শনিবার, ২৪শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১৮ই জিলহজ্জ, ১৪৪১ হিজরী

কাদিয়ানী সম্প্রদায় কেন অমুসলিম (পর্ব-০৬)-মাওলানা মুহাম্মাদ মনযূর নুমানী রহ.


কাদিয়ানী সম্প্রদায় কেন মুসলমান নয়

মাওলানা মুহাম্মাদ মনযূর নুমানী রহ.


ইহুদী খৃস্টানদের পারস্পরিক বিরোধ এবং কুরআনের ফায়সালা

ইহুদীদের (নাউযুবিল্লাহ, আল্লাহর পানাহ) দাবি হল, ঈসা মাসীহ মারইয়ামের অবৈধ সন্তান (এরা মারইয়ামের উপর যেনা-ব্যাভিচারের অপবাদ আরোপ করে থাকে) এবং বলে থাকে, ঈসা নবুওতের ভন্ড দাবিদার, মিথ্যুক ও ধোকাবাজ। সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলার জন্য যা কিছু সে দেখিয়ে থাকে, সেটা যাদু ও ভোজবাজি ছাড়া কিছু নয়। তাওরাত এবং ইসরাঈলী শরিয়ত অনুসারে এমন ব্যক্তির শাস্তি শূলে চড়িয়ে হত্যা। এ মৃত্যু অভিশাপপূর্ণ। আমরা ঈসাকে তাওরাত অনুসারেই শূলীতে চড়িয়েছি এবং তার ইহলীলা সাঙ্গ করেছি। আর সে অভিশপ্ত অবস্থায় দুনিয়া ছাড়তে বাধ্য হয়েছে।

এ হল ঈসা আলাইহিস সালামের ব্যাপারে ইহুদীদের জঘন্য আকিদা। এর বিপরীতে খ্রিস্টানদের অতিরঞ্জিত আকিদা হল, ঈসা পবিত্র আত্মা, আল্লাহর পুত্র ও সন্তান, তিন খোদার একজন তিনি। আর ঈসা মসীহ সম্পর্কে এ আকিদাও তারা পোষণ করে যে, শূলীবিদ্ধ হবার পর আল্লাহ তাঁকে আসমানে তুলে নিয়েছেন। অর্থাৎ ইহুদীগণ কর্তৃক ঈসা মাসীহকে শূলীতে চড়িয়ে হত্যা করার ঘটনাটিকে তারা সত্য বলে স্বীকার করে, (যার উপর তাদের অতিবিভ্রান্তিকর ‘কাফফারা’র আকিদা প্রতিষ্ঠিত) এবং এই বিশ্বাসও রাখে যে, ঐ ঘটনার পর আল্লাহ তাকে জীবিত করে আকাশে উঠিয়ে নিয়েছেন। আর ভবিষ্যতে তিনি আবারও আগমন করবেন।

নওমুসলিমদের সহযোগিতার জন্য এগিয়ে আসুন

(তবে খ্রিস্টজগতের একটি অংশের বিশ্বাস ছিল, ইহুদীরা আদৌ ঈসা মাসীহকে শূলীতে চড়াতে পারেনি, বরং ‘ইহুদা’ নামের এক ব্যক্তিকে তারা শূলীতে দিয়েছে। এ ব্যক্তি ঈসা মাসীহকে হত্যার জন্য গোয়েন্দাবৃত্তিতে লিপ্ত ছিল। আল্লাহ পাক ঈসাহ মাসীহকে নিরাপদে আসমানে তুলে নেন। আর ইয়াহুদাকে মাসীহের আকৃতি দিয়ে দেন। ফলে ইহুদীরা তাকেই ঈসা মনে করে শূলিবিদ্ধ করে হত্যা করে। বার্নাবাসের ইঞ্জিলে ঘটনাটি এভাবেই এসেছে এবং এটা কুরআনের বর্ণনা এবং মুসলমানদের বিশ্বাসের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। কিন্তু বর্তমান পৃথিবীর প্রায় সকল খ্রিস্টান ঈসা মাসীহের শূলীবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করার আকিদা পোষণ করে।)

ঈসা আলাইহিস সালামের ব্যাপারে ইহুদী-খ্রিস্টানদের এই সকল আকিদা ও দৃষ্টিভঙ্গির কথা তাদের ধর্মগ্রন্থ এবং ঐতিহাসিক বিবরণীতে বিদ্যমান রয়েছে। অধিকাংশ আকিদার কথা কুরআনেও এসেছে। তো যেহেতু ঈসা আলাইহিস সালামের ব্যাপারে প্রান্তিকতার কারণে ইহুদী ও খ্রিস্টানরা ভীষণ গোমরাহি কুফর-শিরকে নিমজ্জিত, সে বিষয়ে সুষ্পষ্ট হেদায়েত ও ফায়সালা প্রদান করা ছিল কুরআন মাজীদের অপরিহার্য দায়িত্ব। হককে হক এবং বাতিলকে বাতিল সাব্যস্ত করে মূল বিষয়টি তুলে ধরা এবং উভয় জাতির বিভ্রান্তি দূর করা ছিল তার স্বাভাবিক কর্তব্য। আল্লাহ পাক কুরআন নাযিলের উদ্দেশ্য বর্ণনা করে ইরশাদ করেন-

وَمَا أَنْزَلْنَا عَلَيْكَ الْكِتَابَ إِلَّا لِتُبَيِّنَ لَهُمُ الَّذِي اخْتَلَفُوا فِيهِ وَهُدًى وَرَحْمَةً لِقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ

আমি তোমার উপর এ কিতাব এ জন্য নাযিল করেছি যে, যেসব বিষয়ে তারা মতবিরোধে লিপ্ত, সেসব বিষয় যেন তুমি তাদের সামনে সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা কর এবং যাতে তা ঈমান আনয়নকারীদের জন্য হিদায়াত ও রহমতের অবলম্বন হয়। – সূরা নাহল ১৬ : ৬৪

সুতরাং কুরআন মাজীদ ইহুদী-খ্রিস্টানদের মাঝে বিদ্যমান এখতেলাফের সুস্পষ্ট সমাধান পেশ করেছে এবং উভয় সম্প্রদায়ের ভুল বিশ্বাসগুলো খন্ডন করে প্রকৃত সত্য তুলে ধরেছে।

ঈসা মাসীহের ব্যাপারে খ্রিস্টানদের ঈশ্বরত্বের বিশ্বাস, মাসীহকে আল্লাহর সন্তান ও পুত্র বলে বিশ্বাস এবং তাঁকে তিন খোদার এক খোদা (ত্রিত্ববাদ/তাছলীছ) মান্য করার মতো শিরকী আকিদা ইত্যাদিকে কুরআন মাজীদ চূড়ান্ত ভাষায় নস্যাৎ করে দিয়েছে এবং এ সমস্ত বিশ্বাসকে নিরেট কুফর বলে ঘোষণা করেছে। ইরশাদ হয়েছে, (তরজমা) ‘যারা বলে, মারইয়ামপুত্র ঈসা মাসীহই আল্লাহ, নিশ্চই তারা কাফের। অথচ মাসীহ বলেছিল, হে বনী ইসরাঈল! আল্লাহর ইবাদাত কর, যিনি আমারও রব, তোমাদেরও রব। নিশ্চিত যে, আল্লাহর সঙ্গে যে ব্যক্তি কাউকে শরিক করবে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে রেখেছেন। তার ঠিকানা জাহান্নাম। আর যারা (এজাতীয়) অন্যায় করে তাদের কোনো সাহায্যকারী নেই। এবং তারাও নিশ্চিতভাবে কাফের হয়ে গেছে, যারা বলে আল্লাহ তিনজনের (তিন খোদার) তৃতীয়জন। অথচ এক মাবুদ ব্যতীত আর কোনো মাবুদ নেই। তারা যদি তাদের এ-কথা থেকে বিরত না হয়, তবে তাদের যারা এই কুফুরীতে লিপ্ত হয়েছে, তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি স্পর্শ করবে’। -সূরা মায়েদা ৫:৭২-৭৩

আরো ইরশাদ হয়েছে (ভাবানুবাদ) ‘কাউকে আল্লাহর পুত্র বা সন্তান বলাটা এতটা মারাত্মক ও জঘন্য যে, এর ফলে আকাশ যেন ফেটে পড়বে, জমিন বিদীর্ণ হয়ে যাবে, পাহাড় ভেঙ্গে ঝরে পড়বে। -সূরা মারইয়াম ১৯ : ৮, ৮৯)

অন্য আয়াতে এসেছে (তরজমা) ‘মাসীহ তো আমার একজন বান্দা মাত্র। যাকে আমি বিশেষ কিছু নেয়ামত দান করেছিলাম।’ -সূরা ৪৩ : ৫৯

মোটকথা, কুরআন মাজীদ বহু জায়গায় স্পষ্ট ঘোষণা করেছে যে, নাসারাদের ত্রিত্ববাদ, ঈসা মাসীহের ব্যাপারে ঈশ্বরত্ব, পুত্রত্ব ও সন্তানত্বের আকিদা মারাত্মক গোমরাহি, আল্লাহ জাল্লা জালালুহুর শানে ভীষণ বেয়াদবি ও সুস্পষ্ট কুফর। ঈসা তো কেবল আল্লাহ তাআলার একজন বান্দা ও রাসূল।

আর তিনি নিজেই এ সকল আকিদা শিক্ষা দিয়েছেন বলে যে দাবি খ্রিস্টানরা করে থাকে, তা ঐ মহান নিরীহ নিষ্পাপ নবীর উপর নির্জলা মিথ্যাচার ছাড়া কিছুই নয়। কিয়ামতের দিন ঈসা মাসীহ নিজেই এসমস্ত আকিদা থেকে নিজেকে দায়মুক্ত বলে ঘোষণা করবেন।

ইরশাদ হয়েছে-

وَإِذْ قَالَ اللَّهُ يَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ أَأَنْتَ قُلْتَ لِلنَّاسِ اتَّخِذُونِي وَأُمِّيَ إِلَهَيْنِ مِنْ دُونِ اللَّهِ قَالَ سُبْحَانَكَ مَا يَكُونُ لِي أَنْ أَقُولَ مَا لَيْسَ لِي بِحَقٍّ إِنْ كُنْتُ قُلْتُهُ فَقَدْ عَلِمْتَهُ تَعْلَمُ مَا فِي نَفْسِي وَلَا أَعْلَمُ مَا فِي نَفْسِكَ إِنَّكَ أَنْتَ عَلَّامُ الْغُيُوبِ * مَا قُلْتُ لَهُمْ إِلَّا مَا أَمَرْتَنِي بِهِ أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ رَبِّي وَرَبَّكُمْ وَكُنْتُ عَلَيْهِمْ شَهِيدًا مَا دُمْتُ فِيهِمْ فَلَمَّا تَوَفَّيْتَنِي كُنْتَ أَنْتَ الرَّقِيبَ عَلَيْهِمْ وَأَنْتَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ شَهِيدٌ

এবং (কেয়ামতের সে সময়ের বর্ণনাও শোন,) যখন আল্লাহ বলবেন, হে ঈসা ইবনে মারইয়াম! তুমিই কি মানুষকে বলেছিলে যে, তোমরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে আমাকে এবং আমার মাতাকে উপাস্যরূপে গ্রহণ কর? সে বলবে, আমি তো আপনার সত্তাকে (শিরক থেকে) পবিত্র বলে বিশ্বাস করি। যে কথা বলার অধিকার আমার নেই, সে কথা আমি বলতে পারি না। এরূপ কথা আমি বলে থাকলে তো আপনিই জানতেন। আপনি আমার অন্তরে যা গোপন আছে তাও জানেন। কিন্তু আপনার গুপ্ত বিষয় আমি জানি না। আপনিই কেবল যাবতীয় গুপ্ত বিষয় সম্পর্কে সম্যক অবগত। আপনি আমাকে যে বিষয়ের আদেশ করেছিলেন, তা ছাড়া অন্য কিছু আমি তাদেরকে বলিনি। তা এই যে, তোমরা আল্লাহরই ইবাদত কর, যিনি আমারও প্রতিপালক তোমাদেরও প্রতিপালক। আর আমি যতদিন তাদের মাঝে ছিলাম, ততদিন আমি তাদের অবস্থা সম্পর্কে অবগত ছিলাম। তারপর আপনি যখন আমাকে লোকান্তরে তুলে নিলেন তখন আপনিই তাদের পর্যবেক্ষক ছিলেন। আর আপনি হলেন সবকিছুর সাক্ষী। -সূরা মায়েদা ৫:১১৬-১১৭

কুরআন মাজীদ এভাবেই খ্রিস্টানদের বদ-আকিদাগুলোও নস্যাৎ করে দিয়েছেন তেমনি ইহুদীদের জন্য বিশ্বাসগুলিও বাতিল করে দিয়েছে। (সূরা নিসার ১৫৬ থেকে ১৫৯ নম্বর আয়াত, সূরা মায়েদার ১১০ থেকে ১১৫ নম্বর এবং ৭৫ নম্বর আয়াত, সূরা আলে ইমরানের ৩৩ থেকে ৬০ নম্বর আয়াত, সূরা মারইয়ামের ১৫ নম্বর আয়াত থেকে ৩৭ নম্বর এবং ৮৮ নম্বর থেকে ৯২ নম্বর আয়াতে বিষয়গুলির বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে।)

কুরআনে স্পষ্টতই বলা হয়েছে, ঈসা ইবনে মারইয়াম আল্লাহ তাআলার একজন নৈকট্যপ্রাপ্ত, সম্মানিত ও খাঁটি বান্দা। তিনি ‘কালিমাতুল্লাহ’ অর্থাৎ আল্লাহ তাঁকে নিজের বিশেষ কুদরতে এবং হুকুমে কুমারি মাতার গর্ভে অলৌকিকভাবে সৃষ্টি করেছেন। তাঁর মাতাকে কোনো পুরুষের স্পর্শ নিতে হয়নি। আর তাঁর মাতা মারইয়ামও আল্লাহ পাকের পবিত্র বান্দী ছিলেন, সিদ্দীকা ছিলেন।

ইহুদীরা তাঁর বিষয়ে যা বলে থাকে তা তাঁর পবিত্রতার উপর মহা অপবাদ। এ অপবাদ আরোপের কারণে ইহুদীরা আল্লাহ পাকের নিকট শাস্তির উপযুক্ত, অভিশপ্ত।

(চলবে ইনশাআল্লাহ)

ভাষান্তর : মাহমুদ হাসান মাসরুর

কাদিয়ানী সম্প্রদায় কেন মুসলমান নয় সকল পর্ব 

Series Navigation<< কাদিয়ানী সম্প্রদায় কেন অমুসলিম (পর্ব-০৫)-মাওলানা মুহাম্মাদ মনযূর নুমানী রহ.কাদিয়ানী সম্প্রদায় কেন অমুসলিম (পর্ব-০৭)-মাওলানা মুহাম্মাদ মনযূর নুমানী রহ. >>

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Archives

August 2020
S S M T W T F
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031  
shares