বৃহস্পতিবার, ২৯শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৩শে জিলহজ্জ, ১৪৪১ হিজরী

মনীষীদের জীবনী ০৭ঃ শাহসূফী মুজাদ্দিদে যামান আবুবকর সিদ্দিকী (রহ.)

চৌদ্দশতকে উপমহাদেশে যে সমস্ত পীরে কামেলের পরিচয় আমরা পাই, ফুরফুরা শরীফের পীর হযরত মাওলানা আবু বকর সিদ্দিকী(রহ.) নিঃসন্দেহে তাঁদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। বর্তমান সময়ে ভারত উপমহাদেশে এত ব্যাপকভাবে গৃহীত আর কোন ব্যক্তি হতে পারেন নি। যার কারণে তিনি উভয় বাংলায় ‍মুসলমানতো বটেই হিন্দুদের মধ্যেও ব্যাপক সাড়া জাগাতে সক্ষম হন। সত্যি কথা বলতে কি এখনো পর্যন্ত তাঁর মুরীদগণ বাংলাদেশের আনাচে কানাচে ইসলাম প্রচারের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। এই সূফী শ্রেষ্ঠ ও ইসলাম প্রচারক আবু বকর সিদ্দিকী(রহ.) পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলার ফুরফুরায় ১২৫৩ বঙ্গাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। যেটা বর্তমানে ফুরফুরা শরীফ নামে পরিচিত। জন্মের মাত্র ৯ মাস পর তিনি পিতৃহারা হন। তাঁর পিতার নাম ছিল গোলাম মুকতাদীর। মাতা মুহব্বতুন্নিসা এতিম পুত্র আবু বকর সিদ্দিকী(রহ.) কে লালন পালন করেন এবং তাঁর সুশিক্ষার ব্যবস্থা করেন।

হযরত আবু বকর সিদ্দিকী(রহ.) ছাত্র হিসেবে অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। প্রথমে সিতাপুর মাদরাসা, পরবর্তীতে হুগলী মুহসিনিয়া মাদরাসায় পড়ালেখা করেন। কৃতিত্বের সাথে তিনি মুহসিনিয়া মাদরাসা থেকে তদানীন্তন মাদরাসা শিক্ষার সর্বোচ্চ ডিগ্রী জামাতে উলা পাশ করেন। পরে কলকাতা সিন্ধুরিয়া পট্টির মসজিদে হাদীস, তাফসীর ও ফিকাহ অধ্যয়ন করেন। মাওলনা বিলায়েত (রহ.) এর নিকট কলকাতা নাখোদা মসজিদে তিনি মানতিক হিকমা প্রভৃতি বিষয়ে অধ্যয়ন করেন। এরপর তিনি মদীনা শরীফে যান। সেখানে তিনি হাদীস ও হাদীস সম্বন্ধে গভীরভাবে অধ্যয়ন করেন। দেশে ফিরে তিনি একনাগাড়ে ১৮ বছর অধ্যয়ন অব্যাহত রাখেন। এমনকি নিরলস অধ্যবসায়ের মাধ্যমে তিনি ইসলাম ও অন্যান্য বিষয়ে প্রকৃত পান্ডিত্য অর্জন করেন এবং কুতুবুল ইরশাদ হযরত ফতেহ আলী(রহ.) এর নিকট বয়’আত হয়ে ইলমে তাসাওফের সকল তরীকার পূর্ণ কামিলিয়াত হাসিল করেন এবং খিলাফত লাভ করেন।

তিনি শরীয়তের একান্ত পাবন্দ একজন পীরে কামিল ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, শরীয়ত ব্যতীত মারিফত হয় না। এজন্যই বাংলা, আসামে তাঁর অগণিত মুরীদও একই পন্থা অবলম্বন করে জীবন যাপন করেন। তিনি এও বিশ্বাস করতেন যে, শুধু পীরের সন্তান হলেই পীর হওয়া যায় না। তিনি যে বংশের হউন না কেন যদি শরীয়ত মারিফত ইত্যাদিতে কামিল হন তবে তিনিই পীর হতে পারেন।

হযরত আবু বকর সিদ্দীক(রহ.) ছিলেন একজন সুবক্তা। যার কারণে তিনি বাংলা আসামের গ্রামে গ্রামে প্রতিটি অলিগলিতে ইসলামের সুমহান বাণী প্রচার করতে পেরেছিলেন। তিনি ক্ষেত্র বিশেষে কলমও ধরেছেন। তাঁর লেখা কাওলুল হক(উর্দূ) এবং অছীয়ৎনামা(বাংলা) প্রকাশিত হয়েছে। জানা যায় তিনি আল-আদিররাতুল-মুহাম্মদিয়া নামে আরবীতে একটি গ্রন্থ রচনা করেন, যেটি অপ্রকাশিত।

শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল খুবই উৎসাহব্যঞ্জক। তাঁর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ চেষ্টা এবং সহযোগিতায় অসংখ্য মক্তব মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। যে সময়ে ভারতীয় মুসলমানগণ ইংরেজী শিক্ষার প্রতি অনীহা পোষণ করতো তিনি ইংরেজী শিক্ষার জন্য এদেশের মুসলমানদের প্রতি জোর আহবান জানান। তিনি মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করার জন্য মাদরাসার পাঠ্য তালিকার সংস্কারের জন্য দাবী জানান। তিনি পর্দার সাথে নারীদের শিক্ষা জরুরী বলেও মত প্রকাশ করেন। এমনকি নারীদের জন্য পৃথক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জন্যও তিনি উপদেশ দেন। একটি তথ্য অনুযায়ী তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে ৮০০ মাদরাসা ও ১১০০ মসজিদ স্থাপন করেন। ১৯২৮ সালে কলিকাতা আলীয়া মাদরাসার যে প্রথম গভর্নিং বডি গঠিত হয় তিনি তার সদস্য নির্বাচিত হন।

তিনি ইসলামী সমাজ হতে শিরক বিদআত ও অনৈসলামিক কার্যকলাপ উচ্ছেদের চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। এজন্য ১৯১১ সালে তাঁরই পৃষ্ঠপোষকতায় ‘আঞ্জুমানে ওয়াজীন’ নামে একটি সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয়। যার কাজ ছিল মুসলিম সমাজ হতে কুসংস্কার দূর করার জন্য ওয়াজের ব্যবস্থা করা, খৃস্টান মিশনারীদের অপপ্রচারের জবাব দেওয়া এবং অমুসলিমদের মধ্যে ইসলাম প্রচার করা।

তিনি যমিয়তে উলামায়ে হিন্দ-এর বাংলা আসামের সভাপতিও ছিলেন। এ সময়ে তিনি আযাদী আন্দোলনে যোগ দেন। ইসলামী রাজনীতির ব্যাপারে তিনি পরিষ্কার বলেছেন, “রাজনীতির ক্ষেত্র হইতে আলেমদিগকে সরিয়া পড়িবার জন্য আজ মুসলিম সমাজে নানাবিধ অন্যায় ও বে-শরা কাজ হইতেছে।” পরে ‘জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলা আসাম’ গঠন করেন।

১৯৩৮ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে তিনি তাঁর মুরিদান ও সাধারণ মুসলমানদের মুসলিম লীগ প্রার্থীকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করার আহবান জানান।

তিনি তৎকালীন সময়ে প্রকাশিত মুসলমানদের পত্র-পত্রিকাগুলোকেও সহযোগিতা প্রদান করেন। তাঁর সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতায় যে সমস্ত পত্রিকা প্রকাশ হয় তা হল-সাপ্তাহিক মিহির ও সুধাকর, মাসিক নবনূর, সাপ্তাহিক মোহাম্মদী, সাপ্তাহিক সোলতান, সাপ্তাহিক মুসলিম হিতৈষী, মাসিক ইসলাম দর্শন, সাপ্তাহিক হানাফী, মাসিক শরিয়তে ইসলাম প্র্রভৃতি।

বাংলা চতুর্দশ শতাব্দীর নকীব, সমাজ সংস্কারক, ইসলাম প্রচারক, মুজাদ্দিদ, অলিয়ে কামিল এদেশের মুসলমানদের নয়নের মণি হযরত মওলানা আবু বকর সিদ্দিকী(রহ.) দীর্ঘদিন রোগে ভোগার পর ১৩৪৫ বাংলা সনের ৩ চৈত্র মোতাবিক ১৯৩৯ সালের ১৭ মার্চ শুক্রবার সকালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ফুরফুরা শরীফের মিয়া পাড়া মহল্লায় তাঁকে দাফন করা হয়। প্রতিবছর ফাল্গুন মাসের ২১, ২২ ও ২৩ তারিখ এখানে এছালে সওয়াব অনুষ্ঠিত হয়। তাঁর খলীফাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন-মওলনা রুহুল আমীন, শর্ষিণার পীর মওলানা নেছারুদ্দীন, মওলানা আহমদ আলী এনায়েতপুরী(যশোর), মওলানা আবদুল খালেক, মওলানা সদরুদ্দীন, ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, মওলানা হাতেম আলী, দ্বারিয়াপুরের পীর মওলানা শাহ সূফী তোয়াজউদ্দীন আহমদ(রহ.) প্রমুখ।

Series Navigation<< মনীষীদের জীবনী ০৮ঃ হযরত মাওলানা শাহ মোহাম্মদ আবদুলকরীম (রহ.)মনীষীদের জীবনী ০৬ঃ মহাকবি আলাওল >>

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Archives

August 2020
S S M T W T F
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031  
shares