মঙ্গলবার, ৪ঠা কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৩রা রবিউল আউয়াল, ১৪৪২ হিজরি

একজন গাজী ইয়াকুব শুধু একজন মানুষ নয় বরং তিনি একাই একটা উম্মাহ


হযরত Gazi Yakub ভাই (হাফিজাহুল্লাহু তাআলা ওয়া রাআহু) সম্পর্কে যদি বলি, তিনি একজন মানুষ তাহলে ভুল হবে। বরং তিনি একাই একটা উম্মাহ। একা এক জাতি। ২০০৩/৪ থেকে তাঁকে চিনি। এই ১৪ বছরে যতবার তাঁর সংস্পর্শে গিয়েছি মনে হয়েছে তাঁকে এখনও পড়তে পারিনি। তাঁর অন্তরের বিশালতা মাপতে পারিনি। তাঁর আখলাক-চরিত্র এবং তাকওয়া ও আল্লাহভীতির নূর এখনও অবলোকন করতে পারিনি। আর তাঁর খিদমাতে খালক ও মানবসেবার দৃশ্য যখনই দেখেছি তখনই মা খাদীজার সেই বক্তব্যটি মনে পড়েছে যা তিনি নবীজিকে লক্ষ করে বলেছিলেন, ” আল্লাহ্‌র কসম, কক্ষনো না। আল্লাহ্ আপনাকে কক্ষনো অপমানিত করবেন না। আপনি তো আত্মীয়-স্বজনের সাথে সদ্ব্যবহার করেন, অসহায় দুর্বলের দায়িত্ব বহন করেন, নিঃস্বকে সাহায্য করেন, মেহমানের মেহমানদারী করেন এবং দুর্দশাগ্রস্তকে সাহায্য করেন।”

ইয়াকুব ভাইয়ের ছোট ভাই Gazi Yasin আমাদের মাদ্রাসা জীবনের সহপাঠী। ইয়াসিনকে দেখতে ইয়াকুব ভাই মাদ্রাসায় আসতেন। আমরা দেখতাম, ইয়াসিনের সাথে দেখা করার পর ইয়াকুব ভাই চলে যেতেন আদীব হুজুর মাওলানা আবু তাহের মিছবাহর খাছ কামরায়। হুজুরের খুব কাছের মানুষ ছাড়া সে কামরায় আমরা তেমন কাউকে কখনো যেতে দেখিনি। আদীব হুজুরের মহব্বত ও ভালোবাসা নিয়ে যখন ইয়াকুব ভাই খাছ কামরা থেকে বের হতেন তখন তাঁর মুখের স্নিগ্ধ হাসি দেখে আমরা মুগ্ধ হতাম। এরপর আমরা ইয়াসিনের কাছে রহস্য জানতে চাইতাম, যদ্দুর মনে পড়ে, ইয়াসিন তখন তিনটি কথা বলত। এখানে একটি বলি। “আমার ভাই আমিনী সাহেব হুজুরেরও খুব কাছের মানুষ।” তখন মন বলত, আসলেই রত্নের কদর সব দুয়ারে আছে।

এরপর ধীরে ধীরে সময় গড়াতে থাকে। প্রায় প্রতি ঈদেই ইয়াসিনদের বাসায় যাওয়া হত। দুরু দুরু বুকে ইয়াকুব ভাইয়ের সাথেও দেখা করতাম। আমার হাবভংগি দেখে ঝাড়ি দিয়ে স্নেহমাখা গলায় বলতেন, এই মিয়া, এমন কাচুমাচু মেরে থাকো কেন? ভাই মনে করতে পারো না? বড় ভাইয়ের মত কথাগুলো তিনি বলতেন। এখনও বলেন। কিন্তু সামনে গেলে এখনও কুঁচকে যাই। চেষ্টা সত্ত্বেও কুঁচকানো ভাব কমাতে পারিনা। ভাবি, মহৎ মানুষদের সামনে এই যে কুঁচকে যাওয়া এটা তাঁদের ব্যক্তিত্বের প্রভাব। গোসলের সময় প্রথম মগ পানি ঢালার সময় যে অবস্থা হয় ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষের সোহবতে গেলেও সে হালত হয়। কারণ গোসল যদি শরীরের ময়লা দূর করে তাহলে ইয়াকুব ভাইদের মত মানুষের সংস্পর্শ অন্তরের ময়লা দূর করে। উম্মাহর ফিকির তৈরি করে।

শ্রদ্ধার পাশাপাশি ইয়াকুব ভাইয়ের সাথে একটা দাবীর সম্পর্কও তৈরি হয়েছে এই ক’ বছরে। সত্য বলতে, তিনিই বানরটাকে মাথায় চড়িয়েছেন। না হলে এমন মানুষের ধারে কাছে ভিড়বার যোগ্যতা অন্তত আমার নাই। কয়েক বছর আগের কথা। তাঁর দল তাঁকে মেয়র নির্বাচনের পদপ্রার্থী করল। ফোন করে বললাম, ভাই, নির্বাচন না করলে ভাল হয়। তিনি দুই এক কথার পরই বললেন, নির্বাচন করব না। এবং সত্যি সত্যি তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালেন। পরে এ বিষয়ে যা জানতে পারলাম তা আরো অবাক করা। এক. কিছু মানুষ তাঁর মাথায় হাড়ি ভেঙে খেতে চাচ্ছে। দুই. একই জায়গায় একই রকম দুটি ব্যানার না থাকাটাকেই তিনি বেশি যৌক্তিক মনে করছেন। এই ভাবনা থেকে তিনি নিজেকে গুটিয়ে নেন এবং দ্বিতীয় ব্যানারটির যত্নের প্রতি নজর দেন। সমর্থন জানান ইসলামের পক্ষে কাজে নামা আরেকটি দলকে এবং শুধু সমর্থনই নয়, তাদের হয়ে অনেক কিছু করেও দেন। নিষ্ঠা ও বিচক্ষণতা যে পরস্পর বিরোধী নয়, বরং কামিল ইনসানের অন্যতম সিফাত তা ইয়াকুব ভাইয়ের সাথে পরিচয় না হলে সম্ভবত জানা হত না। ইয়াকুব ভাই নিজেকে ছোট করেছিলেন। আল্লাহ তাআলা তাকে বড় করেছেন। নবীজি সত্যই বলেছেন, যে আল্লাহর জন্য বিনয় অবলম্বন করে আল্লাহ তাকে উঁচু করে দেন। সম্মান দান করেন।

রোহিঙ্গা শরণার্থীরা যখন দেশে এল তখন দেখেছি ইয়াকুব ভাইকে। কখনো কখনো নিজের ঘরের জিনিসও বিলিয়ে দিতেন। অথচ ঘরে চুলা জ্বলত না। আর বর্তমানে করোনা সংকটের সময় তার খিদমত তো জাতির সামনেই আছে। সে সম্পর্কে নতুন করে কিছু বলার নাই। সংকট শুরু হওয়ার আগের থেকেই তিনি যেভাবে কাজ করে যাচ্ছেন তা আল্লাহ দেখছেন। আল্লাহ তাআলা ভাইকে ভরপুর জাযা দান করেন। আমি ভাইকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ভাই, এত ফান্ড কোত্থেকে পান? নববী উত্তর দিলেন, “আরশের মালিকের কাছ থেকে”। আল্লাহর উপর যার অগাধ ভরসা সে না খেয়ে থাকলেও তার কোন অভাব থাকতে পারে না। মনের সচ্ছলতাই যে আসল সচ্ছলতা।

করোনা সংকটকালে বর্তমানে ইয়াকুব ভাই মানবসেবার জন্য Taqwa Foundation করেছেন। নানাবিধ প্রকল্পের মধ্যে এই সংগঠনের পক্ষ থেকে দৈনিক ৫০০ জন মানুষের ইফতারের আয়োজন করা হচ্ছে। কিন্তু এতটুকুতে তিনি তৃপ্ত নন। নেক কাজে যে কোন তৃপ্তি থাকতে নাই তাও শেখা হল। গতকাল লালবাগসহ ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় ইফতারের ব্যবস্থা করা হয়। আল্লাহ তাআলা ইখলাসের সাথে কাজ করার তাওফিক দান করেন এবং ইয়াকুব ভাই ও তাঁর ফাউন্ডেশনকে কবুল করেন। আমাদেরকেও শেখার তাওফিক দেন।

 

লেখক:মাওলানা রাশেদুর রহমান ।। পেশ ইমাম ও খতীব, কেন্দ্রীয় মসজিদ, বুয়েট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Archives

October 2020
S S M T W T F
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31  
shares