Today is Tuesday & July 16, 2019 (GMT+06)

New Muslim interview ebook

প্রসঙ্গ কওমী মাদরাসার চাঁদা সংগ্রহ এবং আমার অভিজ্ঞতা (এক) – লিসানুল হক

আমরা ছাত্রজীবন থেকেই মাদরাসার জন্যে চাঁদা সংগ্রহ করি ৷ চাঁদার জন্যে আমরা কোনো অমুসলিমের কাছে যাই না ৷ ইসলামের জন্যে মুসলমানের কাছেই যাই ৷ কিছু মুসলমান অবুঝ ৷ কিছু মুসলমান অহংকারী ৷ কিছু মুসলমান সম্পদের অহমিকায় মত্ত ৷ কিছু মুসলমান জেনারেল লাইনে পড়ে নাম কে ওয়াস্তে মুসলমান ৷ কিছু মুসলমান স্বভাবগত নীচ ৷ কিছু মুসলমান ভিন্নমতের কারণে হিংসুক অথবা প্রতিহিংসাপরায়ণ ৷ কিছু মুসলমান সম্পদ আছে, কিন্তু মূর্খতার কারণে বিত্তশালী হওয়াকেই নিজেদের জন্যে সম্মানজনক মনে করে ৷ কিছু মুসলমান ছোটখাটো কোনো পদের অধিকারী হয়ে বাকি মুসলমান বিশেষতঃ আলেমদের ব্যাপারে তাদের নিম্ন ধারণা পোষণ ৷ অল্পসংখ্যক মুসলমান আছে যাদের জ্ঞান কম হলেও দ্বীনের সমঝ আছে; তারাই শুধু শতভাগ বিশ্বাস নিয়ে দ্বীনি মাদরাসায় চাঁদা, সদকা ও যাকাত প্রদান করে ৷

চাঁদা সংগ্রহের কারণে শুধু আলেমদের দিকে আঙ্গুল তোলা এটা জ্ঞানীসুলভ আচরণ নয়, বরং মূর্খতার পরিচায়ক ৷ চাঁদা কেউ কম করে না ৷ কেউ চেয়ারে বসে পায়ের উপর পা তোলে করে ৷ আর কেউ রাস্তায় নেমে বিনয়ের সহিত করে ৷ দ্বীন কারো ব্যক্তিগত সম্পদ নয় ৷ দ্বীনের হেফাযতের দায়িত্ব নির্বিশেষে সমস্ত মুসলমানের ৷ দ্বীনি প্রতিষ্ঠান কারো ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নয় ৷ ব্যক্তিগত অর্থে প্রতিষ্ঠান চলে না ৷ সমস্ত মুসলমানের অনুদানের বদৌলতেই প্রতিষ্ঠান চলে ৷ কিন্তু তথাকথিত বিত্তশালীদের তাচ্ছিল্যের নজরদাতা মুসলমান মনে করে আলেমরা ফকির ৷ এতে অবশ্য আলেমদের মান ইজ্জত যায় না ৷ কারণ অন্ধ যদি সূর্য না দেখে সেটা সূর্যের দোষ নয় ৷

স্কুল-কলেজ ও সরকারি মাদরাসায় যে অর্থ আসে সেটাও জনগণের টাকা ৷ সরকারের পৈতৃক সম্পত্তি থেকে কোনো প্রতিষ্ঠান চলে না ৷ অনেক স্কুল, কলেজ ও সরকারি মাদরাসার জায়গা দাতা ব্যক্তিই হয়ে থাকে ৷ ওটাও তো চাঁদা ৷ আমাদের মাদরাসার জায়গা দিয়েছেন মাওলানা জমীর উদ্দীন সাহেব রহঃ ৷ এর পাশেই নানুপুর আবু সোবহান উচ্চ বিদ্যালয়ের দাতাও আবু সোবহান নামক এক ব্যক্তি ৷ নানুপুর লায়লা কবির ডিগ্রি কলেজের দাতাও ফটিকছড়ির তৎকালিন এমপি মরহুম রফিকুল আনোয়ার ৷

ফুটবল, ক্রিকেট টুর্নামেন্টের জন্যে চাঁদা সংগ্রহ করা হয় ৷ নির্বাচনের তহবিল সংগ্রহ করা হয় ৷ পদ্মাসেতুর জন্যে চাঁদা সংগ্রহ করা হয় ৷ দলের কারাবন্দী কর্মীর জন্যে চাঁদা সংগ্রহ করা হয় ৷ এসবের জন্যে কোনো অভিযোগ নেই ৷ অথচ ওগুলো দ্বীনি বিষয়ও নয় ৷ অধিকাংশ পূণ্যের বিষয়ও নয় ৷ কিন্তু মাদরাসার আলেমরা চাঁদা তুললেই সেটা ভিক্ষা হয়ে যায়! চাঁদা, সদকা ও যাকাত প্রদান ব্যক্তির বাহাদুরী নয় ৷ বরং আল্লাহ প্রদত্ত সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় দেওয়ার জন্যে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের বিষয় ৷ বরং কোনো দাতা যদি গ্রহীতাকে ফকির ভেবে দান করে তার দান তার মুখেই নিক্ষেপ করা হয় ৷

অনেক মাওলানা সাবও দলিল দেন اليد العليا خير من اليد السفلي দিয়ে ৷ অথচ এ হাদীসের ব্যাখ্যাও পড়ে দেখার সময় তাদের নেই ৷ আমরা চাঁদার মওসুমে চাঁদা সংগ্রহ করার সময় অপমানিতও হই সম্মানিতও হই ৷ আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি সমাজের নীচ লোকেরা পাঁচ টাকা দিতে পাঁচ হাজার টাকার মন্দ কথা বলে ৷ আর অভিজাত বংশের মানুষগুলো পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে বলে, মন চায় সব সম্পদ উজাড় করে দিই দ্বীনের জন্যে, কিন্তু তাওফীক যে নেই ৷ অনেককে দেখেছি এসি রুমে বসিয়ে আতিথেয়তা করে ইনভেলাপে ভরে চাঁদা দেয় ৷

সত্য তো এটাই যে, চাঁদা ও যাকাত প্রদানে ব্যক্তির ব্যক্তিত্বও প্রকাশ হয়ে যায় ৷ মুসলমানের মুসলমানীর পরিমাপ হয়ে যায় ৷ হযরত আবু বকর রাঃ চুলোর ছাই এনে বলেন ঘরে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে রেখে এসেছি ৷ হযরত উমর রাঃ অর্ধেক দিয়ে বলেন, হায় আবু বকরের সাথে কখনো জিততে পারলাম না ৷ এ কারণেই আমি ব্যক্তিগতভাবে মানুষের দুর্ব্যবহার পেয়ে সাময়িক কষ্ট পেলেও কখনোই মনক্ষুন্ন হইনি ৷ কারণ আমি কারো দুয়ারে নিজের জন্যে যাইনি ৷ আল্লাহর বান্দার কাছে আল্লাহর জন্যে হাত পেতেছিলাম ৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *