বুধবার, ১০ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১০ই রবিউস সানি, ১৪৪২ হিজরি

আঁধার থেকে আঁধারে : সুপ্রভাতের সন্ধানে !!

Related image

আনাস বিন ইউসুফঃ চার বছর আগের কথা ৷ ৬ ই মে’র সেই ভয়ংকর কালরাত ৷ রাজপথে উপস্থিত লক্ষ লক্ষ নিরপরাধ আলেমের উপর নেমে এলো এক ঘোর অমানিষা ৷ রাস্তার বাতিগুলো নিভিয়ে দেয়া হল ৷ চারদিক অন্ধকার ৷ মৃত্যুপুরী হতে চলেছে শাপলার আশপাশ ৷ রাতের অন্ধকারে ভয়ংকর এক তান্ডবলীলায় মেতে উঠলো একদল কাপুরুষ ৷ অস্ত্রশস্ত্রে ঝাপিয়ে পড়লো ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের উপর ৷ বন্দুক-বুলেট, সাউন্ড গ্রেনেড, জলকামান আর টিয়াসেলের সামনে অসম লড়াইয়ে অবতীর্ণ হল গ্রাম থেকে আগত লোকগুলো ৷ যাদের অনেকেই জানে না, লড়াই কী ! প্রতিরক্ষা কী !

মতিঝিলের অলি-গলি অতিক্রম করে ধর্মপ্রাণ মানুষগুলো পালায়নপর দৌড়ে ছুটলো শুধুমাত্র বাঁচবার আশায় ৷ দূরদূরান্তে দেখা যাচ্ছে খন্ড খন্ড অগ্নিচিত্র ৷ বাতাসের সাথে কানে ভেসে আসছে রাষ্ট্রযন্ত্রের নগ্ন তান্ডবলীলার নির্দয় শব্দমালা ৷ সাথে নিরিহ মানুষের আর্তচিৎকার ৷ এক সময় মনে হচ্ছিল, জীবন মৃত্যুর মধ্যখানে দাঁড়িয়ে আছি আমি ৷ বাঁচতে হলে এখন আমাকে লড়াই করতে হবে ৷ নতুবা পরাজিত আত্মসমর্পনের বিকল্প কোন পথ খোলা নেই সামনে ৷

“আক্রমনই সর্বোত্তম প্রতিরক্ষা” এই নীতি অবলম্বন করে কিছু সময় লড়াই চালিয়ে গেলাম ৷ কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের মত দিকবেদিক ছুটোছুটি, কখনো গলা ফাটিয়ে স্লোগান, আর কখনো রাস্তায় পড়ে থাকা কগজগুলো একত্রিত করে আগুন জ্বালানো- এই ছিল আমাদের লড়াই ৷ প্রতিরক্ষার ব্যর্থ প্রচেষ্টা ৷
অত্যাধুনিক সমরাস্ত্রে সুসজ্জিত রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সাথে আমাদের অসম লড়াইয়ের স্থায়িত্ব বেশিক্ষণ টেকে নি ৷ এক পর্যায়ে থেমে গেলাম ৷ থেমে যেতে বাধ্য হলাম ৷

“আবার আসিবো ফিরে” প্রত্যয় নিয়ে ত্যাগ করলাম অঘোষিত সেই রণক্ষেত্র ৷ হাজার হাজার ভাইদেরকে অস্ত্র আর বুলেটের মুখে রেখেই ফিরে এলাম ৷ মনকে শান্ত্বনা দিলাম “একদিন সব খুনের বদলা নিবো, প্রতিটি রক্ত ফোঁটার পাই টু পাই হিসাব নিবো” এই বলে ৷

অতঃপর ভয়-উৎকন্ঠা জয় করে জীবনটা হাতে নিয়েই ছুটে চললাম আপন গন্তব্যে ৷ রাতের সে আঁধারেই খুঁজে নিতে হয়ছিল আমাদেরকে প্রভাতের প্রত্যয়ী পথচলা ৷
.
আমি ১৯৭১ সাল দেখি নি ৷ দেখি নি ২৫ মার্চের সেই ভয়ংকর কালরাত ৷ ইতিহাস থেকে জেনেছি, সেদিন রাতের আঁধারেই নিরিহ নিরস্ত্র বাঙালীর উপর ঝাপিয়ে পড়েছিল একদল হায়েনা ৷ সংখ্যায় অধিক হওয়া সত্ত্বেও মজলুম বাঙালীরা তাৎক্ষণিক কোন প্রতিরোধ তৈরি করতে পারে নি ৷ ফলে অসংখ্য মানুষ প্রাণ দিয়েছে ৷ আগুনে পুড়ে মরেছে ৷ তাই বলে তারা হেরেও যায় নি ৷ বিজয়ের লক্ষ্যে নব বিপ্লবের সূচণা হল সাময়িক পরাজয় থেকেই ৷ রেইসকোর্সের তপ্ত ভাষণ আর কালুরঘাটের দ্বিপ্ত ঘোষণায় ঘুরে দাঁড়ালো বাঙালী মানুষ ৷ জুলুম-শোষাণ-নির্যাতনের বিরুদ্ধে গর্জে উঠলো লাখো বাঙালী ৷ দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে রচিত হল একটি বিজয় গাঁথা ৷ আমরা পেয়েছি স্বাধীন পতাকা ৷

বাঙালি জাতীর বিজয়ের এই সূর্য্যটি উদিত হয়েছিল রক্তনদী পেরিয়ে ৷ আর বিজয় অর্জনের প্রেরণার শুরু ছিল রাতের ঐ আঁধার থেকেই ৷ ২৫ শে মার্চের কালরাতেই লড়াকু বাঙালী জাতী খুঁজে নিয়েছিল তাদের ভোরের পথচলা ৷
.
সেদিন খবরে দেখলাম, এক নেত্রীর আগমন উপলক্ষে তার হাজার হাজার ভক্ত সমর্থক ভীড় করেছে রাজধানীর বিমানবন্দর এলাকা ও তার আশপাশে ৷ এতো মানুষের এমন সরব ও উৎফুল্ল উপস্থিতি সহ্য হয় নি কোন একটি গৌষ্ঠির ৷ ফলে প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে রাস্তার বাতিগুলো নিভিয়ে দিয়েছে তারা ৷
কে জানে, হয়তো বা ৭১ কিংবা ১৩ এর মত কিছু করার অসৎ উদ্দেশ্যও ছিল তাদের ৷ ক্ষুদ্র জীবনের অভিজ্ঞতা এবং অতীত ইতিহাস বলে, এমনটি করা তাদের পক্ষে অসম্ভব ছিল না ৷

খবরটি শুনার পর আচমকা বুঁকটা কেঁপে উঠলো ৷ মতলববাজরা কি রাতকেই বেছে নেয় সাধারণ মানুষের উপর হামলে পড়ার জন্য !? যুগে যুগে এরা ছিল ৷ এরা ছিল ১৯৭১ সালে ৷ ছিল ২০১৩ সালেও ৷ এরা বেচে থাকবে বছরের পর বছর ৷ দেখিয়ে যাবে নিজেদের কাপুরুষোচিত আচরণ ৷

আমি ৬ ই মে’র বাতি নিভানোর সাথে ১৮ অক্টোবরের বাতি নিভানোকে মিলাতে যাবো না ৷ কারণ, দু’টি দুই সুতোয় গাঁথা ৷ তবে হ্যাঁ, ১৩ তে যারা সুইচ অফ করে ন্যাক্কারজনক কর্মকান্ডের নজীর স্থাপন করেছিল তারা এখনো বেচে আছে ভূ-পৃষ্ঠে ৷ আর তাইতো এমন জঘন্য দৃশ্য আজো দেখতে হয় আমাদেরকে ৷
.
ব্যর্থ সাম্রাজ্যবাদীরা এভাবেই পিছন পথে আক্রমণ করে ৷ সম্মুখ পথে লড়াই করার সৎ সাহস তাদের নেই ৷ তাদের বুকের পাঠা এতটুকুই ৷ সর্বময় ক্ষমতার দৌড় ঐ বাতি নিভানো পর্যন্তই ৷

তাদের সামনে রাতের আঁধারে নিজিকে বিলিন না করে বরং ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয় থাকতে হবে আমাদের ৷ মনে রাখতে হবে, আর কিছু সময় অতিক্রান্ত হলেই ভোরের আলো ফুটবে উঠেবে ৷ নতুন কোন সুখবার্তা নিয়ে প্রভাতের আগমন ঘটবে ৷ অতএব রাতের আঁধারেই ঠিক করে নিতে হবে ভোরের পথচলা কেমন হবে আমাদের ৷ আমরা না জাগলে কি আর ভোর হবে?

আমাদের প্রেরণা একাত্তর ৷ জোর পূর্বক ক্ষমতাকে স্থায়িত্ব দিতে মুখে একাত্তরের ফেনা তুলবো কেন? একাত্তরকে সত্যিকারের প্রেরণা হিসেবে দেখতে চাই আমরা ৷ সেই যে কালরাত; সে রাতে যে ক্ষোভের আগুন প্রজ্জলিত হয়েছিল বাঙলার প্রতিটি ঘরে ঘরে তা নিভেছিল বিজয় অর্জনের মধ্য দিয়েই ৷ সেটাই আমাদের প্রেরণা ৷ নব বিপ্লবের হাতিয়ার ৷

২৫ শে আগস্ট ২০১৭ ৷ আরো একটি কালরাত ৷ মিয়ানমারের সামরিকজান্তার চলমান হত্যাযজ্ঞের সূচনা হয়েছিল সে রাতেই ৷ তারাও রাতের আঁধারেই ঝাপিয়ে পড়েছে নিরিহ-নিরস্ত্র আরাকানিদের উপর ৷

আমি স্বপ্ন দেখি, পৃথিবীর সব সাম্রাজ্যবাদীরা এভাবেই ঝাপিয়ে পড়বে মুসলিম জনপদগুলোতে ৷ মাজলুমনদের তাজা রক্তে ভিজে উঠবে পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তর, প্রতিটি খন্ড ৷ অতঃপর “মাতা নাসরুল্লাহ” চিৎকার ভেসে আসবে আকাশে ৷ এক সময় নারী-শিশু, যুবক-বৃদ্ধার লাল রক্তের স্রোতে ভেসে যাবে সকল অন্যায় ৷ আসবে নতুন বিজয় ৷ সে বিজয়ের পদধ্বনি আমি স্বপ্নে শুনি ৷ শুধু বাংলা নয়, বিজয়ের ঝান্ডা উত্তলিত হবে সারা বিশ্বময় ৷ মুক্ত হবে প্রতিবেশি আরাকান, মুক্ত হবে আপন কাশ্মীর ৷ স্বাধীন হবে ফিলিস্তিন, স্বাধীন হবে শাম ৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Archives

November 2020
S S M T W T F
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930  
shares