শনিবার, ৪ঠা আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২রা সফর, ১৪৪২ হিজরি

দাওয়াত ও তাবলিগ এর মেহনত কি? লাভ কি?? বিশ্ব ইজতেমা কি??

তাবলিগ’ শব্দের আভিধানিক অর্থ প্রচার করা, প্রসার করা, ইসলামের দাওয়াত দেওয়া, বয়ান করা, প্রচেষ্টা করা বা পৌঁছানো প্রভৃতি। পরিভাষায় একজনের অর্জিত জ্ঞান বা শিক্ষা নিজ ইচ্ছা ও চেষ্টার মাধ্যমে অন্যের কাছে পৌঁছানো বা অপরকে শিক্ষা দেওয়াকে তাবলিগ বলা হয়।
তাবলিগের মুখ্য উদ্দেশ্য আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর সঙ্গে মানুষের পরিচয় ও সম্পর্ক হওয়া, যাতে তাঁর কাছ থেকে সব সমস্যার সমাধান লাভ করে ইহকাল ও পরকালে শান্তি সফলতা পায়। ধর্মপ্রাণ মানুষ আত্মশুদ্ধি ও তাকওয়া অর্জনের মাধ্যমে সমাজজীবনে নানা রকম সামাজিক অনাচার থেকে নিজে বিরত থাকতে পারেন এবং অন‍্যকে বিরত রাখতে পারেন। ইসলাম ধর্মের মৌলিক নীতি, আদর্শ ও শিক্ষাবলি অন্যের কাছে সহজভাবে পৌঁছে দেওয়াই হলো তাবলিগ।ঈমান ,আমল মজবুত করে লক্ষ্যে শিরক মুক্ত ঈমান এবং বিদ‌আত মুক্ত আমল যেন সবার জীন্দেগীতে এসে যায় তার জন্য‌ই এই মেহনত।

আর ‘ইজতেমা’ শব্দের অর্থ সমবেত করা, সভা-সমাবেশ বা সম্মেলন। আর বিশ্ব ইজতেমা বলতে সমগ্র বিশ্বের সকল মুসলমান‌দের একত্রিত হ‌ওয়াকে বুঝায়।ধর্মীয় কোনো কাজের জন্য বহুসংখ্যক মানুষকে একত্রিত করা, কাজের গুরুত্ব বোঝানো, কাজটি যথাযথভাবে সম্পন্ন করার জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং ব্যাপকভাবে এর প্রচার, প্রসারের জন্য বলিষ্ঠ পদক্ষেপ গ্রহণ করা ইত্যাদিবিষয়কে ইসলামের পরিভাষায় ইজতেমা বলা হয়ে থাকে। নবী করিম (সা.)-এর মুখ নিঃসৃত শাশ্বত বাণী ‘তোমার কাছে যদি কোনো বাণী থাকে, তা অন্যের কাছে পৌঁছে দাও’-কে আহ্বান করে ঢাকার অদূরে টঙ্গীর তুরাগ নদীর তীরে প্রতিবছর অনুষ্ঠিত হচ্ছে তাবলিগ জামাতের উদ্যোগে মুসলিম জাহানের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমাবেশ বিশ্ব ইজতেমা।

বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রাম-শহর-বন্দর থেকে লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলমান এ মহাসম্মেলনে সমবেত হন। একই সঙ্গে বিশ্বের শতাধিক দেশ থেকে লাখ লাঠ তাবলিগের সাথী ঈমানদার মুসল্লি মিলিত হন। তাঁরা কোনো রকম বৈষয়িক লাভের আশা না করে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দ্বীনের মেহনত করে ইজতেমা ময়দানকে মুসলিম মহামিলনের জন্য প্রস্তুত করে তুলেন।ইসলাম প্রচারে তাবলিগ জামাতের মুসল্লিদের আল্লাহর পথে মানুষকে আহ্বানের যে নিরন্তর প্রচেষ্টা, যে গভীর আন্তরিকতা এরই এক প্রাণবন্তময় বহিঃপ্রকাশ বিশ্ব ইজতেমা। এখান থেকে সবাই জামায়াত‌বদ্ধ হয়ে দেশ -বিদেশে ছড়িয়ে পড়েন।ধর্মের কাজে তাঁরা একদিকে নিজেকে পরিশুদ্ধ ও উন্নত করার জন্য, অন্যদিকে যারা উদাসীন তাদের ধর্মের প্রতি আহ্বান করতে অনেক ত্যাগ স্বীকার করেন। দুনিয়া ও আখিরাতে মানুষের আত্মিক প্রশান্তি লাভের জন্য বিশ্ব ইজতেমা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

মুসল্লিরা আল্লাহর দ্বীন ইসলাম প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পাগলপারা ও নবীপ্রেমিক হয়ে ঘর-বাড়ি, আরাম-আয়েশ ত্যাগ করে বিশ্ব ইজতেমায় সম্মিলিতহন। বিশ্ববরেণ্য আলেমসমাজ, ধর্মীয় নেতারা বিশ্ব ইজতেমায় শামিল হয়ে ইসলামের শাশ্বত বাণী বয়ান করেন এবং মানুষকে ধর্মের পথে জীবন পরিচালনার জন্য উদাত্ত কণ্ঠে আহ্বান জানান।মানবজাতির আদি পিতা হজরত আদম (আ.)-এর মাধ্যমে দুনিয়ার ইতিহাসে তাবলিগ শুরু হয়।

আল্লাহর একত্ববাদ প্রচারের জন্য অসংখ্য নবী ও রাসুল প্রেরণ করা হয়েছে। যেহেতু আর কোনো নবী-রাসুল দুনিয়াতে আসবেন না, তাই তাবলিগের আমলের দায়িত্ব ইসলামের সর্বশেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর উম্মতদের। দশম হিজরিতে আরাফাতের ময়দানে বিদায় হজের ভাষণে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছিলেন, ‘আমিই সর্বশেষ নবী, বিধায় নবুওয়াত ও রিসালাতের অব্যাহত ধারার এখানেই পরিসমাপ্তি। অনাগত কালের মানুষের জন্য দ্বীনের পরিচয় বিধৃত আল কোরআন ও সুন্নাহ রেখে গেলাম। এগুলো মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব তোমাদের।’ সাহাবিরা এ অনুপ্রাণিত বক্তব্য শোনার পরপরই তাবলিগ করার জন্য সারা পৃথিবীতে সফর করেন। এভাবে অনেক সাহাবায়ে কিরাম, তাবেঈন, তাবে-তাবেঈন, ওলি-আউলিয়া, সুফি-দরবেশ ও হাক্কানি আলেম সমাজের কঠোর ত্যাগ-তিতিক্ষা ও বিসর্জনের জন্য তাবলিগের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ইসলাম প্রচার ও প্রসার লাভ করেছে। আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, ‘তোমরাই সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি; মানবজাতির কল্যাণের জন্য তোমাদের নির্বাচন করা হয়েছে। তোমরা মানুষকে সত্ কাজের আদেশ করবে ও অসত্ কাজ থেকে নিষেধ করবে, আর তোমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে।’ (সূরা আলে ইমরান, আয়াত-১১০)

মুসলমানদের ধর্ম, ঈমান, আমল, ঐতিহ্য রক্ষা করে চলার জন্য প্রয়োজন ইসলামের অনুসারীদের জাতীয় ঐক্য এবং বিশ্ব মুসলিমের ভ্রাতৃত্ববোধ সুদৃঢ় করা। বিধিবদ্ধ ইবাদত ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো পালনের মাধ্যমে বিশ্ব মুসলিমের ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যের বন্ধন সুদৃঢ় ও মজবুত হয়।‘কালেমা, নামাজ, ইল্ম ও জিকর, ইকরামুল মুসলেমিন (মানুষের উপকার), ইখলাছ-ই-নিয়ত এবং দাওয়াতে তাবলিগ’-এ ছয়টি উসুলবা মূলনীতি সামনে রেখে তাবলিগ জামাত বিশ্ব ইজতেমায় প্রতি ওয়াক্ত নামাজে ঈমান ও আমলের সমন্বয়ে তাদের দাওয়াতি কাজ করে যাচ্ছে। তাঁরা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে বিভক্ত হয়ে ধর্মের দাওয়াত নিয়ে গ্রামে-গঞ্জে, শহরে-বন্দরে সারা বছর মানুষের পিঠে হাত বুলিয়ে আল্লাহ‌র পথে ডাকেন। দুনিয়ার প্রত‍্যেকটি মানুষ যেন আল্লাহ‌ওয়ালা হয়ে যায় সেইজন্যই এই নিরলস মেহনত।
এ চলমান প্রক্রিয়া শুধু বাংলাদেশে নয়—এশিয়া, মধ‍্যপ্রাচ‍্য,আফ্রিকা,ইউরোপ,আমেরিকা,অস্ট্রেলিয়া সহ পৃথিবীর সব রাষ্ট্রে আল্লাহর রহমতে দ্বারা আল্লাহ‌ই করাচ্ছেন।আলহামদুলিল্লাহ।

আল্লাহ আমাদেরকে কবুল করুন।সমগ্র বিশ্ববাসীকে হেদায়েত দান করুন।আমিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Archives

September 2020
S S M T W T F
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930  
shares