রবিবার, ৫ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৩রা সফর, ১৪৪২ হিজরি

নাফ নদীর তীরে কাঁদে মানবতা (০২) আল্লামা মামুনুল হক

সবুজ বাংলার পথেপ্রান্তরে… /৩৬

শাহপরীর দ্বীপ। রোহিঙ্গা নির্যাতনের এক জীবন্ত সাক্ষী। নাফ নদী আর বঙ্গোপসাগরের মোহনায় বাংলাদেশ মিয়ানমার সীমান্তে অবস্থিত। এককালের ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ আর ১০ কিলোমিটার প্রস্থ সাবরাং ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত এই দ্বীপটি বঙ্গোপসাগরের গর্ভে অনেকাংশ হারিয়ে এখন দৈর্ঘে ৪ কিলোমিটার আর প্রস্থে ৩ কিলোমিটারে দাঁড়িয়েছে। দ্বীপের ঘাটে পৌঁছেই আমরা দেখলাম ত্রাহী ত্রাহী অবস্থা। শত শত মানুষ দাঁড়িয়ে আছে ট্রলারের অপেক্ষায়। সকলেই প্রায় রোহিঙ্গা মুহাজির। তাদের ভিড়ে স্বল্প সংখ্যক স্থানীয় অধিবাসী। ঘাটেই আমাদের ভাইয়েরা মুহাজিরদের পারাপারের কাজে সহযোগিতা করছিল। আমরাও যুক্ত হয়ে গেলাম তাদের সাথে। মানুষের দুর্ভোগের করুন দৃশ্য দেখে বেমালুম ভুলে যেতে হলো নিজেদের টানা পনের-ষোল ঘণ্টার সফরের ক্লান্তির কথা। সারি সারি মানুষ আসছে। আবাল বৃদ্ধা বণিতা ৷ যাদের এক সময় ঠিকানা ছিল। এখন কোনো গন্তব্য নেই। সামনে চলতে হবে শুধু এটুকুই তাদের জানা। আপাতত এই নদীপথটুকু পাড়ি দিতে হবে। এমন তাড়া নিয়েই জড়ো হয়েছে ঘাটে। ট্রলার রিজার্ভ করে মাল সামানাসহ তাদেরকে তুলে দিয়ে আল্লাহর নামে রওয়ানা করিয়ে দেয়া এখানকার কাজ। অনেক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এ কাজ করলাম আমরা। কতক্ষণ আর করা যায়! এক সময় ক্লান্ত হয়ে ক্ষ্যান্ত দিলাম। কিন্তু জীবনের তাগিদে ছুটতে থাকা ভাগ্যাহত মানুষের মিছিল তো আর শেষ হয় না।

ঘাট থেকে একটা অটোরিক্সা নিয়ে এগিয়ে গেলাম আরও সামনের দিকে। একেবারে নাফ নদীর তীরে। বর্ডার গাড বাংলাদেশের ক্যাম্প সংলগ্নে নাফ নদীর উপর নির্মিত জেটি। সীমান্তের ওপার থেকে আসা মালামাল খালাস হয় যেখানে। নদীর তীর থেকে সেতু নির্মাণ করে চলে গেছে নদীর অনেকটা মাঝখান বরাবর। সেখান থেকে মিয়ানমারের সীমানা খুবই কাছে। জেটির শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে অপলক তাকিয়ে থাকলাম সীমান্তের দিকে। আরাকানী মুসলিমদের জনবসতীগুলো দেখা যায়। জায়গায় জায়গায় তখনও জ্বলছে আগুন। কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠছে ধোয়া। চারিদিকের আকাশ স্বচ্ছ থাকলেও আরাকানের আকাশে ঘোলাটে কালো মেঘেরা জমাট বেঁধে আছে। বাড়ি-ঘর আর গাছপালা পোড়ানো কালো ধোয়ায় জমিন থেকে আসমান পর্যন্ত একাকার। চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। নিপীড়িত জনপদের করুন কান্নাগুলো অশ্রু হয়ে গড়িয়ে পড়ল আমার দুচোখ বেয়ে। আর সইতে পারলাম না। ফিরে এসে বসে পড়লাম জেটির ছাউনিতে। ক্ষণিকের তরে চোখ বন্ধ করে ফিরে গেলাম দূর অতীতের আরাকানে। মুসলিম সৌর্যবীর্যের কীর্তিগাঁথা ইতিহাসগুলো চঞ্চল করে তুলল আমাকে।

এই সেই আরাকান, ১৪৩০ থেকে ১৭৮৪ সাল পর্যন্ত ১৮ জন মুসলিম রাজা শাসন করেছে যাকে। কুরআনের আয়াত ‘আকীমুদ্দীন’ খাচিত ইসলামের পতাকা পতপত করে উড়েছিল যার আকাশে। তেরশত বছরের নিরবচ্ছিন্ন মুসলিম ইতিহাস রচিত হয়েছে যে মাটির পরতে পরতে। বাংলার দক্ষিণ পূর্বাঞ্চল আর আরাকান একাকার ছিল দীর্ঘকাল। সেই সবই আজ অতীত। সামান্য নাফ নদী কেমনে বিভক্ত করে দিল হাজার বছরের জুড়ে থাকা মুসলিম জনপদকে। বেদনা ভরা করুন উপাখ্যান দুমড়ে মুচড়ে দিচ্ছিল আমার অনুভূতির গোটা অস্তিত্বকে। কাজের তাগিদে ফিরে এলাম অতীত থেকে বর্তমানে। সম্বিত ফিরল বিজিবি সদস্যদের বাঁশির শব্দে। তীরে ফিরে যেতে তাড়া দিল আমাদেরকে। বেশি মানুষ দেখলে বর্মী সীমান্ত রক্ষীরা আবার গুলি ছুড়তে পারে এমন সম্ভাবনার কথাও বলল। আমরা ফিরে এলাম।

ফিরে এলাম আমাদের আস্থার একটা ঠিকানায়। জামিয়া আহমাদিয়া বাহরুল উলুম। হেদায়া জামাত পর্যন্ত কওমি মাদরাসা। শাহপরীর দ্বীপে এটাই বড় মাদরাসা নামে পরিচিতি। রোহিঙ্গাদের গণহারে হিজরতের প্রথম থেকেই এ মাদরাসা ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। মাদরাসার মুহতামিম মাওলানা হোসাইন আহমদ সাহেব সজ্জন ও সচেতন একজন মানুষ বলেই আমার মনে হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে রোহিঙ্গা নির্যাতন ও নির্বাসনের পুরোটা সময় জুড়েই তিনি ও তার সহকর্মীবৃন্দ হৃদয় উজাড় করে অসহায় মানুষদের আশ্রয় ও সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।

শাহপরীর দ্বীপে রোহিঙ্গা মুহাজিরদের আগমন যেমন অধিক হারে হচ্ছে, প্রচার মাধ্যমগুলোর কল্যাণে এ সংবাদ অবগত হয়ে সারা দেশ থেকে সাহায্যার্থে ছুটে আসা মানুষের সংখ্যাও বেশুমার। আর এটাতো ইতোমধ্যেই সকলে জেনে গেছে যে, মানবতার টানে ছুটে যাওয়া মানুষদের মধ্যে আলেম-ওলামার সংখ্যা কম করে হলেও আশি ভাগ হবে। আর এই সুবাদে বাহরুল উলুম মাদরাসায় ত্রাণকাজে আগত আলেমদের হুজুমটাও প্রকট। কিন্তু আলহামদুলিল্লাহ, এই বিপুল সংখ্যক মানুষকে সাদরে গ্রহণ ও তাদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা এখানে করা হয়েছে অকৃপণভাবে। আল্লাহ মুহতামিম সাহেব ও তার সহকর্মীবৃন্দকে উত্তম জাযা দান করুন। শাহপরীর দ্বীপের এই বড় মাদরাসার ন্যায় সীমান্ত অঞ্চলের কওমি মাদরাসাগুলোই রোহিঙ্গা মুহাজিরদের খেদমতে প্রধান ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। ওলামায়ে কেরাম ও কওমি মাদরাসাগুলোই যে দ্বীন ও মিল্লাতের অতন্দ্র প্রহরী টেকনাফের রোহিঙ্গা দুর্গত অঞ্চলে গেলে যে কারো তা উপলব্ধি হবে।

শাহপরীর দ্বীপে দুদিন অবস্থান করে রোহিঙ্গা মুসলিমদের অবর্ণনীয় দুঃখগুলো কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। এক একজন রোহিঙ্গা মুসলিমকে কষ্টের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে কীভাবে একটু মাথা গোঁজার নিরাপদ আশ্রয় বাংলাদেশর উদ্বাস্তু শিবির পর্যন্ত পৌঁছতে হয়েছে তা ভাষায় ব্যক্ত করার মতো নয়।

বাংলাদেশের সীমান্তের ওপারেই রাখাইনের মংডু এলাকা। মংডু হলো রাখাইনের অন্যতম মুসলিম প্রধান এলাকা। আরেকটু দূরের মুসলিম অধ্যুসিত এলাকা হলো রাসিডং, বুসিডং ইত্যাদি। নির্যাতন শুরুর পর প্রতিটি মুসলিম প্রধান এলাকা থেকেই মুসলমানদের দেশত্যাগের হিড়িক পড়েছে। পাহাড় জঙ্গল বন বাঁদাড় সব মারিয়ে যে যেভাবে পেরেছে নাফ নদীর তীরে এসে জড়ো হয়েছে। দশদিন, পনেরদিন পর্যন্ত পায়ে হেঁটে অনেকে এসেছে। আর এই সুদীর্ঘ পথে পদে পদে মৃত্যুর মুখোমুখী হতে হয়েছে। মগদস্যু আর খুনী সামরিক সদস্যদের সশস্ত্র হামলায় হাজার হাজার মুসলিমকে প্রাণ হারাতে হয়েছে। এভাবেই জীবন মৃত্যুর দোলাচলে দুলতে দুলতে নাফ নদীর তীরে এসেও শুধু অর্থের অভাবে অনেককে থমকে দাঁড়াতে হয়েছে। স্থানীয়দের মারফত এ খবর শুনার পর হৃদয়টা হাহাকার করে উঠেছিল। যাদের কাছে নগদ কিছু অর্থ ছিল তারা ন্যায্যমূল্যের চেয়ে বহুগুণ বেশি বিনিময় শোধ করে নদী পাড়ি দিতে পেরেছে। আর যাদের সে সামর্থ্য নেই তারা নদীর ওপারেই ধুকে ধুকে মরছে… চলবে ৷

সৌজন্যে:
মাসিক রাহমানী পয়গাম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Archives

September 2020
S S M T W T F
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930  
shares