শনিবার, ২৪শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১৮ই জিলহজ্জ, ১৪৪১ হিজরী

নওমুসলিমদের সাক্ষাৎকার [পর্ব-১৬] :: মুহাম্মদ আকবর (জতিন্দ্র কুমার)-এর সাক্ষাৎকার


আমার আবার পয়গাম কী! আমি তো ছোট ভাই। আমার তো এখনও পর্যন্ত নিজের ঈমানের ব্যাপারেই সন্দেহ কাটেনি। হ্যাঁ, এতটুকু অবশ্যই বলবো, প্রত্যেকেরই নিজ নিজ এলাকার অমুসলমানদের কথা ভাবতে হবে। অন্যথায় হাশরের মাঠে আল্লাহ তায়ালা অবশ্যই ধরবেন। এ কথা ভাবার সুযোগ নেই, এখানে কে ইসলাম গ্রহণ করবে? চারদিকে মানুষ ইসলাম গ্রহণ করছে। আমার খান্দানের জন্য দুআ করবেন। বিশেষ করে আমার জন্য, আমার ঈমান যেন দুর্বল হয়ে না পড়ে। আল্লাহ তায়ালা যেন আমাকে ঈমানের উপর অটল রাখেন।


আহমদ আওয়াহ: আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু!
মুহাম্মদ আকবর: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ!

আহমদ আওয়াহ: আকবর ভাই! আমি হযরতের ছেলে, আমার নাম আহমদ। আমাদের এখান থেকে প্রতি মাসে আরমুগান নামে একটি উর্দূ পত্রিকা বের হয়। তাতে নওমুসলিমদের ঘটনা ছাপা হয়। এসব ঘটনা পড়ে আমাদের মুসলমান ভাইদের মধ্যে যেমন চিন্তার সৃষ্টি হয়, ঠিক তেমনিভাবে যারা অমুসলমান তাদের মধ্যেও ইসলামের দিকে আসার একটা পথ তৈরি হয়। আমাকে আব্বু আপনার কাছে পাঠিয়েছেন একটা ইন্টারভিউ নেয়ার জন্য। আপনার পক্ষে কি কথা বলা সম্ভব?
মুহাম্মদ আকবর: ভাই আহমদ! আপনি সম্ভবত মাওলানা সাহেব। আমাকে মাফ করবেন। প্রথম কথা হলো, মাত্র কয়েকদিন আগে আমি মুসলমান হয়েছি। আমি যে একজন মুসলমান এ বিষয়ে আমার নিজের সন্দেহই এখনও কাটেনি। দ্বিতীয় কথা হলো, আমি আমাকে পরিপূর্ণভাবে হযরতের হাতে সঁপে দিয়েছি। দশদিন ফুলাতে থাকার পর আল্লাহ তায়ালার অনুগ্রহে গতকাল হযরতে সাথে সাক্ষাত হয়েছিল। হযরত আমাকে বলেছিলেন, প্রথমেই জামাতে যেতে হবে। এর আগে কিচ্ছু চিন্তা-ভাবনা করার সুযোগ নেই। আমি এখন হযরতের নির্দেশেই চলবো। প্রথমে জামাতে যাবো। আশা করি এর মাধ্যমে আমার ভেতর হয়তো সামান্য ইসলাম আসতে পারে। হয়তো ঈমানও কিছুটা তাজা হবে। জামাত থেকে আসার পর আমাকে প্রশ্ন করুন।

নওমুসলিমদের সহযোগিতার জন্য এগিয়ে আসুন

আহমদ আওয়াহ: না, না আকবর ভাই! আমি তো আপনাকে চিনিও না। আব্বুই আমাকে পাঠিয়েছেন। আমি আপনার সাথে মিথ্যা বলছি না।
মুহাম্মদ আকবর: না আহমদ ভাই! আমাকে ক্ষমা করুন। হযরত যদি আমাকে আদেশ করেন তাহলেই কেবল আমি আপনার সাথে কথা বলতে রাজি আছি। অন্যথায় নয়।

আহমদ আওয়াহ: আচ্ছা, আব্বুর সাথে আপনাকে ফোনে আলাপ করিয়ে দিই?
মুহাম্মদ আকবর: জী, ফোনে অনুমতি এনে দিন, তারপর কথা বলবো। (অনেকক্ষণ চেষ্টা করেও ফোনে হযরতকে পাওয়া গেল না।)

আহমদ আওয়াহ: তাহলে কী মাওলানা ওয়াসির সাথে কথা বলিয়ে দেব? তার কথা বিশ্বাস করবেন তো?
মুহাম্মদ আকবর: হ্যাঁ! তিনিই আমাকে হযরতের সাথে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। অন্তত তার সাথে হলেও কথা বলিয়ে দিন। (ফোনে মাওলানা সাহেবকে পাওয়া গেল। তিনি মুহাম্মদ আকবরকে বললেন, হযরতের সাথে কথা হয়েছে। হযরতই মাওলানা আহমদকে পাঠিয়েছেন। আপনি তাকে ইন্টারভিউ দিন। দায়-দায়িত্ব আমার।) হ্যাঁ, এবার বলুন!

আহমদ আওয়াহ: প্রথমেই আপনার পারিবারিক পরিচয় বলুন।
মুহাম্মদ আকবর: আমার পারিবারিক নাম ছিল যতীন্দ্রকুমার। আমি লাখনৌ নিকটবর্তী হারদুই জেলার একটি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছি। আজ থেকে ২২ বছর আগে। আমার বাবা কৃষক ছিলেন। প্রাথমিক লেখাপড়া গ্রামের স্কুলে হয়েছে। ইন্টার কমপ্লিট করার আগেই লেখাপড়া ছেড়ে দিয়েছি। আমার ভাইবোনসহ আমাদের বিশাল পরিবার।

আহমদ আওয়াহ: আপনার ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে বিস্তারিত বলবেন কি?
মুহাম্মদ আকবর: আমাদের গ্রামে এবং পুরো এলাকায় মুসলমানদের সংখ্যা অনেক তবে নামে মুসলমান। বেদআতীর সংখ্যাই বেশি। তবে কোনো কোনো মসজিদে তাবলীগের কাজ হয়। সেখানকার মসজিদে যখন নামায হতো তখন আমি মসজিদের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ সময় কুরআন পাঠ শুনতাম। সকালে যখন আমি ঘরে যেতাম তখন ইমাম সাহেব নামায পড়াতেন। ইমাম সাহেবের আওয়াজ ছিল খুবই চমৎকার, তার তেলাওয়াত আমার অন্তরকে স্পর্শ করতো। বহুবার তার তেলাওয়াত শুনে আমার চোখ থেকে অশ্র“ প্রবাহিত হয়েছে। মনে হতো কে যেন আমার অন্তর থেকে বলছে এই কালাম সত্য। মানুষের অন্তরে কত সুন্দর প্রভাব ফেলে। আরো ভাবতাম যারা এর মর্ম বুঝে তারা না জানি এর দ্বারা আরও কত গভীরভাবে প্রভাবিত। আমাদের মসজিদে জামাতের লোকেরা গাশত করতো। একদিন গাশত অবস্থায় হাফেয সাহেবের সাথে আমার দেখা হলো। আমি বললাম হুযুর! জামাতের কাজ তো খুবই পুরনো। এটা নিশ্চয়ই হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে চলে আসছে। আচ্ছা, তিনি কি মানুষ বুঝে দাওয়াত দিতেন? যারা কেবল মুসলমান তাদেরই কেবল দাওয়াত দেবে অন্য ধর্মের হলে তাদের দাওয়াত দেয়া যাবে না, এটা তিনি বলেছেন? আমি আমার মুসলমান বন্ধুদের কাছে শুনেছি, তিনি যখন দাওয়াতের কাজ করতেন তখন কোনো মুসলমানই ছিল না। তাহলে তো হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইহুদী, খ্রষ্টানদেরও ধর্মের দাওয়াত দিতেন। আপনারা কেন হিন্দুদের মসজিদে ডাকেন না? ইসলাম সম্পর্কে তাদের বুঝান না কেন?

আমি প্রতিদিন কুরআন তেলাওয়াত শুনি এবং এর ভালোবাসায় পাগলের মতো হয়ে যাচ্ছি। না জেনে বুঝে আমি এর দ্বারা এত প্রভাবিত হই এত আনন্দ বোধ করি তাহলে এর মানে বুঝলে না জানি কত স্বাদ পাব! হাফেয সাহেব বললেন, আসলে আমরা মুসলমানরাই এখন বিকৃতির শিকার। আমাদের জীবন নষ্ট হয়ে পড়েছে। আমরা তাই প্রথমে মুসলমানদের অবস্থার সংস্কার চাচ্ছি। আমাদের বড়দের পক্ষ থেকে আপনাদের দাওয়াত দেয়ার অনুমতি নেই। তবে ভারতের বাইরে যারা তাবলীগের কাজ করছে তারা অমুসলিমদেরও দাওয়াত দিচ্ছে। আমি তাকে বললাম, তাবলীগের কাজ তো চলছে আমাদের দেশ নিযামুদ্দীন মারকাযে থেকে, অথচ আমাদের দেশের অমুসলিমরা এ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আর অন্য দেশের লোকেরা উপকৃত হচ্ছে। আপনারা যখন মারা যাবেন তখন কি প্রশ্ন করা হবে, বড়দের কথা কেন মাননি? প্রশ্ন তো হবে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পদ্ধতিতে কেন দাওয়াত দাওনি।

আহমদ আওয়াহ: আপনি এটা কী করে জানলেন হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাওয়াতের কাজ করেছেন এবং তাঁর সময়ে কোনো মুসলমান ছিল না? আর নিযামুদ্দীন মারকায থেকেই যে এর নবসূচনা এটাই বা বললো কে?
মুহাম্মদ আকবর: আমাদের ঘরের পাশেই মসজিদ। সেখানে তাবলীগের কাজকর্ম হতো। আমাদের প্রতিবেশিদের অনেকেই এর সাথে স¤পৃক্ত ছিল। সাদ্দাম নামে আমার এক বাল্যবন্ধু ছিল। আমি তাকে সবসময় ইসলাম এবং তাবলীগ জামাত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতাম। সে উত্তর দিতে না পারলে আমাকে হাফেয সাহেবের কাছে নিয়ে যেত।

আহমদ আওয়াহ: হাফেয সাহেব কি আপনার সব প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারতেন?
মুহাম্মদ আকবর: না, তিনি আমার সব প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারতেন না বরং তার উত্তর শুনে আমার মনের ভেতর প্রশ্নগুলো আরো বেড়ে যেত। আমার বন্ধু সাদ্দাম একবার দেখলাম গাশত করছে। আমি তাকে ধরে তাদের আমীর সাহেবের কাছে গেলাম। তারপর বললাম, আপনারা শুধু চেহারা দেখেই মুসলমানদের দাওয়াত দেন কেন? আমীর সাহেব বললেন, আমাদের মুসলমানদের অবস্থাই তো এখন ভয়াবহ। আমরা প্রথমে তাদের অবস্থা সংশোধনের চেষ্টা করছি।
আমি বললাম মৃত্যুর পর যখন আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে তখন আমরা আল্লাহকে বলবো- মালিক! আপনি হয়তো আমাদের আপনার প্রিয় নবীর জামানায় প্রেরণ করতেন অন্যথায় আমাদের এই সঙ্গীদের পাকড়াও করুন। এই সাদ্দাম এবং জামাতের লোকেরা আমাদের সাথেই বসবাস করে। আমাদের এলাকায় তাবলীগের কাজ করে। আপনি যখন আমাদের দ্বীনের কথা বলা ও শোনার জন্য কোনো ব্যবস্থাই করেননি তখন আমরা দ্বীন পাবো কোথায়? আমার বিশ্বাস, আপনারা হয় আমাদের ইসলামের কথা বলুন। নয়তো আমাদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলার দরবারে আপনারাই পাকড়াও হবেন।
আমীর সাহেব মাওলানা ছিলেন। তিনি বললেন, এই কাজের জন্য আমাদের একটি জামাত রয়েছে। আপনি সুযোগ করে একবার ফুলাত চলে যান। এই জেলারই একজন সন্তান মাওলানা ওয়াসী সাহেব ওখানে থাকেন। ওখানকার মাদ্রাসায় গিয়ে তার সাথে দেখা করুন। তিনি আপনাকে মাওলানা কালিম সাহেবের সাথে সাক্ষতের ব্যবস্থা করে দেবেন। আমি তার কাছ থেকে ঠিকানা নিলাম। পরের দিন পিতা মাতার কাছে জামাতে যাবার অনুমতি নিয়ে ফুলাত চলে এলাম।

আহমদ আওয়াহ: আপনার মাতা-পিতা কি জানতেন আপনি মুসলমান হওয়ার জন্য যাচ্ছেন?
মুহাম্মদ আকবর: না, আসলে তারা জামাত কী তাও জানতেন না। তবে এতটুকু বুঝতেন এটা একটা ভালো কাজ। এরা মুসলমানদের নামাযের দাওয়াত দেয়।

আহমদ আওয়াহ: তারপর কী হলো?
মুহাম্মদ আকবর: আমি ফুলাত চলে গেলাম, মাওলানা ওয়াসি সাহেবের সাথে দেখা হলো। তিনি আমাকে ‘আপকি আমানত’ বইটি দিলেন। আমি একে একে চারবার পড়লাম বইটি। ঘটনাক্রমে সেদিন হযরত মাওলানা কালিম সাহেব সন্ধ্যায় তাশরিফ আনলেন। তিনি আমাকে কালেমা পড়ালেন। তারপর কারী সাহেবকে ডেকে বললেন, একে নামায শিখিয়ে দাও। আমি কারী সাহেবের কাছে নামায ইত্যাদি শিখতে লাগলাম। আলহামদুলিল্লাহ! পনের দিনে নামায শিখলাম এবং কায়দা পড়ে ফেললাম। হযরত সবসময় সফরে থাকেন। যার কারণে তার সাথে মনে চাইলেও সাক্ষাত করা সম্ভব হয় না।

আমার ধারণা ফুলাত যারা থাকেন তারা সকলেই তাঁর সাক্ষাতের জন্য আকুল থাকেন। খানকায় যারা আছে সকলের অবস্থা আমি এমনই দেখেছি। কতদূর এলাকা থেকে সফর করে আসে। অনেক অনেক বাঁধার সম্মুখীন হয়ে মার খেয়ে আসে। কিন্তু হযরতের সান্নিধ্যে এলে মনে হয় যেন প্রচন্ড তাপ থেকে ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছে। কয়েক মাস পরও যদি একবার দেখা হয়, অন্তরের সমস্ত কষ্ট নিমেষে দূর হয়ে যায়। এখানকার প্রত্যেকেই মনে করে হযরত আমাকে সবচে’ বেশি ভালোবাসেন। দুই সপ্তাহ পর হযরত ফুলাত এসেছেন। একজন একজন করে ডেকে পাঠিয়েছেন। সকলের কথা শুনছেন, কোলাকুলি করছেন, আমিও সাক্ষাত করেছি। আমার জামাতে যাওয়ার প্রোগ্রাম হয়েছে।
আজ সকালে আইনী কাগজপত্র তৈরি করছি। উকিল আমাকে নাম জিজ্ঞেস করলে বললাম, হযরত তো বলেছেন নাম পরিবর্তন করা জরুরী নয়। আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সকলের নাম বদলাতেন না। তবে তুমি যদি চাও তোমার নাম পছন্দমতো রেখে দিতে পারো। আমি উকিল সাহেবকে বললাম আযানে উচ্চারিত, আল্লাহু আকবার শব্দটি আমার খুব ভালো লাগে। মুহাম্মদ আকবর কি কারও নাম হয়? উকিল সাহেব বললেন, হ্যাঁ, মুসলমানগণ তো মুহাম্মদ আকবর নাম রাখে। তাছাড়া বাদশাহ আকবরের নাম নিশ্চয়ই আপনি শুনে থাকবেন। আমি বললাম, তাহলে এটাই থাক। আযান থেকেই আমার নাম হয়ে যাক। মুয়াজ্জিন যখন নামাযের জন্য মানুষকে ডাকে তখন সে দাওয়াতে আমার নামটাও উচ্চারিত হবে। আপনি আমার নাম মুহাম্মদ আকবর লিখে দিন।

আহমদ আওয়াহ: এখানে আসার পর বাড়িতে আর ফোন করছেন?
মুহাম্মদ আকবর: আসলে হযরত আমাকে ফোন করে মাকে সান্তনা দিতে বলেছিলেন। কিন্তু আমি ভাবলাম এখনও আমার ঈমান দুর্বল। আমি আমার মাকে খুব ভালোবাসি। ভয় করছি এখন কথা বলতে গেলে তিনি কান্নাকাটি শুরু করেন তাহলে আমার অন্তর গলে যাবে। মায়ের কাছে যাওয়ার জন্য পাগল হয়ে উঠবে। আর সেখানে গেলে আমার ঈমান বিপদে পড়ে যাবে। এজন্য বারবার বিপদে পড়া সত্ত্বেও আমি মাকে ফোন করিনি। প্রথমে জামাতে যাবো। সেখান থেকে ফিরে এসে বাড়িতে যাবো। তারপর পরিবারের সবাইকে দ্বীনের দাওয়াত দিব।

আহমদ আওয়াহ: আপনার কি মনে হচ্ছে তারা আপনার বিরোধিতা করবে এবং আপনাকে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে?
মুহাম্মদ আকবর: তেমন আশংকা করছি না। কেননা, আমার পরিবারের লোকেরা খুবই অমায়িক। ইসলামের সাথে তাদের একটা আন্তরিকতার সম্পর্ক রয়েছে। তাছাড়া প্রথমেই আমি তাদের হযরতের কিতাব ‘আপকি আমানত’ পড়তে দিব। আমি বাড়ি ফেরার পর এই কিতাব এক হাজার কপি ছাপাবো। এই কিতাব মানুষের চিন্তা এবং অন্তরকে এমন নিঁখাদ ভালোবাসার সাথে স্পর্শ করে যদি সত্যমনে কোনো মানুষ এটা পড়ে তাহলে ইসলামের দাওয়াত উপেক্ষা করতে পারবেনা বরং ইসলামের ছায়ায় চলে আসবে। যদি বিরোধিতা হয় হবে। কারী সাহেব আমাকে সাহাবায়ে কেরামের ঘটনাবলী পড়ে শুনিয়েছেন। আমি নিজে হিন্দিতে ফাযায়েলে আমাল পড়েছি। সাহাবাযে কেরাম যখন কুরবানী দিয়েছেন তখন আমরাও দেব। এ পথে যদি জীবন চলে যায় কোনো পরোয়া নেই। মূল্যহীন পথে জীবন দেয়ার চাইতে এমন মূল্যবান পথে জীবন দেয়া শ্রেয়। বেহেশতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে প্রিয়তম নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উদ্দেশ্যে জীবন দেয়ায় ব্যর্থতার কিছু নেই। আমি আমার অন্তরকে বারবার পরীক্ষা করে দেখেছি, আমার অন্তর আমাকে একথাই বলেছে, আকবর! আল্লাহর ভালোবাসায় দাওয়াতের পথে আল্লাহর বান্দাদের দোযখ থেকে উদ্ধার করতে গিয়ে জীবন দান করা এমনি মরে যাওয়ার চে’ অনেক উত্তম এবং সুখকর।

আহমদ আওয়াহ: মাশাআল্লাহ! আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে এই আবেগ দান করুন।
মুহাম্মদ আকবর: মাওলানা আহমদ সাহেব! আসল কথা হলো, আমরাই ভয় করছি। নইলে পৃথিবী এখন তৃষ্ণার্ত। আমাদের এলাকায় হযরত মাওলানাকে জানেন এমন দুই তিনজন লোকে আছেন। অথচ তাদের হাতে গত বছর আমাদের এলাকায় অন্তত পঁচিশজন মুসলমান হয়েছে। আরও শত-শত অপেক্ষায় আছে। এরা মন থেকে প্রস্তুত। কিন্তু যারা কালেমা পড়াবে তাদের ভেতরে ভয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তারা ফুলাত যাওয়ার কথা বলেন। এদিকে আমাদের এলাকার মুসলমানদের মধ্যে অধিকাংশই বেদআতী এবং কবরপূজারী। এরা নামাযও পড়ে না।

আহমদ আওয়াহ: বেদআত একটি খারাপ কাজ এটা আপনাকে বললো কে?
মুহাম্মদ আকবর: এটা মানুষের স্বাভাবিক বিবেক থেকেও বোঝা যায়। আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে পূজা করা যাবে না। এই তো ইসলাম। সুতরাং কবরকে পূজা করার কথা কিভাবে ভাবা যায়? আমি তো বেদআতী মুসলমানদের বলতাম, তোমাদের আর আমাদের মধ্যে আর কতটুকু পার্থক্য? তোমাদের তুলনায় আমরা অনেকটা ভালো। আমরা যাদের পূজা করি তারা অন্তত আমাদের সামনে থাকে এবং আমাদের দেখতে পায়। আর তোমরা যে এই কবরের পূজা করছো। তোমাদের হয়তো জানাই নেই এটা কার কবর। মানুষের কবর না ঘোড়ার কবর?

লাখনৌ ঘোড়াশাহ নামে এক পীর ছিলেন। বহুদিন পর্যন্ত তার নামে ওরশ হতো। পরে জানা গেল, এটা কোনো এক নবাবের ঘোড়ার কবর। সুতরাং তোমাদের চেয়ে আমরা ভালো। অথচ মূর্তিপূজা যে ঠিক নয় এটা আমরাও বুঝি। নিজের হাতেই তৈরি একটা বস্তুকে পূজা করার কী মানে আছে? মূর্তি যদি আমাদের পূজা করতো তাও একটা যুক্তি ছিল। সৃষ্টিকর্তার পূজা করা অযৌক্তিক কিছু নয়। ইসলাম গ্রহণের আগেও আমি আমার হিন্দু ভাইদের বলতাম- যে ভগবান লজ্জাস্থানের পূজা করতে বলে সে আবার ভগবান হলো কী করে? আসলে মানুষের বিবেক মাঝেমাঝে লোপ পেয়ে যায় নতুবা কেউ চাইলে নিজের বিবেক দ্বারাও এসব বুঝতে পারে।

আহমদ আওয়াহ: ইসলাম গ্রহণ করার পর আপনার কেমন অনুভূতি হচ্ছে? তাছাড়া ইসলামের কোনো বিষয়টি আপনার ভালো লেগেছে?
মুহাম্মদ আকবর: খুব ভালো লাগছে। ইসলামে এমন কোনো বিষয় আছে কি যা ভালো লাগবার মতো নয়? ইসলামের প্রতিটি বিষয় এমন কি আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতিটি সুন্নাতই এমন, যদি কোনো ব্যক্তি একটু ভাবে তাহলে মুসলমান হয়ে যেতে পারে। সবচে’ বড় কথা হলো ইসলাম পুরো জীবনের একটি পরিপূর্ণ নমুনা। এমন নয় ধর্ম থাকবে মন্দিরে আর ব্যবসা-বাণিজ্য, লেন-দেন, পরিবার সমাজ সবকিছু চলবে মনমত। বরং ইসলাম মানব জাতিকে পরিপূর্ণ জীবনের পথ বলে দিয়েছে। আর সে পথ এতোটাই আকর্ষণীয় যে, কোনো মানুষ যদি গভীরভাবে এসব নিয়ে ভাবে তাহলে এর জন্য সে পাগল হয়ে যাবে।

আহমদ আওয়াহ: মাশাআল্লাহ! আল্লাহ তায়ালা আপনার সামনে হেদায়াতের পথ খুলে দিয়েছেন। এবার বলুন, জামাত থেকে ফিরে কী কর্মসূচি?
মুহাম্মদ আকবর: জামাত থেকে ফিরে প্রথমে বাড়ি যাবো। পরিবারের লোকজনের সাথে দাওয়াতের কাজ করবো। আমার ইচ্ছা মুসলমানদের মাঝেও কাজ করবো। বিশেষ করে বেদআতী মুসলমানদের ভেতর কাজ করার ইচ্ছা আছে। আমাদের এলাকায় প্রচুর সরল ও ভালো মানুষ আছে। দু-চারজন যদি নিজেদের এ পথে বিলিয়ে দিতে পারে তাহলে পুরো এলাকা দোযখ থেকে মুক্তি পেতে পারে। কিছুদিন আগে আমাদের এলাকায় এক হিন্দু লালাজি মুসলমান হয়েছেন। এই লালাজিই রাম মন্দির নির্মাণ এবং বাবরি মসজিদ শহীদ করার জন্য পঁচিশ লাখ রুপি নিজের পকেট থেকে খরচ করেছেন। তার প্রতি আল্লাহ তাআলার দয়া হয়েছে। হয়তো মালিককে খুশি করার জন্যই তিনি রামমন্দির নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন। তার প্রতি মালিকের মমতা হয়েছে। তার একজন যুবক পুত্র এক্সিডেন্টে মারা গেছে। তার দোকানে আগুন লেগেছে। নিজেও অসুস্থ হয়ে পড়েছে।

আহমদ আওয়াহ: আপনি এটাকেই আল্লাহ তায়ালার মমতা বলছেন?
মুহাম্মদ আকবর: মাওলানা আহমদ সাহেব! আমি এগুলোকেই আল্লাহ তাআলার মমতা বলছি। কারণ, এসব দুর্ঘটনায় পড়ার পর তার মনে হয়েছে, আমি কোনো ভুল করেছি। অবশেষে তার চিন্তায় এসেছে, আমি মালিকের ঘর ভেঙ্গে দিয়েছি। তারপর সে ইসলাম সম্পর্কে পড়তে শুরু করেছে। এক পর্যায়ে এসে যখন মুসলমান হতে চাইলো তখন মানুষ ভয়ে তার সাথে দেখা করতো না। তাকে কেউ কালেমা পড়াতেও প্রস্তত হচ্ছিল না। অবশেষে মাওলানা কালিম সিদ্দীকি এক ব্যক্তিকে পাঠিয়ে দেন। সেই ব্যক্তি গিয়ে তাকে কালেমা পড়ান। লালাজি এখন একটি মসজিদ বানাচ্ছেন। সাথে একটি মাদরাসা। দেখুন, এক পুত্র কিছু সম্পদ এবং স্বীয় স্বাস্থ্যের পতন তার হেদায়েতের উপলক্ষ হয়েছে। এটা আল্লাহর করুণা নয় তো কী?

আহমদ আওয়াহ: আপনি সত্যই বলেছেন।
মুহাম্মদ আকবর: আমাকে কয়েকজন মুসলমান ভাই বলেছেন, ঘরবাড়ি ছেড়ে তুমি কোথায় যাচ্ছ, কেন যাচ্ছ? আমি বলেছি ধোঁকার ঘর ছেড়ে চিরস্থায়ী ঘর বেহেশতের মহল খরিদ করার জন্য যাচ্ছি। আমি যদি বাড়িঘর না ছাড়তাম তাহলে হয়তো আমার ঈমান নসীব হতো না। সুতরাং এই যে আমার ঘরবাড়ি ত্যাগ করা এটা কি আল্লাহ তায়ালার করুণা ও তার মমতা নয়?

আহমদ আওয়াহ: নিঃসন্দেহে। জাযাকাল্লাহু! মুসলমানদের উদ্দেশ্যে আপনার কোনো পয়গাম?
মুহাম্মদ আকবর: আমার আবার পয়গাম কী? আমি তো ছোট ভাই। আমার তো এখনও পর্যন্ত নিজের ঈমানের ব্যাপারেই সন্দেহ কাটেনি। হ্যাঁ, এতটুকু অবশ্যই বলবো, প্রত্যেকেরই নিজ নিজ এলাকার অমুসলমানদের কথা ভাবতে হবে। অন্যথায় হাশরের মাঠে আল্লাহ তায়ালা অবশ্যই ধরবেন। এ কথা ভাবার সুযোগ নেই, এখানে কে ইসলাম গ্রহণ করবে? চারদিকে মানুষ ইসলাম গ্রহণ করছে। আমার খান্দানের জন্য দুআ করবেন। বিশেষ করে আমার জন্য, আমার ঈমান যেন দুর্বল হয়ে না পড়ে। আল্লাহ তায়ালা যেন আমাকে ঈমানের উপর অটল রাখেন।

আহমদ আওয়াহ: আপনাকে অনেক অনেক শুকরিয়া আকবর ভাই। আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু!
মুহাম্মদ আকবর: আপনাকেও, ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু!

সাক্ষাৎকার গ্রহণে
মাও. আহমদ আওয়াহ নদভী
মাসিক আরমুগান, মে ২০০৯

Series Navigation<< নওমুসলিমদের সাক্ষাৎকার [পর্ব-২০] :: মুহতারামা খাইরুন নিসা (শালিনী দেবী)-এর সাক্ষাৎকার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Archives

August 2020
S S M T W T F
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031  
shares