদ: আজ থেকে পাঁচ বছর আগের কথা। ২০০৩ সালের জুন মাস। বাচ্চাদের ছুটি চলছে। পরিবারের সবাই বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ছুটি কাটানোর পরিকল্পনা করি। আমাদের প্রোগ্রাম ছিল পুনায় কয়েকদিন ঘুরে দিল্লি হয়ে শিমলা যাওয়ার। সফর শেষ করলাম। মুম্বাই থেকে দিল্লির টিকেট আগেই করা ছিল। আমরা যে কেবিনে ছিলাম- সেই কেবিনে ষষ্ঠ ব্যক্তি ছিলেন আপনার আব্বু মাওলানা কালিম সিদ্দিকী। তাঁকে দেখেই আমাদের ভালো লেগে গেলো। ভাবলাম, ভালোই হলো একজন ধার্মিক সঙ্গী পাওয়া গেল। আমাদের সন্তানরা আনন্দ-ফুর্তির ভেতর দিয়ে কিছু শিখতেও পারবে। আমাদের সফর ছিল নিছক আনন্দ-ফুর্তির উদ্দেশ্যে।

আমাদের প্রতি আল্লাহ তাআলার অশেষ কৃপা তিনি আমাদের পরিবারকে পূর্ব থেকেই পরস্পর হৃদ্যতা ভালোবাসা ও মমতা দান করেছেন। তাছাড়া সফরে গিয়ে সেই হৃদ্যতা আরো একটু অকৃত্রিমতা পায়। আমাদের ছেলেমেয়েরা তখন খুব আনন্দ করছিলো। সন্ধ্যার পর আমি তাদের শাসিয়ে বললাম, আংকেল সাথে আছেন। আর তোমরা মস্তি করছো! কিন্তু মাওলানা আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, এরা বাচ্চা মানুষ; নিষ্পাপ। এরা ফুর্তি করে মজা পাচ্ছে। আপনি এদের বাঁধা দিচ্ছেন কেন? তার কথা আমার কাছে ভালো লাগলো। রাত দশটায় আমি মাওলানা সাহেবকে বললাম, যদি ঘুমাতে চান তাহলে বার্থ খুলে নিতে পারেন। মাওলানা সাহেব বার্থ খুলে শোয়ার জন্য চাদর বিছাতে গেলেন তখন আমার স্ত্রী মেয়েদের ধমকের সুরে বললো, তোমাদের লজ্জা নেই দুজন মেয়ে উপস্থিত থাকতে আংকেল নিজ হাতে বিছানা করেছেন। মেয়েরা ছুটে গিয়ে বললো, আংকেল আমরাই আপনার বিছানা করে দিচ্ছি। মাওলানা সাহেবের বারংবার বাধা সত্ত্বেও তারা জোর করেই বিছানা করে দিল। আমার স্ত্র্রী এমনিতেই একটু সেবক স্বভাবের। সে মাওলানার জুতা তুলে হেফাযতের উদ্দেশ্যে রেখে দিল এবং মাওলানা সাহেবকে বললো, আপনার জুতা বার্থের নীচে রাখা আছে। রাতে উঠে এখানে খুঁজলেই পাবেন।

মাওলানা সাহেব বললেন, আপনি আমাকে খুব লজ্জা দিলেন। ভাই আহমদ! সত্য কথা কী, মানবতার একজন হৃদয়বান বন্ধু এই সামান্য সেবাতেই আবেগাপ্লুত। আমার মেয়েরা তার বিছানা করে দিয়েছে, স্ত্রী তার জুতা ভাজ করে রেখেছে। আর তার বিনিময়ে আল্লাহ তায়ালা আমাদের ভাগ্য খুলে দিয়েছেন। কুফর ও শিরকের অন্ধ জগতে উ™£ান্ত আমাদের হেদায়েতের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। আমার মেয়েদের এবং আমার স্ত্রীর এই সামান্য সেবার উসিলায় আমরা হেদায়েতের আলো পেয়েছি।

আহমদ আওয়াহ: একটু ব্যাখ্যা করে বলুন!
মুহাম্মদ শাহেদ: ভাই আহমদ! মাওলানা সাহেব আমাকে পরবর্তীতে বলেছেনÑ আমার স্ত্রী এবং মেয়েদের এই সামান্য সেবা তাকে খুবই আপ্লুত করেছিল। এতে তিনি খুবই খুশি হয়েছিলেন। গভীর রাত পর্যন্ত তিনি আমাদের হেদায়েতের জন্য দুআ করতে থাকেন। শেষ রাতে তাহাজ্জুদে আমার এবং আমার বংশধরের জন্য হেদায়েতের দুআ করেন। তিনি নিজেই বলেছেন, আল্লাহ তায়ালার কাছে তিনি এই বলে দুআ করেছেন, হে আমার মালিক! বিদ্বেষ ও ঘৃণাভরা এই পরিবেশে নিষ্পাপ মেয়ে দুটি এবং তাদের মা এই অধমের সেবা করেছে। হে আল্লাহ! এই পাপী অধম এর বিনিময় দিতে অক্ষম। এর বিনিময়ে আপনি তাদের এবং তাদের বংশধরকে হেদায়েত দান করুন। মাওলানা সাহেব বলেছেন, তিনি আমাদের জন্য দুআ করেছেন এবং ইচ্ছা করেছেন আমাদের সাথে দ্বীনী দাওয়াত সম্পর্কে আলোচনা করবেন।

সকাল আটটার সময় বাচ্চারা ঘুম থেকে উঠেই নাশ্তা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তারপর খেলাধূলায় লেগে যায়। মাওলানা সাহেব বলেন, আমি তখন চরম অস্থির ছিলাম। কিভাবে এদের ইসলামের দাওয়াত দিই। মনে হচ্ছিল কে যেন আমার মুখটা বন্ধ করে রেখেছে। বারবার আমি কিছু বলতে যাই, কিন্তু বলতে পারি না। সকাল এগারটায় ট্রেন এসে নিযামুদ্দীন স্টেশনে পৌঁছায়। মাওলানা সাহেব বলেন, যতই সময় যাচ্ছিল আমার অস্থিরতা ততই বাড়ছিল। বারবার মনে হচ্ছিল, আমি যদি এদের দাওয়াত না দিই তাহলে এদের কে ইসলাম গ্রহণের কথা বলবে? কিন্তু তা সত্ত্বেও মুখ খুলতে পারছিলাম না। আমরা সবাই গাড়ি থেকে নামলাম। মাওলানা সাহেবের ব্যাগ জোর করে তুলে নিলাম। ভাবছিলাম এমন একজন মানুষের সেবা আমিও একটু করি। মাওলানা সাহেব সাহস করে তাঁর ব্রিফকেস থেকে ‘আপকি আমানত’ পুস্তিকাটি বের করেন। তিনি বলেন, আমি মনেমনে নিজেকে ভর্ৎসনা করি। তারপর সাহস করে আমাদের সামনে বাচ্চাদের ডেকে বলেন, তোমাদের পরস্পর হাসি-আনন্দ আমার কাছে খুবই ভালো লেগেছে। আমার অন্তর উচ্ছ্বাসিত হয়েছে। তোমাদের খুবই ভালো লাগছিলো। তোমাদের প্রতি তোমাদের আংকেলের একটি মাত্র আবেদন আশা করি তোমরা কথা রাখবে। আর তা হলো, বিয়ের পরও তোমরা পরস্পরে এমন ভালোবাসার সাথেই থাকবে। দুই পয়সা, সন্তান কিংবা স্বামীদের ফাঁদে পড়ে পবিত্র এই বন্ধন ছিন্ন করবে না।

আমার বাচ্চারা মাওলানা সাহেবের পা ছুঁয়ে সালাম করে। তিনি তাদের বারবার নিষেধ করেন। অবশেষে তিনি আমার হাতে আপকি আমানত পুস্তিকাটি তুলে দেন। বলেন এটা আমার ঠিকানা। এখন আমার কাছে ভিজিটিং কার্ড নেই। এই সফর থেকে ফিরে আসার পর আমি আমার পরিবারের লোকদের বললাম, আমার মালিক আমাকে এ কোনো দেবতার সাথে সফর করালেন। তিনি আমার সন্তানদের কি আন্তরিক ও মমতামাখা উপদেশ দিলেন। আমি আমার সন্তানদের বারবার বলতে থাকি দেখো, আংকেলের উপদেশ ভুলে যেও না যেন। নিশ্চয় তিনি কোনো দেবতা ব্যক্তি। দুই-তিনদিন আমরা দিল্লীতে ছিলাম।

তারপর শিমলায় চলে যাই। পথে চন্ডিগড়ে ট্রেনে এক ব্যক্তির সাথে সাক্ষাত হয়। সে তার জীবনের দুঃখভরা কাহিনী যাত্রীদের শোনাতে থাকে এবং ভিক্ষা চাইতে থাকে। শুনে আমার মন ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। শিমলায় পৌঁছে রাস্তায় কী কী দেখলাম, শুনলাম এ বিষয়ে আলোচনা ওঠে। আমি আমার সন্তানদেরকে আরেকবার মনে করিয়ে দিই আংকেলের উপদেশ ভুলে যেও না। কমলা বললো, পিতাজী আংকেল একটা ঠিকানা দিয়েছিল সেটা কোথায় গেল? আমি সাথেসাথে পুস্তিকাটি বের করলাম। এক বৈঠকে পড়ে ফেললাম। দ্বিতীয়বার সবাইকে পড়ে শোনালাম। আসলে নেযামুদ্দীন ষ্টেশনে মাওলানা যে উপদেশ দিয়েছিলেন সে উপদেশ আমার এবং সন্তানদের অন্তরে মিঁশে গিয়েছিল। আমাদের কাছে মনে হয়েছে তিনি আমাদের এক নিখাদ কল্যাণকামী। আমরা সকলে আমাদের একজন অকৃত্রিম কল্যাণকামীর লেখা মনে করেই পুস্তিকাটি পড়ি এবং শুনি।

আহমদ ভাই! আপনি জানেন, আপকি আমানত আসলেই একটি ফাঁদ। যদি কারও অন্তরে পাথর বসানো না থাকে যদি কারও অন্তর সত্যিকার অর্থেই অন্তর হয়ে থাকে তাহলে এই কিতাব পড়ে এর জন্য পাগল না হয়ে পারবে না। শিমলা থেকে চন্ডিগড়ে ফিরে এসে এই কিতাবের বেশ কিছু ফটোকপি করালাম। কারণ, এই কিতাবে অন্যদের কাছে এর কপি পৌঁছানোর কথাও বলা হয়েছে। ফেরার সময় আমাদের এই সফর আর আনন্দ ফুর্তির সফর রইলো না বরং এক বিপ্লবী সফর হলো। এমনিতেই আমার পিতাজি ছিলেন একজন সেক্যুলার মানুষ। ফলে অন্যান্য ভারতবাসীর মতো মুসলমানদের প্রতি আমাদের কোনরূপ ঘৃণা বা ক্ষোভ ছিল না। বলতে পারি ইসলাম আর মুসলমান আমাদের পর ছিল, কিন্তু এখন আর তা রইল না। ট্রেনে আমি ভ্রমণকারীদের কাছে এই বইয়ের ফটোকপি বিলি করলাম।

পুরো রাস্তা আমার সন্তানদের মুখে এই বইয়ের কথাই আলোচিত হতে লাগলো। পুনায় আসার পর ইসলাম সম্পর্কে জানার আগ্রহ বেড়ে গেল। এক ব্যক্তি আমাক প্রফেসর আনিস চিশতির সাথে দেখা করার পরামর্শ দিল। আমি যখন তার সাথে দেখা করতে গেলাম তখন তিনি কী যেন এক সমস্যায় ছিলেন। ফলে আমাকে খুব একটা সময় দিতে পারলেন না। আমি এক জায়গা থেকে ‘ইসলাম কিয়া হ্যায়’ বইটি সংগ্রহ করি। এটা পড়ার পর কুরআন শরীফের হিন্দি অনুবাদ পড়তে থাকি। কয়েক মাস চিন্তা-ভাবনা করার পর আবার ‘আপকি আমানত’ পুস্তিকাটি পড়ি। সিদ্ধান্ত নিই মুসলমান হবো। মুসলমান হওয়ার জন্য আমি অনেক শিক্ষিত মুসলমানের দ্বারস্থ হই কিন্তু কেউ আমাকে মুসলমান বানাতে রাজি হয়নি। আমার ছেলে তখন আমাকে বলে, তুমি ফুলাতের মাওলানা সাহেবের কাছে চিঠি লেখ। আমার চিঠি ঈদের চারদিন আগে মাওলানা সাহেবের হাতে পৌঁছে। চিঠি পাওয়ার পর তিনি আমাকে জবাবী চিঠি লেখেন। তাঁর চিঠিটি আমি সবসময় আমার পকেটে রাখি। চিঠিটি ছিল-

প্রিয় দবেদী সাহেব! আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু! আপনি আপনার বাচ্চাদের নিয়ে একদিনের সফরে আমাকে আপন করে নিয়েছেন। আপনাকে এবং আপনার সন্তানদের আমার খুব মনে পড়ে। আপনি একজন শিক্ষিত মানুষ। মুসলমান হওয়ার জন্য কেন এদিক ওদিক ছুটে বেড়াচ্ছেন? ইসলাম একটি সত্যের নাম। ‘আপকি আমানত’ পড়ে সত্য দিলে কালেমা পড়লেই মুসলমান হয়ে যাবেন। ইসলাম কোনো রুসম ও রেওয়াজের ধর্ম নয়। হ্যাঁ, আপনার মনের সান্ত¡নার জন্য যদি ফুলাত চলে আসেন আপনাকে স্বাগতম। আপনার চিঠি যদি আগে পেতাম তাহলে একসাথে ঈদ করতে পারতাম। যদি ভাবি এবং বাচ্চাদের নিয়ে চলে আসেন তাহলে আমার পরিবারের জন্যও সেটা ঈদ হিসেবে বিবেচিত হবে। আপনি যখনই আসবেন খুশি হবো।
ওয়াস সালাম
আপনার আপনজন
কালিম

আমি রাজধানী এক্সপ্রেসে রিজার্ভেশন করে দিল্লী পৌঁছাই। তারপর ঈদের দিন আড়াইটার সময় ফুলাত পৌঁছি। মাওলানা সাহেব আনন্দে আমাকে জড়িয়ে ধরেন। দীর্ঘক্ষণ পর্যন্ত আমাকে বুকের সাথে মিলিয়ে রাখেন। আমার বাচ্চাদেরকে আদর করেন। মনের সান্তনার জন্য আমাদের কালেমা পড়ান। আমার নাম রাখেন শাহেদ। আমার স্ত্রীর নাম খাদিজা। আর ছেলের নাম জাভেদ। আর বড় মেয়ের নাম আমেনা, ছোট মেয়ের নাম ফাতেমা। সত্যকথা কী সেটাই ছিল আমাদের এক আনন্দঘন ঈদ। রোযা ছাড়াই আমরা ঈদের আনন্দে শরীক হয় যাই। মাওলানা সাহেব বলেন, সেই সফরে আমি খুবই হতাশা বোধ করি। আল্লাহ তাআলার কাছে ফরিয়াদ করতে থাকি, হে আল্লাহ! আমার অযোগ্যতা দেখ। মন থেকে এতটা আগ্রহ পাওয়ার পরও এমন প্রিয় মানুষগুলোকে তোমার দীনের একটা কথাও বলতে পারলাম না। পরে আবার এই ভেবে আনন্দিতও হয়েছি আল্লাহ তায়ালা তার দীনের দাঈদের হেফাযতও করেন। মাঝে মধ্যে বান্দার শক্তিতে কিছু হয় না; হয় সবকিছু মহান আল্লাহর ইঙ্গিতে, এই সত্যকে অন্তরে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যও বান্দার মুখে তালা এঁটে দেন।

আহমদ আওয়াহ: তারপর কী হলো?
মুহাম্মদ শাহেদ: আমরা দুইদিন ফুলাতে থাকলাম। সেখানে দুই বছর আগে মুসলমান হয়ে এসেছেন ভাই আব্দুর রহমান। তিনি বলেন, যখন বাড়ির কথা মনে হয় তখন অন্তরটা ভেঙ্গে যেতে চায়। মাওলানা সাহেব যখন সফর থেকে ফিরে আসেন। মুসাফাহা করেন। মাঝে মধ্যে বুকে জড়িয়ে ধরেন কখনও বা সামান্য রসিকতা করেন তখন সব দুঃখ ভুলে যাই। মনে হয় যেন উজাড় অন্তর আবার ফুলেফলে ভরে উঠেছে। দুই দিন ফুলাত থেকে আমি নিজেও তার কথার সত্যতা প্রত্যক্ষ করেছি। মাওলানা নিজ খরচে ট্যাক্সি করে আমাদের দিল্লী পৌঁছে দেন। ফেরার সময় পরিবারের লোকদের জন্য হেদায়েতের দুআ এবং মা-বাবা ও আত্মীয়-স্বজনের মাঝে দাওয়াতের কাজ করার জোর তাগিদ দেন।

আহমদ আওয়াহ: আপনি কি পরিবারের লোকদের মাঝে দাওয়াতের কাজ করেছেন?
মুহাম্মদ শাহেদ: আল্লাহ তায়ালা আমার ওয়াদার মর্যাদা রক্ষা করেছেন। আমার এক ভাই এবং এক বোন তাদের সন্তানসহ মুসলমান হয়েছে। মা-বাবা উভয়েই মুসলমান হয়েছেন। আব্বু ইন্তেকাল করেছেন। আলহামদুলিল্লাহ! এলাহাবাদ তাঁকে দাফন করা হয়েছে। আমার দুই বোন তো এর মধ্যে ইসলাম কবুল করেছে। আরও আশ্চর্য্যরে কথা হলো, যে সফরে মাওলানা সাহেবের সাথে দেখা সেই সফর থেকে ফেরার সময় যাদের আমি ‘আপকি আমানত’ দিয়েছিলাম তাদের মধ্যে থেকে একজন ব্যবসায়ী এবং একজন ইঞ্জিনিয়ার ইসলাম গ্রহণ করেছেন। মাওলানা সাহেব নিজেই বলেছেন, তাদের ইসলাম গ্রহণের কাহিনী খুবই আকর্ষণীয় এবং আল্লাহ তায়ালার শানে হেদায়েতের কারিশমা। সে সব কাহিনী আমিও আপনাকে শোনাতাম। কিন্তু এ মুহূর্তে আমাদের ট্রেনের সময় হয়ে এসেছে। আলহামদুলিল্লাহ গত বছর আমার বাচ্চাদেরসহ আমার আব্বুকে নিয়ে হজ্জ করেছি। এই অধম পাপীদের প্রতি আল্লাহ পাকের কী অনুগ্রহ। তিনি দয়া করে তাঁর ঘর পর্যন্ত দর্শনের সুযোগ করে দিয়েছেন।

আহমদ আওয়াহ: আপনাকে অনেক শুকরিয়া। আরমুগানের পাঠকদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন।
মুহাম্মদ শাহেদ: সত্যকথা হলো, পৃথিবীব্যাপী মানবতা আজ তৃষ্ণাকাতর। প্রয়োজন হলো মানবতার কল্যাণের মুসলমানদের বেরিয়ে আসা। মুসলমানদের প্রমাণ করতে হবে আমরা মানুষের নিখাঁদ বন্ধু। বিশেষ করে ভারতবর্ষের এই হিন্দু সমাজকে বুঝিয়ে দিতে হবে আমরা তাদের অকৃত্রিম বন্ধু। এটা প্রমাণিত যে, যখনই তাদের সামনে এই বন্ধুত্বের রূপ মূর্ত হয়ে উঠেছে তখনই তারা মুসলমানদের গোলামে পরিণত হয়েছে। আমার জন্য দুআ করবেন। পৃথিবীর সকল মানুষের জন্য দুআ করবেন। আরও দুআ করবেন, আল্লাহ তায়ালা যেন ভারতবর্ষের সকল হিন্দু ভাইকে আমার মতো ঈদ নসীব করেন।

আহমদ আওয়াহ: আমীন আল্লাহ কবুল করুন। আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু!
মুহাম্মদ শাহেদ: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু!


  • সাক্ষাৎকার গ্রহণে
    মাও. আহমদ আওয়াহ নদভী
    মাসিক আরমুগান, অক্টোবর- ২০০৭
Series Navigation<< নওমুসলিমদের সাক্ষাৎকার [পর্ব-০৬] :: মুহাম্মদ উমর (রাজবীর ঠাকুর)-এর সাক্ষাৎকারনওমুসলিমদের সাক্ষাৎকার [পর্ব-১০] :: মুহাম্মদ আসজাদ (বিনদ কুমার)-এর সাক্ষাৎকার >>

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Archives

October 2020
S S M T W T F
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31  
shares