Today is Thursday & June 27, 2019 (GMT+06)

New Muslim interview ebook

মুফতি আমিনী রহ. বড় কাটারা মাদরাসার প্রিন্সিপাল হওয়ার প্রেক্ষাপট

মুফতি আমিনী রহ. বড় কাটারা মাদরাসার প্রিন্সিপাল হওয়ার প্রেক্ষাপট থেকে শুরু করে গত পনেরো বছরে সেখানে ঘটে গেছে বেশ কিছু ঘটনা ও দুর্ঘটনা। তবে সেসব নিয়ে কখনো খোলামেলা আলোচনা না হওয়ায় অনেকের মনেই কিছু প্রশ্ন তৈরী হয়েছে। সম্প্রতি কাটারায় হামলার পর অনেকেই আমার কাছে বিষয়গুলো আবারো স্পষ্টভাবে জানতে চেয়েছেন।
সেসব প্রশ্নের উত্তর খুজতেই দ্বারস্থ হয়েছিলাম মুফতি আমিনী রহ. এর জামাতা মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন সাহেবের। যিনি পুরো সময়টাকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন, এবং বড় কাটারা মাদরাসা সংশ্লিষ্ট প্রায় সবকিছুতেই তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন। সাক্ষাতকারটি পড়লে আশা করি বিষয়গুলো স্পষ্ট হয়ে যাবে।

-বড় কাটারা মাদরাসা থেকে পীরজী হুজুরের ছেলে মৌলভী রশিদ সাহেবকে কখন এবং কি কারণে বের করে দেওয়া হয়েছিল?

-রশিদ সাহেব মুহতামিম হওয়ার আগেও প্রায় এক যুগ যাবৎ অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বিরাজ করছিল বড় কাটারা মাদরাসায়। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর ২০০১ সালে রশিদ সাহেব মুহতামিম হলেও পরবর্তী দুই বছর কাটারা মাদরাসায় তার সেচ্ছাচারিতা ও দুর্নীতির কারণে শিক্ষক ও কর্মচারীররা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। একদিকে মাদরাসার টাকায় নিজের পরিবার নিয়ে মাদরাসার সম্পত্তির উপর আবাসন গড়ে তোলা, মাদরাসার অনুদান ভোগ করার পাশাপাশি জীবিকা নির্বাহের জন্য মুরগির ফার্ম বানানো, গাড়ির গ্যারেজ বানিয়ে ভাড়াও দেওয়া অন্যদিকে ছাত্রদের বোর্ডিং চালানোর টাকা না দেওয়া, মাসের পর মাস শিক্ষকদের বেতন বন্ধ রাখা, এইসব কিছু মিলিয়েই ছাত্র-শিক্ষকদের ভেতর একটা চাপা ক্ষোভ তৈরী হয়েছিল। এ কারণে
২০০৩ সালের শুরুর দিকে বড় কাটারা মাদরাসা ছাত্র শিক্ষক এলাকাবাসী মিলে মৌলভী রশিদ সাহেবকে বড় কাটারা মাদরাসা থেকে অপদস্থ করে বের করে দেয়।

-রশিদ সাহেব বহিষ্কৃত হওয়ার পর মুফতি আমিনী রহ. কিভাবে বড় কাটারা মাদরাসার মুহতামিম হলেন?

-রশিদ সাহেবকে বের করে দিয়ে ছাত্র শিক্ষক ও এলাকাবাসী মুফতি আমিনী রহ. এর কাছে এসে কাটারার প্রিন্সিপাল হওয়ার আবেদন জানান। আমিনী রহ. তখন সংসদ সদস্য। কিন্তু ছাত্র শিক্ষকদের অনেক অনুরোধের পরও আমিনী সাহেব কোনভাবেই বড় কাটারার মুহতামিম হতে রাজি হননি। খুব পীড়াপীড়ির পর তারা হুজুরের হাতে পায়ে পড়ে কান্নাকাটি শুরু করে। এরপর হুজুর আকাবেরদের এই প্রতিষ্ঠানটি রক্ষার স্বার্থে একটি উদ্যোগ গ্রহণ করেন। জীবনের শেষ সময় যেই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালন করেছেন পীরজী হুজুর রহ.।
প্রথমে আমিনী সাহেব এলাকাবাসীদের নিয়ে বসেন। তারা বিগত সময়ের সকল অবস্থা তুলে ধরে আমিনী সাহেবকে আবার দায়িত্ব গ্রহণের অনুরোধ করেন।
এলাকার লোকদের সাথে পরপর তিনবার মিটিং শেষে একটি অস্থায়ী কমিটি গঠিত হয় এলাকার লোকদের নিয়ে। এই কমিটি মুতাওয়াল্লি নিয়োগে ভূমিকা রাখবে।

-মুফতি আমিনী রহ. কি তখন শুধুমাত্র ছাত্র-শিক্ষক ও এলাকার মানুষদের অনুরোধেই বড় কাটারার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন?

-না। এরপর আমিনী সাহেব ঢাকার বড় বড় মাদরসারা মুহতামিমদের ডেকেছিলেন। উনারা সকলেই পরিস্থিতি বিবেচনা করে আমিনী সাহেবকে বললেন, “যেহেতু আকাবেরদের প্রতিষ্ঠান আপনিই এটার দায়িত্ব গ্রহণ করুন”।
অত:পর গঠিত সেই অস্থায়ী কমিটি ও ওলামায়ে কেরামের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী সাহেবকে সভাপতি ও আমিনী সাহেবকে মুতাওয়াল্লি করে একটি প্রস্তাবনা কমিটি ওয়াকফ অফিসের কাছে পেশ করে।
এবং ২০০৩ এর শেষেরদিকে ওয়াকফ অফিস সেই প্রস্তাবনা গ্রহণ করে আমিনী সাহেবকে মুতাওয়াল্লি নির্ধারণ করা হয়। এইভাবে আইনী জটিলতার নিরসন করে আমিনী সাহেব প্রিন্সিপালের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

-আমিনী রহ. প্রিন্সিপাল হওয়ার পর রশিদ সাহেব পুনরায় বড় কাটারা মাদরাসা দখলে কি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন?

-আমনী সাহেবকে মুতাওয়াল্লি ঘোষণা করে দেওয়ার পর রশিদ সাহেব ওয়াকফ অফিসের দ্বারস্থ হয়। অভিযোগ জানায় যে কাগজপত্র অনুযায়ী তার মুতাওয়াল্লি থাকার কথা।
তার অভিযোগের প্রেক্ষিতে ওয়াকফ অফিস কাগজপত্র সত্যতা যাচাই করে ও তদন্ত করতে সরেজমিন থেকে রিপোর্ট নেয়। সেই তদন্তে বেরিয়ে আসে রশিদের দুর্নীতির বিশাল ফিরিস্তি।
এরপর ওয়াকফ অফিস থেকে রশিদ সাহেবকে তার মুহতামিম থাকাকালীন সময়ের আয় ব্যায়ের হিসেব চাওয়া হয়। এবং রশিদ সাহেব সে হিসাবে দিতে ব্যর্থ হন।
এসব কিছু আমলে নিয়ে ওয়াকফ অফিস থেকে রশিদ সাহেবকে মুতাওয়াল্লির দায়িত্ব থেকে বরখাস্ত করা হয়। এবং অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করা হয়।

-রশিদ সাহেবের শিক্ষাগত যোগ্যতা কি ছিল?

– উনাকে বড় কাটারার যেসব উস্তাদরা দেখেছেন তারা জানিয়েছেন উনি কওমী মাদরাসার হিফজ বা কিতাব বিভাগ কোনটাতেই পড়েননি। স্কুল থেকে ক্লাস এইট পাশ করে বেরিয়েছেন। মক্তবে কিছু পড়ালেখা করেছে। এরপর বাবার ইন্তেকালের পর তাবীজ ও পানিপড়া দিয়ে জীবিকা নির্বাহ শুরু করেন।

-বড়কাটারা মাদরাসার জায়গার মধ্যে কোন অংশ কি পিরজী হুজুরের ব্যক্তিগত সম্পত্তির অন্তর্ভুক্ত ছিল?

– বড় কাটারা মাদরাসার পুরো জায়গাটাই ওয়াকফ এস্টেট। কিছু জায়গার দাতা ছিলেন হোসাইন আহমদ সাহেব। আর কিছু জায়গা পীরজী হুজুর রহ. কিনে মাদরাসার নামে ওয়াকফ করেছিলেন। সেই জায়গার দলিলে এই বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে পিরজী হুজুর উল্লেখ করে লিখেছেন যে “আমি জনগণ থেকে অনুদান উঠাইয়া কিছু জায়গা নিজের নামে খরিদ করিয়া তাহা মাদরাসার নামে ওয়াকফ করিলাম”।
এই ওয়াকফ দলিল যখন রশিদের সামনে আসে তখন সে বলে যে আমার বাবা ভুল করেছে। এক বিঘা সম্পত্তি উনার সন্তানদের আছে। বাবা ভুলে সব ওয়াকফ করে দিয়েছে।
সে তার দখলের পক্ষে একটা ভুয়া দলিল তৈরী করছে “ওয়াকফ লিল আওলাদ” এর ভিত্তিতে। অথচ পিরজী হুজুরের মাদরাসার নামে পুরো জায়গার ওয়াকফটা আসলে “ওয়াকফ লিল্লাহ” ছিল। এই ভুয়া কাজগুলো রশিদ সাহেব মুহতামিম থাকাকালে তৈরী করেছিলেন। কিন্তু ওয়াকফ অফিস দ্বারস্থ হওয়ার পরই তার সেই জালিয়াতি ধরা পড়ে যায়।

-মুফতি আমিনী রহ ও কাটারা কর্তৃপক্ষের নামে রশিদ সাহেব কি কি অভিযোগে মামলা করেছিলেন?

-রশিদ সাহেব ওয়াকফ অফিস কর্তৃক বহিষ্কৃত হওয়ার পরই কাটারা মাদরাসা দখলের অভিযোগে প্রথম মামলাটি করেন। এবং এই মামলায় আমিনী সাহেব বা লালবাগের কারো নাম ছিল না। মামলাটি ছিল মুতাওয়াল্লি নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে। অভিযোগ ছিল ওয়াকফ অফিসের নিয়োগ পদ্ধতি সঠিক হয়নাই।
এতেই স্পষ্ট হয়ে যায় যে রশিদ সাহেবও বেশ ভাল মতই জানতেন মুফতি আমিনী রহ. তাকে কাটারা থেকে বের করেন নি।
এই মামলায় কোন আশানুরূপ ফলাফল না পেয়ে রশিদ সাহেব তার সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে কাটারায় হামলা করা শুরু করে। এবং প্রত্যেক হামলার পরই একটা করে মামলা করেন। এই অভিযোগে যে তার বাড়িতে তাকে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। তখন আমিনী সাহেবের নামেও তিনি মামলা দিতে শুরু করেন। গত পনেরো বছরে আমিনী সাহেবের সাথে আমাদের আসামী করে তিনি মোট বাইশটা মামলা করেছে।

-রশিদ সাহেবের এই মিথ্যা মামলাগুলো প্রতিহত করতে মুফতি আমিনী রহ. কি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন?

-আমিনী সাহেব কখনো তার বিরুদ্ধে মামলা করেননি। তবে বাদী হয়ে যেসব মামলা রশিদ সাহেব করেছিলেন সেগুলোর আইনী লড়াই লড়ে গেছেন। রশিদ সাহেবের ব্যাপারে মুফতি আমিনী রহ. একটা নীতি ছিল। আমিনী রহ. বলতেন, “রশিদ নিজেকে না চিনুক, আমরা তাকে চিনি যে সে পীরজী হুজুরের ছেলে। অতএব এই নিসবতকে সম্মান করেই আমমরা তার বিরুদ্ধে কোন একশন নিব না”।
এমন কয়েকবার ঘটেছে যে হামলা করতে এসে রশিদ নিজেই ছাত্রদের হাতে কাছে ধরাশায়ী হয়েছে। আর আমিনী সাহেব তাকে মারতে নিষেধ করে বিদায় করে দেওয়ার আদেশ দিয়েছেন।

-আমিনী রহ. এর তো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ছিল। রশিদ সাহেব কি কখনো এর সুযোগ নিয়েছেন?

– রশিদ সাহেব বেশ ভালভাবেই এর সুযোগ নিয়েছিলেন। আওয়ামীলীগ যখন ক্ষমতায় আসে তখন তিনি আওয়ামীলীগে যোগ দেন। তার ছেলেরা যোগ দেয় যুবলীগে। এবং গল্প সাজায় যে ২০০৩ সালে তৎকালীন সংসদ সদস্য নাসির উদ্দিন পিন্টুকে সাথে নিয়ে আমিনী সাহেব বড় কাটারা মাদরাসা দখল করেছিল। অথচ মুফতি আমিনী রহ. এর কাটারার মুহতামিম হওয়ার ঘটনায় নাসির উদ্দিন পিন্টুর কোন সংশ্লিষ্টতাই ছিল না।
আবার মাদরাসার একটি বাড়ি দখল করে যে রশিদ সাহেব এখনো ভাড়া উঠিয়ে খাচ্ছেন সেক্ষেত্রে বিএনপির আমলে সম্পূর্ণ সহায়তা নিয়েছেন সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার কাছ থেকে। এইভাবে তিনি পীরজী হুজুরের ছেলে হওয়ার পরিচয়কে কাজে লাগিয়ে ক্ষমতাসীন দল থেকে ফায়দা গ্রহণ করে গেছেন।

-রশিদ সাহেবের এত হামলা ও ক্ষমতার প্রয়োগের পরও মাদরাসা কিভাবে এখনো টিকে আছে?

-এখানে একটা বিষয় আমাদের কাছে স্পষ্ট যে আল্লাহ তায়ালা নিজেই তার দ্বীনী প্রতিষ্ঠানকে রক্ষা করছেন। এটা আমিনী সাহেব প্রায়ই আমাদের মনে করিয়ে দিতেন। আমিনী সাহেব শুধু প্রতিষ্ঠানকে বাচানোর প্রচেষ্টা করে গেছেন। সাহায্য যা এসেছে সব আল্লাহর পক্ষ থেকেই। নাহলে সম্প্রতি যে হামলা হয়েছিল এতে প্রশাসনসহ দুনিয়ার কোন আসবাবই আমাদের পক্ষে ছিল না। এরপরও আল্লাহ তার প্রতিষ্ঠানকে জালেমের হাত থেকে রক্ষা করেছেন। এর আগে ২০০৯ সালের ১লা মে সালে রশিদ সাহেব কাটারা মাদরাসায় সবচেয়ে বড় আক্রমণটি করেছিলেন। সাথে নিয়ে এসেছিলেন পুরান ঢাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী দিলু মাস্তানকে। সেবার ৭০০ সন্ত্রাসী নিয়ে হামলা হয়েছিল। মাগরিবের পর থেকে রাত একটা পর্যন্ত মাদরাসার ভেতরে ঢুকার প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়েছে তারা। মাদরাসার চতুর্দিকে ২০ টা মই লাগিয়ে মাদরায় উঠার চেষ্টা করেছিল।
আওয়ামীলীগ তখন মাত্র ক্ষমতায় এসেছে। তাই প্রশাসনও পুরাপুরি ওদের পক্ষে ছিল। আধাঘণ্টা পর পর ফোন করে বলা হচ্ছিল, প্রশাসনের লোকেরা মাদরাসায় ঢুকে সার্চ করবে। এবং স্বাভাবিকভাবেই পুলিশ ঢুকে তখন ছাত্রদের গ্রেফতার করতো। কারণ সবাই উপর থেকে ইট পাটকেল ছুড়ে সন্ত্রাসীদের মই বেয়ে দেয়ালে ওঠা থেকে বাধা দিয়ে যাচ্ছিল। আর পুলিশ মাদরাসায় ঢুকে গেলেই সন্ত্রাসীরা মাদরাসা দখলে নিয়ে নিত।
কিন্তু কোন এক অজানা কারণে সেদিন তারা ব্যর্থ হয়ে ফিরে যায়। অবশ্যই আল্লাহ তায়ালার গায়েবী মদদ ছিল। তার কিছুদিন পর জানা যায়, সেই শীর্ষ সন্ত্রাসী দিলু মাস্তান ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছে।
এভাবেই আল্লাহ তায়ালা তার এই দ্বীনী প্রতিষ্ঠানকে এক যুগ ধরে রক্ষা করে আসছেন।

সংগ্রিহিত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *