• আসসালামুআলাইকুম, আমাদের ওয়েবসাইটে উন্নয়ন মূলক কাজ চলিতেছে, হয়তো আপনাদের ওয়েব সাইটটি ভিজিট করতে সাময়ীক সমস্যা হতে পারে, সাময়ীক অসুবিধার জন্য আমরা আন্তরিক ভাবে দুঃখিত।

বৃহস্পতিবার, ২৭শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ, ১৫ই রবিউস-সানি, ১৪৪১ হিজরী

নওমুসলিমদের সাক্ষাৎকার [পর্ব-০৬] :: মুহাম্মদ উমর (রাজবীর ঠাকুর)-এর সাক্ষাৎকার

ইসলাম প্রতিটি মানুষের প্রয়োজন। তার ক্ষুধা-তৃষ্ণার প্রকৃত চিকিৎসা হলো ইসলাম। আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদের কাছেই গচ্ছিত রেখেছেন পুরো মানবতার সকল ব্যাধির সমাধান ও চিকিৎসার ভার। সুতরাং আমি মুসলমানদের আমন্ত্রণ জানাবো মানবতার প্রতি আপনারা আন্তরিক হোন। মানুষকে দোযখ থেকে বাঁচানোর কথা ভাবুন। ইনশাআল্লাহ! পরবর্তী সাক্ষাতে আমার দাওয়াতী অভিজ্ঞতা এবং আগামী দিনের ইচ্ছাÑ এসব বিষয়ে কথা বলবো। আমি আশা করি আমার উদ্দেশ্য সাধনে আপনার সহযোগিতাও পাব।

আহমদ আওয়াহ: আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু!
ডা. মুহাম্মদ উমর: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু!

আহমদ আওয়াহ: ডাক্তার সাহেব! আব্বু আলীগড় থেকে ফিরে আপনার কথা বলেছিলেন। আপনাকে দেখার খুব ইচ্ছা ছিল। গতকাল আব্বু বললেন, আপনি দিল্লী আসছেন। মথুরা যাওয়ার সময় আমাকে বলে গেছেন আমি যেন আপনার সাথে সাক্ষাত করি এবং আরমুগানের জন্য একটা সাক্ষাতকার নিই। প্রথমেই আপনার ব্যক্তিগত পরিচয় সম্পর্কে কিছু বলুন।

ডা. মুহাম্মদ উমর: স্কুল সার্টিফিকেট হিসেবে আমার জন্ম ১৯৩৯ সালের ৩০ অক্টোবর বেনারসের একটি গ্রামে। আমি একটি রাজপূত খান্দানে জন্মগ্রহণ করেছি। আমার পিতাজী ছিলেন বড় জমিদার। আমার নাম রেখেছিলেন রাজবীর ঠাকুর। আমার প্রাথমিক লেখাপড়া হয়েছে গ্রামের স্কুলেই। হাই স্কুল শেষ করার পর বেনারস চলে গিয়েছি। বি.কম শেষ করেছি ওখানে। আমার চাচা ছিলেন বেনারস ইউনিভার্সিটির প্রফেসর। তিনি আমাকে ইংল্যান্ড গিয়ে এম.বি.এ করার পরামর্শ দেন। তাছাড়া ওখানে যাওয়ায় আয়ও বেড়ে গেল। আমি পি.এইচ.ডিতে রেজিস্ট্রেশন করে নিলাম। এরই মধ্যে সংবাদ পেলাম হার্ট এ্যাটাক করে বাবা মারা গেছেন। একজন প্রবাসী পুত্রের কাছে পিতৃবিয়োগের এই দুঃসংবাদ কতটা বেদনাদায়ক হতে পারে তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। এটা ছিল আমার জীবনের সবচে’ কষ্টদায়ক সময়। আমি বসেবসে ভাবতাম, নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্য পরিবারিক জীবনের মাথায় কুড়াল মেরে বাইরে চলে এলাম। আজ যদি আমি পারিবারিক জমিদারী দেখাশোনা করতাম। পিতা-মাতার সেবায় উপস্থিত থাকতাম তাহলে কতো ভালো হতো! আমি এসব ভাবতে ভাবতে হতাশ হয়ে পড়তাম।

অবশেষে দেশে ফিরে এলাম। ইচ্ছা ছিল লেখাপড়া বন্ধ করে দেব। কিন্তু মা বাঁধা দিয়ে বললেন, আমার পি.এইচ.ডির খবর শুনে আমার পিতাজী নাকি খুব খুশি হয়েছিলেন। তিনি নাকি মানুষকে বলতেন আমাদের তো সহায়-সম্পদের অভাব নেই। এবার ছেলেটা যদি পি.এইচ.ডিটা করতে পারে তাহলেই ভালো। আমার মা আমাকে বলেছেন তুমি যদি পি.এইচ.ডিটা শেষ করো তাহলে তোমার পিতাজীর আত্মা খুশি হবে। আমি পুনরায় ইংল্যান্ডে ফিরে যাই। বিজনেস ম্যানেজমেন্টে পি.এইচ.ডি শেষ করি। তারপর বাড়িতে ফিরে আসি। আমি যখন ব্যবসায় পি.এইচ.ডি করি তখন আমাদের এদেশে এম.বি.এ করা লোকও ছিল হাতে গোনা। তাছাড়া আমাদের দেশে তখনও বিজনেস ম্যানেজমেন্টে পি.এইচ.ডি চালুই হয়নি।

আমার ধারণায় আমরা খুব অল্প কজনই এ বিষয়ে তখন পি.এইচ.ডি করেছি। ইচ্ছা ছিল দেশে কোনো একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করবো। কিন্তু আমার উদ্দেশ্য সফল হয়নি। আমার আগ্রহ ছিল কোনো মানসম্পন্ন ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা করার। আমি এ বিষয়ে চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম। এরই মধ্যে জমশেদপুর টাটানগর থেকে সেখানকার প্রধান জেনারেল ম্যানেজার আসলো। আমাকে সেখানে নিয়ে গেল এবং একটি কোম্পানির জেনারেল ম্যানেজার বানিয়ে দিল। অথচ আমার মন ছিল শিক্ষকতায়। পাঁচ বছর চাকরি করার পর সুযোগ পেয়ে গেলাম। বেনারস ইউনিভার্সিটিতে ভালো একটি চাকরি হয়ে গেল আমার। এদিকে আমার মা বিয়ে-শাদির জন্য পীড়াপীড়ি করাতে অবশেষে আমাকে বিবাহ করতে হয়। আমার স্ত্রী দিল্লী সেন্ট স্ট্যাফিন কলেজ থেকে গ্রাজুয়েশন করেছে। সে ইউনিভার্সিটির একজন রেজিস্টার। মূলত তার সহযোগিতায়ই আমি খুব দ্রুত প্রফেসর-এ উন্নীত হই। তারপর ১৯৯৯ সালে ডীন হিসেবে অবসর গ্রহণ করি।

এই ছিল আমার প্রথম জনমের ইতিহাস। এই জীবনে আমি অনেক বাঁকের মুখোমুখি হয়েছি। কত বন্ধুর সাথে পরিচয় হয়েছে। কত অফিসার ছাত্রের সাথে ওঠাবসা হয়েছে। আমার এই জীবন এক দীর্ঘ ইতিহাস। তাছাড়া আমার বিয়ের কাহিনীও দীর্ঘ এবং রোমাঞ্চকর। তবে এসবই হলো আমার প্রথম জম্মের কাহিনী। এই জম্মের কাহিনী বলেই বা লাভ কী।

আহমদ আওয়াহ: আলহামদুলিল্লাহ! আপনি এখন মুসলমান। আপনি বারবার প্রথম জম্মের কথা বলছেন। ইসলামে এর কোনো স্থান নেই।
ডা. মুহাম্মদ উমর: হ্যাঁ, পূর্বজন্মের কথা যেটা বলছি সেটা হলো হিন্দুধর্মের কথা।
আমি আগেও এতে বিশ্বাসী ছিলাম না। অবশ্য ইসলামে দ্বিতীয় এবং তৃতীয় জনমের কথা আছে। আমরা একসময় রূহের জগতে ছিলাম। সেখান থেকে এই দুনিয়ায় জন্মলাভ করেছি। আমাদের সামনে আখেরাতের একটা জগত অপেক্ষা করছে। আর আমি এখানে যে প্রথম জীবনের কথা বলছি সেটা কেবল আমার জীবনেরই বিষয়। অবশ্য আমার মতো আরও যারা ভাগ্যবান আছে তাদের জীবনের একটা অধ্যায় যারা এই পৃথিবীতে আসার পর দ্বিতীয়বার নতুন জীবন লাভ করেছে। আপনি আমার কথা শোনলে বিশ্বাস করতে বাধ্য হবেন, প্রথম এবং দ্বিতীয় জনম বলতে একটা কিছু আছে।

আহমদ আওয়াহ: হ্যাঁ, ইসলাম গ্রহণের পর নতুন একটি জীবন অবশ্যই শুরু হয়।
ডা. মুহাম্মদ উমর: হ্যাঁ, এইতো বুঝেছেন। তাহলে আপনিও দ্বিতীয় জনমে বিশ্বাসী।

আহমদ আওয়াহ: এবার তাহলে এই দ্বিতীয় জনমের কথাই বলুন!
ডা. মুহাম্মদ উমর: অবসর গ্রহণ করার পর বিভিন্ন জায়গা থেকে অফার আসতে থাকে চাকরির। অবশেষে আমি বাজাজ কোম্পানির আমন্ত্রণে সাড়া দিই।

বাজাজ কোম্পানির ইচ্ছা ছিল ইউপিতে কিছু সুগার মিল করবে। এজন্য তাদের একজন এডভাইজার দরকার ছিল। আমি আমার সার্বিক দিক বিবেচনায় এই কাজটাকে উপযুক্ত মনে করি এবং তাদের আমন্ত্রণে সাড়া দিই। ২০০৩ সালের জানুয়ারী মাসের কথা। একটি মিটিংয়ের উদ্দেশ্যে মুম্বাই যাবো। ফেরার পথে আলীগড়ের কাছাকাছি একটা এলাকা পরিদর্শনে যেতে হবে। বিমানে দিল্লী পৌঁছে পরমুহূর্তে লম্বা সফর। এটা আমার কাছে খুবই কষ্টকর মনে হচ্ছিলো। ভাবছিলাম অগ্যস্ত ক্রান্তিতে মথুরায় এসে সেখান থেকে সাইডে চলে গেলে ভালো হবে। এই ভেবে ফার্স্টক্লাসে রিজার্ভেশন করলাম। মুম্বাইয়ের সড়ক পথে কী যে জ্যাম হয়। গাড়ি ছাড়ার আধা মিনিট আগে আমি এসে ট্রেনে বসলাম।

চলতি গাড়িতেই হাঁটতে হাঁটতে আমার কেবিনে পৌঁছে দেখি একজন মুসলমান ভদ্রলোক আমার কেবিনে বসে আছেন। তার সাথে কথা হলো এবং করমর্দন হলো। মনে মনে খুশি হলাম একজন ধার্মিক মানুষের সাথে সফরটা ভালোই কাটবে। সিটের নীচে সামান রেখে কাপড় পরিবর্তন করলাম। হাতমুখ ধুয়ে এসে আরাম করে বসলাম। ভদ্রলোকের কাছে জানতে পারলাম, তিনি ইউপির মুজাফফরনগর জেলার খাতুলির নিকটবর্তী একটি বিদ্বান ও বুযুর্গ পরিবারের মানুষ। বিশেষ করে বিশ্ববিখ্যাত ইসলামী মহাপুরুষ মাওলানা আলী মিয়া নদবীর সাথে তার বিশেষ ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। মূলত সেই ধার্মিক ভদ্রলোক ছিলেন আপনার বাবা কালিম সিদ্দীকি। কয়েকটা দিক তার সাথে আমার মিলে গেল। একে তো ইউনিভার্সিটিতে চাকরি করা অবস্থায় খাতুলিতে আমি বারবার গেছি। আমার এক বন্ধুর সুবাদে ওখানে আমার আরো বেশি যাওয়া হয়েছে। তিনি ছিলেন খাতুলি সুগার মিলের জিএম। তিনি তার মিলের কর্মচারীদের উদ্দেশ্যে লেকচার দেয়ার জন্য আমাকে বহুবার ডেকে এনেছেন। তাছাড়া কয়েকবার পরিবারে ওখানে ছুটি কাটাতেও গিয়েছি। দ্বিতীয়ত এই ধার্মিক লোক ইউপির অধিবাসী। তৃতীয়ত মুসলমানদের ভেতর আমি সর্বাধিক প্রভাবিত ছিলাম মাওলানা আলি মিয়া নদবির দ্বারা। আমি ছয়-সাতবার লক্ষ্মৌ তাঁর খেদমতে গিয়েছি। পয়গামে ইনসানিয়াত এর প্রোগ্রামে চার-পাঁচবার অংশগ্রহণ করেছি। আমি আমার ব্যাগ থেকে কিছু নাশতা বের করে মাওলানার খেদমতে পেশ করলাম।

প্রথমে তিনি খেতে অস্বীকার করলেন। কিন্তু আমার পীড়াপীড়িতে সামান্য কিছু তুলে নিলেন। আমি একটি দীর্ঘ মিটিং থেকে ফিরেছি ফলে ক্লান্ত ছিলাম। মাওলানা সাহেবও মুম্বাইয়ে অনেক ব্যস্ত সময় কাটিয়ে এসেছেন। ফলে এক-দুই ঘন্টা আমাদের মধ্যে কোনো কথাবার্তা হয়নি। সাতটার পর আমি মাওলানাকে বললাম অত্যন্ত ক্লান্ত অবস্থায় গাড়িতে চড়েছিলাম। ভেবেছিলাম গাড়িতে ওঠার পরই ঘুমিয়ে পড়বো। কিন্তু আপনাকে দেখে মনে হলো একজন ধার্মিক সঙ্গী পেয়েছি। বিশ্রাম কালও করতে পারব, আজ না হয় আত্মার শান্তির জন্য ঘুমটা ছেড়েই দিলাম। ধর্মের প্রতি আামর বেশ আগ্রহ রয়েছে। আমি অনেক ধার্মিক লোকের সাথে মিশেছি। তাছাড়া বেনারস তো এমনিতেই হিন্দু প-িতদের নিবাস। এলাহাবাদ, ঋষিকেশ, হরিদুয়ার ছিল আমার নিয়মিত যাতায়াতের জায়গা। জায়গুরুদেব, ব্র‏হ্মাকুমারী, রামকৃষ্ণ মিশন, রাধাস্বামী সত্যসংঘ, নরিনকারী সত্যসংঘ, এনিনাথ ছাড়াও গোল্ডেন টেম্পলে গিয়েছি। আমি বৌদ্ধমতের অনুসারীদের সাথে অনেক মেলামেশা করেছি। দালাইলামার সাথেও সাক্ষাত করেছি। দক্ষিণাঞ্চলের আশ্রমগুলোতেও সময় কাটিয়েছি। বেরেলি আজমীর গিয়েছি।

আসলে আমার স্বভাবটাই হলো অনুসন্ধানী। এতোসব জায়গা ঘুরেও আমি মানসিক শান্তিটা আজও পাইনি। মাওলানা সাহেবকে বললাম, মাঝে মধ্যে আত্মার শান্তির জন্য আমি মসজিদে চলে যাই। সেখানে গেলে অন্তরে শান্তি অনুভূত হয়। তাছাড়া মাওলানা আলি মিয়া নদবির সাথে যখনই সাক্ষাত করেছি অদ্ভূত রকমের এক শান্তি পেয়েছি। আমার মনে হয়েছে যেন গরম রৌদ্রতাপ থেকে হালকা শীতল ছায়ায় এসে আশ্রয় নিয়েছি। এই দুই-আড়াই ঘন্টা যে আমি আপনার সামনে বসে আছি মনে হচ্ছে আমি যেন আলী মিয়াজির পাশেই বসে আছি।

মাওলানা সাহেব আমাকে বললেন, আপনার অন্তরটা খুবই পরিষ্কার এটা তারই প্রমাণ। আসলে মানুষের অন্তর হলো আয়নার মতো একটা বিষয়। যদি অন্তর পরিষ্কার থাকে তাহলে তার সামনে যা আসে তাই পরিষ্কার দেখায়। সত্য কথা হলো আমি মুজাফফরনগরের একজন গোয়ার মানুষ। জীবনে যা কিছু লাভ করেছি তা কেবলই আমার মালিক এবং হযরত মাওলানা আলী মিয়া সাহেবের সংস্পর্শের উসিলায়। তাঁর চরণধূলির বরকতেই আল্লাহ তায়ালা আমাদের কিছু দান করেছেন। এখানে নিজের কিছুই নেই। মাওলানা বারবার বলছিলেন, আপনার অনুভূতি সত্যি বিস্ময়কর। আসলে মাওলানা আলী মিয়া নদবীর কারণে আমরা উভয়ে নিজেদের একই ঘরের সদস্য মনে করতাম। মাওলানা সাহেব আমাকে বিস্তারিত প্রশ্ন করতে থাকেন। তিনি জানতে চাইলেন, প্রথমে আপনি কোনো ধর্মগুরুর সাথে দেখা করেছেন।

আমি বেনারসের বিভিন্ন আশ্রম, হিন্দুদের বিভিন্ন পন্ডিতের সাথে আমার সাক্ষাত ও বিভিন্ন ধর্মের লোকদের সাথে সাক্ষাতসহ সেইসব জায়গা থেকে নিরাশ হয়ে ফিরে আসা এবং আমার মনের অস্থিরতার বিস্তারিত বিবরণ মাওলানার সামনে তুলে ধরি। আমার কাহিনী মাওলানা নীরবে শুনতে থাকেন। রাত বারটার সময় কাহিনী শেষ হয়। তখন হযরত বলেন আমিও আপনাকে কিছু শোনাতে চাই। কিন্তু আপনি মুম্বাই সফর থেকে এসেছেন। খুব ক্লান্ত। এখন বিশ্রাম করুন। আমি আগামী কাল সকালে কয়েক মিনিট সময় আপনার কাছ থেকে নেব। এবার আমি আমার ভুল বুঝতে পারি। একজন ধার্মিক মানুষ যার সঙ্গলাভের প্রভাব আমি অন্তরে অনুভব করছিলাম। তার সামনে ‘মুখ’ না হয়ে ‘কান’ হয়ে থাকা উচিত ছিল। আমি কোনো এক সুফির এই উপদেশ পড়েছিলাম, কোনো পীরের সঙ্গ থেকে উপকার পেতে হলে মুখ বন্ধ রেখে কান খোলা রাখতে হয়। আমি তার কাছে ক্ষমা চাইলাম। বললাম, আপনার অনেক সময় নষ্ট করেছি, আপনাকে ক্লান্ত করে ফেলেছি। মাওলানা পরম আন্তরিকতার সাথে আমার হাত চেপে ধরলেন। মমতার সাথে বললেন, ঠাকুর সাহেব! এ কেমন কথা! আপনার কথা শুনে আমি বেশ আনন্দ পেয়েছি। অল্প সময়ের ভেতর আমি অনেক কিছু শিখতেও পেরেছি। আপনি বরং আমার উপর অনুগ্রহ করেছেন।

আমি মাওলানা সাহেবের আচরণে মুগ্ধ হই। সোয়া বারোটার দিকে আমরা উভয়ে শুয়ে পড়ি। খুব সকালে মাওলানা ঘুম থেকে উঠলেন এক আধবার আমারও চোখ খুলেছে। দেখেছি কেবিনে তিনি নামায পড়ছেন। দুআ করছেন। সকাল আটটায় লোকজন আমাকে নাস্তার জন্য জাগিয়ে দেয়। আমি টয়লেট থেকে ফ্রেশ হয়ে আসি। নাশতা করার পর মাওলানা সাহেব তার কথা শুরু করেন। ট্রেন রাস্তায় এক ঘন্টা লেট করেছিল। তখনও মথুরায় পৌঁছতে আরও দেড় ঘন্টা সময় লাগবে। মাওলানা সাহেব আমাকে ইসলাম সম্পর্কে কিছু কথা বললেন। তারপর আমাকে জোর দিয়ে বললেন আপনি কালেমা পড়ে নিন। আর আমাকে তিনি বারবার বলছিলেন, আপনার এই দীর্ঘ কাহিনী শুনে আমি নিশ্চিত হয়েছি আল্লাহ তায়ালা আপনাকে কেবল মুসলমানই বানাননি। মুসলমান তো জম্মগতভাবে প্রতিটি মানুষই। আল্লাহ তাআলা আপনাকে মুসলমানই রেখেছেন। আমার আশা আপনার মৃত্যু হবে মুসলমান অবস্থায়। সুতরাং আপনি আজই কালেমা পড়ে নিন। তাছাড়া আমি আপনার একটি নামও ঠিক করে ফেলেছিÑ ‘মুহাম্মদ উমর’, তারপর তিনি তার ব্রিফকেস থেকে ‘আপকি আমানত’ পুস্তিকাটি বের করে দিলেন। আমি পড়তে লাগলাম।

মাওলানা সাহেব বললেন, এটা আপনি পরেও পড়তে পারবেন। এটা দিয়েছি এজন্য যে, এটা পড়ে আপনার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে আপনি পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হতে পারেন। আমার ইচ্ছা আপনি এখনই কালেমা পড়ে নিন। আমি বললাম, এত সহজেই তো আর সিদ্ধান্ত দেয়া সম্ভব নয়। আমি আরো চিন্তা ভাবনা করি। তারপর ফুলাতে আপনার কাছে আসবো। তিনি বললেন, দুই দিন পর আলীগড়ে আমার একটি সফর আছে। একদিন রাত ওখানে থাকবো। ফোনে যোগাযোগ করে আপনি সেখানেও দেখা করতে পারেন। সেই সাথে এ-ও বলে দিলেন, এ বিষয়ে দেরী করা ঠিক হবে না। কারণ, কখন মৃত্যু এসে যায় তাতো বলা যায় না। আমি বললাম, আমি খুব দ্রুত এবং আন্তরিকভাবে চিন্তা-ভাবনা করবো। আর আলীগড়ে তো অবশ্যই দেখা করবো।

ট্রেন মথুরায় চলে এসেছে। মাওলানা সাহেব দরজা পর্যন্ত আমাকে এগিয়ে দিতে আসলেন। গাড়ি যখন চলছে তখনও লক্ষ্য করলাম, জানালা দিয়ে তিনি আমাকে দেখছেন। আমি গাড়ি থেকে নেমে আসলাম ঠিক, কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল কে যেন ভেতর থেকে আমাকে বারবার চাপ দিচ্ছে। এই অনুভুতি ক্রমে প্রখর হচ্ছিলো, দুপুরের দিকে আমি মাওলানা সাহেবকে ফোন করলাম। কিন্তু আমার দূর্ভাগ্য তাকে পেলাম না। পরের দিন অন্তত পঞ্চাশবার চেষ্টার পর তাঁকে পেলাম। জানতে পারলাম তিনি চন্ডিগড়ে প্রোগ্রামে গেছেন। আমি ওখানেই দেখা করার অনুমতি চাইলাম। তিনি বললেন, আমি তো এখনই বের হয়ে যাচ্ছি আপনি আলীগড়েই আসেন। একদিন অপেক্ষা করা আমার জন্য খুবই কঠিন ব্যাপার ছিল। যখনই আমার অনুভূতি চরমে উঠতো ‘আপকি আমানত’ নিয়ে বসতাম। দিনে অন্তত দশবার আমি পুস্তিকাটি পড়েছি। চরম অস্থিরতার ভেতর দিয়ে পরের দিন দশটায় আমি আলীগড়ে পৌঁছি। গেস্ট হাউজে তার জন্য অপেক্ষা করতে থাকি। নির্ধারিত রুটিন মাফিক বারটায় এসে তিনি আমাকে অপেক্ষারত দেখে খুব খুশি হন। সাক্ষাতের পর ওখানেই আমি তাকে কালেমা পড়াতে বলি। তিনি সাথে সাথেই আমাকে কালেমা পড়িয়ে দেন। গভীর ভালোবাসায় আমার মাথায় চুমু খান। বলেন, ট্রেনেই তো আপনার নাম রেখে দিয়েছি ‘মুহাম্মদ উমর’। সুতরাং এখন থেকে আপনি মুহাম্মদ উমর।

আহমদ আওয়াহ: ইসলাম গ্রহণের পর আপনার অনুভূতি কী হয়েছিল?
ডা. মুহাম্মদ উমর: আহমদ মিয়া! ইসলাম গ্রহণের পর আমার মনে হয়েছিল যেন আমি নতুন করে জন্ম গ্রহণ করেছি। আমার কাছে আরও মনে হয়েছে যেন কোনো ভয়ানক দূর্ঘটনার হাত থেকে আমি রক্ষা পেয়েছি। ২০০৩ সালের ২৮ শে নভেম্বর থেকে আজ পর্যন্ত প্রতিটি মুহূর্তেই আমার কাছে হযরত মাওলানার এই কথার সত্যতা উজ্জ্বল হয়ে দেখা দিয়েছে, প্রতিটি সন্তানই মুসলমান অবস্থায় জন্মগ্রহণ করে। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা আপনাকে সেই স্বভাবজাত মুসলমান হিসেবেই রেখেছেন। আসলে ইসলাম গ্রহণ করার পর আমার কাছে কোনো অপরিচিত কিছু মনে হয়নি। বরং আমার কাছে মনে হয়েছে আমি আপন ঠিকানায় আছি। আমি আমার বিশ্বাসেই আছি।

ইসলাম গ্রহণের আগের দুইদিন আমি এমন অস্থিরতায় কাটিয়েছি, সাইড পরিদর্শনের জন্য যেতে পারিনি। ফলে তিনদিন পর্যন্ত আমি সমস্ত কাজকর্ম বন্ধ রেখেছি। তাছাড়া হযরতও আমার ইসলাম গ্রহণে খুবই খুশি হয়েছেন। তিনি আমাকে বলেছেন, আমাদের মতো মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষ ফার্স্টক্লাস এসি তো দূরের কথা থার্ড এসিতেও সফর করে না। আমি তো বরাবরই সিøপার ক্লাসে সফর করি। আসলে ঐদিন আমার ফেরার কথা ছিল না। ফলে আমাদের বন্ধু মুফতী মুহাম্মদ হারুন সাহেব আগ্যস্ত ক্রান্তিতে রিজার্ভেশন করিয়ে দেন। একদিন আগেই অবশ্য টিকিট করা ছিল। কিন্তু তিনি আমাকে টিকিট দেননি। বরং নিজে এসে আমাকে গাড়িতে তুলে দিয়ে গেছেন। যখন তিনি আমাকে নিয়ে ফার্স্ট এসির বগির দিকে যাচ্ছিলেন তখন আমি পেছন থেকে বারবার বলছিলাম, এতো ফার্স্ট এসি। মুফতী সাহেব এবং নওমুসলিম ভাই আব্দুল আজীজ আমাকে বললো, আমাদের সামনে দিয়ে এগুলো চলে যাবে আর আমরা কম্পার্টমেন্টের ভেতরে থেকেও দেখতে পাবো না এটা কোনো কথা হলো! তারা যখন আমাকে ফার্স্ট এসির ভেতর এনে বসিয়ে দিলেন তখন আমি বললাম আমি এতে সফর করবো না। মুফতী সাহেব বললেন, আসলে অগ্যস্ত ক্রান্তিতে রিজার্ভেশন পাওয়া যায়নি। তারপর আব্দুল আজীজ পয়সা নিয়ে গেল। বললো আমি রিজার্ভেশন করিয়ে আনছি। যখন ফার্স্ট ক্লাসের টিকিট দেখলাম তাকে বললাম, মাওলানা তো ফার্স্ট এসিতে সফর করবেন না! ভাই আব্দুল আজীজ বললো আমি মাওলানাকে রাজি করবো।

যখন কোনভাবেই আমি প্রস্তুত হচ্ছিলাম না তখন আবুল আজীজ বললো, দেখুন, বিমানে তিন ঘন্টা সফরের সময় ড. কাসেমের মতো মানুষ মুসলমান হয়েছেন। আর এখানে আপনার সাথে অন্তত আরও তিনজন ব্যক্তি থাকবেন। পথে সময় পাবেন ঘোল ঘন্টা। সামান্য কিছু টাকা খরচ হওয়ার বিনিময়ে যদি তিন জন ভিআইপি ইসলাম গ্রহণের সুযোগ পান তাহলে তো আমি মনে করি এটা খুবই সস্তা সদাই।
একথা শোনার পর আমি চুপ হয়ে গেলাম। কিন্তু ফার্স্ট এসিতে কে কতো সফর করে? যারা পরের পয়সায় সফর করে তারাই না ফার্স্ট এসিতে ওঠে। গাড়ি যখন ছাড়ার সময় হলো অথচ কেউ এলো না তখন মনে মনে ভাবলাম, আচ্ছা ঠিক আছে, আমি অন্য কেবিনে গিয়ে মানুষের সাথে কথাবার্তা বলবো, তারপর যখন আপনি এলেন এবং মুখোমুখি একজন দাড়িওয়ালা মানুষকে দেখে বিস্মিত না হয়ে বরং আনন্দ প্রকাশ করলেন তখন সত্যিই আমি কিছুটা আশ্চর্য হয়েছি। আমিও মাওলানা সাহেবকে বললাম, আপনাকে ফার্স্ট এসিতে দেখে আমিও কিন্তু মনে মনে আশ্চর্য হয়েছি। কিন্তু পরে ভেবেছি হয়তো কোনো ভক্ত টিকিট কিনে দিয়েছে। কিন্তু আজ অনুভূত হচ্ছে, কোনো ভক্ত নয়; বরং আমার দয়াময় মালিক আমার মতো তৃষিত এবং অস্থির বান্দার প্রতি করুণা করে আপনার মতো হৃদয়বান স্বজনকে এসি বগিতে পৌঁছে দিয়েছিলেন।

আহমদ আওয়াহ: তারপর কী হলো?
ডা. মুহাম্মদ উমর: আমি বারবার আল্লাহ তায়ালার অনুগ্রহের জন্য তাঁর দরবারে সেজদা আদায় করি। তাঁর প্রশংসা করি তিনি স্বভাবগতভাবেই আমার জন্য ইসলামকে সহজ করে দিয়েছেন।

আহমদ আওয়াহ: আপনার পরিবারের অবস্থা কিছু বলবেন?
ডা. মুহাম্মদ উমর: আমার স্ত্রীকে নিয়ে অবশ্য আমাকে কিছুটা ঝামেলা পোহাতে হয়েছে। আমার ইসলাম গ্রহণের সংবাদ শুনে সে আমার সংসার ছেড়ে চলে যায়। প্রায় এক বছর আমরা আলাদা থাকি। আমি আল্লাহ তায়ালার কাছে খুব দুআ করতে থাকি। আল্লাহ তায়ালা অবশেষে আমার দুআ কবুল করেন। সে নিজ থেকেই ইসলাম গ্রহণ করার জন্য রাজি হয়ে যায়। ইসলাম গ্রহণ করার পর মাওলানা সাহেব তার নাম রাখেন আয়েশা। ইসলাম সম্পর্কে সে অনেক পড়াশোনাও করেছে। নিয়মিত তাহাজ্জুদ পড়ে। আমি এ পর্যন্ত দুই চিল্লা দিয়েছি। আমার ছেলে এবং তার স্ত্রী দুই সন্তানসহ আমেরিকার নিউইয়র্কে থাকে। তারাও পুরো পরিবারসহ মুসলমান হয়েছে। অবশ্য তাদের মুসলমান হওয়ার ক্ষেত্রে আমাকে কোনো কষ্ট করতে হয়নি। আমার মেয়েও মুসলমান। এখন ফ্রান্সে থাকে। আমার পরামর্শে সে এক আরব যুবককে বিয়ে করেছে। তার ইসলাম গ্রহণের কাহিনী বেশ দীর্ঘ। মৌলভী আহমদ! সেই কাহিনী শোনার মতই। কিন্তু আমার ফ্লাইটের সময় ঘনিয়ে এসেছে। আমাকে চীন যেতে হবে। তো ইনশাআল্লাহ! পরে কখনও এ বিষয়ে কথা বলবো।

আহমদ আওয়াহ: এক মিনিটে মুসলমানদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন।
ডা. মুহাম্মদ উমর: ইসলাম প্রতিটি মানুষের প্রয়োজন। তার ক্ষুধা-তৃষ্ণার প্রকৃত চিকিৎসা হলো ইসলাম। আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদের কাছেই গচ্ছিত রেখেছেন পুরো মানবতার সকল ব্যাধির সমাধান ও চিকিৎসার ভার। সুতরাং আমি মুসলমানদের আমন্ত্রণ জানাবো মানবতার প্রতি আপনারা আন্তরিক হোন। মানুষকে দোযখ থেকে বাঁচানোর কথা ভাবুন। ইনশাআল্লাহ! পরবর্তী সাক্ষাতে আমার দাওয়াতী অভিজ্ঞতা এবং আগামী দিনের ইচ্ছা, এসব বিষয়ে কথা বলবো। আমি আশা করি আমার উদ্দেশ্য সাধনে আপনার সহযোগিতাও পাব।

আহমদ আওয়াহ: আপনাকে অনেক অনেক শোকরিয়া। জাযাকাল্লাহ! যে কোনো মুহূর্তে আমি উপস্থিত আছি। আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু!
ডা. মুহাম্মদ উমর: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহু!


সাক্ষাৎকার গ্রহণে
মাও. আহমদ আওয়াহ নদভী
মাসিক আরমুগান, ফেবরুয়ারী – ২০০৭

Series Navigation<< নওমুসলিমদের সাক্ষাৎকার [পর্ব-০৫] :: আব্দুল্লাহ ভাই-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎকারনওমুসলিমদের সাক্ষাৎকার [পর্ব-০৭] :: ভাগ্যবতী বোন যায়নাব (চৌহান) >>

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

December 2019
S S M T W T F
« Nov    
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031  
shares