রবিবার, ২৮শে আষাঢ়, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২১শে জিলক্বদ, ১৪৪১ হিজরী

দান এবং আমি – শায়েখ ওলিউল্লাহ আরমান

Wali Ullah Arman

(প্রিয় বন্ধু! চলছে দানের মওসুম। নির্যাতিত, নিপীড়িত আরাকানের মুসলমানদের পাশে দাঁড়ানোর মওসুম। আসুন, লেখাটি পড়ে ঈমান তাজা করে নিই!)

-আলী তানতাভী

গত রাতের পরিবেশটা ছিলো চমৎকার। প্রচণ্ড শীতেও আমার কামরাটা ছিলো নাতিশীতোষ্ণ। বসে বসে ভাবছিলাম— কী নিয়ে লেখা যায়। পাশেই বাতি। নিকটেই টেলিফোন। ছেলেমেয়েরা যার যার পড়াশুনা নিয়ে ব্যস্ত। একটু আগেই সবার খাওয়া-দাওয়া শেষ হয়েছে। সবকিছুই শান্ত ও অনুকূল। সুন্দর লেখা জন্ম নেয়ার মতো সত্যি উপযোগী একটা পরিবেশ। এখন কারো বিরুদ্ধে আমার কোনো অভিযোগ নেই। নেই কারো কাছে কোনো চাহিদাও। আমি ভীষণ তৃপ্তি অনুভব করলাম। হৃদয়োৎসারিত কণ্ঠে বললাম— আল হামদুলিল্লাহ!
‘আল হামদুলিল্লাহ’ বলার সাথে সাথে মাথায় একরাশ চিন্তা এলো। এই-যে আমরা ‘আল হামদুলিল্লাহ’ বলে শোকর আদায় করি এবং আল্লাহর প্রশংসা গাই, এ কিন্তু নিছক উচ্চারণ-সর্বস্ব নয়। হোক সে উচ্চারণ হাজার মুখে লক্ষ বার। বরং এই ‘আল হামদুলিল্লাহ’ হলো অনেক ব্যাপক ও বহুমাত্রিক। আরেকটু খুলে বলি। আল্লাহর পক্ষ থেকে নেয়ামত লাভের পর ‘আল হামদুলিল্লাহ’ বলা’র অর্থ হলো— এই নেয়ামতে আমি নিজেই শুধু উপকৃত হবো না, বরং মুখাপেক্ষী ও অভাবী’র জন্যেও এখানে থাকবে একটা অংশ।
সুতরাং ধনী’র আলহামদু লিল্লাহ বলার অর্থ হলো— দরিদ্রকে দান করা।
সবলের আলহামদু লিল্লাহ বলার অর্থ হলো— দুর্বলকে সহযোগিতা করা।
সুস্থ ব্যাক্তির আলহামদু লিল্লাহ বলার অর্থ হলো— অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
শাসকের আলহামদু লিল্লাহ বলার মানে— শাসিতের মাঝে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা।
এ দৃষ্টিকোণ থেকে আমি ‘আলহামদু লিল্লাহ’ বললে আল্লাহর শোকর আদায় হবে না, যদি আমার প্রতিবেশী অনাহারে কিংবা শীতে কষ্ট পায় অপরদিকে আমি এবং আমার পরিবার যদি থাকি খাবারে তৃপ্ত এবং শীতবস্ত্রে আবৃত। আমার প্রতিবেশী আমার কাছে হাত নাও বাড়াতে পারেন। তার লাজবিনম্র স্বভাব তাকে বাধাও দিতে পারে। কিন্তু আমার দায়িত্ব কী? আমার দায়িত্ব হলো যেচে (নিজের ইচ্ছায়) তাকে জিজ্ঞাসা করা এবং নিজেই গিয়ে তার পাশে দাঁড়ানো।

এ সব যখন আমি ভাবছিলাম তখন আমার স্ত্রী এসে আমার পাশে দাঁড়ালেন। আমার নিবিষ্টতা-আচ্ছন্ন নীরবতা ভেঙে জানতে চাইলেন :
— কী এতো ভাবছেন!
আমি তাকে মনে খেলে-যাওয়া ভাবনাগুলো একে একে সব বললাম। তিনি হাসতে হাসতে বললেন :
— কিন্তু মানুষ মানুষের জন্যে কতোটুকুই বা করতে পারে! যথেষ্ট পরিমাণ অবশ্যই করতে পারে না। করা সম্ভবও না। কেননা মানুষের জন্যে যথেষ্ট শুধু আল্লাহ। আপনি যদি আপনার দরিদ্র প্রতিবেশীর জন্যে যথেষ্ট পরিমাণ সাহায্য করতে যান তখন দেখা যাবে তারা স্বাবলম্বী হতে-না-হতে আপনি নিজেই ফতুর হয়ে গেছেন!
আমার স্ত্রী থামলে আমি হাসিমুখে বললাম :
— বিষয়টা আসলে কাউকে ধনী বানিয়ে দেওয়া বা কারো জন্যে যথেষ্ট হওয়ার নয়! ধরো আমি যদি প্রচুর সম্পত্তির মালিক বা ধনী হতামও তবুও তাদেরকে ধনী বানাতে পারতাম না! আমি তো নিজেই পাখির জীবন যাপন করছি, পাখি সকালবেলা বেরিয়ে যায় খালি পেটে আর বিকেলবেলা ফিরে আসে ভরা পেটে। সেখানে দান করে আমি কাউকে ধনী বানিয়ে দেবো— সে কেমনে হয়! অকল্পনীয়!
আমার স্ত্রী চোখ দু’টি ছোট করে আমার দিকে তাকালেন। মনে হয় তার চোখের ভাষাটা শব্দায়িত হলে অর্থটা দাঁড়াতো এমন— ‘অমন দার্শনিক দার্শনিক কথা বলবেন না তো! একটু সোজা করে বলুন!
আমি বললাম :
— আমি দান করে কাউকে ধনী বানাতে চাই না। কে ধনী আর কে গরীব— বিষয়টা আপেক্ষিক। অর্থাৎ যার লাখ লাখ টাকা আছে তার তুলনায় হয়তো আমি দরিদ্র। কিন্তু ঐ যে খেটে-খাওয়া দিনমজুর, তার তুলনায় তো আমি ধনী! আবার ঐ দিনমজুর দরিদ্র হয়েও ঐ বিধবার তুলনায় অবশ্যই ধনী, যার নেই কোনো সহায়-সম্পদ। আরো সোজা করে বলি। যার লাখ লাখ টাকা সে দরিদ্র, যার মিলিয়ন মিলিয়ন টাকা আছে, তার তুলনায়! আবার মিলিয়নপতি অবশ্যই দরিদ্র বিলিয়নপতির তুলনায়! আবার সেও দরিদ্র ট্রিলিয়নপতির তুলনায়! সুতরাং এ পৃথিবীতে কেউ শুধু দরিদ্র আবার কেউ শুধু ধনী নয়। একজনের তুলনায় আরেকজন ধনী। আবার একজনের তুলনায় আরেকজন দরিদ্র। দরিদ্র-ধনী হওয়া আপেক্ষিক। ঐ যে চড়ুই পাখিটি, তা কি ক্ষুদ্র? হাতির তুলনায় অবশ্যই ক্ষুদ্র। কিন্তু পিঁপড়ের তুলনায়? অবশ্যই বড়! আমি ব্যক্তিগতভাবে অনেক ধনী— ঐ সহায় সম্পদহীন বিধবার চেয়ে। আবার আমি অনেক দরিদ্র— সম্পদ-রাজাদের তুলনায়!

না, আমি দার্শনিকতা দেখাচ্ছি না। আমি শুধু বলতে চাই— আমাদের মধ্যে সবাই কিছু-না-কিছু দান করতে পারি সে মানুষটিকে যে আমাদের চেয়ে তুলনামূলক দরিদ্র ও অভাবী। তিনটা রুটি আর এক বাটি ডাল ছাড়া আমার কাছে যদি কিছুই না-থাকে তাহলে যার কিছুই নেই তাকে একটা রুটি এবং সামান্য ডাল তো আমি দান করতে পারি! অনেক ‘বিলাসী ভোজনের’ পর থেকে যায় কতো ‘বাহারি’ খাবার (উচ্ছিষ্ট), আমরা কি তা তুলে দিতে পারি না— অভাবী প্রতিবেশীকে? অনাহারে কষ্টক্লীষ্ট মানুষের মুখে?
একই কথা প্রযোজ্য জামা কাপড়ের ক্ষেত্রে। যার আছে জোড়ায় জোড়ায় সে অবশ্যই ভুলবে না তাকে, যার কিছুই নেই— জীর্ণ একটি বস্ত্র ছাড়া! তুমি হয়তো ভাবছো, আমার পুরোনো কাপড় কে আর নেবে? ঈদ-আনন্দে এটা পেয়ে কে আর আহ্লাদিত হবে? কিন্তু বন্ধু, ছিন্নমলিন কাপড় যার নিত্যবসন (সব সময়ের পোশাক), তার কাছে এ-ই যে ঈদের খুশি—বাঁকা চাঁদের সেরা উপহার!
মোটকথা; যে যতো দরিদ্রই হোক, তার নিচে আছে আরো অনেক দরিদ্রের বসবাস।
তাদের হাত যেনো প্রসারিত হয় ওদেরও দিকে।
তাদের হাসি যেনো ফোটে ওদেরও মুখে।
তাদের ঈদ-আনন্দ যেনো আাভা ছড়ায় ওদেরও ঠোঁটে।
যে ব্যবসায়ীটি মাসে মাসে লাভ গোনেন রাশি রাশি, তার হাত যেনো প্রসারিত হয় ঐ দিনমজুরের দিকে।
ঐ অনাথার দিকে।
ঐ অবলার দিকে।
কিংবা মাতৃস্নেহ-বঞ্চিত ছলছল তাকিয়ে-থাকা কোনো এতিমের দিকে!

এ কথা ভাবার কোনো অবকাশ নেই যে আমার দান বুঝি নিস্ফল বিনিময়হীন! না, এ দান কখনো বিনিময়হীন হয় না। হতে পারে না। বরং এ দানের বিনিময় অপরিসীম। অপরিমেয়। দানের পরিমাণের চেয়েও অনেক অনে-ক বেশি করে এর বিনিময় পাওয়া যাবে আল্লাহর কাছে। ঐ আখেরাতের আগে এই দুনিয়াতে বসেই। বিশ্বাস হয় না বুঝি! আমি নিজে তার বাস্তব প্রমাণ।

আমি পরিবারের জন্যে কয়েক যুগেরও বেশি সময় ধরে খরচ করে যাচ্ছি। আমার অঢেল সম্পদ নেই। আয়-রোজগারের পথও মুক্ত অবারিত নয়। তবুও আমার পরিবার সুখে আছে। আমি সুখে আছি। অর্থকষ্ট কোনোদিন আমাকে কষ্ট দেয় নি।
আমার পরিবারের হাসিমুখে কালি ঢেলে দেয় নি।
কারণ কী? কারণ আর কিছুই না! আমার হাতে টাকা এলেই প্রয়োজনীয় খরচের পর আমি সব টাকা আল্লাহর পথে খরচ করে ফেলি—দান করে দিই। দানের ভালোবাসায় ব্যাকুল অস্থির হয়ে। দরিদ্র ও অভাবীদের দুঃখে কষ্টে চোখ মুছে মুছে। না! ‘ব্যাংক একাউন্টে’ সঞ্চয় করার জন্যে কখনোই আমি অস্থির হই নি। আরো পরিষ্কার ভাষায় বলি— আমি জীবনে কোনো টাকা-পয়সা সঞ্চয়ই করি নি। এ জন্যে আমার স্ত্রী আমাকে প্রায়ই বলতেন :
— টাকা-পয়সা কিছু তো জমান! কমপক্ষে মাথাগুঁজার একটু জায়গা তো করুন!
আমি বলতাম :
— আল্লাহর হাতে ছেড়ে দাও! তিনিই ব্যবস্থা করবেন!

এরপর কী হলো জানো, বলবো? আমি দান করে-করে আল্লাহর কাছে যা যা জমা করেছিলাম আল্লাহ আমাকে লাভসহ তা ফেরত দিলেন! একেবারে কড়ায়-গণ্ডায় আমাকে সে লাভ বুঝিয়ে দিলেন আমার মাওলা। এক বছরের লাভ এলো একশত সত্তর হাজার! বিশ্বাস করতে তোমার কষ্ট হচ্ছে? এই দেখো আল্লাহ কী বলেছেন—
مَثَلُ الَّذِينَ يُنفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ كَمَثَلِ حَبَّةٍ أَنْبَتَتْ سَبْعَ سَنَابِلَ فِي كُلِّ سُنْبُلَةٍ مِائَةُ حَبَّةٍ وَاللَّهُ يُضَاعِفُ لِمَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ.
‘যারা আল্লাহ্র রাস্তায় দান করে তারা তো একটি বীজ বপন করে, যা থেকে আসবে সাতটি শীষ। প্রতিটি শীষে থাকবে একশ’ দানা। আল্লাহ যদি চান, তাহলে আরো বাড়িয়ে দিতে পারেন। আল্লাহ চিরপ্রাচুর্যময়, মহাজ্ঞাতা।’ – সূরা বাকারা, আয়াত- ২৬০

বেশ ক’দিন পরে কী ঘটলো? হঠাৎ আমার বাসায় এসে উপস্থিত হলেন দামেস্কের এক বিশিষ্ট ব্যক্তি। এসে বললেন : ‘জায়গা কিনুন! টাকা যা লাগে আমি ঋণ দেবো!’ জায়গা কেনা হয়ে গেলো। এরপর আল্লাহ পাঠিয়ে দিলেন আরো ক’জন বিশিষ্ট বন্ধুকে। তারা এসে জায়গার উপর বাড়ি বানালেন! বিশ্বাস করো, আমি শুধু ওদেরকে পথে দেখা-হওয়া মানুষের মতোই চিনতাম। কোনো ঘনিষ্ঠতাই ওদের সাথে আমার ছিলো না।

পরে আল্লাহ আমাকে হালাল টাকার ব্যবস্থা করে দিলেন। জায়গার ঋণ এবং বাড়ি বানানোর ঋণ সবই আমি পরিশোধ করে দিলাম! বলা যায়— প্রায় স্বপ্নের মতোই যেনো সব হয়ে গেলো!
আমি আস্থার সাথেই বলতে পারি— আমি যখনই বিপদে পড়েছি আল্লাহ আমার বিপদ দূর করে দিয়েছেন। কোনো কিছুর প্রয়োজন দেখা দিলে আল্লাহ অভাবনীয়ভাবে আমার সে প্রয়োজন মিটিয়ে দিয়েছেন! আর সত্য কথা হলো, এ-সবই হয়েছে আমার সেই দানের বরকতে! এ-ই আমার বিশ্বাস। এ-ই আমার ইয়াকিন। এ জন্যেই আমি আখেরাতের ব্যাংকে টাকা জমা করতে কখনো দ্বিধাগ্রস্ত হই নি। কার্পণ্য করি নি। আমি মনে করি, তারা আসলেই বোকা যারা মাত্র ৫% লাভের (যা সুদ এবং হারাম) আশায় দুনিয়ার ব্যাংকে টাকা জমা করে! সে ৫% লাভও আবার অনিশ্চিত! ব্যাংক থাকলে লাভ হবে! ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে গেলে ‘আমও যাবে ছালাও যাবে’। অথচ আখেরাতের ব্যাংকে টাকা জমা করলে (অর্থাৎ দান করলে) একশতে লাভ আসছে সুনিশ্চিতভাবে সত্তর হাজার! দেউলিয়াত্বের কোনো দূরতম সম্ভাবনাও নেই। বরং আখেরাতের সীমাহীন বিনিময় লাভের আগেই এই দুনিয়াতে তার জন্যে বয়ে আনবে ঈর্ষণীয় সফলতা। আমি অনেক দৃষ্টান্তই এখানে দিতে পারি, কিন্তু বিরত থাকছি। শুধু দুয়েকটি পেশ করছি।

আমার আব্বার উস্তায। নাম শায়খ সালীম। দারিদ্র সত্ত্বেও কোনোদিন কোনো ভিক্ষুককে তিনি ফিরিয়ে দেন নি। জুব্বা ছিলো তাঁর পছন্দের পোশাক। বের হলে প্রায় সময়েই এই জুব্বা পরে বের হতেন। কিন্তু শীতে কষ্ট-পাওয়া কোনো অসহায় মানুষ যখন তাঁর সামনে এসে দাঁড়াতো, তিনি সাথে সাথে জুব্বাটা তাকে দিয়ে দিতেন! গৃহে ফিরে আসতেন জুব্বাহীন ইযার পরে। তাঁর আরেকটা অভ্যাস ছিলো এই যে, তিনি ভিক্ষুক এলে আর দেরি করতেন না, পরিবার পরিজনের একেবারে সামনে থেকে খাবার উঠিয়ে নিয়ে ভিক্ষুককে বিলিয়ে দিতেন! এ জন্যে গৃহিণী’র অনেক ঝাল-কথাও তাঁকে শুনতে হতো।
একদিনের ঘটনা। তখন রমজান মাস। মাগরিবের আযানের বেশিক্ষণ আর বাকি নেই। সবাই ইফতারি সামনে নিয়ে বসে অপেক্ষা করছে। এই বুঝি ইফতারির ঘণ্টাটা বেজে উঠলা! ঠিক সেই মুহূর্তে এক ভিক্ষুক এসে দরোজায় দাঁড়ালো। হাঁক দিলো। কসম খেয়ে বললো: ‘স্বপরিবারে আমি উপোস! আছে কি খাবার কিছু!!’ এ কথা শুনে শায়খ সালীমের মন কেঁদে উঠলো! তিনি স্ত্রীর অসতর্কতায় সব খাবার উঠিয়ে ভিক্ষুককে দিয়ে দিলেন! একটু পর স্ত্রী এসে দেখেন দস্তরখান শূন্য! হয়তো রোজা রেখে ইফতারি বানানোর ধকলটা সইতে পারেন নি, তাই একটু মন খারাপ করেই বললেন : তোমার কাছে কি আমার কষ্টের কোনোই মূল্য নেই?! খাও এখন কী খাবে! আমি আর কিচ্ছু বানাতে পারবো না!

শায়খ সালীম নীরবে স্ত্রীর কথা হজম করলেন।
এদিকে আধাঘন্টা না-পেরুতেই কে যেনো দরোজায় এসে আওয়াজ দিলো। দরোজা খুলতেই দেখা গেলো নানা রকমের নানা স্বাদের খাবারে সাজানো বিরাট এক খাঞ্চা নিয়ে প্রখ্যাত শিল্পপতি সাঈদ বাশা’র খাদেম দাঁড়িয়ে আছে। সবাই জানতে চাইলো :
— তুমি এইসব নিয়ে এখানে?! কী খবর!
খাদেম বিনয়ের সাথে বললো :
আজ সাঈদ বাশা’র বাসভবনে মেহমান আসার কথা ছিলো। কিন্তু তারা কেউ আসেন নি। এ জন্যে সাঈদ বাশা বলেছেন— এ খাবার না-খেয়ে সব এখানে—শায়খ সালীমের বাড়িতে পৌঁছে দিতে!
শায়খ সালীম বুঝলেন এ আল্লাহর ইন্তেযাম! তাই নিজের অকৃত্রিম তৃপ্তিভরা হাসিটি তিনি গোপন করতে পারলেন না! স্ত্রীকে বললেন : বেগম! কিছু বুঝলে!

আরেক মায়ের একটা ঘটনা বলি। ছেলে জরুরি সফরে বাইরে ছিলো। একদিন মা খেতে বসেছেন। সামনে ছিলো সামান্য রুটি ও একটু তরকারি। ভীষণ খিদে। এ সামান্য আয়োজন কিছুই না। তবুও মা সবর করলেন। মুখে অল্পেতুষ্টির সোনালি আভা। ঠিক সেই মুহূর্তেই দরোজায় এসে দাঁড়ালো এক ভিক্ষুক। অনাহারী। রাজ্যের ক্ষুধা ছায়া ফেলেছে মুখে। মা আর খেলেন না, সবটাই বিলিয়ে দিলেন ভিক্ষুককে! রাত কাটালেন না-খেয়ে—ক্ষুধার সাথে লড়াই করে!
ক’দিন পর ছেলে সফর থেকে ফিরে এলো। এসে মাকে সফরের বৃত্তান্ত শুনালো। এক পর্যায়ে ছেলে বললো : কিন্তু সবচে’ বিস্ময়কর ঘটনাটা শোনো মা! পথে হঠাৎ আমাকে একটা সিংহ তাড়া করলো! আমি ছিলাম একা। ভীষণ ভয় পেয়ে গেলাম। পড়িমরি করে ছুটতে লাগলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ধরা পড়ে গেলাম। এক্ষুনি সিংহটা আমাকে বুঝি সাবাড় করে দেবে! গিলে খাবে! কিন্তু হঠাৎ অনুভব করলামএক সাদা পোশাকধারী আমার সামনে এসে হাজির! মুহূর্তেই আমাকে সিংহের কবল থেকে মুক্ত করে বললো : ‘গ্রাসের বদলে গ্রাস’! এ কথার কী তাৎপর্য তা আমি এখনো বুঝতে পারি নি মা!

রাজ্যের উৎকণ্ঠা নিয়ে মা শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় ছেলের ঘটনা শুনছিলেন ছেলের বেঁচে যাওয়ার কাহিনী! চোখ মুছতে মুছতে জানতে চাইলেন তিনি— ঘটনার সময়টা! তখন দেখা গেলো যে, মা যে মুহূর্তে ভিক্ষুককে সব খাবার উজাড় করে দান করে দিয়েছিলেন, এ সে সময়েরই ঘটনা!! মা ‘আলহামদু লিল্লাহ’ বলে সেজদায় লুটিয়ে পড়লেন! নিজের মুখের গ্রাস তিনি তুলে দিয়েছিলেন ভিক্ষুকের মুখে, বিনিময়ে সিংহের গ্রাস হওয়া থেকে আল্লাহ বাঁচিয়ে দিয়েছেন তার ছেলেকে আসমানের ফেরেশতা পাঠিয়ে!

সুতরাং জোর দিয়েই বলছি; দানে ধন বাড়ে। দানে বিপদ কেটে যায়। কষ্ট থেকে মুক্তি ঘটে। হাদীসে নববীতেও এ আলোচনা এসেছে। আমার ছোট মেয়ে বানান-এর কথা বলি। একবার বানান একটা থালায় রুটি নিয়ে দারোয়ানকে দিতে যাচ্ছিলো— ভিক্ষুককে দিতে। আমি ওকে ডেকে বললাম : মা-মণি বানান! এভাবে দিতে যেয়ো না! ভিক্ষুকের মন খারাপ হবে! এই রুটিটাই তুমি তাকে দাও আরো সুন্দর একটা থালায় এবং ট্রেতে করে! চামচ পানির জগ ও গ্লাসসহ। খাবার তো একই! কিন্তু এভাবে দিলে সে ভাববে, আমাকে ভিক্ষুক নয়— মেহমান মনে করা হয়েছে! সে তখন খুব খুশি হয়ে তা খাবে!

দানের সাথে অতি সহজেই আমরা আরেকটা জিনিস করতে পারি। তা হলো, মৃদু হাসি। মৃদু হাসিতে ফকির খুব খুশি হয়। নাক উঁচু করে হাজার দিরহাম দান করার চেয়ে বিনম্র মৃদু হাসিতে মুখটা আলোকিত করে এক দিরহাম দান করাও অনেক উত্তম। হাদীসে নববীতে এই মৃদু হাসির অনেক ফযিলত বর্ণিত হয়েছে।

অনেক সময় দেখা যায়; আমরা সবজি বিক্রেতার সাথে দুয়েক দিরহামের জন্যে যুদ্ধ শুরু করে দিই। এটা অন্যায়। ওরা তো খেটে-খাওয়া মানুষ। আমাদের আয়রোজগার ওদের চেয়ে কতো বেশি। তারপরও কেনো এই অশালীন ঝগড়া? ওরা যে দাম চাইছে সে দামেই কিনে নিলে কী হয়! যা ওরা বেশি চেয়েছে তা কি সদকার নিয়তে আমরা দিয়ে দিতে পারি না! তখন দেখা যাবে ওরা লাভ করেছে মাত্র চার পাঁচ টাকা। আর আমরা বিনিময়ে পেয়ে যাবো আল্লাহর কাছে অনেক অনে-ক বেশি! এই দুনিয়াতেও এবং ঐ আখেরাতেও।

শেষ কথা হলো— যাদের যাদের বসবাস আমারে নিচে, আমার দানের হাত যেনো প্রসারিত হয় তাদের দিকে। মনে রাখতে হবে, শোকর ও প্রশংসা শুধু মুখে হয় না। আচার আচরণেও তার প্রকাশ ঘটাতে হয়। কোনো ধনী কৃপণ যদি দান না করে শুধু তাসবিহ হাতে সারাক্ষণ জপতে থাকে ‘আলহামদু লিল্লাহ’, তাহলে কী মন হয় তোমার? তা কি কোনো কাজে আসবে? অনুরূপভাবে যার যে অবস্থান যে অবস্থানের সাথে সঙ্গতি রেখেই তাকে দান করতে হবে। এটাই শোকর। এটাই প্রশংসা। শুধু উচ্চারণসর্বস্ব শোকর ও হামদের আলাদা কোনো তাৎপর্য নেই।

সুতরাং হে বন্ধু! হে দাতা! আল্লাহর নেয়ামত ভোগ করো এবং সে নেয়ামতের শোকর আদায় করে সব সময় তা ভোগ করে যাও! তোমরা যদি অনাথ অসহায় এতিম বিধবা ও অভাবীর পাশে দাঁড়াও তাহলে আল্লাহও তোমাদের পাশে দাঁড়াবেন! তোমাদেরকে দান করবেন বিজয়! দুশমনের উপর বিজয়! বিস্ময়কর বিজয়!!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Archives

July 2020
S S M T W T F
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031
shares