মঙ্গলবার, ৩০শে আষাঢ়, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২২শে জিলক্বদ, ১৪৪১ হিজরী

শিক্ষনীয় ঘটনা 

ঘটনাটি ইমাম কুরতুবী রহ. বর্ণনা করেছেন। তাঁর জন্মস্থান স্পেনের কর্ডোভায়। যে স্পেনে সাতশত বছর মুসলমানরা রাজত্ব করেছে। আজ সেখানে মুসলমান নেই বললেই চলে! সেই স্পেনের কর্ডোভায় ইমাম কুরতুবির বাড়ি হওয়ার সুবাদে তাঁকে কুরতুবী বলা হয়। তিনি ২২ খণ্ডে পবিত্র কুরআনের এক বিশাল তাফসীর গ্রন্থ রচনা করেছেন। যে তাফসীর গ্রন্থের নাম الجامع لاحكام القران এই তাফসীরে তিনি বর্ণনা করেছেন : হযরত ইবরাহীম আ. ছিলেন বড় অতিথি পরায়ণ। কোনো সময় তিনি মেহমান ছাড়া খাবার খেতেন না। গরীব, অসহায়, মিসকীন ডেকে দস্তরখানে বসিয়ে তবেই তিনি খাবার খেতেন। এটা তাঁর চিরাচরিত অভ্যাস ছিল।

একদিনের ঘটনা : দুপুর বেলা। হঠাৎ দেখেন এক ব্যক্তি হন্তদন্ত হয়ে একটি থলে নিয়ে দক্ষিণ দিকে যাচ্ছে। তিনি লোকটিকে ডাকলেন। বললেন, ভাই তুমি কি মুসাফির? লোকটি বলল হ্যাঁ; আমি মুসাফির। ইবরাহীম আ. বললেন, তুমি কি দুপুরের খাবার খেয়েছ? ‘না, দুপুরের খাবার পাইনি!’ লোকটি বলল। ইবরাহীম আ. তখন বললেন, তুমি আসো আমার বাড়িতে! খাবার প্রস্তুত। তোমাকে নিয়ে আমি দুপুরের খাবার গ্রহণ করব। লোকটি তাঁর দাওয়াত গ্রহণ করে তাঁর বাড়িতে আসল। মহান আল্লাহর পয়গম্বর হযরত ইবরাহীম আ. দস্তরখানে বড় মজাদার ও সুস্বাদু খাবার উপস্থিত করলেন। হাত-মুখ ধৌত করার পর মেহমান নিয়ে দস্তরখানে বসলেন। এবার মেহমানকে ইবরাহীম আ. বললেন سم الله আল্লাহর নামে শুরু কর! নাও গোস্ত, নাও বিরানী, নাও যা তোমার মন চায়! লোকটি ছিল মূর্তিপুজারী! সে বিচলিত হয়ে বলল : لا ادرى ما الله হে ইবরাহীম! আল্লাহ কে? আমি তো আল্লাহকে চিনি না! আমি যাকে চিনি না তাঁর নাম নিতে পারব না। তার কথায় হযরত ইবরাহীম আ. নাখোশ হয়ে গেলেন।

তিনি বললেন : পঞ্চাশ বছর হয়ে গেল তোমার! চুল শুভ্র হয়ে গেল, দাঁড়ি পেকে গেল, গোঁফ পেকে গেল এখনো তুমি আল্লাহকে চিন না! আল্লাহর কোনো নাফরমানকে তাঁর নেয়ামত দিয়ে আমি আপ্যায়ন করব না। এরপর হযরত ইবরাহীম আ. ওই ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে বললেন : اخرج তুমি বিদায় নাও। فخرج من عنده منكسرة القلب অর্থাৎ ভগ্ন হৃদয়ে লোকটি ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আল্লামা কুরতুবী রহ.- এর তাফসীরের ভাষা, মেহমানের কলিজাটা ভেঙ্গে গেল। আমাকে দাওয়াত দিয়ে জোর করে মুসলমান বানাতে চায়!

আসমান থেকে জিবরাঈল আ. অবতরণ করলেন। এসে বললেন : হে ইবরাহীম আ.! ان الله تعالى يقول আসমানে যে মহান আল্লাহ বসে আছেন তিনি বলেছেন : কেন আপনি তাকে খাবার দেননি? অথচ আল্লাহ পাক তাকে পঞ্চাশ বছর যাবত খাওয়াচ্ছেন! আর আপনি তাকে দস্তরখান থেকে তাড়িয়ে দিলেন। তার অন্তর ভেঙ্গে দিলেন! মহান আল্লাহ আপনার কাছে জানতে চাচ্ছেন কেন আপনি ওই ব্যক্তিকে দস্তরখান থেকে তাড়িয়ে দিলেন? ان الله تعالى يرزقه منذ خمسين عاما অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা তাকে পঞ্চাশ বছর যাবত খাওয়াচ্ছেন। আর আপনি মাত্র একবেলা তাকে খাওয়াতে পারলেন না। وانت بخلت عليه بلقمة Ñএকলোকমা খাবার দিতে আপনি কৃপণতা করলেন।
হযরত ইবরাহীম আ. বুঝতে সক্ষম হলেন যে, এই ব্যক্তিকে দস্তরখানায় বসিয়ে উপস্থিত খাবার থেকে তাড়িয়ে দেওয়া আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পছন্দ করেননি।

এবার তিনি লোকটির সন্ধানে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লেন। ইতোমধ্যে লোকটি অনেক দূর চলে গেল। হযরত ইবরাহীম আ. দৌঁড়ে গিয়ে লোকটিকে থামালেন। বিনয়ের সঙ্গে বললেন : ভাই! আমাকে ক্ষমা করে দাওÑ আমার ভুল হয়ে গেছে! চলো আমার বাড়িতে। আল্লাহর নাম নিতে হবে না। লোকটি তখন বলল, ইবরাহীম! তুমি আমাকে একবার লজ্জা দিয়েছ! আবারো কি লজ্জা দিতে চাও? চলে যাও। আমি তোমার বাড়িতে আর যাব না। তখন লোকটিকে লক্ষ্য করে ইবরাহীম আ. বললেন : ভাই তুমি যদি আমার বাড়ি না খাও তবে যে আমি বড়ই লজ্জিত হবো! আমাকে লজ্জা দিও না। দয়া করে আমার সঙ্গে চলো। লোকটি বললো : যাবো, তবে এর রহস্য বলতে হবে। তখন হযরত ইবরাহীম আ. পূর্ণ ঘটনার বিবরণ দিলেন।
সব শোনে লোকটি বিস্ময়ে অবাক হয়ে বলল বলো কি ইবরাহীম! যে আল্লাহ তা‘আলাকে আমি জীবনে কোনো দিন ডাকিনি তিনি কি আজ আমার দুপুরের খাবারের খবরও রেখেছেন! অথচ পঞ্চাশ বছর যাবত আমি আল্লাহর দিকে মুখ ফিরাইনি! নামায পড়িনি, রোযা রাখিনি। মূর্তিপূজা করেছি, চন্দ্রপূজা করেছি, সূর্যপূজা করেছি, মাছের, গাছের আরো কত কিছুর পূজা-অর্চনা করেছি! অথচ একবেলা খাইনি বলে যে মহান আল্লাহ খবর রাখেন তার ইবাদত-বন্দেগী কখনোও করিনি??? আর বঞ্চিত থাকতে চাই না।

হে আল্লাহর নবী ইবরাহীম আ.! আমাকে কালেমা পড়িয়ে আল্লাহর খাঁটি বান্দায় পরিণত করুন। অতঃপর লোকটি কালেমা পড়ে হযরত ইবরাহীম আ.-এর হাতে মুসলমান হয়ে গেল।
(সূত্র : আল-জামে লি আহকামিল কুরআন।)

প্রিয় পাঠক! এ ঘটনা থেকে আমরা একথা বুঝতে পারলাম যে, আল্লাহ তা’আলা তাঁর বান্দার উপর কত বড় মেহেরবান ও দয়ালু। যে তাঁকে ডাকে না তাকেও খাওয়ান। তাই দুনিয়ার সব মানুষের উচিৎ মহান আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগী করা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Archives

July 2020
S S M T W T F
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031
shares