মঙ্গলবার, ৪ঠা কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৩রা রবিউল আউয়াল, ১৪৪২ হিজরি

কাদিয়ানী মতবাদ এবং খতমে নবুওয়ত: – আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আবদুল জলীল মাদানী


কাদিয়ানী মতবাদ এবং খতমে নবুওয়ত

আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আবদুল জলীল মাদানী

:الحمد لله و الصلاة و السلام على رسول الله أما بعد

আরব সহ সমগ্র বিশ্ব তখন গভীর তিমিরে আচ্ছন্ন। সর্বত্র বিরাজ করছে এক প্রকার গুমোট অস্থিরতা। এমনি এক মুহূর্তে মক্কার আকাশে নতুন এক সূর্যের আবির্ভাব হল। সে সূর্য হল নবুওয়তের সূর্য। আলোকিত হয়ে উঠল মক্কার আকাশ। ঘরে ঘরে পৌঁছতে লাগল আলোক রশ্মি। নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মানুষকে সে আলোর পথে ডাকতে থাকলেন। অন্ধকারের অলি-গলি পার হয়ে অসংখ্য মানুষ খুঁজে পেলেন সত্যের পথ। ক্রমেই দিক-দিগন্তে আলোর পরিধি বাড়তে থাকল।

কিন্তু! আঁধারেই যাদের বসবাস তারা তো আলোকে সহ্য করতে পারেনা। বাদুড় তো চিরদিনই সূর্যের বিরোধিতা করবেই। তাই বলে সূর্য উঠা কি বন্ধ হয়ে যাবে?

একদল লোক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আওয়াজকে নিস্তব্ধ করার জন্য উঠে পড়ে লাগল। কিন্তু এ আওয়াজ তো বন্ধ হওয়ার নয়। বরং মরুভূমির প্রচণ্ড ঝড়ো হাওয়ার সাথে তা আছড়ে পড়ল পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে। ফলে তারা হিংসা-বিদ্বেষ আর অন্তর জ্বালায় জলে-পুড়ে ছারখার হতে থাকল। এভাবে ইসলামের আলো আস্তে আস্তে বিশ্বব্যাপী বিস্তার লাভ করল। আল্লাহর বাণী চির সত্য। তিনি বলেন: “তারা তো মুখের ফুঁৎকারে আল্লাহর আলোকে নিভিয়ে দিতে চায় কিন্তু আল্লাহ তাঁর আলোকে পূর্ণতা দান করবেনই যদিও কাফেরেরা তা অপছন্দ করে।” (সূরা আস সাফ্‌ফ: ৮)

কিন্তু ওসব হিংসুক কাফেরের দল বসে রইল না। বরং নানা কুট কৌশল আর ষড়যন্ত্রের জাল বুনতে থাকল। কিভাবে ইসলামের অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করা যায়। ফলে মুসলমানদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ইবনে সাবা নামক ইহুদীকে ঢুকিয়ে দেয়া হল। সে মুসলমানদের মাঝে বিভিন্ন দল-উপদল সৃষ্টি করে তাদেরকে বিভক্ত করে ফেলল। আলী (রা:) কে কেন্দ্র করে শিয়া দলের সৃষ্টি হল।

▪ ইসলামের পোশাক পরে শত্রু:

এর পর মুসলমানদের এ বিভক্তির দুর্বলতাকে সুযোগ মনে করে তারা ইসলামী দেশগুলোতে সামরিক আক্রমণের মাধ্যমে দখল করে নেওয়ার জন্য সর্ব সর্বশক্তি নিয়োগ করল। কিন্তু আল্লাহর রহমত এবং অকুতোভয় মুসলিম সৈনিকদের সাহসী প্রতিরোধে তারা বিভিন্ন যুদ্ধে পরাজয় বরণ করতে থাকে। পরিশেষে সামরিক দিক দিয়ে মুসলমানদের কাছে ব্যর্থ হওয়ার পর শত্রুরা আবার তাদের সেই পুরনো পদ্ধতিতে ফিরে আসল। ইসলামী দেশগুলোতে ইসলামের পোশাক পরিয়ে বিভিন্ন দালাল তৈরি করল। ইরানে সে সমস্ত দালালদের একজন হল মির্যা হুসাইন বিন আলী বাহাঈ। সে বাাহাঈ দল সৃষ্টি করে ঘোষণা করল কুরআন ভুল-ভ্রান্তিতে ভরা। আরও ঘোষণা করল, সে মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর শরীয়তকে বিলুপ্ত কারী। কিন্তু মুসলমানগণ তার এ প্রকাশ্য ঘোষণার কারণে খুব সহজে তার আসল পরিচয় পেয়ে গেল। ফলে তাকে ঘৃণ্য ভাবে প্রত্যাখ্যান করায় তার এ ষড়যন্ত্রও মুখ থুবড়ে পড়ল।

▪ভণ্ডামির নানান রূপ:

গোলাম আহমাদ ছিল অত্যন্ত ধূর্ত ও চালবাজ। সে অত্যন্ত সুকৌশলে মুসলমানদের মাঝে তার ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করতে থাকে। প্রথমে সে নিজেকে একজন মুজাদ্দিদ বা মহান সংস্কারক, তারপর ইমাম মাহদী, কখনো বা নিজেকে ঈসা আলাইহিস সালাম দাবী করে। তারপর নিজেকে ‘ছায়া নবী’ সবশেষে একজন ‘পূর্ণ নবী’ বলে জোরেশোরে প্রচার চালাতে থাকে। শরীয়তের অনেক বিধান রহিত ঘোষণা করে এবং অনেক হুকুম-আকহাম রদবদল করতে থাকে। একদল লোককে তার অনুসারী হিসেবে পেয়ে যায়। তাদেরকে নিয়ে দল প্রতিষ্ঠা করে নাম দেয় ‘আহমদিয়া মুসলিম জামাত’।

▪ মুসলিম বিশ্ব এবং বাংলাদেশ:

প্রায় সবকটি মুসলিম দেশে ‘আহমদীয়া মুসলিম জামাত’ ও এ দলের অনুসারী কাদিয়ানীদেরকে সরকারীভাবে অমুসলিম ঘোষণা করে তাদের যাবতীয় বই-পুস্তক, ও কার্যক্রমকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ বাংলাদেশে তাদেরকে আজো অমুসলিম ঘোষণা করা হয়নি । যার কারণে বর্তমানে তারা আমাদের দেশে প্রকাশ্যে তাদের অপ তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।

▪সাম্রাজ্যবাদ শাসন এবং ভণ্ড নবীর আবির্ভাব:

অবিভক্ত ভারতে তখন সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজদের শাসনের নামে শোষণ চলছে। তাদের জুলুম-নির্যাতনে মানুষ দিশেহারা। সর্বত্র বিদ্রোহের গুঞ্জরন। মুসলমানগণ ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে জিহাদের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এমনি একটি মুহূর্তে ইংরেজ শাসকগণ তাদের হাতে গড়া দালাল মির্যা গোলাম আহমাদ কাদিয়ানীকে মুসলমানদের মুখোমুখি এনে দাঁড় করিয়ে দিল। প্রথম পর্যায়ে সে নিজেরকে ইসলামের একজন একনিষ্ঠ খাদেম হিসেবে প্রকাশ করল। কিন্তু কিছু দিন যেতে না যেতেই নিজেকে আল্লাহর নবী হিসেবে ঘোষণা করল। তারপর যা হবার তাই হল। শুরু হল ইসলাম সম্পর্কে নানা অপব্যাখ্যা। আল্লাহ, রাসূল, নবী, নবুওয়ত, সাহাবায়ে কেরাম, কুরআন, ওহী, জিহাদ, মদ ইত্যাদি নানা বিষয়ে জঘন্য বিভ্রান্তিমূলক এবং আপত্তিকর বক্তব্য দেয়া শুরু করল। উপনেবিশবাদী ব্রিটিশ-বেনিয়াদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের জিহাদকে নাজায়েয বলে ফাতাওয়া জারি করল।

যা হোক, নিম্নে আমরা কেবল ‘খতমে নবুওয়াত’ সর্ম্পকে তার অপব্যাখ্যা এবং কুরআন ও হাদীসের আলোকে এর জবাব সংক্ষেপে উপস্থাপন করব ইনশাআল্লাহ।

❖ খতমে নবুওয়তের ব্যাপারে কাদিয়ানীদের বক্তব্য এবং তার খণ্ডন:

গোলাম আহমদ কাদিয়ানী প্রচার করতে থাকে যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শেষ নবী নয় বরং যুগের চাহিদা মোতাবেক নবুওয়তের ধারা অব্যাহত থাকবে এবং অন্যান্য নবী ও রসূলগণের মত সে ও একজন নবী এবং রাসূল!

তার এ দাবী যে স্পষ্ট ভ্রান্ত তা নিম্নোক্ত আয়াত ও হাদিস দ্বারা সুপ্রতিভাত:

🔸 ১. আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন:
مَا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِنْ رِجَالِكُمْ وَلَكِنْ رَسُولَ اللَّهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّينَ
“মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তোমাদের কোন পুরুষের পিতা ছিলেন না। তবে তিনি আল্লাহর রাসূল এবং সর্বশেষ নবী।” (সূরা আহযাব: ৪০)

বিশ্ববিখ্যাত তাফসীর কারক আল্লামা ইমাম ইবনে কাসীর রহ. বলেন, “অত্র আয়াতের মাধ্যমে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, তাঁর মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পরে কোন নবী নাই। নবী যখন আসবেন না রাসূল আসার তো কোন প্রশ্নই উঠে না। এ ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে অসংখ্য মুতাওয়াতির হাদিস বর্ণিত হয়েছে। (৩য় খণ্ড, ৪৯৩ পৃষ্ঠা, মিসরিয় ছাপা)

🔸 ২. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:

((وَإِنَّهُ سَيَكُونُ فِي أُمَّتِي ثَلَاثُونَ كَذَّابُونَ كُلُّهُمْ يَزْعُمُ أَنَّهُ نَبِيٌّ وَأَنَا خَاتَمُ النَّبِيِّينَ لَا نَبِيَّ بَعْدِي))

“আমার উম্মতর মধ্য থেকে ত্রিশ জন মিথ্যাবাদী আসবে প্রত্যেকেই নিজেকে নবী বলে দাবী করবে। অথচ আমি হলাম শেষ নবী; আমার পরে কোন নবী নেই।” ইমাম তিরমিযী হাদিসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন। (তিরমিযী ৮/১৫৬ হাদিস নং ৩৭১০)

🔸 ৩. প্রখ্যাত সাহাবী আবু হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন:

إِنَّ مَثَلِي وَمَثَلَ الْأَنْبِيَاءِ مِنْ قَبْلِي كَمَثَلِ رَجُلٍ بَنَى بَيْتًا فَأَحْسَنَهُ وَأَجْمَلَهُ إِلَّا مَوْضِعَ لَبِنَةٍ مِنْ َاوِيَةٍ فَجَعَلَ النَّاسُ يَطُوفُونَ بِهِ وَيَعْجَبُونَ لَهُ وَيَقُولُونَ هَلَّا وُضِعَتْ هَذِهِ اللَّبِنَة ُقَالَ فَأَنَا اللَّبِنَةُ وَأَنَا خَاتِمُ النَّبِيِّينَ

“পূর্ববর্তী অন্যান্য নবীদের উপর ছয়টি বিষয়ে আমাকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। আমাকে দেয়া হয়েছে অল্প শব্দে অনেক বেশী অর্থবোধক কথা বলার যোগ্যতা, আমি অনেক দূর থেকে শত্রুবাহিনীর মধ্যে ত্রাস সৃষ্টির মাধ্যমে বিজয় প্রাপ্ত হই। গনিমত তথা পরাজিত শত্রুবাহিনীর ফেলে যাওয়া সম্পদ আমার জন্যে বৈধ করা হয়েছে। জমিনের মাটিকে পবিত্রতা অর্জনের মাধ্যম এবং সেজদা প্রদানের স্থান বানানো হয়েছে। সমগ্র সৃষ্টিকুলের জন্য আমাকে নবী বানানো হয়েছে এবং আমার মাধ্যমেই নবী আগমনের ধারাকে সমাপ্ত করা হয়েছে।” (মুসলিম হাদিস নং-৭১২)

এছাড়াও অসংখ্য সহীহ হাদিস দ্বারা দ্যার্থহীনভাবে প্রমাণিত হয় যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আখেরি-সর্বশেষ নবী । তাঁর পরে কোন নবী আগমন করবে না। পূর্ববর্তী সালাফে সালেহীন এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ একমত।

🌀 যুগে যুগে মুসাইলামা কায্‌যাব, তুলাইহা, আসওয়াদ আনাসীর মত অনেক ভণ্ড ও মিথ্যাবাদীর আবির্ভাব হয়েছে কিন্তু সবাইকে আল্লাহ ও তার রাসূলের অভিসম্পাতের অধিকারী হয়ে লাঞ্ছিত অবস্থায় দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে হয়েছে এবং তারই ধারাবাহিকতায় মির্যা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীও নিকৃষ্ট অবস্থায় পায়খানায় পড়ে মৃত্যুবরণ করে ইতিহাসের আস্তা কুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে।

🌀 পরিশেষে আহবান জানাব, আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর খতমে নবুওয়ত এবং এই কাদিয়ানী ফেতনা সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করতে হবে এবং এ ব্যাপারে আমাদের সর্বোচ্চ সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। যেন কোন অপশক্তি ইসলামের সুরম্য অট্টালিকায় প্রবেশ করে আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ তথা ঈমান হরণ করতে না পারে।

আল্লাহ আমাদেরকে হকের উপর জীবনের শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত টিকে থাকার তৌফিক দিন। আমীন ॥

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Archives

October 2020
S S M T W T F
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31  
shares