• আসসালামুআলাইকুম, আমাদের ওয়েবসাইটে উন্নয়ন মূলক কাজ চলিতেছে, হয়তো আপনাদের ওয়েব সাইটটি ভিজিট করতে সাময়ীক সমস্যা হতে পারে, সাময়ীক অসুবিধার জন্য আমরা আন্তরিক ভাবে দুঃখিত।

সোমবার, ১লা পৌষ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৮ই রবিউস-সানি, ১৪৪১ হিজরী

নাফ নদীর তীরে কাঁদে মানবতা (০৪) আল্লামা মামুনুল হক

সবুজ বাংলার পথেপ্রান্তরে… /৩৮

এক ট্রলারের মুহাজিরদেরকে আমি এস্তেকবাল করে নিয়ে আসার ঘণ্টাখানেক পর আবার দ্বিতীয় ট্রলারের খবর পৌঁছল। এবার জহির ভাই গেলেন এবং একইভাবে মুহাজিরদেরকে এস্তেকবাল করলেন। ফিরে এসে তিনি শোনালেন স্বচক্ষে দেখা এক হৃদয়বিদারক কাহিনী। আমাদের ভাড়া করা ট্রলারের পাশাপাশি আরেকটি ট্রলার যাত্রী নিয়ে আসছিল। সমুদ্রতীরের অদূরেই হঠাৎ ঢেউয়ের তোড়ে ডুবে গেল ট্রলারটি। নারী শিশু বৃদ্ধসহ যাত্রীদের চিৎকারে ভারী হয়ে উঠল চারপাশ। আশপাশ থেকে উপকূলের মানুষেরা কয়েকটি ট্রলার নিয়ে এগিয়ে গেল ডুবন্ত মানুষগুলোকে উদ্ধার করতে। অনেককে জীবন্ত উদ্ধার করা গেলেও দুর্বল নারী আর শিশুদের মধ্যে কয়েকজন ভেসে গেল সমুদ্রের অথৈ জলরাসিতে। বেশ কিছু সময় ট্রলার নিয়ে খোঁজাখুঁজি করে কয়েকজন নারী আর শিশুর মৃতদেহ উদ্ধার করা গেল। আর কয়েকজন হারিয়ে গেল মহাসমুদ্রের গর্ভে। স্বজনরা অশ্রুশিক্ত হলেও হতবাক হলো না। কেননা মৃত্যুপুরী রাখাইনের পথে পথে তারা এমন বহু স্বজন হারিয়েছেন। স্বজন হারানোর বেদনা উপলব্ধি করার ইন্দ্রীয় তাদের অনেক দুর্বল হয়ে গেছে। হবেই না বা কেন? যে জনপদের দুগ্ধপোষ্য শিশুরা মায়ের রক্তস্নাত লাশের উপর হামাগুড়ি খায়, রক্তেভেজা বাবার জামা দেখে যারা লালকে চিনে, লাশের মিছিলে মিছিলে যারা হাঁটতে শিখে, তাদের তো সাগরবক্ষে হারিয়ে যাওয়া স্বজনের পথে তাকিয়ে থাকার ফুরসত নেই। জীবনযুদ্ধে তাদেরকে চলতে হবে সম্মুখের পাণে। তাই তারা আবার চলতে শুরু করে। জহির ভাইয়ের কাছ থেকে এই ট্রলারডুবির চাক্ষুস ঘটনা শুনে বিমর্ষ হয়ে পড়লাম। অনুমান করলাম, নাফনদী আর সাগরপথে এমন কত রোহিঙ্গার সলীল সমাধি ঘটেছে, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। খুব অল্পই বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম কিংবা অন্য কোনো উপায়ে দুনিয়ার মানুষ জানতে পেরেছে।

আমাদের লক্ষ্য ছিল, আরাকানের নিপীড়িত জনপদ থেকে বাংলাদেশের অস্থায়ী শরণার্থীক্যাম্প পর্যন্ত পৌঁছতে যতগুলো ধাপ পার হতে হয় একজন মুহাজিরকে, আমরা প্রতিটি জায়গায় তাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করব। অগণিত মানুষের অনিঃশেষ এই মিছিলে সবার পাশে দাঁড়ানো তো আর আমাদের মতো সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব না, অন্তত অল্প কিছু মানুষের জন্য হলেও এই খেদমতটুকু করার স্পৃহা নিয়ে আমরা কাজ করলাম। ট্রলারে পার হয়ে আসার পর তাদের জন্য সামান্য আপ্যায়নের আয়োজন আর হাতে কিছু নগদ হাদিয়া তুলে দিয়ে তাদেরকে নিয়ে যাত্রা শুরু করলাম উখিয়ার কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্পের দিকে। জহির ভাই, সিঙ্গাইরের শাহআলম ভাইসহ পাঁচজন সাথীকে কাজের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখার জন্য শাহপরীর দ্বীপে রেখে আমরা অবশিষ্টরা চললাম টেকনাফের পথে।

মুহাজিরদলকে নিয়ে আমরা শাহপরীর দ্বীপ থেকে টেকনাফের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করলাম। প্রথমেই ছিল ট্রলারযোগে হারিয়াখালী ঘাট পর্যন্ত পৌঁছার পালা। আমাদের ট্রলারে সহযাত্রী হলো বোরকা আবৃত চার-পাঁচজন মহিলাসহ একটি পরিবার। নারী আর শিশু বাদে পুরুষ সদস্য মাত্র দুজন। পোশাক পরিচ্ছদ দেখেই অনুমান করা যাচ্ছিল, যথেষ্ট স্বচ্ছল ও অভিজাত একটি দীনদার পরিবার। পুরুষ সদস্য দুজনকে দেখে হৃদয়টা ডুকরে কেঁদে উঠল। একজন মাঝ বয়সী প্রৌঢ় নিপাট ভদ্রলোক। তিনিই পরিবারটির কর্তা। বয়স ষাটের ঘরে হবে। শশ্রুমন্ডিত চেহারায় আভিজাত্যের ছাপ স্পষ্ট। আর দ্বিতীয় পুরুষটি বয়সে চব্বিশ-পঁচিশ বছরের একজন যুবক। মায়াবি চেহারা। ফর্সা মুখে সুন্নতের দাড়িতে যুবকের মুখ সুন্দর লাগছিল। প্রৌঢ়ের সাথে যুবকের সম্পর্ক পিতা পুত্রের। কিন্তু প্রৌঢ়ই কোলে করে বয়ে বেড়াচ্ছে যুবককে। কারণ, যুবক শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী। পা দুটো তার নিশ্চল। মেঝে ছাড়া উঁচু কোনো জায়গায় বসতেও পারে না। ফ্যাল ফ্যাল করে শুধু তাকিয়ে থাকে আর মিটি মিটি হাসে। স্ত্রী কন্যা শিশু আর এই প্রতিবন্ধী যুবক সন্তানকে নিয়ে মাঝ বয়সি প্রৌঢ় দেশান্তরের মতো কঠিন পথে পা বাড়িয়েছেন। হিং¯্রতার তা-বে ল-ভ- হয়ে যাওয়া জীবনকে নিয়ে আবার ঘুরে দাঁড়াতে আশ্রয় নিয়েছেন বাংলাদেশে। চলছেন হাজারো শরণার্থীর মিছিলে অনিশ্চিত এক গন্তব্যের দিকে।

ট্রলারের আরেকটি ছোট্ট শিশু আমাদের সকলের দৃষ্টি কাড়ছিল। শিশুটি এক বালিকার কোলে। বালিকার বয়স হবে বড়জোর বারো কি তেরো বছর। বালিকার কোলে শিশুটিকে ঠিক মানানসই মনে হচ্ছিল না। বালিকাই কি শিশুটির মা? হয়তো হবে! রোহিঙ্গা মেয়েদের অল্প বয়সেই বিয়ে হয় এবং সন্তানও হয়। আবার নাও হতে পারে। কেননা, মা যত অল্প বয়সেরই হোক না কেন, তার মধ্যে এক ধরনের পূর্ণতা বিরাজমান থাকে। শিশুকে কোলে করা সেই রোহিঙ্গা বালিকার মাঝে মায়ের সেই পূর্ণতা ছিল অনুপস্থিত। এমন উভয় সম্ভাবনার দোলাচলে কৌতুহল হলো আমাদের। শেষে প্রশ্নই করে বসল আমাদের সাথী মোরশেদুল আলম। শিশুটির সাথে বালিকার কী সম্পর্ক? উত্তর শুনে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম আমরা সবাই। অশ্রুতে ভিজে উঠল আমাদের চোখগুলো। শিশুটি বালিকার সন্তান নয়। শিশুর বাবা-মা রয়ে গেছে আরাকানেই। সামরিক জান্তা আর রাখাইন দস্যুদের আক্রমণে তারা উভয়েই আহত হয়ে গেছে। মায়ের হাতেও বুলেট বিদ্ধ হয়েছে। দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে হিজরত করার সামর্থ্য তাদের নেই। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাই রয়ে গেছে এলাকাতেই। ঝোপঝাড়ে আত্মগোপন করে বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যাবে। কিন্তু হাতে গুলি লাগায় মা তার সন্তানকে কোলে নিতে পারে না। বুকে জড়িয়ে দুধও পান করাতে পারে না। প্রতিবেশী পরিবারগুলো যখন এলাকা ছেড়ে নির্বাসনের পথে পা বাড়িয়েছে, আহত বুলেট বিদ্ধ মা তার কলিজা ছেঁড়া বুকের মানিক শিশু সন্তানকে এই বালিকার হাতে সোপর্দ করে দিয়েছে। নিজে মরে গেলেও বেঁচে থাকে যেন তার সন্তান। নিজ দেশে না হলেও পরবাসে। নিজের কোলে না হলেও অন্যের কোলেই বেড়ে উঠুক তার সন্তান। তার স্বপ্ন। মরে গেলেও শান্তনা থাকবে। বেঁচে আছে আমার ধন। আমার সোনা মানিক। বালিকাটি কোলেকাখে করেই শিশুটিকে নিয়ে পথ চলেছে দিনের পর দিন। এবং চলছে অবিরাম জীবনের সন্ধানে। এতটুকু কৌতুহল নিবৃত্ত হতেই অশ্রুসজল হয়ে উঠেছিল আমাদের চোখ। নির্বাক বনে গিয়েছিলাম আমরা সবাই। জিজ্ঞেস করতে ভুলেই গেছি দশ-বারদিন যাবৎ কী খেয়ে বেঁচে আছে মা-হারা দুগ্ধপোষ্য এ শিশু! এমন প্রশ্নের কী জবাব ছিল মায়ের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেওয়া সেই বালিকার কাছে? কিংবা এ প্রশ্নের কী জবাব দেবে বিশ্ব বিবেক?

ট্রলার থেকে নেমে ভগ্নদশার রাস্তা ধরে হারিয়াখালীর দিকে চলার সময় একটা বাচ্চার কান্নার চিৎকার আমার মনোযোগ আকৃষ্ট করল। স্থানীয় অধিবাসী একটি পরিবার বেড়াতে যাচ্ছে কোথাও। বেশভূষায় বেশ স্বচ্ছল বলেই মনে হলো। নারী পুরুষ মিলিয়ে পাঁচ ছয়জনের সঙ্গে একটা মাত্র বাচ্চা। চার পাঁচ বছর হবে বয়স। কোনো একটা কিছু তার মনোপূত না হওয়ায় চিৎকার-চেঁচামেচি করে চারিদিক মাথায় তোলার দশা। মা-বাবা আপনজন কেউ-ই তার কান্না থামাতে পারছে না। স্থানীয় বাচ্চাটার সামান্য কিছু নিয়ে এমন মাত্রাতিরিক্ত কান্নায় বেমালুম থাকা একটা বিষয়ের দিকে আমার খেয়াল হলো ক্ষুধা-তৃষ্ণাসহ সীমাহীন কষ্ট ভোগ করে এই যে হাজার হাজার রোহিঙ্গা শিশুর দল আসছে, ওরা কিন্তু এমন কান্নাকাটি করছে না! আমরা শাহপরীর দ্বীপে দেখেছি, শত শত শিশু, কিন্তু সেই অনুপাতে তেমন শোরগোল নেই। বিষয়টি আগে লক্ষ করিনি। স্থানীয় ওই বাচ্চার গগনবিদারী চিৎকার শুনে অনুভব করলাম, হয়ত কাঁদতে কাঁদতে রোহিঙ্গা শিশুদের চোখের অশ্রু শুকিয়ে গেছে অথবা দয়াল রাহমানুররাহীম ওদের দুঃখের অনভূতিশক্তিই হ্রাস করে দিয়েছেন। এটাও আল্লাহর মেহেরবানী, নির্বাসিত রোহিঙ্গাদের অবুঝ লাখো শিশু যদি ঐ শিশুটার মতো চিৎকার কান্নাকাটি করত তাহলে রোহিঙ্গা নারী আর পুরুষদের জন্য সেটা হত অতিরিক্ত কষ্টের কারণ। শত কষ্টের মাঝেও আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তার বান্দার প্রতি এমন অনেক অনুগ্রহ দান করেন যা মানুষ অনুভবই করে না।

ট্রলার থেকে নেমে পায়ে হেঁটে অগ্রসর হলাম হারিয়াখালীর দিকে। এখান থেকে ছোট-বড় বিভিন্ন বাহনে করে টেকনাফ সদরে পৌঁছার ব্যবস্থা আছে। বড় রকমের হুজুম। ছোট রাস্তা, কিন্তু পথিকের সংখ্যা অগণিত। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ত্রাণ বিতরণ করতে আসা মানুষ আর শাহপরীর দ্বীপ হয়ে আগত রোহিঙ্গা মুহাজির সব মিলিয়ে জনজটের একরকম ত্রাহি অবস্থা। আমরা মুহাজিরদেরকে নিয়ে অটোরিক্সাযোগে টেকনাফের পথে রওয়ানা হলাম।

টেকনাফ পৌঁছেই প্রথমে গেলাম সেন্টমার্টিন পরিবহনের কাউন্টারে। ঘড়ির কাটায় তখন সাড়ে চারটা। সোয়া পাঁচটায় ছিল ঢাকার বাস এবং তখনো বেশ কয়েকটা সিট খালি ছিল। তাই কম ভাড়াতেই মিলল সিট। আসরের নামাজ পড়েই চেপে বসলাম বাসে। গোধুলি বেলার হলদে আভা ধীরে ধীরে ছেয়ে যাচ্ছিল পশ্চিমের আকাশ জুড়ে। আকাশের দিকে চোখ মেলে তাকাতেই উদাস হয়ে গেল মন। দুদিনের ক্ষণিক সান্নিধ্য এক অদ্ভূত মায়া ধরিয়ে দিয়েছে ভিটে-মাটি ছেড়ে আসা রোহিঙ্গা মানুষদের প্রতি। ভৌগলিকভাবে ভিনদেশী হলেও ঈমানী ভ্রাতৃত্বের বন্ধন হৃদয়ের আপন করে তুলেছে তাদেরকে। ছেড়ে যেতে তাই হৃদয়ে টান লাগছিল। মনে মনে সংকল্প করলাম, আবার ফিরে ফিরে আসব মমতার টানে নিপীড়িত স্বজনের এই জনপদে।

সৌজন্যে:
মাসিক রাহমানী পয়গাম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

December 2019
S S M T W T F
« Nov    
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031  
shares